এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শুক্রবার, 13 নভেম্বর 2015 21:05

মানুষের নয়, রাজনীতির উন্নয়নে ভেসে যাচ্ছি আমরা!

এস.এম সাজু আহমেদ:  এস.এম সাজু আহমেদ:

এস.এম সাজু আহমেদ: অনেক দিন পর সেদিন রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। আমার পাশের বেঞ্চে বসে চা খাচ্ছিল আরও কয়েকজন। শহর থেকে কিছুটা দূরে মোটামুটি নির্জন এলাকায় চা খেতে বেশ ভালোই লাগছিল। কিন্তু চায়ের কাপে চুমুক দেয়ার সাথে  শুরু হয়ে গেল দেশের বর্তমান অবস্থার হালচাল নিয়ে বিক্ষিপ্ত আলোচনা-সমালোচনা। দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানা বিষয়ে চলছে আমার পাশের বেঞ্চে বসা ৪/৫ জনের তর্ক-বিতর্ক। আমি কান খাড়া করে শুনে যাচ্ছিলাম তাদের কথাবার্তা। কেউ বলছেন- পুরো দেশ আর দেশের মানুষকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খাচ্ছে সরকারি দল। আবার কারো অভিমত- দেশের অশান্তির মূলে মূলত বিএনপি-জামায়াত। কেউ বলছে- দেশের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। সরকারি দল দেশকে অনেক এগিয়ে নিয়ে গেছে, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে দেশ। পাল্টা অপর জনের মন্তব্য- দেশের উন্নয়ন নয় বরং সরকারি দল শুধু নিজেদেরই উন্নয়ন করছে তাদের পাঞ্জাবির নিচের ভুঁড়িটাকে ফুলিয়েছে তারা। তাদের রাজনীতির উন্নয়নে ভেসে যাচ্ছি আমরা। এরকমই নানা অভিমত শুনলাম। 

 

প্রকৃতপক্ষে রাজনীতি এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিষয়ে এমন সব আলোচনা অনেক আগে থেকেই চলমান। আর গত ৫ জানুয়ারি বিরোধীদলকে বাদ দিয়ে দশম নির্বাচনের পর থেকে এই আলোচনা-সমালোচনা যেন আরো বাড়িয়ে দিয়েছে এবং দিন দিন আরো বেড়েই চলছে। বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক, শিক্ষাব্যবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ প্রায় সকল কাঠামোতেই যেন বেহাল দশা বিরাজমান। দেশের প্রত্যেকটি মানুষ যেন সর্বদা উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় দিনাতিপাত করছে। ঘুম থেকে উঠে দৈনন্দিন কাজে বের হয়ে আবার বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা এরকম নিশ্চয়তা নেই বললেই চলে। সাধারণ মানুষ তাদের রুজি রোজগারের চেষ্টায় দিন দিন হাহাকারের দিকে পতিত হচ্ছে। এছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রে দুর্নীতি, ঘুষ দিন দিন কঠিন আকার ধারণ করছে।

 

বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে রমরমা ঘুষ বাণিজ্যের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়- গত কয়েকদিন আগে আমার এক নিকটাত্মীয় এক সমস্যায় পড়িছিল। এ কারণে আমি স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সাথে কয়েকবার ফোনে যোগাযোগ করে সমস্যাটি আইন অনুযায়ী সমাধানের চেষ্টা করি।  ওসি সাহেব আমাকে প্রত্যেকবারই খুব সুন্দরভাবে কাজটি করে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে কাজটি আর হচ্ছিল না। আর শেষের দিকে আসল ভিন্ন পন্থা, এক নেতা মারফত প্রস্তাব এল তাদের সন্তুষ্ট করলে কাজটি দ্রুত হয়ে যাবে, অবশেষে সরকার দলীয় এক নেতা মারফত ওসি সাহেবের প্রতিনিধির হাতে কিছু কাগজের টাকার নোট ধরিয়ে দেয়া হলে মাত্র ৫ ঘণ্টায় সম্পন্ন হয়ে গেলে কাজটি। তেমনিভাবে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার অন্যতম স্থান সচিবালয়ও ঘুষ বাণিজ্যে পিছিয়ে নেই।  কিছু দিন আগে আমার এক পরিচিত জনের কোনো একটি কার্ডের জন্য সচিবালয়ে ধরণা দিতে হয়েছিল। এরপর বেশ কয়েকদিন ঘুরেও যখন কাজটি হচ্ছিল না তখন শেষ পর্যায়ে এক আওয়ামী লীগ নেতার মাধ্যমে কয়েকটি নোট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার হাতে ধরিয়ে দিলে কাজটি মাত্র একদিনের মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গেল। এই হলো আমাদের সম্মানিত মানুষগণের অসম্মানজনক কাজের ছোট্ট নমুনা।

 

অপরদিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম নাজুক বলে স্পষ্টভাবেই বলা যায়- গত কিছুদিন আগে পরপর দুই বিদেশিকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার পর শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলা করে প্রথমে একজন এবং পরে আরেকজন নিহতের ঘটনা। এরপর সম্প্রতি এক ব্লগার ও প্রকাশককে গলা কেটে হত্যা এবং আরো এক প্রকাশক ও তার কয়েক সহযোগীকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। এছাড়া বর্তমানে সারাদেশে গণহারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক ধরপাকড় দেশের আইনশৃঙ্খলাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে নির্দ্বিধায় বলা যায়। খুন, হত্যা, রাহাজানি, অন্যায়, অত্যাচার, গ্রেফতার এবং গ্রেফতারের পর সেটা নিয়ে আবার রমরমা ঘুষ বাণিজ্যের নির্লজ্জ কর্মকাণ্ড। এরকম নানা সমস্যায় বাংলার মানুষ যেন বহুলাংশে অশান্তির উচ্চ শিখরে বসবাস করছে।

 

এদিকে, আমাদের প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি নেতা-কর্মীরা সর্বদা বিপক্ষ দলকে ঘায়েল করতে ব্যস্ত। যে কোনো ঘটনা ঘটলেই সেটা না দেখে না জেনে শুধুমাত্র শুনেই শুরু হয়ে যায় তাদের সেই চিরচারিত নিয়ম বিপক্ষ দলের নেতাদের ঘাড়ে দোষ চাপানো। দেশে বর্তমানে যেকোন হত্যাকাণ্ড অথবা অন্য যেকোনো আলোচিত ঘটনা ঘটলেই সরকার দলীয় নেতারা দোষ চাপাচ্ছেন বিএনপি-জামায়াতের ওপর, ঠিক তেমনি বিএনপি-জামায়াত নেতরাও যেকোন ঘটনায় গণহারে দোষ চাপাচ্ছেন সরকারের ওপর।

 

এইতো গত কয়েকদিন আগে সরকারের ওপর দোষ চাপিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া লন্ডনে বসে দাবি করেছেন,  দেশে 'রাজতন্ত্র' কায়েম করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের বর্তমান অবস্থার জন্য শেখ হাসিনা দায়ী। অপরদিকে গতকাল (বৃহস্পতিবার) বগুড়ায় এক জনসভায় বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে সকল কু-কর্মকাণ্ডের হোতা অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বললেন,  ৯৩ দিন জ্বালাও- পোড়াও করে নাকে খত দিয়ে বিএনপি নেত্রী বাড়ি ফিরেছেন। এতিমদের টাকা আত্মসাত করে আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। এখন বিদেশে বসে মানুষ হত্যার নির্দেশ দিচ্ছেন।

 

এই হলো আমাদের দেশের উন্নয়ন এবং আমাদের প্রিয় রাজনৈতিক নেতাদের সংক্ষিপ্ত কৃষ্টি কালচার। যারা অন্যের ঘাড়ে শুধু দোষ চাপিয়ে নিজেদের সব সময়ই ‘সাধু’ বলে জাহির করছেন। দেশ কোথায়, দেশের মানুষ কোথায় যাচ্ছে সেটা তাদের দেখার বিষয় নয় । তারা শুধু ঘুম থেকে উঠে আবার ঘুমোতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিপক্ষ দলের ১৪ গোষ্ঠী তুলে বদনাম করছে। আর অপরদিকে তারা দেশের সাধারণ মানুষের প্রায় সমস্ত কিছু লুটে নিয়ে নিজের দেহখানা মানুষের দেহ থেকে হাতির দেহে পরিণত করছে। সর্বোপরি দেশ, দেশের মানুষের উন্নয়ন নয় তাদের ‘সুন্দর‘ রাজনীতিতে- রাজনীতির ব্যাপক উন্নয়নে ভেসে যাচ্ছি আমরা!

 


লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক, মেইল: এই ইমেইল ঠিকানাটি spambots থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। এটি দেখতে হলে আপনার জাভা স্ক্রিপ্ট সক্রিয় থাকতে হবে।

 

(মতামত প্রকাশিত বক্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব,  রেডিও তেহরানের সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভূক্ত নয়।)

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন