এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 26 নভেম্বর 2015 23:36

রুশ প্রেসিডেন্টে ভ্লাদিমির পুতিন: বিশ্ব রাজনীতিতে চালকের আসনে

রুশ প্রেসিডেন্টে ভ্লাদিমির পুতিন: বিশ্ব রাজনীতিতে চালকের আসনে

আনোয়ারুল হক আনোয়ার : সিরিয়া যুদ্ধে রাশিয়ার অংশগ্রহণের মাধ্যমে আবারো আলোচনায় উঠে আসে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ রাশিয়ার শক্তিধর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নাম। ইউক্রেন ইস্যুতে পশ্চিমাদের টেক্কা দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে সমর্থ হন। পারমানবিক ইস্যুতে ইরানের সাথে পশ্চিমা শক্তি কর্তৃক সৃষ্ট বিরোধে তেহরানের একনিষ্ট বন্ধু’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে শেষতক উভয় পক্ষকে এক টেবিলে এনে শান্তি চুক্তি সম্পাদনের ন্যায় ঝুঁকিপূর্ণ একটি ইস্যু শন্তিপূর্ণভাবে সম্পাদনেও ভ্লাদিমির পুতিন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। দক্ষিণ চীন সাগরের কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ নিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে চীনের বিরোধ অতঃপর কোনো কারণ ছাড়াই আমেরিকার রণপ্রস্তুতি বিশ্ববাসীকে আতঙ্কিত করে তোলে। শেষতক কোনো ঘোষণা ছাড়াই আমেরিকার যুদ্ধজাহাজ প্রত্যাহারের নেপথ্যে কাজ করেছে চীনের প্রতি ভ্লাদিমির পুতিনের সমর্থন। মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে এবার নড়েচড়ে বসেছে ভ্লাদিমির পুতিন। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে রাশিয়ার কুটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো জোরদার হচ্ছে। রাজা-বাদশাহ এমনকি তাদের প্রতিনিধিরাও মস্কো যাতায়াত বৃদ্ধি করেছে। নিজ দেশে স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতির চাকা সচল করতে সমর্থ হন তিনি। পাশাপাশি সামরিক শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে চোখ ধাঁধানো সাফল্যের নেপথ্যে পুতিনের নিরলস প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবি রাখে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে পশ্চিমাদের বিপরীতে কঠোর অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে রাতারাতি হিরো বনে যান ভ্লাদিমির পুতিন। ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে ভ্লাদিমির পুতিন এখন চালকের আসনে।

 

ভ্লাদিমির পুতিনের পরিচিতি :

১৯৫২ সালের ৭ অক্টোবর ভ্লাদিমির পুতিন জন্মগ্রহন করেন। তিনি রুশ অর্থোডক্স গির্জার একজন সদস্য। এক সময় পুতিন কেজিবি প্রধান ছিলেন। রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ সংকটজনিত সময়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের পদত্যাগের পর ভ্লাদিমির পুতিন ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে রুশ প্রজাতন্ত্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করেন। ২০০৪ সালে পুতিন দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের ৭ মে মেয়াদ শেষ হয়। এসময় সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি ধারাবাহিকভাবে তৃতীয় মেয়াদের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে না পারলেও ২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার উত্তরসুরি হিসেবে বিশ্বস্ত ও সাবেক সেনা প্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভের বিজয় সুনিশ্চিত করেন। পরে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভ্লাদিমির পুতিনকে মনোনীত করেন। ২০১২ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্ধিতা করে পুতিন তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

 

রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অগ্রগতি :

তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণের পর পশ্চিমাজগত এবং নিজ দেশের বিরোধীরা তাকে ‘অগণতান্ত্রিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও দেশে আইনের শাসন প্রবর্তন এবং স্থিতিশীলতা আনার মাধ্যমে রুশ সমাজ ব্যবস্থায় তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার সর্বশেষ জনপ্রিয়তা হচ্ছে ৮৪%। পুতিন তার শাসনামলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হন। রাশিয়ার অর্থনৈতিক ভিত এসময় শক্তিশালী হয়। দারিদ্রতা ৭০% হ্রাস পায়। মাসিক বেতন ৮০ ডলার থেকে ৭৯০ ডলারে উন্নীত হয়। জ্বালানি নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার ফলে দেশটি জ্বালানি খাতে বৃহৎ শক্তি হিসেবে আর্বিভূত হয়। বৃহৎ জ্বালানি প্রকল্প হিসেবে দেশটি পারমানবিক শক্তিতে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়। অনেকগুলো রফতানি সহায়ক পাইপ লাইনের মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থার অবকাঠামো নির্মাণে সফল হয় দেশটি। এরমধ্যে ইস্টার্ণ সাইবেরিয়া-প্যাসিফিক ওশেন অয়েল পাইপলাইন নর্ড স্ট্রিম প্রকল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পুতিন লভ্যাংশের উপর কর হ্রাসসহ ১৩% হারে আয়কর ধার্যের বিষয়ে আইন পাস করেন। এতে দেশটির রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পায়। ফলে অভ্যন্তরীণ সমৃদ্ধির পাশাপাশি লাখ লাখ বেকারের কর্মসংস্থানের সূযোগ সৃষ্টি হয়।

 

সোভিয়েত ইউনিয়নের সংকটকাল :

আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তি পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করে। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার যুবক পাকিস্তানে পাড়ি জমায়। তখন সিআইএ এবং ওসামা বিন লাদেন গ্রুপের মাধ্যমে যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পরবর্তীতে এসব যুবককে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্বে যুদ্ধে নিয়োজিত করা হয়। আফগান যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হলে একসময় আফগানিস্তান ত্যাগ করে সোভিয়েত সেনারা। একই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে চরম আর্থিক মন্দা এবং দেশটির কয়েকটি অঞ্চল স্বাধীনতার দাবিতে মস্কো সরকারের ভিত দুর্বল করে দেয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় অদক্ষ এবং দুর্বল চিত্তের অধিকারী সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ এ দু’টি সংকট নিরসনে চরম ব্যর্থ হওয়ায় শেষতক সোভিয়েত ইউনিয়নের কয়েকটি অঞ্চল স্বাধীনতা ঘোষণা করে। চরম আর্থিক মন্দা, পশ্চিমা ষড়যন্ত্র এবং সোভিয়েত সাম্রাজ্য ভেঙে কয়েকটি দেশের অভুদ্বয়ের ঘটনাবলী সামাল দিতে না পেরে মিখাইল গর্বাচেভ এক পর্যায়ে ক্ষমতা ত্যাগে বাধ্য হন। এরপর দেশটির হাল ধরেন বরিস ইয়েলৎসিন। অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে অত্যন্ত দুর্বল এবং মোটা বুদ্ধির অধিকারী বরিস ইয়েৎসিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালে দেশ ও জনগণের জন্য তেমন কোন সাফল্য অর্জন করতে পারেনি উপরন্তু পশ্চিমা শক্তিকে সমীহ করত। ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়ার গুরুত্ব হ্রাস পায়। এ সুযোগে আমেরিকা বিশ্বব্যাপী তাদের অবস্থান আরো সুসংহত করে। যার ফলশ্রতিতে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমারা তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে আগ্রাসন এমনকি সরকার পরিচালনায় দিক নির্দেশনা প্রদান করে থাকে। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভ্লাদিমির পুতিন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দৃশ্যপট পাল্টাতে থাকে। ভ্লাদিমির পুতিনের শাসনামল অর্থাৎ দেড় দশকের ব্যবধানে রাশিয়া অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।

 

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পে অগ্রগতি:

সিরিয়া যুদ্ধে বাশার আল আসাদের আহবানে সাড়া দিয়ে রাশিয়া কাস্পিয়ান সাগরে অবস্থানরত যুদ্ধ জাহাজ থেকে ৯৬০ মাইল দূরবর্তী সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের অসংখ্য অবস্থানে নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষ আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের প্রতি প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। এতদিন পশ্চিমা সমরবিদরা রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত না থাকলেও সিরিয়ার অভ্যন্তরে বিদ্রোহীদের অবস্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে দেশটির শক্তি সামর্থ সম্পর্কে তাদের ধারণা পাল্টে যায়। উন্নত প্রযুক্তির নিত্যনতুন সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণের মাধ্যমে ভ্লাদিমির পুতিন সরকার আমেরিকার সামরিক কর্তৃত্বকে রীতিমত চ্যালেঞ্জ করেন। শুধু সিরিয়া নয়- প্রয়োজনে ইরাক, লিবিয়া এবং ইয়েমেনে অভিযান চালানোর ইঙ্গিত দেন ভ্লাদিমির পুতিন। সাবেক সোভিয়েত আমলের অস্ত্রশস্ত্রের পরিবর্তে পশ্চিমা শক্তির বিপরীতে সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীকে আধুনিকীকরণের উদ্যোগ দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করার পথে এগুচ্ছে দেশটি।

 

আমেরিকা কর্তৃক ভবিষ্যতে তারকা যুদ্ধ ’স্টার ওয়্যার”কে সামনে রেখে রাশিয়াও ইতোমধ্যে অনেকদূর এগিয়েছে। যুদ্ধের কাজে ব্যবহৃত উপগ্রহ ধ্বংস করার পদ্বতি আয়ত্ব করে ফেলেছে রাশিয়া। আমেরিকার ১১ টি বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজের বিপরীতে রাশিয়ার কোনো বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজ না থাকলেও কয়েক মিনিটের ব্যবধানে এসব বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি এগুলোকে ধ্বংস করার প্রযুক্তিও দেশটির রয়েছে। সংখ্যায় নয়- বরং মানগুণ সম্পন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আয়ত্বে রাশিয়ার সমর বিজ্ঞানীরা তৎপর রয়েছে বলে প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন সাময়িকীর খবরে জানা গেছে।

 

সম্প্রতি রাশিয়া শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ভূগর্ভস্থ সামরিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করেছে। সিরিয়া যুদ্ধে যাবতীয় দিক নির্দেশনা এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে প্রদান করা হচ্ছে। আমেরিকার সাথে পাল্লা দিয়ে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে সামরিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

সিরিয়া যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভ্লাদিমির পুতিনের অবস্থান আরো মজবুত হয়েছে। আমেরিকার মিত্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজা-বাদশাহ শাসিত দেশগুলো এখন প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে রাশিয়া থেকে অস্ত্রশস্ত্র আমদানীর চুক্তিও সম্পাদন করেছে। ফ্রান্সে সন্ত্রাসী হামলার পর ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্রিটেন-জার্মানিও একই পথ অনুসরণ করছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ভ্লাদিমির পুতিনের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রে ভ্লাদিমির পুতিনের জয় জয়কার। ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে ভ্লাদিমির পুতিন এখন চালকের আসনে।#

 

লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার ও ব্যুরো চীফ, দৈনিক ইনকিলাব এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক গবেষক

 

(মতামত প্রকাশিত বক্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব, রেডিও তেহরানের সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভূক্ত নাও হতে পারে। )

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন