এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 16 নভেম্বর 2015 15:18

১২ বিপদের মুখোমুখি বাংলাদেশের মানুষ

মাহমুদ জাবির:  সীমাহীন সমস্যার দেশ বাংলাদেশ। দারিদ্র্য, অসমতা, দুর্নীতি, লুণ্ঠন, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, অশ্লীল ও অপসংস্কৃতি, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নসহ বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত এদেশ। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত অমানবিক ও অন্যায্য বিশ্বব্যবস্থার প্রভাবে বাংলাদেশ আজ এক দুর্বিষহ অবস্থার মুখোমুখি। অন্যায়, অবিচার আর অন্যায্য ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে পুঁজিবাদ, ফ্যাসিবাদ এবং পরাশক্তির আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে এ দেশে। এমতাবস্থায় জনগণ মুক্তি চায়। কিন্তু জনগণের মুক্তির লড়াই আজ ছিন্ন বিছিন্ন। বাংলাদেশের জনগণ বহুবিধ বিপদের সম্মুখীন।

  

অর্থনীতিবিদ ও লেখক আনু মুহাম্মদ বাংলাদেশের পাঁচ বিপদ সম্পর্কে আলোকপাত করেন। তার মতে, বিপদ পাঁচটি হল- (১) সাম্রাজ্যবাদ (২) ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষ (৩) দেশের মূলধারার রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ও বিভিন্ন ইসলামপন্থি গোষ্ঠীর সাথে সমঝোতা (৪) ভারতের সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদী রাজনীতির শক্তি বৃদ্ধি এবং এর ফলে বাংলাদেশে ইসলামপন্থি সাম্প্রদায়িকতার উসকানি সৃষ্টি (৫) দেশে বিপ্লবী, বামপন্থি এবং ডানপন্থি রাজনীতির দৈন্যদশা। আনু মুহাম্মদ তার লেখায় স্পষ্ট করেন যে, মূলত দেশে রয়েছে দু’টি বিপদঃ (১) সাম্রাজ্যবাদ (২) ধর্মীয় রাজনীতি। বামপন্থিদের দৈন্যদশাকে তিনি অন্তর্মুখী বিপদ হিসেবে উল্লেখ করেন। মূলত তিনি এদেশ থেকে সাম্রাজ্যবাদ ও ইসলাম ধর্মের রাজনীতিকে উচ্ছেদ করতে চান।

আমার মতে, বাংলাদেশ আজ ১২ টি বিপদের মুখোমুখি। এর বেশিও হতে পারে। মূলত এ ১২ টি বিপদ জনগণের মুক্তি ও উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে।

 

প্রথম বিপদ হলো: পাশ্চাত্যমুখী ভাবাদর্শ:

উন্নত সভ্যতা ও উচ্চতর জীবনদর্শন সৃষ্টির সূতিকাগার প্রাচ্য হলেও আমাদের দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ব্যাপক অংশ আজ পাশ্চাত্যমুখী ভাবাদর্শের অনুরাগী হয়ে পড়েছে। তারা মনে করে পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞানের কেন্দ্র। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে পাশ্চাত্য হাজির করেছে বহুবিধ মতাদর্শ। পাশ্চাত্য প্রচার করেছে ডারউনের মতবাদ, হেগেলের ভাববাদ, কার্ল মার্ক্সের বস্তুবাদ, ফ্রয়েডের সেক্স-তত্ত্ব এবং বহু সমাজবিজ্ঞানী দার্শনিকদের রচিত পুঁজিবাদ সমর্থিত মুখরোচক তত্ত্ব। আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণি এবং বহু বুদ্ধিজীবী এ সকল তত্ত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আছে। কেউ হয়েছে বামপন্থি, কেউ হয়েছে পুঁজিবাদপন্থি, কেউ হয়েছে পাশ্চাত্য গণতন্ত্রপন্থি। এ সকল তত্ত্ব যেহেতু তাত্ত্বিকভাবেই ধর্মবিরোধী, সে কারণে বিজ্ঞানের নামে, প্রগতির নামে, বিজ্ঞানবাদিতার প্রভাবে এ শ্রেণি পাশ্চাত্য সৃষ্ট মতাদর্শের অনুসারী হয়ে পড়েছে। এদের কাছে প্রাচ্যে সৃষ্ট জ্ঞান হলো প্রগতিহীন ও অগ্রহণযোগ্য। ধর্মকে নাকচ করে দেয় বলে এ সকল তত্ত্ব সাদরে গৃহীত হয়েছে। এর ফলে ধর্মবিরোধিতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। পাশ্চাত্যের দেশগুলো সমন্বিত প্রয়াসে প্রাচ্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করলেও মতাদর্শিকভাবে এ শ্রেণি পাশ্চাত্যের রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রতি কোমল মনোভাব প্রদর্শন করছে।

 

দ্বিতীয় বিপদ: পাশ্চাত্যমুখী চাকচিক্যময় সংস্কৃতি:

পাশ্চাত্যসৃষ্ট বস্তুবাদী মতাদর্শের প্রভাবে আমাদের শিক্ষিত শ্রেণি ব্যাপকভাবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েছে। বস্তুবাদীরা এমনকি অনেক ধর্মবিশ্বাসীরা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুসারী হয়ে পড়েছে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি আচ্ছন্ন হয়েই এ শ্রেণি তার সন্তানদের শিশুকাল থেকেই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে দেয়। অর্থের অভাবে যারা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াতে পারে না তারা নিজেদের অভাগা মনে করে। নিজ দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা না করে পাশ্চাত্যের ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চার মধ্য দিয়ে তারা আভিজাত্যের স্বাদ আস্বাদন করে। এ শ্রেণি পাশ্চাত্যের যেকোন দেশে বসবাসের সুযোগকে স্বর্গীয় আখ্যা দেয়। এদের দৃষ্টিতে পাশ্চাত্যের কৃষ্টি, ধ্যান ধারণা, চাল চলন, জীবন ধরণ সবই  উচ্চমার্গের ও আকর্ষণীয়। চাকচিক্যময় জীবনের প্রতি এরা আসক্ত। এদের কাছে কোকাকোলা ডাবের পানির চেয়ে প্রিয়, ইংরেজী ভাষা বাংলা ভাষার চেয়ে মধুর। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি এরুপ অনুরক্ততার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অরাজনৈতিক শ্রেণি । এ শ্রেণি দেশের রাজনীতি, দেশের সমস্যা বুঝতে চায় না। এরা চায় পাশ্চাত্য ঢং এর জীবন। আধিপত্যবাদী পরাশক্তিবর্গ চায় এমন শ্রেণি সৃষ্টি হোক যারা জন্মগতভাবে হবে বাংলাদেশী, চিন্তায়-চাল চলনে- ধ্যান ধারণায় হবে বিদেশি। এর ফলে এদেশে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সহজতর হবে। কেননা পরাশক্তিবর্গ জানে ধর্মীয় আদর্শ এবং জাতীয়তাবোধের অভাব হলে সে জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করা অতি সহজ।

 

তৃতীয় বিপদ: ভারতীয় মিডিয়ার সাংস্কৃতিক আগ্রাসন:  

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত নেপালকে পুরোদস্তর পরাস্ত করতে না পারলেও বাংলাদেশকে অনেকখানি পরাস্ত করেছে। এ ক্ষেত্রে যে উপাদানটি কাজ করেছে তা হলো ভারতীয় মিডিয়া। ভারতীয় চ্যানেলগুলো দিনরাত প্রচার করে চলছে মোহনীয় মুভি, আকর্ষণীয় টিভি সিরিয়াল এবং উম্মাতাল ড্যান্স। এদেশের তরুণ তরুণীরা ভারতীয় মুভি বা সিনেমার প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত। মস্তিষ্কে কম্পন সৃষ্টিকারী প্রেমের জ্ঞান, উত্তেজনা সৃষ্টিকারী ড্যান্স এদেশের তরুণ তরুণীদের মাতাল করে রেখেছে। নারীদের বিরাট অংশ ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের প্রতি এতই মোহবিষ্ট যে পারিবারিক দায়-দায়িত্ব ভুলে সিরিয়াল উপভোগের জন্য তারা তীর্থের কাকের মত অপেক্ষা করে। কি উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত কি নিম্নবিত্ত সকল শ্রেণির মানুষ ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি মোহবিষ্ট  হয়ে পড়েছে । অশ্লীল বিনোদন আর মোহসৃষ্টিকারী ভারতীয় মিডিয়া সংস্কৃতি আজ উচ্চমাত্রায় প্রভাব সৃষ্টিকারী আফিমে পরিণত হয়েছে। উত্তেজনা সৃষ্টিকারী নিম্নমানের এ সংস্কৃতি গোটা জাতিকে মাতাল করে রেখেছে। এরুপ পরিস্থিতি পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য অনুকূল। এর ফলে ভারত এদেশে যেমন বাজার সৃষ্টি করতে পেরেছে  তেমনি ভারত বিরোধিতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। সীমান্তে বিএসএফ বাংলাদেশীদের প্রতিনিয়ত হত্যা করছে। এতে আমরা শোকাহত নই, বিক্ষুব্ধ নই। আমরা প্রতিবাদী হই না। কারণ ভারতীয় মিডিয়া সংস্কৃতি আমাদের হৃদয়কে গ্রাস করেছে। আমরা হয়েছি ভারতীয় সংস্কৃতির ক্রেতা ও ভোক্তা কার্ল মার্ক্স যে শ্রেণি সংগ্রামের কথা বলেছে সেই শ্রেণি সংগ্রাম আজ ভারতীয় সংস্কৃতির যাঁতাকলে নিষ্পেষিত। কারখানার শ্রমিকেরা বস্তিতে বসবাস করেও শ্রমশোষণের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয় না, আন্দোলনে নামে না। কারণ, কাজ শেষে ঘরে ফিরে তারা উপভোগ করে ভারতীয় মুভি, টিভি সিরিয়াল। ছাত্র-ছাত্রীদের বড় অংশ এরূপ আফিম সেবনের ফলে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। জনতার মুক্তির লড়াই আজ স্তিমিত। ভারতের আধিপত্য বিস্তার চলছে নির্বিঘ্নে। বামপন্থি রাজনীতি তথা সেকুলারিজম অসহায় হয়ে পড়েছে।

     

চতুর্থ বিপদ: প্রযুক্তি নির্ভর অশ্লীল সংস্কৃতির বিস্তার:

বিশিষ্ট তাত্ত্বিক জে এফ ল্যয়টা বলেন, ‘অমানবিকতা আমাদের জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে পড়েছে। কারণ, মানুষ এবং প্রযুক্তির মধ্যে সম্পর্কের দিক ব্যাপকভাবে পরিবর্তন হয়েছে।’ এর মানে আগে মানুষ প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের কাজে লাগাতো। আজকের যুগে প্রযুক্তি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করছে। মানুষ আজ প্রযুক্তির উপনিবেশে বসবাস করছে। উচ্চতর ক্ষমতাসম্পন্ন মোবাইল, অত্যাধুনিক কম্পিউটার মানুষের জীবনাচার নিয়ন্ত্রণ করে চলছে। এর ফলে প্রাইভেসির সীমা অতিক্রম করে অশ্লীল বিনোদনের চর্চা সহজতর হয়েছে। কম্পিউটার শুধু জ্ঞানের বাক্সই নই, কম্পিউটার এখন অশ্লীল সংস্কৃতি চর্চার আধার। ফেইসবুক বহুবিধ কৃত্রিম সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। মোবাইল- ফেইসবুক ব্যবহৃত হচ্ছে অল্প বয়স থেকে প্রেমের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কাজে। মোবাইল ফেইসবুকের প্রতি আসক্তি সৃষ্টির ফলে তরুণ তরুণী, ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে জ্ঞান চর্চা এবং শিক্ষা অর্জনের প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। প্রযুক্তির প্রতি অতি আকর্ষণ পারিবারিক বন্ধন, আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক, প্রতিবেশীর সম্পর্ক দুর্বল করে তুলছে। প্রযুক্তি নির্ভর যুগল প্রেমের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে আজকের তরুণ সমাজ অতিমাত্রায় রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়েছে। তারা মনে করে যুগল প্রেম নির্ভর জীবনই আসল জীবন। এ  ধরণের তরুণ সমাজ জনগণের সমস্যা নিয়ে ভাবতে রাজী নয়। সুখের সাগরে ঢেউ খেলে এ শ্রেণি ভাসতে চায়। এ শ্রেণি ভাসমান শ্রেণি। স্থির নয়, অস্থির। দায়িত্বশীল নয়, দায়িত্বহীন। এরা এমন এক তরুণ প্রজন্ম যারা প্রযুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, প্রযুক্তির মোহমায়ায় আচ্ছন্ন এবং প্রযুক্তির চৌম্বকক্ষেত্রে আবদ্ধ থাকে। ফলে সৃষ্টি হয় চিন্তাহীন প্রজন্ম। যে প্রজন্ম সমাজ সংস্কারে অনীহা প্রকাশ করে, নিত্য নতুন কুসংস্কারকে স্বাগত জানায়। আবেগধর্মী এ প্রজন্ম সমাজ সংস্কারমুখী যে কোন উদ্যোগকে প্রগতিহীন মনে করে। এ শ্রেণি ধর্মীয় নীতি নৈতিকতার শুধু বিরোধিতাই করে না, অশ্লীল নীতিহীন কর্মকাণ্ডকে ব্যক্তি স্বাধীনতার নৈতিকতা মনে করে। ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে বল্গাহীন অনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়ায় নারী–কিশোরী নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে। মদ–গাঁজা-আফিম তথা ইয়াবা আসক্ত হয়ে পড়ছে তরুণ প্রজন্ম। অশ্লীল সংস্কৃতি আর ইয়াবার প্রতি আসক্তি ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে পুঁজিবাদ যেমন সম্প্রসারিত হচ্ছে তেমনি অসুস্থ ও চেতনাহীন হয়ে পড়ছে তরুণ সমাজ। তারুণ্য বার্ধক্যের কংকালসারে পরিণত হয়েছে। এরূপ নিষ্ক্রিয় তারুণ্যই এদেশে পরাশক্তিবর্গের প্রবেশের দ্বার খুলে দেয়।

 

পঞ্চম বিপদ: ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তার:

পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা ভোগ সংস্কৃতির বিস্তারকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়ে চলছে। অত্যাধুনিক ব্র্যান্ডের পণ্যসামগ্রী, আকর্ষণীয় বিলাসদ্রব্য, জাঁকজমকপূর্ণ আবাসান, দেশে-বিদেশে নান্দনিক হোটেল- এ সবকিছু আকৃষ্ট করছে এ দেশের মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত মানুষদের। চাকচিক্যময় বিলাসী জীবন যাপনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে এদেশের বহু মানুষ। এ সকল মানুষের কাছে ভোগ বিলাসী জীবনযাপনই জীবনের একমাত্র লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। জীবন মানে ভোগ, ভোগই জীবন, ভোগেই সুখ-এ হলো জীবনের মর্মার্থ। ভোগের মানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় শ্রেণি বিভাজন। নিম্ন শ্রেণির তারাই যারা কম ভোগ করে। উচ্চ বিলাসী মানুষেরা উচ্চশ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত হয়। এর ফলে ভোগের প্রতিযোগিতা ক্রমশ বেড়ে চলছে। ‘ভোগ’ই যেহেতু জীবনের লক্ষ্য, সে লক্ষ্য পূরণের জন্য মানুষ হচ্ছে পরিশ্রমী, দুর্নীতিবাজ, লুটপাটকারী, সন্ত্রাসী, মাস্তান। উচ্চবিত্তের লক্ষ্য উচ্চমানের ভোগ, উচ্চশিক্ষিত মানুষের লক্ষ্য তেমনি উচ্চভোগ। উচ্চভোগই যখন ‘লক্ষ্য’ তখন লক্ষ্য অর্জনের জন্য কারো হাতিয়ার বিত্ত, কারো হাতিয়ার শিক্ষা, কারো হাতিয়ার সন্ত্রাস ও দুর্নীতি। ভোগ সংস্কৃতিতে ‘ উদ্বৃত্ত সম্পদ’ বলতে কিছু থাকে না। সবই ব্যয় হয়ে যায় পণ্যক্রয়ে আর বিলাস ব্যসনে। সমাজবিজ্ঞানী জিগমুন্ড বাউমেন তার বইয়ে উল্লেখ করেন যে- উৎপাদনধর্মী জীবনে বিলাসের আকাঙ্ক্ষা ছিল পাপ অথচ ভোগসর্বস্ব জীবনে ভোগের আকাঙ্ক্ষা সীমাহীন, আকাশই একমাত্র সীমা। সীমাহীন ভোগই যখন জীবনের একমাত্র ধর্ম তখন যে কোন প্রকার অন্যায়, অন্যায্য পন্থায় উপার্জন, লুন্ঠনের পথ বেছে নেয়াই স্বাভাবিক। একশ্রেণির সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি-লুণ্ঠন, আর একশ্রেণির দুর্নিবার দুর্নীতির মূলে রয়েছে উচ্চতর ভোগধর্মী জীবন প্রতিষ্ঠা।  যার ফলে অবিচার,  বৈষম্য আর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে জনগণকে। ভোগবাদ এমন এক ব্যাধি যা মানুষে মানুষে ব্যবধান ও বৈষম্য বাড়িয়ে তুলছে। ভোগবাদী জীবনে মানুষ হয়েছে চরম স্বার্থপর যেখানে সমাজের উন্নয়ন, সমাজ সংস্কার এবং দায়িত্ববোধ চরমভাবে উপেক্ষিত। সামাজিক সম্পর্ক অর্থবিত্তের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় বলে সামাজিক অনৈক্য সৃষ্টি হয়। এ দেশে ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তারের ফলে এদেশ পুঁজিবাদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। শোষণ- নিপীড়ন, লুণ্ঠন নির্বিঘ্নে চলছে।  

 

ষষ্ঠ বিপদ: ঘূণে ধরা শিক্ষাব্যবস্থা:

দীর্ঘদিন ধরে  দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে বস্তুবাদী শিক্ষাব্যবস্থা। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় বস্তুগত সমৃদ্ধিকে শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্য বানানো হয়েছে। পাওলো ফ্রেইরের ভাষায় এ শিক্ষা হলো ব্যাংকিং শিক্ষা। ব্যাংকিং শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থী পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান মাথায় জমা রাখে, শিক্ষক জ্ঞান প্রদানকারী। মুখস্থবিদ্যার মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি- শিক্ষা আজ এ টুকুতেই সীমাবদ্ধ। জ্ঞান  অর্জনের মুখ্য উদ্দেশ্য চাকরিলাভ। জ্ঞান অর্জন আজ বস্তুবাদের চার দেয়ালে বন্দি। এর ফলে শিক্ষার্থী সৃজনশীল হতে পারছে না, হারিয়ে ফেলছে উদ্ভাবনী ক্ষমতা। জ্ঞান অর্জন করে যারা হয়েছে জ্ঞানী, তারা আজ আপোষকামী। যে জ্ঞান বস্তুবাদী চিন্তাধারা তৈরি করে সে জ্ঞান মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক করে। আত্মকেন্দ্রিকতার কারণে আপোষকামী মনোভাব সৃষ্টি হয়। কেননা শিক্ষা অর্জনের মধ্য দিয়ে সে মানুষ নৈতিক শিক্ষা পায়নি, পায়নি সৃজনশীল শিক্ষা।  এর ফলে মানুষ হারিয়ে ফেলেছে আত্মবিকাশের সু্যোগ। বেড়ে চলছে অসচেতনতা। সমাজচিন্তা না করে এরা স্বার্থচিন্তায় বিভোর। সমাজের সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং সমাধানের শিক্ষা পায়নি বলে ব্যক্তির নিজের সমস্যা নিয়ে এরা আজ বেশি চিন্তিত। প্রচলিত এ শিক্ষা পদ্ধতি  শিক্ষার্থীর মধ্যে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে বিধায় মানুষ কূপমন্ডুক হয়ে পড়েছে। দেশ সমাজ জাতি নিয়ে এরা ভাবতে চায় না। কেননা শিক্ষিত শ্রেণিকে চিন্তাশীল করে গড়ে তোলা হয়নি। এতে করে অনুকরণ প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, সৃষ্টির উদ্যোগ থেকে ফিরে এসে অন্ধত্বকে গ্রহণ করেছে। ফলে কর্পোরেট মিডিয়া এ শ্রেণিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে।  অন্ধভাবে মিডিয়া সংস্কৃতি এবং মিডিয়ায় প্রচারিত ধ্যান ধারণা গ্রহণ করছে। বিজাতীয় সংস্কৃতি আর বিজাতীয় বস্তুবাদী শিক্ষার প্রভাবে ব্যক্তি তার স্বকীয়তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। জ্ঞানী ও শিক্ষার্থী শ্রেণি যখন আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার হারায় তখনই আধিপত্যবাদী শাসকগোষ্ঠী এবং পরাশক্তিবর্গ ঐ জাতিকে নিয়ন্ত্রণের অবারিত সুযোগ পেয়ে যায়। ঘুণে ধরা বস্তুবাদী  শিক্ষা ব্যবস্থায় নীতি আদর্শহীন শ্রেণি সৃষ্টির ফলে শিক্ষিত শ্রেণি অন্যায়, অবিচার আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারছে না। এমতাবস্থায় ভারত-আমেরিকার নীতিতে এদেশেকে পরিচালিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

 

সপ্তম বিপদ: সাম্রাজ্যবাদ:

ভারত-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বাংলাদেশের জন্য দৃশ্যমান চরম বিপদ। কেননা ‘বাংলাদেশ’কে শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে ভারত ও আমেরিকা একযোগে কাজ করছে। ভারত চায় এদেশের কৃষিব্যবস্থা ধ্বংস করে এদেশকে তাদের বাজারে পরিণত করতে, তাতে অনেকখানি সফল হয়েছে। ভারত চায় ট্রানজিট সুবিধা, করিডোর সুবিধা এবং সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুবিধা। ইতিমধ্যে চুক্তি করে সব কিছুই আদায় করে নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় এ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন করতে, লুণ্ঠন করতে। সেজন্যে তাদেরই বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নিয়োগ নিশ্চিত করতে এবং তাদেরই শর্ত মেনে নিতে সরকারকে বাধ্য করা হয়। তাতেও তারা অনেক সফল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ কে ব্যবহার করে ঋণদানের নামে এদেশের মানুষের উপার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করে চলছে। ভারত-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অক্ষুণ্ণ রাখতে সকল প্রকার বিরোধিতা দমনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এদেশে ‘জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব আছে’ এ বিষয়টি প্রমাণ করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করছে। উপর্যুপরি গুপ্ত হত্যার ঘটনা ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে যাতে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এদেশে প্রভাব বিস্তারের সরাসরি সুযোগ পায়।

 

অষ্টম বিপদ: পরাশক্তির আনুগত্যনির্ভর রাজনীতি:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন দুর্দিন চলছে। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে থাকে সরকারের সাথে জনগণের চুক্তি, স্বাধীন রাষ্ট্রে জনগণের সমস্যা সমাধান এবং জনগণের অধিকার পূরণের অঙ্গীকার করে সরকার গঠন করা হয়। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতি আজ জ্ঞান, দূরদর্শিতা, নীতি-নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতা থেকে সরে এসে পেশীশক্তি নির্ভর ও দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। লুণ্ঠনতন্ত্র কায়েম হয়েছে। অত্যাচার, নিপীড়ন, শোষণ, লুণ্ঠন রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছে। রাজনীতি যখন দুষ্টচক্রের নিয়ন্ত্রণের এসে পড়ে, রাজনীতি যখন সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয় এবং দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পড়ে তখনই রাজনীতি হয় জনবিচ্ছিন্ন এবং মেরুদণ্ডহীন। জনগণই রাজনীতির মেরুদণ্ড। অথচ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে রাজনীতিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতালাভের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিবর্গ জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতিকে সাম্রাজ্যবিস্তারের হাতিয়ার মনে করে। জনবিচ্ছিন্ন শাসকবর্গ সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের বন্ধুতে পরিণত হয়। এ কারণে মিশরে নির্বাচিত মুসলিম ব্রাদারহুডের সরকারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে সামরিক সিসি ক্ষমতাসীন হয়।  জনবিচ্ছিন্ন সিসি কেই মার্কিন সরকার আস্থাভাজন মনে করে। জনগণকে প্রতারিত করে যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় সেই গণতন্ত্রই একমাত্র মার্কিন সরকারের সমর্থন পায়। মূলত যে নামেই হোক না কেন জনবিচ্ছিন্ন সরকার ও রাজনীতিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে চলছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।

 

দুর্ভাগ্যের বিষয়, বাংলাদেশ আজ কঠিন বিপদের মুখোমুখি। কেননা বাংলাদেশের রাজনীতি ভারত-মার্কিন বলয় কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। মিডিয়াকে ব্যবহার করে, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করে ভারত-মার্কিন সমর্থনপুষ্ট দলকে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সরকারী দল- বিরোধী দল ভারত- মার্কিন তুষ্টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব  দিয়ে চলছে। তারা মনে করে জনগণ নয়, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র হলো সকল ক্ষমতার উৎস। জনগণকে সাময়িকভাবে প্রতারিত করার জন্য রাজনৈতিক চাল হিসেবে ধর্মকে এবং ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন লাভের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু ভারত-মার্কিন জোটের সমর্থন লাভকে ক্ষমতারোহণের সর্বশ্রেষ্ঠ যুক্তি মনে করা হয়। এর ফলে ভারত-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আরো শক্তিশালী হচ্ছে। পরাশক্তির আনুগত্য রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনীতির মূলমন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। পরাশক্তির আনুগত্য ও দাসত্ব নির্ভর রাজনীতিতে রাজনীতি নয় বাংলাদেশ পরাস্ত হয়েছে।

 

নবম বিপদ:সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও অনৈক্য:

সাম্প্রদায়িক বিভাজন, অনৈক্য এবং এর ফলশ্রুতিতে দ্বন্দ্ব-সংঘাত জাতীয় ও বৈশ্বিক সংকট। সম্প্রদায়গত বিভাজন ও অনৈক্য সৃষ্টিতে অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী উপাদান সক্রিয় ভুমিকা রাখছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ সর্বদাই সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও অনৈক্য সৃষ্টিতে নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে। কেননা একটা জাতিকে এবং জাতীয় ঐক্যকে খণ্ড বিখন্ড করতে পারলে জনগণের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। জনগণের ব্যবচ্ছেদ ঘটায় সাম্প্রদায়িক বিভাজন। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব হয়েছে সম্প্রদায়গত বিভাজন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আজকের যুগেও সাম্রাজ্যবাদ শক্ত অবস্থান নিয়ে আছে সাম্প্রদায়িক অনৈক্যকে পুঁজি করে। এদেশের ৯০ শতাংশের অধিক মুসলমান হলেও মুসলিম সম্প্রদায় নিজেই বিভক্ত ও বিভাজিত।  ইসলাম ধর্ম বিশ্বাসীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান করলেও মুসলমানরা বহির্মুখী ও অন্তর্মুখী উপাদানের প্রভাবে বিভক্ত হয়ে আছে। ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন ধরণের মাযহাব সৃষ্টি হলে অনৈক্যের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু স্থূলজ্ঞানে মাযহাবের প্রতি নিষ্ঠা প্রদর্শন করতে গিয়ে অনুসারীদের অনৈক্যের পথে হাটতে হয়েছে। এক পর্যায়ে ধর্মীয় মূলনীতিকে অবহেলা করে অন্ধত্ব- গোঁড়ামি চেপে বসলে সম্প্রদায়গত ও মাযহাবগত দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। ইসলাম ধর্ম ঐক্যের নীতিতে চলাকে ফরজ ঘোষণা করলেও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আর খেয়ালখুশিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি হয়। পবিত্র কুরআন খেয়ালখুশিমত চলাকে বারণ করেছে এবং বিচারবুদ্ধিমত চলার আহবান জানায়। কেননা নিজের মনোবৃত্তিকে প্রাধান্য দেয়ার ফলে মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন-দ্বন্দ্ব-সংঘাত রূপ নিতে পারে। যা ফেতনারূপ পরিগ্রহ করে। আল কুরআনে বলা হয়েছে “ফেতনা হত্যা অপেক্ষা জঘন্য’’ (২:২১৭)।

 

মুসলমানরা আজ দলে দলে বিভক্ত হয়ে একদল অন্যদলকে কাফের বলছে। কতগুলো মতাদর্শ সৃষ্টি করে ভিন্ন মাযহাবের অনুসারীদের কাফের আখ্যায়িত করছে বহু বিভ্রান্ত আলেম ওলামা। এমতাবস্থায় সাম্রাজ্যবাদী লুটেরা ওই সকল দেশে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়ে যায়। একদিকে বিভ্রান্ত ধ্যান ধারণা হাজির করে মুসলমানে মুসলমানে শত্রুতা ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা হচ্ছে অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন- ইসরাইল শক্তি গোয়েন্দাদের কাজে লাগিয়ে মুসলমানদের অনৈক্য ও দ্বন্দ্বকে সংঘাতে রূপ দিচ্ছে। এরূপ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার ঝুঁকিই শুধু বেড়ে যায় না, এ দেশ দেশীয় শাসকশ্রেণি এবং বিদেশি পরাশক্তির লুণ্ঠনের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়।

 

দশম বিপদ: ধর্মলেবাসী ক্ষুদে জঙ্গি গোষ্ঠীর দৌরাত্ম:

প্রচার করা হয়, ‘উগ্র ইসলামপন্থি জঙ্গিবাদ বাংলাদেশের জন্য এক মহাবিপদ। আরো প্রচার হয়- ধর্মপন্থি উগ্র অসহিষ্ণু রাজনীতি বাংলাদেশে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি হুমকি। এ ধরণের সেক্যুলার প্রচারণায় এক ধরণের বিভ্রান্তি রয়েছে। ধর্মের নাম ব্যবহার করে যারা উগ্রপন্থাকে বেছে নেয় তাদের ‘ইসলামপন্থি’ নামকরণ করা হচ্ছে। এ এক চরম মিথ্যাচার। অথচ ইসলাম তাত্ত্বিক ও দালিলিক ভাবে ‘উগ্রপন্থা’ এবং মানুষ হত্যার নীতিকে ইসলাম বিরোধী ও শরিয়ত পরিপন্থি ঘোষণা করে। পবিত্র কুরআনে সুপষ্টভাবে বলা হয়েছে তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন কর। সূরা মায়েদায় আল্লাহ্‌ বলেন, ‘ কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সকল মানুষকে হত্যা করল। কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল (৫;৩২)। এ থেকে স্পষ্ট যে ইসলাম উগ্রপন্থা এবং অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যাকে জঘন্য পাপ গণ্য করে। কিন্তু এক শ্রেণি ইসলাম ধর্ম ও কুরআন না বুঝেই মানুষ হত্যাকারী উগ্রপন্থিদের ইসলামপন্থি নামে আখ্যায়িত করে। তারা ভেবেছিল এ ধরনের প্রচারে মানুষ ইসলাম ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করবে।

 

এটা সত্য যে, ক্ষুদ্র এক গোষ্ঠী ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যায় প্রভাবিত হয়ে ‘জিহাদ’ নাম দিয়ে উগ্রপন্থা ও সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়। এ ধরণের নীতি খোদায়ী নীতি নয়, বরং মানুষ সৃষ্ট বিভ্রান্তিকর নীতি। সৃষ্টিগতভাবে একটি ফল (আপেল,কমলা) অনেক পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কিন্তু ওই ফলে যখন বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশানো হয় তখন ওই ফল স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়। কিন্তু বলা যাবে না যে ফল মাত্রই ক্ষতিকর। ফলে বিষযুক্ত হয়েছে বলেই তা ক্ষতির কারণ হয়েছে। ইসলাম ধর্মের চর্চা করতে গিয়ে ইসলামের নীতির মধ্যে কিছু বিষাক্ত ও ভ্রান্ত ধ্যান ধারণার প্রবেশ ঘটানো হয়। এর ফলে  তারা উগ্র জঙ্গিবাদী নীতি গ্রহণ করে দাবি করছে তারা ইসলাম মানছে। তখনই একশ্রেণি দাবি করছে ইসলাম নিজেই মানুষের জন্য ক্ষতিকর একটা বিষয়। এটাই সেক্যুলার শ্রেণির বিভ্রান্তি।

 

আঙুর একটা স্বাস্থ্যকর খাবার। কিন্তু আঙুর প্রক্রিয়াজাতকরণ করে তথা বিকৃত করে মদ তৈরি করলে তা দেহ ও সমাজের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। চিকিৎসা পদ্ধতিতে ভুল হলেই তা জীবন রক্ষার বদলে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। ইসলাম ধর্ম সঠিকভাবে বুঝার এবং পালনের ব্যর্থতায় যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় সে বিভ্রান্তির ফলে সমাজে ক্ষতি সাধিত হয়।  সে ক্ষতি কিন্তু ইসলামের কারণে হয় নি, ইসলামকে বিকৃত করণের ফলে হয়েছে।

ইসলামের বিকৃতকারী গোষ্ঠী জঙ্গিগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। সে কারণে এ ধরণের গোষ্ঠীকে আমরা ইসলামপন্থি না বলে ধর্মলেবাসী জঙ্গিগোষ্ঠী বলতে পারি। এ গোষ্ঠীর তৎপরতায় ভিন্ন মতাবলম্বী ধর্ম বিশ্বাসীরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকছে। ভয়-আতঙ্ক আর অজানা শঙ্কার মধ্যে বসবাস করতে হয় বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী মানুষদের। এরূপ পরিবেশে জঙ্গিবাদ দমনের প্রতিশ্রুতি দেয় সরকার। সরকারকে সাহায্য করারা নামে বিদেশি আধিপত্যশক্তি এদেশে ঘাঁটি স্থাপনের জন্য পরিকল্পনা করে। বিপদের মোকাবিলায় সৃষ্টি হয় আর এক বিপদ।

 

এগারতম বিপদ: ইসলামের বিরুদ্ধে সেক্যুলার বামপন্থি, পুঁজিপন্থি ও সাম্রাজ্যবাদীদের অনন্ত লড়াই:

ঐতিহাসিকভাবেই ইসলামের বিরুদ্ধে ইসলাম বিরোধী শক্তিবর্গ সংঘবদ্ধভাবে ষড়যন্ত্র চক্রান্ত করে চলছে। ইসলামকে এবং ইসলামপন্থিদের দুনিয়া থেকে চিরতরে উচ্ছেদ করতে প্রতিটি সমাজের ও রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী শাসকবর্গ এবং সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছে। তৎকালীন ফেরাউনের যুগে ফেরাউন তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য এবং নবী মুসা (আ.) কে পরাস্ত করার জন্য যাদুর প্রতিযোগিতার আহবান করল। সে যুগের যাদুকররা ছিল এ যুগের বুদ্ধিজীবী। যাদুকররা ফেরাউনকে বলল- “আমরা যদি বিজয়ী হই আমাদের জন্য পুরষ্কার থাকবে তো? ফেরাউন বলল, অবশ্যই তোমরা আমার ঘনিষ্ঠদের শামিল হবে।” (সূরা শুয়ারাঃ ৪১-৪২)

 

সে যুগের সেক্যুলার জাদুকররা যেভাবে স্বৈরশাসক ফেরাউনের ঘনিষ্ঠ ছিল এ যুগেও বহু সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী স্বৈরশাসকদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে সমন্বিত প্রয়াসে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। স্বৈরশাসক দমন নিপীড়নের মধ্য দিয়ে ইসলাম পন্থিদের বিরুদ্ধাচরণ করে অন্যদিকে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী শ্রেণি জ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য,  বক্তব্য ও লেখনী দিয়ে মগজ ধোলাই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করে। ইসলামের প্রশ্নে বাম্পন্থী, পুঁজিপন্থি, সাম্রাজ্যপন্থি একত্রিত হয়, সমন্বিতভাবে ইসলাম ও ইসলামী শক্তিকে মোকাবিলা করার জন্য। যদিও বাম্পন্থী ও পুঁজিপন্থি মতাদর্শিকভাবে বিরোধী, তবুও ইসলাম বিরোধিতা করতে গিয়ে তারা নিজেদের মত পার্থক্য ও দ্বন্দ্ব ভুলে যায়। কেন তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে সদা তৎপর? কেননা মার্ক্সবাদ, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ একই পতাকাতলে অবস্থান করে। সেই পতাকার নাম ইহজাগতিকতা। প্রতিটি মতবাদের ভিত্তি মানুষ রচিত আইন- যে আইন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা পরিচালনার নিমিত্তে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে ইসলাম এমন এক ধর্ম ও দ্বীন যা একমাত্র এক আল্লাহ্‌র রচিত বিধানকে দ্বীনের ভিত্তি হিসেবে গণ্য করে। ইসলাম আল্লাহ্‌র রচিত বিধান, নীতি ও আইন অনুযায়ী অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালনার কথা বলে। সে কারণে ইসলামের রাজনীতির বিরুদ্ধে সেক্যুলারপন্থিদের সরব প্রচারণা চলছে। মুসলিম  অধ্যুষিত বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ, জঙ্গিবাদ দমনের সরকারী প্রতিশ্রুতি এবং বিদেশি পরাশক্তিবর্গের তৎপরতা, ইসলামের রাজনীতিকে উগ্র ও অসহিষ্ণু আখ্যাদান- এ সবকিছুর মুখ্য উদ্দেশ্য বাংলাদেশের বিশ্বাসী মানুষদের ইসলামের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা।

 

মনে করা হয়- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বে তথাকথিত ইসলামী জঙ্গি বা সন্ত্রাসী তৈরির যে প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে তার উদ্দেশ্য কৃত্রিম শত্রু সৃষ্টি করা, যার মাধ্যমে  সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের অপকর্ম জায়েজ করতে পারে। জঙ্গি দমনের নামে এক একটি দেশ দখল ও সাম্রাজ্য বিস্তারের বিশ্বব্যাপী যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে তার মুখ্য উদ্দেশ্য আরো গভীর। সাম্রাজ্যবাদীদের রয়েছে স্বল্পস্থায়ী ও দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্প। স্বল্পস্থায়ী প্রকল্পে জঙ্গি দমনের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্য বিস্তার ও লুণ্ঠন কার্যক্রম সহজতর হয়। দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্প হলো মুখ্য। এ প্রকল্পে মুসলমানদের সন্ত্রাসী ও জঙ্গি নামে ব্যাপক প্রচারণা চালনো হয়। এর সাধারণ উদ্দেশ্য হলো অমুসলিম থেকে মুসলিম হওয়ার প্রবণতা রোধ করা। ইসলাম ধর্মের বৈশিষ্ট্য উচ্চতর হওয়ার প্রবণতা রোধ করা। ইসলাম ধর্মের বৈশিষ্ট্য উচ্চতর হওয়ার কারণে এবং এর জীবন দর্শন মহত্তর বলে বহু মানুষ ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। এ কারণে পাশ্চাত্যের মিডিয়াকে ব্যবহার করা হছে ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য। এছাড়াও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রবর্গ রাজতান্ত্রিক সৌদি সরকারকে সহযোগী করে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন নামে কিছু উগ্রপন্থি গোষ্ঠী তৈরি করে। এর মুখ্য উদ্দেশ্য হলো ইসলামের পরিচ্ছন্ন রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, এর উপর  মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করা। বিশ্বাসী মানুষদের পরিচ্ছন্ন ইসলামী রাজনীতির চর্চা থেকে  ফিরিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে কৃত্রিম  জঙ্গি গোষ্ঠী  তৈরি করা হয়েছে। একটি গোষ্ঠীর নাম দেয়া হয়েছে আইএস- মানে ইসলামিক স্টেট। এর মানে ইসলামের বিরুদ্ধবাদীরা বুঝাতে চায়- যারা ইসলামের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামের রাজনীতি করে তারা কত ভয়ংকর, কত নৃশংস, কত অমানবিক, কত বিধ্বংসী। সুতরাং ইসলামের রাজনীতি খুবই খারাপ, খুবই জঘন্য কাজ- এরূপ বার্তা পৌঁছে দিতে ইসলাম বিরোধী শক্তিগুলো তৎপরতার সাথে কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আল কায়েদা, আইএস এর উদাহরণ সৃষ্টি করে বিশ্বাসীদের ইসলামী রাজনীতি থেকে দূরত্ব বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়। সাম্রাজ্যবাদীরা কেন এরূপ দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্প হাতে নিল? এর কারণ, তাদের গবেষণা সেল জানিয়েছে, ইসলাম বর্তমান ও আগামী দিনে সাম্রাজ্যবাদীদের সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রধান হুমকি। তাদের গবেষণা সেল জানিয়েছে, বামপন্থি রাজনীতি যতটা সাম্রাজ্যবাদ মোকাবিলায় সক্ষম তার চেয়ে অনেক বেশি সক্ষম ইসলামী রাজনীতি, তখনই সাম্রাজ্যবাদীরা পরিকল্পনা করে– কী করে বিশ্বাসীদের ইসলামের রাজনীতি থেকে বিমুখ করা যায়।

 

ইসলাম ও মুসলমানদের ক্রমাগত অগ্রযাত্রায় হতবিহবল হয়ে বামপন্থিরাও ইসলামের বিরুদ্ধে বিষেদাগার বাড়িয়ে তুলছে। তারা বলছে, ইসলামের রাজনীতি এক ধরণের সাম্প্রদায়িকতা যা মুসলিমবিদ্বেষের প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট। তারা আরো বলছে, ইসলামের রাজনীতি উগ্র, অসহিষ্ণু রাজনীতি। এ সবই তারা বলছে বিশ্বাসীদের মধ্যে ইসলামের রাজনীতি সম্পর্কে বিরুপ মনোভাব বাড়িয়ে তুলতে। মূল ইসলাম সম্পর্কে এবং ইসলামের মহাগ্রন্থ আল কুরআন সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান গবেষণা ছাড়াই এসব বলা হচ্ছে।  ইসলাম নীতিগতভাবে বামপন্থি দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী, পুঁজিবাদ নীতির বিরোধী এবং সাম্রাজ্যবাদের চরম বিরোধী বলেই ইসলাম বিরোধিতাকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে । তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে চায়। যদিও আল কুরআনে আল্লাহ্‌ বলেন-“তারা চায় যে, আল্লাহ্‌র নূরকে নিজেদের মুখ দ্বারা নির্বাপিত করতে, অথচ আল্লাহ্‌ তার নূরকে প্রজ্বলিত করবেনই, কাফেররা যতই অসন্তুষ্ট হোক না কেন।” (সূরা- সাফ- ৮)।   

 

বারতম বিপদ: প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও প্রকৃত প্রশিক্ষণের অভাব:

বাংলাদেশে বিশ্বাসীদের ব্যাপক অংশের রয়েছে প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে বিভ্রান্তি আর অবিশ্বাসীদের রয়েছে প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা। বিশ্বাসীদের অধিকাংশই অনুকরণ প্রবণ। যার ফলে সূক্ষ্ম চিন্তা ও বিচার বিবেচনা শক্তিকে ব্যবহার না করে ধর্ম শিক্ষা ও চর্চা করা হয়। সমাজে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় চর্চা যা অধিকাংশ পালন ও লালন করে- তাই সত্যরূপে জ্ঞাত হয়। অধিকাংশ যে পথ ও মতাদর্শ অনুসরণ করে সেই পথকে সঠিক ধর্মীয় পথ মনে করা হয়। এর ফলে বিভ্রান্তি চরম আকার ধারণ করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্‌ পাক বলেন-“যারা অধিকাংশের পথ অনুযায়ী চলে নিশ্চিত তারা বিভ্রান্ত ”

“অধিকাংশ লোক কেবল অকৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করে ”(২৫;৫০)

“ উহাদের অধিকাংশই ইহা(সত্য) অনুধাবন করে না ” (২৯;৬৩)

 

এ কথা সত্য যে, দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে বহু ধরণের মতভেদ রয়েছে, সেই মতভেদে মুসলিম জাতি বিভক্ত হয়ে আছে । কিন্তু এসকল মতভেদ ইসলাম সৃষ্ট নয়, মানুষ সৃষ্ট। আল্লাহ্‌ বলেন-“এবং অন্তর্ভুক্ত হয়ো না মোশরেকদের, যারা নিজেদের দ্বীনে মতভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে । (৩০;৩১-৩২)”

এ থেকে স্পষ্ট দ্বীনে মতভেদ ইসলামে নিষিদ্ধ, কেননা এসকল মতভেদ মানুষ সৃষ্ট এবং তা মানুষের খেয়াল খুশি চর্চার ফল।

 

দ্বীন সম্পর্কিত বিভিন্ন মতাদর্শে কোনটি সত্যিকার ইসলামী মতাদর্শ তা বুঝতে প্রয়োজন সূক্ষ্মজ্ঞান ও বিচার বুদ্ধির প্রয়োগ। একশ্রেণি অজ্ঞতা ও অন্ধত্বকে পুঁজি করে ধর্ম বুঝে ও ধর্ম মানে আর এক শ্রেণি অজ্ঞতা এবং ধর্ম বিদ্বেষী প্রবণতা থেকে ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করে। উভয় শ্রেণিই প্রকৃত ইসলামের বিরোধিতা করতে থাকে। ধর্ম বিদ্বেষী শ্রেণি এবং ধর্মানুরাগী অন্ধ শ্রেণির প্রকৃত ইসলাম বিরোধিতা প্রকারান্তরে সাম্রাজ্যবাদীদের সাম্রাজ্য বিস্তারের সুযোগ করে দেয়। কেননা প্রকৃত ইসলাম কাঠামোগতভাবে এবং তত্ত্বগতভাবে এমনকি ব্যবহারিকভাবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ধর্ম। এক শ্রেণি ইসলাম ধর্মের চর্চা করতে গিয়ে সুফিবাদী মতাদর্শের অবতারণা করে ধর্মকে সন্ন্যাসবাদে রূপান্তরিত করে। সন্ন্যাসবাদী ধর্ম বিশ্বাসীদের মধ্যে এমন এক চেতনা তৈরি করে যার ফলে শুধুমাত্র এক আল্লাহ্‌র সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং নিজ চরিত্র সংশোধন করতে সম্পূর্ণ মনোযোগী হয়ে পড়ে। সমাজ সংস্কার ও সামাজিক উন্নয়ন তথা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক দিক থেকে আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে তারা অপারগ। সমাজে ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত অন্যায় অবিচার ও জুলুম নির্ভর যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে সে ব্যাপারে তারা নিঃস্পৃহ। এ ধরণের ধর্ম চর্চাকে ধর্ম বিরোধীরা স্বাগত জানায়। কারণ বৌদ্ধ ধর্মের মত এ ধরণের ধর্ম চর্চা সমাজের শান্তি কামনা করলেও শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনরূপ ঝুঁকি ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে রাজী নয়। এ অবস্থায় বামপন্থিরা তাদের রাজনীতি চর্চার জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ পায়। সাম্রাজ্যবাদীরাও চায় ইসলাম ধর্মের চর্চা যেন এভাবেই করা হয় যেভাবে করছে সুফীবাদীরা, সন্ন্যাসবাদীরা। এজন্যে সাম্রাজ্যবাদীরা এবং রাষ্ট্রীয় শাসকবর্গ সকল প্রকার পৃষ্ঠপোষকতা দিতে রাজী আছে। কারণ সন্ন্যাসবাদী ধর্ম চর্চার ফলে ধর্মীয় ব্যক্তি ও দল শুধুমাত্র পরকালের চিন্তায় বিভোর থাকে। অথচ দেশ- সমাজ –জাতির দুর্দশা, দুরবস্থা ও দুঃসহ পরিণতি তাদেরকে চিন্তিত করে না। এক ধরণের দুনিয়াবিমুখতা সৃষ্টির ফলে তারা চিন্তায় কল্পনায় পরকালে বসবাস করে, যদিও তাদের দেহ দুনিয়াতেই রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদীরা চায় এ ধরণের ধর্মচর্চা চিরকাল টিকে থাকুক, তাহলে নির্বিঘ্নে সাম্রাজ্য বিস্তার করা যাবে। লুটেরা শ্রেণি এ ধরণের ধর্ম চর্চাকে অভিবাদন জানায়, কেননা এতে বিনা বাধায় লুট করা সম্ভব। তখনই বামপন্থিরা চিৎকার করে বলে ধর্ম পুঁজিবাদীদের সহসঙ্গী হিসেবে কাজ করে, ধর্ম একটি আফিম, যা পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের সহযোগিতায় কাজ করছে।

অথচ এ ধরণের সন্ন্যাসবাদী ধর্ম ইসলামে অনুমোদিত নয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- “সন্ন্যাসবাদ”- ইহা তো উহারা নিজেরাই আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রবর্তন করেছিল আমি উহাদের ইহার বিধান দেই না । (সূরা হাদীদ,২৭)

 

এর মানে সন্ন্যাসবাদ আল্লাহ্‌ কর্তৃক স্বীকৃত নয় বরং তা মানুষ কর্তৃক প্রবর্তিত। সুতরাং সন্ন্যাসবাদীদের ধর্ম চর্চা দেখে বলা যাবে না ইসলাম পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নিঃস্পৃহ। কেননা সন্ন্যাসবাদী ধর্ম মূলত ইসলাম ধর্ম নয়, এক বিকৃত ধর্ম।    

আর এক শ্রেণি ইসলামের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ইসলামকে একটি রাজনৈতিক ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। এ শ্রেণি মনে করে, সন্ন্যাসবাদী ধর্ম ইসলাম সম্মত নয়। বরং ইসলাম প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণের মধ্য দিয়ে আল্লাহ্‌ নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা হয়। এ শ্রেণি মনে করে, মহানবী (সা.) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে আল্লাহ্‌র আইন-বিধান বাস্তবায়ন করে গেছেন। এর ফলে সমাজে ন্যায়বিচার, সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন এবং অশ্লীলতামুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে। তারা বিশ্বাস করে হযরত মুহম্মদ (সা.) এর রাজনৈতিক আদর্শ এবং আল কুরআনের বিধান অনুসরণ মানে হলো ইসলামের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ইসলামী বিধান কার্যকরের উদ্যোগ নিতে গিয়ে এ শ্রেণি বিতর্কিত ও বিভ্রান্তিকর পন্থা অবলম্বন করেন। এ শ্রেণির তিনটি উপশ্রেণি রয়েছে।

 

এক,  উদারনৈতিক তথা মডারেট শ্রেণি। এ শ্রেণি ইসলামী রাজনীতিতে বিশ্বাসী। দলগঠন প্রক্রিয়ায় সাংগঠনিক কার্যক্রমকে পাশ্চাত্য পদ্ধতির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে সমন্বিত করতে এ দল প্রয়াসী হয়। অস্ত্রের  উপর নির্ভরশীল না হয়ে সাংবিধানিক পন্থায় সরকার গঠনে এ দল বিশ্বাসী। ফলে এ পন্থা পাশ্চাত্যের সরকার গঠন পদ্ধতির বিরোধী হয় না। মুক্তবাজার অর্থনীতির বিরোধিতা না করে এ দল প্রকারান্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্য শক্তির আংশিক সমর্থন লাভ করে। ফলে সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে এ দল মডারেটরূপে চিহ্নিত হয়। এ দল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা না করে অগ্রসর হতে চায়। বিরোধিতা না করাকে এরা রাজনৈতিক কৌশল মনে করে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীরা যে চিরকাল ইসলাম বিরোধী এ বিষয়টি তারা বুঝতে চায় না। বামপন্থিরা এ দলকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহযোগী ও এজেন্ট বলে চিহ্নিত করে।  বামপন্থিরা মনে করে, ধর্ম যে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের সমর্থক, এ দলই তার প্রমাণ। অথচ বামপন্থিরা বুঝতেই পারে না যে ইসলামের মৌল নীতির সাথে এ দলের নীতির রয়েছে অসামঞ্জস্যতা।

 

দুই, ইসলাম ধর্ম চর্চাকারী আর এক দল রয়েছে যারা মডারেট নয়, যারা সাংবিধানিক পদ্ধতি, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করে। এ শ্রেণি দ্রুততার সাথে রাষ্ট্রে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ শ্রেণি সূক্ষ্ম চিন্তা ও বিচারবুদ্ধির অগ্রে স্থান দেয় আবেগকে। এ শ্রেণি স্থূলদর্শী। ফলে আল কুরআনের কতগুলো আয়াতকে স্থূলভাবে ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে। এরূপ রাজনৈতিক কর্মকে এরা নাম দিয়েছে জিহাদ। এ শ্রেণি প্রতিক্রিয়াশীল। পাশ্চাত্য ধরণের অতি আধুনিকায়নে যে অবাধ সংস্কৃতির বিস্তার ঘটছে- এ শ্রেণি তার প্রচণ্ড বিরোধী। কিন্তু অতি আধুনিকায়নের প্রতিক্রিয়ায় এ দল অসহনশীল হয়ে পড়ে। স্থূলদর্শীতা এবং  অসহিষ্ণুতার ফলে এ দল দ্রুত পদক্ষেপে প্রয়াসী হয়। ফলে চরমপন্থা গ্রহণ করে। চরমপন্থা নীতিকে কাজে লাগায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার অনুগত কিছু মুসলিম রাষ্ট্রের সরকারকে ব্যবহার করে এ দলকে অস্ত্র সহযোগিতা দিতে থাকে। অত্যাধুনিক অস্ত্র পেয়ে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে এ দল ইসলাম বিরোধী প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও সরকারকে আক্রমণ করে। এর  নাম দিয়েছে জিহাদ। কুরআনকে সার্বিকভাবে না বুঝে আংশিকভাবে বুঝার ফলে এ দলের মধ্যে জিহাদ সম্পর্কিত ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয় । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী চক্র চরমপন্থি এরূপ দলগুলোকে এক পর্যায়ে তাদেরই সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে কাজে লাগায়। চরমপন্থি এ সকল দলকে শক্তিশালী করতে এবং পৃষ্ঠপোষকতা করতে সাম্রাজ্যবাদী চক্র প্রথমদিকে সহযোগিতা করে। পরবর্তীতে এ সকল দলকে জঙ্গি আখ্যা দিয়ে জঙ্গি দমনের অভিযানে নামে। এ ভাবেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠিত করতে আফগানিস্তান, ইরাককে লক্ষ্যস্থল বানানো হয়। তখনই বামপন্থিরা চিৎকার করে বলে ধর্মপন্থি উগ্র রাজনীতি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে শক্তিশালী করতে সহায়ক। কিন্তু চরমপন্থিদের এরূপ পন্থা যে ধর্ম পন্থা নয়, তা বামপন্থিরা বুঝতে পারে না। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, ইসলাম ধর্মের মৌলনীতি এরূপ চরম পন্থার চরম বিরোধী।

তিন, তৃতীয় যে শ্রেণি ইদানিং আবির্ভূত হয়েছে তাতে মানবসভ্যতা বিস্ময়ে হতবাক। এটি নৃশংস শ্রেণি। সাম্রাজ্যবাদী চক্র বিশেষত আমেরিকা- ইসরাইল-সৌদি আরব অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কৌশলী ব্যবহারে এ শ্রেণি গঠন করা হয়েছে।  এ শ্রেণি কৃত্রিম রাজনৈতিক শ্রেণি। বিশ্বের বহু দেশ থেকে এমনকি ইউরোপ- আমেরিকা থেকে কর্মী সংগ্রহ করে প্রশিক্ষণ দিয়ে, অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে এ দল গঠন করা হয়েছে। এ দল মার্কিন- ইসরাইল বিরোধী নয়। এ দল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে মার্কিন- ইসরাইল বিরোধিতার বদলে ধর্মীয় দলগুলোর বিরুদ্ধে নেমেছে। এ দল মার্কিন- ইসরাইলপন্থিদের হত্যা না করে হত্যা করছে তাদের যারা মার্কিন- ইসরাইল বিরোধী এবং মার্কিন–ইসরাইলের সাম্রাজ্যবাদের মোকাবিলা করছে। কাফের আখ্যা দিয়ে এ দল হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে শিয়াদের ওপর, এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল সন্তুষ্ট হয়। এ দল হিজবুল্লাহ বিরোধী, হামাস বিরোধী।  ফলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠায় এ দল চরমভাবে সহায়ক। এ ধরণের নৃশংসপন্থা কি ইসলাম সমর্থন করে? এ ধরণের নৃশংসতা সরাসরি ইসলামী শক্তি দমনে ব্যবহৃত হচ্ছে- এ চিত্রই স্পষ্ট করে দেয়- এ দল ইসলামী রাজনীতি করে না। বরং ইসলামের নামে ইসলামী রাজনীতিকে কুলষিত করতে এ দল বিষফোঁড়া হয়ে আছে। সাধারণ জ্ঞানেই বুঝা যায় এ ধরণের নৃশংস কর্মসূচি পুরোদস্তর ইসলাম বিরোধী।

 

উপর্যুক্ত তিন উপশ্রেণির কার্যক্রমকে বিবেচনায় নিয়ে বামপন্থিরা প্রচার করছে, যেহেতু ইসলাম ধর্মীয় রাজনীতি এক ধরণের উগ্র, অসহিষ্ণু এবং জঙ্গিবাদী রাজনীতি- ফলে ইসলাম ধর্মের রাজনীতি প্রকারান্তরে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা গড়তে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার ফ্যাসিবাদী আবহাওয়ার মধ্যে, কোথাও তার সহযোগী হিসেবে, কোথাও তার বিরোধিতা করতে গিয়ে বিভিন্ন চরিত্রের ধর্মপন্থি রাজনীতির বিস্তার  ঘটেছে।’

 

‘ধর্মপন্থি রাজনীতি’ হলো সেই রাজনীতি যা ধর্মের মৌল নীতি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। প্রকৃত ধর্মপন্থি রাজনীতি কি  পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার সহায়ক? প্রকৃত ইসলামী রাজনীতি কি ফ্যাসিবাদের সমর্থনে কাজ করে? অথবা প্রকৃত ইসলামী ব্যক্তিত্ব কি সাম্রাজ্যবাদীদের দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে? মূলত ইসলাম ধর্ম যতটা পুঁজিবাদ বিরোধী এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী আর কোন মতাদর্শ ও ধর্ম এতটা বিরোধী হতে পারে নি। অথচ ইসলামের তত্ত্বজ্ঞানের অভাবে আনু মুহাম্মদ বলেন-

“ধর্মপন্থি রাজনীতি তার কাঠামোগত ও পরিচয়গত সীমাবদ্ধতার কারণেই বর্তমান দানবীয় বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে সব মানুষের একটি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই এগিয়ে নিতে কোনভাবেই সক্ষম নয়, বরং বর্তমান ধরণে এই রাজনীতি বিস্তার দেশে দেশে মানুষের মুক্তির  লড়াইকে বাধাগ্রস্ত করে বিশ্বের শোষক নিপীড়ক যুদ্ধবাজ জালেমদের শক্তিকেই স্থায়িত্ব দিচ্ছে।”

 

আনু মুহাম্মদের মতো বহু বিজ্ঞজন মনে করেন, ইসলাম ধর্মের পরিচয় যারা ইসলাম ধর্ম পালন করেন তাদের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়। ফলে ইসলাম ধর্মের সত্যিকার পরিচয় লাভ থেকে তারা বঞ্চিত হন। মূলত ইসলাম ধর্মের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য পরিচ্ছন্ন ও নির্ভুলভাবে জেনে বুঝতে হবে কারা ইসলাম ধর্ম মানেন।

 

এটা সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ইসলাম ঐতিহাসিকভাবে এবং মতাদর্শিকভাবে আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক ধর্ম। অন্যান্য ধর্ম থেকে এখানেই ইসলামের পার্থক্য। ইসলাম এক বিপ্লবী ধর্ম, যে ধর্ম শুরুতেই রাজনৈতিক কর্মসূচি হাতে নেয়। সমাজতান্ত্রিক মার্ক্সবাদী আন্দোলন রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। মার্ক্সবাদে মানুষের সংস্কৃতি উৎপাদনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামো দ্বারা নির্ধারিত হয় বলে তারা সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও বিকাশকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চায় না। অন্যদিকে ইসলাম আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেয়। কেননা খোদায়ী বিধান মতে, মানুষের চেতনা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠতে পারে এবং মানুষ তার আকল ও বিচারবুদ্ধির ব্যবহারে উৎপাদন কাঠামোর বন্দিত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে।

 

ফেরাউনের যুগে বনী ইসরাইলের মানুষদের উৎপাদন ও গৃহকর্মে নিযুক্ত করা হয়েছিল, যা ফেরাউনের ভাষায় অনুগ্রহ বলে ব্যক্ত হয়। কিন্তু নবী মুসা (আ.) ফেরাউনের জবাবে বলেন- “আমার প্রতি তোমার যে অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করছ, তা তো এই যে তুমি বনী ইসরাইলকে দাসে পরিণত করেছো।” (২৬;২২)

এ ছিল মুসা (আ.) এর দাসত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম । মুসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের চেতনা উৎপাদন কাঠামো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল না , বরং স্বাধীন বিশ্বাসগত চেতনা দিয়েই মুসা (আ.) প্রচলিত ফ্যাসিবাদী ফেরাউনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।

 

বামপন্থি রাজনীতির রয়েছে দ্রুততার নীতি। দ্রুততার সাথে রাজনৈতিক মোকাবিলার মধ্য দিয়ে শাসনব্যবস্থা কার্যকর করতে তারা উদ্যোগী হয়। তালেবানও দ্রুততার নীতি গ্রহণ করে আফগানিস্থানে শাসন প্রতিষ্ঠা করে। দ্রুততার নীতির কারণে রাশিয়ায় এবং চীনে দ্রুত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। কিন্তু রাশিয়া এক পর্যায়ে আইএমএফ এর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কাছে আত্মসমর্পণ করে। চীনও পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতিকে গ্রহণ করে সমাজতন্ত্রের মৌল নীতি থেকে সরে আসে । কিউবা আজ ব্যক্তিগত মালিকানাকে স্বীকৃতি দিয়ে পুঁজিবাদের পথে যাত্রা শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম বামপন্থিদের মত বা তালেবান- আল কায়েদার মত দ্রুততার নীতিতে বিশ্বাসী নয়। প্রকৃত ইসলাম সুফী সন্ন্যাসীদের মত ধীরে চলা নীতিতেও বিশ্বাসী নয়। ইসলাম চরমপন্থা এবং নরমপন্থা কোনটিকেই স্বীকৃতি দেয় না । বরং আল কুরআন বিশ্বাসীদের মধ্যমপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়। এর মানে ইসলাম বলছে ধীরে নয়, দ্রুতগতিতে নয়, মধ্যমপন্থা চলো, যা নরমও নয়, চরমও নয়।

 

ইসলাম প্রথমেই চায় আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব। ইসলাম বিশ্বাসীদের আহ্বান করে উচ্চতর মানবীয় চেতনাধর্মী স্বাধীন মানুষ হতে। ইসলাম চায় বিশ্বাসী যেন “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” এ নীতি ধারণ করে আত্মিক জগতে বিপ্লব তৈরি করে। এর মানে বিশ্বাসী ব্যক্তি পার্থিব সকল শক্তি ও সকল ক্ষমতার আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করতে প্রস্তুতি নেয়। আল্লাহ্‌ ছাড়া পার্থিব সকল শক্তি তথা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আনুগত্য প্রত্যাখ্যাত হয় “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” কবুল করার মধ্য দিয়ে। পৃথিবীতে আর কোন মতাদর্শ বা ধর্ম রয়েছে- যার কালেমা বা মুখ্যনীতি বাক্য ইসলামের কালেমার মত এত শক্তিশালী? “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” এ কালেমাই একজন বিশ্বাসীর মধ্যে বৈপ্লবিক জাগরণ তৈরি করে। আধ্যাত্মিক এ পরিবর্তনের কারণেই মুসা (আ.) ও হারুন (আ.) ফেরাউনের মত প্রতাপশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন । এ কালেমার শক্তিতেই ইব্রাহীম (আ.) নমরুদ ও তার এলিটদের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। অগ্নিকুণ্ড তাঁকে ভীত সন্ত্রস্ত করতে পারেনি । এ নীতির ভিত্তিতেই ঈসা (আ.) লড়েছিলেন জালেম শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, মুহাম্মদ (সা.) লড়াই ও যুদ্ধ করেন তৎকালীন জুলুমবাজ ও যুদ্ধবাজ শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।

 

ইসলামেরই রয়েছে যুগে যুগে ঐতিহাসিককাল থেকেই যুদ্ধবাজ, অত্যাচারী, ফ্যাসিবাদী এবং মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে লড়াই করার ইতিহাস। বামপন্থি রাজনীতি হয়তো ইসলামের ইতিহাস থেকে কিছু শিক্ষা ও প্রেরণা পেয়েছে। কিন্তু মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে এবং ইসলামের ক্রমাগত অগ্রাভিজানের কারণে আতঙ্কিত হয়ে বামপন্থি রাজনীতি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার সাথে সাথে ধর্ম বিরোধিতায় নেমেছে।

ইসলাম আধ্যাত্মিক বিপ্লবের মধ্য  দিয়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের দিকে বিশ্বাসীদের অনুপ্রাণিত করে। ইসলাম বিশ্বাসীদের আত্মসংশোধন এবং তার ভিত্তিতে সমাজ সংশোধনের কর্মসূচি গ্রহণের আহবান জানায়। ইসলাম জ্ঞান অর্জন এবং পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণের নির্দেশ দেয়। কেননা, আত্মসংশোধন ও পবিত্রতা অর্জনের ফলে একজন মানুষ, একটি দল সমাজ সংস্কারের দায়িত্ব নেয়ার অধিকার রাখে। পবিত্র কুরআনে উল্লখ হয়েছে “যে পবিত্রতা অর্জন করে সে সাফল্য লাভ করে ।”(৮৮;১৪)

 

সমাজ গঠনের জন্য সেক্যুলার মতাদর্শে জ্ঞান অর্জনকে অগ্রাধিকার দেয় এবং জ্ঞান ও বিবেকের উপর নির্ভর করা হয়। ফলে ইহজাগতিক চিন্তাধারা সম্পন্ন মানুষ ব্যাপক মাত্রায় বৈপ্লবিক হতে পারে না। এক আল্লাহ্‌র কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে না- এমন বিশ্বাসে সেক্যুলার মানুষ আত্মস্বার্থ বা কামনার প্রবল প্রতাপ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক সময় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ থেকে সরে আসলেও ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হতে পারে। এ কারণেই বামপন্থি রাজনীতির দৈন্যদশা স্পষ্ট। আল্লাহ-পরকালে অবিশ্বাসী বলেই এবং আত্মসংশোধনের অভাবে বামপন্থি বিদ্ব্য সমাজের বৃহৎ অংশ ক্ষমতা ও অর্থের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

অথচ ইসলাম পবিত্রতা অর্জনের জন্য এবং আত্মসংশোধনের কর্মসূচি গ্রহণের জন্য আত্মিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি চালু করে। নামায,  রোজা, হজ, যাকাত- এ সকল এবাদত নিষ্ঠার সাথে পালনের মধ্য দিয়ে বিশ্বাসীরা সংশোধিত ও পবিত্র হতে পারে । অথচ সেক্যুলার ব্যবস্থায় এ ধরণের কর্মসূচি নেই বলে অর্থনৈতিক ও অনাচারের বিস্তার সহজতর হয়।

 

ইসলাম ধর্মের অনুসারী বিশ্বাসীরা সারা জাহানের স্রষ্টা ও প্রতিপালক এক আল্লাহ্‌র আনুগত্য করতে গিয়ে প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে উচ্চতর আত্মার অধিকারী হয়। কোনরূপ সংকীর্ণতা স্থান পায় না। ব্যক্তিকেন্দ্রিক অথবা নিচক পরিবার কেন্দ্রিক জীবন চেতনা পরিবর্তন করে  মুমিন ব্যক্তি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে। আল্লাহ্‌ বলেন- “যে আমার(আল্লাহ্‌র) স্মরণে বিমুখ, অবশ্য তার জীবন যাপন হবে সংকুচিত।” (২০;১২৪)

সুরা হাজ্জে আল্লাহ্‌ বলেন- “তোমরা সাক্ষীস্বরূপ হও মানবজাতির জন্য।” (২২;৭৮)

এভাবে মুমিন ব্যক্তি খোদায়ী বিধান অনুসরণের ফলে সংকীর্ণ পদ্ধতির জীবন যাপন থেকে সরে এসে মানব জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করে। যখনই বিশ্বাসীরা মানবজাতির সাক্ষ্য হয়ে কাজ করবে তখনই সাম্প্রদায়িক ক্ষুদ্র দৃষ্টিভঙ্গিতে তারা আবদ্ধ থাকে না । কেননা সাম্প্রদায়িকতা এক ধরণের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি যা মানবতাকে খণ্ডিত করে । আল্লাহ্‌ বলেন- “কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন কখনো সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে।” (৫:৮)

 

মূলত ইসলাম ধর্ম পালন করতে গিয়ে মুমিন মানুষেরা উন্নত সংস্কৃতি চর্চা এবং আত্মবিকাশের পথ ধরে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়। ইসলামী দল তখন শুধু সুষম অর্থনীতি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে না, সুস্থ সুন্দর মানবীয় সংস্কৃতি সম্পন্ন জাতি গঠনে আত্মনিয়োগ করে। আল্লাহ্‌র সুস্পষ্ট ঘোষণা পালনে তারা বদ্ধ পরিকর- “আল্লাহ্‌ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎকর্ম ও সীমালঙ্ঘন।” ( ১৬; ৯০)

 

ইসলামী দল সমাজে ন্যায়বিচার ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার কর্মে নিয়োজিত হয়ে সকল প্রকার অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘনের বিরোধী হয়ে পড়ে। অশ্লীলতা, অসৎকাজ এবং সীমালঙ্ঘনের বিরোধিতা করতে গিয়ে ইসলামে বিশ্বাসীরা পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। পুঁজিবাদী অর্থনীতি অন্যায়ভাবে শোষণমূলক ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। আজকের যুগের পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা সুদভিত্তিক অর্থনীতি এবং অশ্লীল সংস্কৃতির উপর দাঁড়িয়ে আছে। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যে ধর্ম সুদভিত্তিক অর্থনীতি এবং অশ্লীল সংস্কৃতির ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার।  

১৪০০ বছর আগেই কুরআনে ঘোষিত হয় যে, তোমরা সুদ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আল্লাহ্‌ ও রসূলের সহিত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।  (২;২৭৯)

পৃথিবীতে সুদ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এত বড় বিদ্রোহ অন্য কোন মতাদর্শে এত শক্তভাবে কি উচ্চারিত হয়েছে?   

 

আজকের যুগে অশ্লীল সংস্কৃতির উপর প্রতিষ্ঠিত আছে নোংরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। এ যুগের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অশ্লীল ও নোংরা সংস্কৃতির চর্চার জন্য পুঁজিবাদী মিডিয়াগুলো ব্যবহার করছে। স্বাধীনতা ও মুক্তির নামে পারিবারিক কাঠামোকে দুর্বল করার সকল আয়োজন চলছে। রোমান্টিক ভালোবাসা, তরল ভালোবাসার চর্চাকে অনুপ্রাণিত করছে মিডিয়ার মুভিগুলো। এর ফলে পরিবার ভাঙছে দ্রুত গতিতে। এছাড়াও প্রাক বৈবাহিক সম্পর্ক, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক চর্চা বৃদ্ধির ফলে পারিবারিক সুস্থ- সুন্দর জীবন গঠন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এরূপ পরিস্থিতি নোংরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করছে। শুধু তাই নয়, পরিবার ভিত্তিক সুস্থ- সুন্দর চরিত্র গঠনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। প্রযুক্তি নির্ভর অশ্লীল সংস্কৃতি এবং ভারতীয় নোংরা সংস্কৃতি চর্চার বৃদ্ধির ফলে পুঁজিপতিদের মুনাফাই শুধু অর্জিত হচ্ছে না পারিবারিক অশান্তি বেড়ে চলছে সাথে সাথে উন্নত সমাজ গঠনের কর্মসূচি স্থবির হয়ে পড়ছে।

 

ইসলাম সর্বোতভাবে পুঁজিবাদীদের এ ধরণের নোংরা সংস্কৃতির চর্চার বিরোধী। ইসলাম প্রাক বৈবাহিক, বিবাহবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্ক চর্চাকে ধর্মবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে। এর ফলে পুঁজিবাদীরা ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় । সেক্যুলার তত্ত্ব অনুযায়ী বামপন্থি সংস্কৃতি বিবাহ বহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্ককে অনৈতিক, অশ্লীল মনে করে না।  

সংস্কৃতির দিক থেকে পুঁজিবাদী ও সমাজতন্ত্রীদের অনেক মিল লক্ষ্য করা যায়। ইসলাম যে সংস্কৃতিকে অনৈতিক মনে করে, পুঁজিবাদী ও সমাজতন্ত্রীদের আছে তা নৈতিক। পার্থক্য  হলো পুঁজিবাদীরা মুনাফার কারণে নৈতিক মনে করে, সমাজতন্ত্রীরা ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে নৈতিক মনে করে। ফলে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পার্থক্য সৃষ্টি করলেও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অভিন্ন রুচিসম্পন্ন হয়ে থাকে।

 

ইসলাম আধ্যাত্মিকতা ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণের আহবান জানায়। ইসলামের রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণকে ফরজ করা হয়েছে। তবে যে কেউ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারে না। অপবিত্র এবং সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ যদি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে তা রাজনীতিকেই কলুষিত করবে। ফলে জুলুম অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ক্ষমতায় আরোহণের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার হতে পারে । ক্ষমতায় আরোহণ করতে পারলেই সেই সংগ্রামী স্বৈরাচার হতে পারে। এ কারণে ইসলামে রাজনীতি- করার উপযুক্ত তারাই যারা পার্থিব চাকচিক্যে মোহগ্রস্ত নয়, যারা প্রশাসনিক ক্ষমতার মধ্যে পার্থিব তৃপ্তির অন্বেষণ করে না। বরং যারা জ্ঞানী, বিচক্ষন, কলুষতা থেকে মুক্ত, পবিত্র ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী তারাই ইসলামী রাজনীতির সৈনিক। এ ধরণের গুণাবলীসম্পন্ন মানুষেরাই অত্যাচারী জালিমের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সর্বাধিক সক্ষম।

অত্যাচারী জুলুমবাজ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং ন্যায় ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা ইসলাম কর্তৃক নির্ধারিত এক মহান দায়িত্ব। সে দায়িত্বের প্রতি জোর দিয়ে আল্লাহ্‌ বলেন- “ তোমাদের কী হলো যে, তোমরা যুদ্ধ করবে না আল্লাহ্‌র পথে- অসহায় নর নারী ও শিশুদের জন্য যারা বলে- হে আমাদের প্রতিপালক- এই জনপদ যার অধিবাসী জালিম, ইহা হতে আমাদের অন্যত্র নিয়ে যাও, তোমার নিকট হতে কাউকে আমাদের অভিভাবক করো, তোমার নিকট হতে কাউকে  আমাদের সহায় করো। ” (৪:৭৫)

 

এর চাইতে সুস্পষ্ট আয়াত কোন বিধানে রয়েছে যে আয়াত অত্যাচারী জালেমদের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পারে? তাহলে কি করে বিরুদ্ধবাদীরা বলতে পারেন দানবীয় বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ইসলামে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে?

 

ইসলাম বিশ্বাসগত ঐশ্বর্যতায় উচ্চতর আত্মিক শক্তির বিকাশকে গুরুত্ব দেয়, তেমনি ব্যবহারিক দিক থেকে ন্যায়নীতির প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়- অত্যাচারী ব্যবস্থার মূলোচ্ছেদ করার লড়াইকে মুমিনদের কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করে। সকল প্রকার অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির আবির্ভাবের জন্য দেবতার উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল হতে ইসলাম নির্দেশনা প্রদান করে। ইসলাম  অসহায়, বঞ্চিত, শোষিত- নিপীড়িত নরনারী ও শিশুদের মুক্তির জন্য বিশ্বাসী মানুষকেই অভিভাবক ও সাহায্যকারী হওয়ার নির্দেশ দেয়। এরূপ দায়িত্ব পালনে কোন প্রকার ওজর আপত্তি থাকতে পারে না। কেননা ইসলাম বিশ্বাসীদের জান-মাল আল্লাহ্‌র পথে তথা জনতার মুক্তির পথে বিসর্জনের নির্দেশ দেয়। কেননা সৎকর্মের প্রতিষ্ঠা এবং দুষ্কৃতির মূলোচ্ছেদ- এ কর্মে শামিল হওয়ার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি বা জাতি শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হতে পারে। আল্লাহ্‌ পাক বলেন- “তোমারাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানবজাতির  জন্য তোমাদের আবির্ভাব । তোমরা সৎকাজের আদেশ দিবে অসৎকাজ তথা দুষ্কৃতির উচ্ছেদ করবে। ” (৩:১১০)

 

এর মানে মুসলমান হলেই সে শ্রেষ্ঠ নয়। শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়- অবিচারমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্যে নিহিত। বলা হয়েছে, “তোমাদের পাঠানো হয়েছে মানবজাতির জন্য।” কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য নয়। এর মানে বিশ্বের যেখানেই ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে যে মানুষই অন্যায়-অবিচারের শিকার সেখানেই অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা মুমিনদের দায়িত্ব।

এরূপ সংগ্রামের জন্য ইসলামের রয়েছে সুমহান ঐতিহ্য। পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায় ইসলামের অনুসারী স্বল্প সংখ্যক হলেও তারা অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে বজ্রকঠোর ছিল। অস্ত্রবল এবং সৈন্যবলের দিক থেকে ব্যাপক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ইসলামের বীর সৈনিকেরা পিছপা হয়নি। বরং শহীদ হওয়ার প্রেরণায় জনতার মুক্তির  জন্য জীবন দেয়ার সংস্কৃতি ইসলামই তৈরি করেছে। এরূপ শহীদী প্রেরণার ফলে ঐতিহাসিকভাবেই ইসলাম বিজয়ী হয়েছে। আরবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ন্যায়- ইনসাফভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্র।

 

যখন ইসলামী দল সাধারণ অর্থে বিজয়ী হওয়ার সম্ভবনা একদম নেই, তখনও অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে ইসলামে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। ইমাম হুসাইন (আ.) যখন দেখলেন জালেম এজিদ গোষ্ঠীর বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার মত সৈন্যবল নেই; তখনো ইমাম হুসাইন লড়াই করতে পিছপা হননি। ইমাম হুসাইন বলেন- “ না, আল্লাহ্‌র কসম খেয়ে বলছি, কিছুতেই আমি তোমাদের (এজিদ গোষ্ঠীর) হাতে হাত মেলাবো না। এমনকি আজ এরূপ দুরবস্থার মধ্যে পড়েও, স্বীয় সঙ্গীদের মৃত্যু নির্ঘাত জেনেও পরিবার পরিজনদের বন্দিদশা অনিবার্য জেনেও আমি আমার মহান লক্ষ্যকে তোমাদের কাছে বিকিয়ে দেবো না।”

ইসলাম এমন এক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে যে লক্ষ্য নিজের জীবন, পরিবার পরিজনের জীবন তথা সঙ্গীদের জীবন বিসর্জনের মধ্য দিয়ে অর্জন করতে হয়। এ হলো জনগণের মুক্তির লড়াই। জনগণের মুক্তির লড়াইয়ে এরূপ উদাহরণ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত আর কোন মতবাদ কি দিতে পেরেছে? ইসলামের সুযোগ্য অনুসারীরা নিজ জীবন, পরিবার- পরিজনের জীবনের চাইতে গণমানুষের মুক্তি ও অধিকার আদায়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। ইমাম হুসাইন (আ.) এর বিপ্লব এর কালজয়ী প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

 

ইমাম হুসাইন (আ.) এর বিপ্লব তথা ইসলামের বিপ্লব শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সুষম ব্যবস্থার জন্যই রচিত হয় নি। বরং এ বিপ্লব ছিল সকল প্রকার দাসত্ব ও অবিচারের বিরুদ্ধে। মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই কেমন উচ্চমার্গীয় হতে পারে তা যেমন মুহাম্মদ (সা.) দেখিয়েছেন তেমনি দেখিয়েছেন ইমাম হুসাইন (আ.)।

বামপন্থিয় রাজনীতি অর্থনৈতিক সমবণ্টনকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিতে চায়, অথচ ইসলাম চায় আগে দাসত্ব থেকে মুক্তি তারপর অর্থনৈতিক মুক্তি ।

 

চীন ৩৫ বছর ধরে এক সন্তান নীতি চালু ছিল। চীনের কম্যুনিস্ট পার্টি অর্থনীতির চাকা সচল করতে এ সিদ্ধান্ত নেয়। চীনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০১৩ এর তথ্যমতে ১৯৭১ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত চীনে ৩৩ কোটি ৬০ লাখ গর্ভপাত হয়েছে। ১ সন্তানের অধিক সন্তান নিলেই পিতামাতাকে কারাবরণ অথবা আর্থিক জরিমানা করতে হতো। একমাত্র সন্তান যেন ছেলে হয় সে জন্যে বেছে বেছে নারী  ভ্রূণ হত্যা করতো পিতামাতার সিদ্ধান্তে। এভাবে অর্থনৈতিক উন্নতিকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে আমানবিক দমন নিপীড়নের পন্থা গ্রহণ করেছে চীনের একদলীয় শাসক।

 

কিন্তু ইসলাম দমন নিপীড়নের পন্থার বদলে মানুষকে দিয়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা , অর্থনৈতিক উন্নতির অগ্রে স্থান দিয়েছে মানবীয় মর্যাদা। ইসলামই কাঠামোগত এবং পরিচয়গত দিক থেকে উচ্চতর ও উন্নততর ধর্মপন্থি রাজনীতির বিকাশকে গুরুত্ব দিয়েছে। যার ফলে ইসলামই পুঁজিবাদী ও ফ্যাসিবাদী দানবীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানবিক সমাজ গঠনে সর্বাধিক অগ্রসর ও সক্ষম।     

 

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
 
(মতামত প্রকাশিত বক্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব,  রেডিও তেহরানের সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভূক্ত নয়।)

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন