এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 19 নভেম্বর 2015 11:23

তাকফিরি জঙ্গি সংগঠন আইএসআইএল’র পেছনের খলনায়ক কারা?

তাকফিরি জঙ্গি সংগঠন আইএসআইএল’র পেছনের খলনায়ক কারা?

মিজানুর রহমান মিলন: আইএসআইএল আসলে কী? এটা কি কোনো রাষ্ট্রশক্তি না পরাশক্তি? এটা শুধুমাত্র একটি ভুঁইফোড় সংগঠন। অবাক করার বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের মত বিশ্ব পরাশক্তি গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আইএসআইএল’র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। আইএসআইএল’র বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ করছে পরাশক্তি ব্রিটেন, ফ্রান্স, আঞ্চলিক শক্তি তুরস্ক, সৌদি আরবসহ অন্য আরব রাষ্ট্রগুলোও। মানে ওরা দাবি করছে যে, ওরা আইএসআইএল’র বিরুদ্ধে জোট গঠন করে যুদ্ধ করছে। তেমনি আইএসআইএল’র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে পরাশক্তি রাশিয়া ও আঞ্চলিক শক্তি ইরান। এতগুলো রাষ্ট্র আইএসআইএল’র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরেও আপাতদৃষ্টিতে ভুঁইফোড় একটি সংগঠন আইএসআইএল’র কোনো চুলও ছিড়তে পারছে না কেউ; বরং দিন দিন এর বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা যেন বেড়েই চলছে। আইএসআইএল এতই শক্তিশালী হয়েছে যে, খোদ জন্মদাতা বাবার বাসভবনেও হামলা করছে! আসলেই কি আইএসআইএল এত শক্তিশালী?

 

আসলে সিরিয়া ও ইরাক হল- বর্তমানে বিশ্বরাজনীতির নাট্য মঞ্চ। মঞ্চের বাইরের দৃশ্য সম্পর্কে ধারণা না থাকলে আপাতদৃষ্টিতে আইএসআইএলকে ভয়ঙ্কর শক্তিশালী মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। আইএসআইএল আসলে কিছুই না। আইএসের জন্মদাতা হল যুক্তরাষ্ট্র, সহযোগী জন্মদাতা হল ব্রিটেন ও ফ্রান্স আর মা হল সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্র অন্যান্য রাজতান্ত্রিক দেশগুলো। তবে আইএসআইএল সৃষ্টিতে তুরস্ক ‘সারোগেট মা’ হিসাবে অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে। অবশ্যই আইএসআইএল সৃষ্টিতে ওহাবি ইসলামী আইডিওলজি একটা বিরাট প্রভাবক কিন্তু এখানে শুধু রাজনৈতিক দিকটা আলোচনা করব। আমি হলফ করে বলতে পারি যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স আজই যদি আইএসআইএলকে বিলুপ্ত করার ইচ্ছা পোষণ করে অথবা নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করে তাহলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আইএসআইএল বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু তারা সেটা করবে না, কখনই করবে না। মূলত এখানেই ভানুমতির খেলা!

 

যেসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি

আইএসআইএল কি নিজেই অস্ত্র বানায়? ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র বানায়? এই যে আইএসআইএল যুদ্ধ করছে তো তাদের অস্ত্রগুলো কোন দেশের? কোন কোন দেশ তাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করছে ও কোনো কোন দেশ তাদের অস্ত্র সহায়তা করছে? আরো প্রশ্ন হল কেন করছে? আইএসের উৎপত্তি ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়ায় কেন? মধ্যপ্রাচ্যে কি মার্কিন ও পশ্চিমা মিত্র রাষ্ট্রের অভাব আছে? এদের একটিতেও আইএসআইএল সক্রিয় নয় কেন? মার্কিন ও পশ্চিমা বিরোধী রাষ্ট্রগুলোতে কেন আইএসআইএল? বিশাল অর্থ সহায়তা ছাড়া রাতারাতি আইএসআইএল’র মত এত বড় একটি সংগঠন কিভাবে দাড়িয়ে গেল? আর সেই অর্থ সহায়তা কোনো দেশ করল? ইরাক ও সিরিয়ার তেলক্ষেত্রগুলো দখল করে সেই তেল উত্তোলন করে আইএসআইএল বিক্রি করছে কিভাবে এবং কার কাছে বিক্রি করছে? আইএসআইএল কোন কোন দেশের সাথে বৈদেশিক বাণিজ্য করছে? আহত আইএসআইএল জঙ্গিরা কোথায় ও কিভাবে চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরী তাহলেই মঞ্চের বাইরের দৃশ্য সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে।

 

আইএসআইএস সৃষ্টিতে দায় কার?

ওবামা বলছেন আইএসআইএল সৃষ্টির জন্য বুশ দায়ী আর বর্তমানে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা বলছেন- ওবামা দায়ী। মানে আমরা তো বটেই স্বয়ং আমেরিকার কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে স্বীকার করছেন যে, আইএসআইএল সৃষ্টিতে আমেরিকাই দায়ী।

 

মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আমেরিকার বৃহত্তর পরিকল্পনায় এখন পর্যন্ত কোনো পরিবর্তন আসেনি আর আসেনি বলেই রাশিয়ার সিরিয়ায় আইএসআইএল’র উপর হামলায় তারা বিরক্তবোধ করছে। রাশিয়া যখন হামলা করে আইএসআইএল, আল কায়েদা ও আল নুশরার উপর তখন উহ-আহ করে আমেরিকা, সৌদি ও তুর্কি। তাই সম্ভবত রাশিয়ার হামলার বিপরীতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের নিমিত্তে প্যারিস হামলার নাটক মঞ্চায়িত হতে পারে।

 

আইএসআইএল ও ফ্রান্সের নীতি

পশ্চিমা অন্যান্য রাষ্ট্রের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপারে ফ্রান্স কিছুটা হলেও দূরত্ব বজায় চেষ্টা করেছিল যদিও ফ্রান্স ২০১১/১২ তে আল কায়েদা, আইএসআইএল ও তথাকথিত মডারেটদের অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা করেছিল বলে রিপোর্টে জানা গেছে কিন্তু পরবর্তীতে ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের মত ততটা সক্রিয় ছিল না বলে অনুমিত হয়েছে। যেমন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল ফ্রান্স। প্যারিসে হামলার মাধ্যমে ফ্রান্সকে সিরিয়াতে সরাসরি উপস্থিত করা হল। এটা গেম প্লানেরই একটি অংশ। এর বাইরে তাদের অত্যন্ত গোপনীয় ও গভীর পরিকল্পনারও কোনো অংশ হতে পারে। তবে সিরিয়ায় রাশিয়ার উপস্থিতিতে আপাতত আসাদ বাহিনীর উপর আপাতত হামলা চালাবে না। পরে কী হবে এখনই বলা যাচ্ছে না।

 

যুক্তরাষ্ট্রের টম অ্যান্ড জেরি খেলা

আইএসআইএল দমনের যুক্তরাষ্ট্র এতদিন টম অ্যান্ড জেরি খেলা খেলছিল প্যারিস হামলার মাধ্যমে সেটাই হয়তো আর দীর্ঘায়িত করা প্রচেষ্টা। অন্যদিকে প্রকান্তরে আসাদ বিরোধীদের শক্তিশালী করা। চলিত ঘটনাবলীর আলোকে বলা যায়- ইরান ও রাশিয়াকে লক্ষ্য করে তারা কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করে থাকতে পারে কারন মধ্যপ্রাচ্যে অঢেল জ্বালানি সম্পদ পুরোপুরি কবজা করতে ইরান ও রাশিয়া ছাড়া অন্যকেউ তাদের প্রতিপক্ষ নয়।

 

প্যারিস হামলার পর বদলে যাচ্ছে পরিস্থিতি

দিন যতই যাচ্ছিল ইরাক ও সিরিয়া নিয়ে পশ্চিমাদের মধ্যে বিভক্তি তত বাড়ছিল, কিন্তু প্যারিসে হামলা তাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে যা আমরা ইতোমধ্যেই লক্ষ্য করছি। কানাডার নতুন প্রধানমন্ত্রী যেখানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিল তিনি এখন তা করবেন কি না তা একটি প্রশ্ন।

 

আইএসআইএল নির্মূল হবে কি?

আসলে আইএসআইএল সহসাই বিলুপ্ত হবে না। বিলুপ্ত হবে না বলে কথা নয় তাদের বিলুপ্ত করা হবে না, তাদেরকে নির্মূল করতে দেবে না। কারা নির্মূল করতে দেবে না, কেন দেবে না- এটাই প্রশ্ন। আইএসআইএল যদি আজই নির্মূল হয় তাহলে আগামীকালই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে যাবে; হুমকির মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন , ফ্রান্স, সৌদি আরব, তুরস্ক ও ইসরায়েলের স্বার্থ। বিনষ্ট হবে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। সাধারণ মানুষ কিছুই না- এরা হল বিশ্ব নেতাদের শক্তিপরীক্ষার গিনিপিগ। আমেরিকা যখন জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিউক্লিয়ার বোমা নিক্ষেপ করে তখন কি সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করছিল? করেনি, তেমনি ফ্রান্সের প্যারিসে যা হল, বৈরুতে যা ঘটেছে, অন্যান্য দেশে জঙ্গিদের বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা যা ঘটছে এসব আসলে বিশ্ব নেতাদের শক্তিপরীক্ষার এক একটি ক্ষেত্র।

 

প্যারিসে আইএসআইএল’র হামলা কেন?

গত এক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা ও সৌদি, তুরস্ক জোট আইএসআইএল বিরোধী যুদ্ধের কথা বলে মূলত আইএসআইএলকে ভয়ঙ্কর থেকে অতি ভয়ঙ্কর দানব বানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে ইরান ও রাশিয়াকে মাইনাস করতে। আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র বাশার আসাদের সিরিয়া হল- ইরান ও রাশিয়ার প্রত্যক্ষ মিত্র। তাই আসাদের উপর পশ্চিমারা ক্ষেপা তেমনি ক্ষেপা সৌদি ও তুরস্কও। এজন্যই তারা আসাদের অপসারণ চায়। ঠিক একই কারণে ইরান ও রাশিয়াই প্রকৃতপক্ষে আইএসআইএল জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। রাশিয়া যদি সিরিয়ায় আইএসআইএল’র ওপর হামলা না করত তাহলে হয়তো প্যারিসে আইএসআইএল বোমা হামলা করত না। একটি ঘটনার সাথে আর একটি ঘটনার যোগসূত্র আছে।

 

প্যারিস-বৈরুত হামলার রহস্য উদঘাটন করতে হলে..

সিএআইএ প্রধান ইতোমধ্যেই বলেছেন প্যারিসে হামলার ঘটনা তারা আগে থেকেই জানত! প্যারিসের হামলায় পশ্চিমা কোনো সরকার বা কোনো গোয়েন্দা সংস্থার হাত আছে কি না তা স্পষ্ট করে না বলে বরং এটাই বলা যায় যে, ফ্রাঙ্কস্টোইন আইএসআইএল সৃষ্টি করেছে সে আইএসআইএলই রাশিয়ার বিমান হামলা ও ইরান, সিরিয়া ও হিজবুল্লাহর গ্রাউন্ড আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে অন্য কোনো দেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পরামর্শে, সহযোগিতায় বোমা হামলা ঘটিয়েছে। কারণ হল পশ্চিমাদের সিরিয়ার মাটিতে রাশিয়া ও ইরানের বিপেক্ষ দাঁড় করানো। সৌদি বাদশাহ মালেক সালমান ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিলে প্যারিস হামলা, বৈরুত হামলাসহ সকল জঙ্গি হামলার নেপথ্য খলনায়কদের মুখোশ উন্মোচনসহ সকল রহস্য বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন হবে।#

 

লেখক: অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক রাজনৈতিক ভাষ্যকার

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন