এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 17 ফেব্রুয়ারী 2016 10:56

মুসলমানদের ক্ষতি করছে মুসলমানরা, অন্যদের দোষ দিয়ে কী লাভ?

আনোয়ারুল হক আনোয়ার আনোয়ারুল হক আনোয়ার

আনোয়ারুল হক আনোয়ার: বিশ্বের কয়েকটি মুসলিম দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। কখনো গোপনে আবার কখনো প্রকাশ্য শত্রুতা প্রদর্শন লক্ষণীয়। প্রতিপক্ষ মুসলিম দেশের শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করতে পশ্চিমাদের সাহায্য কামনার অসংখ্য নজির রয়েছে। আবার বিদ্রোহী জঙ্গি গোষ্ঠী গঠন করে ওই দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা নিত্যকার বিষয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনঠাসা করার প্রতিযোগিতা চলছে এক মুসলিম দেশ অন্য মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে। প্রয়োজনে কোটি কোটি ডলার অপচয় করতে কুন্ঠিত হচ্ছে না প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম শাসকরা। বর্তমান বিশ্বে এটাই হচ্ছে মুসলমানদের বাস্তব পরিস্থিতি।

 

এক সময় ফিলিস্তিনি জনগণের স্বার্থে সোচ্চার ছিল বিশ্বের সকল মুসলিম দেশ। তখন সকল দেশ একবাক্যে ইসরাইলের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক পর্যন্ত ছিন্ন করে। কিন্তু এখন হাতেগোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া অন্যরা ফিলিস্তিন জাতির অধিকার আদায়ের বিষয়টি ভুলে গেছে। অপরদিকে বর্তমানে কয়েকটি মুসলিম দেশের সাথে ইসরাইলের মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা ইস্যুতে ২/৩টি মুসলিম দেশ ব্যতীত অন্য দেশগুলো দর্শকের ভূমিকা পালন করার পরিণামে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নর-নারী শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা ছাড়াও লাখ লাখ অধিবাসীকে তাদের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়ন করা হয়।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মুসলিম নির্যাতনের তিনটি ভয়াবহ ঘটনা ইতিহাস হয়ে থাকবে। প্রথমটি ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিন জাতির উপর সীমাহীন বর্বরতা, দ্বিতীয়টি বসনিয়ায় মুসলমানদের ওপর অত্যচার নির্যাতন আর তৃতীয়টি হচ্ছে, মিয়ানমারে সামরিক জান্তা কর্তৃক লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানের ওপর নির্যাতন ও বিতাড়িত করা। এসব সম্ভব হয়েছে মুসলিম দেশগুলোর ব্যর্থতার ফলে।

 

 এক সময় উপসাগরীয় দেশগুলোর পাশাপাশি ইরাকের সাবেক স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের সাথে পশ্চিমাদের সুসম্পর্ক সকলের জানা। ইরাকের প্রতিবেশী ইরানে আধ্যাত্মিক ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হবার পর পশ্চিমারা সাদ্দাম হোসেনকে প্রলুদ্ধ করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। দীর্ঘ আট বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধে উভয় দেশের কয়েক লক্ষাধিক সেনা হতাহত ছাড়াও হাজার হাজার কোটি ডলারের অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। যুদ্ধের ফলাফল ছিল শূন্য। অর্থহীন যুদ্ধে দুইটি দেশ সর্বক্ষেত্রে বহু বছর পিছিয়ে গেছে।

 

ষড়যন্ত্র এখানেই শেষ নয়। পশ্চিমারা দ্বিতীয়বার সাদ্দাম হোসেনকে ভুল বার্তা প্রেরণ মাধ্যমে কুয়েত দখলে প্রলুব্ধ করে। যেমন কথা তেমন কাজ। সময় দেরী না করে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করে নেয়। এরপর পশ্চিমারা তাদের তৃতীয় নীল নকশা বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হয়। কুয়েত থেকে দ্রুত সেনা প্রত্যাহারের আল্টিমেটাম দেয়া হয় সাদ্দাম হোসেনকে। এতে সাদ্দামের টনক নড়ে। তখন পশ্চিমা ষড়যন্ত্রটি আঁচ করতে পারে একনায়ক সাদ্দাম হোসেন। কিন্তু ততক্ষণে করার কিছু ছিল না। অগত্যা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কুয়েত থেকে সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য হন সাদ্দাম। আর তখনই ঘটে যত বিপত্তি। কুয়েত সিটি থেকে বিশাল সেনাবহর ইরাক অভিমুখে অগ্রসরকালে পশ্চিমাদের কয়েক ডজন বোমারু বিমান সেনাবহরের উপর সাঁড়াশী হামলা শুরু করে। এতে ইরাকি বাহিনীর সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। কয়েকমাস পর পশ্চিমা যৌথ সামরিক বাহিনী সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের লক্ষে বাগদাদসহ বিভিন্ন প্রদেশে হামলা চালায়। এক পর্যায়ে সাদ্দাম হোসেন আত্মগোপন করেও শেষ রক্ষা হয়নি। একই পরিণতি লিবিয়ার নেতা কর্ণেল উয়াম্মার আল গাদ্দাফির বেলায়ও ঘটে।

 

অধিকাংশ মুসলিম দেশের সাথে ইসরাইলের কুটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও উপসাগরীয় ৬টি দেশ এবং মিশর ও তুরস্কের সাথে ইসরাইলের সুসম্পর্ক রয়েছে। পশ্চিমাদের ‘সোনার ডিম’ হিসেবে খ্যাত ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিশালী করার জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে আসছে আমেরিকা। ফলে ফিলিস্তিন জাতির স্বাধীনতার প্রশ্নে এখন আর কেউ জোর গলায় কিছু বলছে না। মুসলিম দেশে দেশে বিরোধ সৃষ্টির সুবাদে ইসরাইল প্রায় পুরো ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড হজম করে ফেলেছে। এখন প্রতিনিয়ত পাখির ন্যায় গুলি করে হত্যা করছে নীরিহ ফিলিস্তিনীদের। মুসলিম বিশ্ব, ওআইসি, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘ কিংবা নিরাপত্তা পরিষদ এখন কেউ আর ফিলিস্তিনিদের স্বার্থে কথা বলছে না।

 

বর্তমানে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধও কয়েকটি মুসলিম দেশের ষড়যন্ত্রের ফসল। আমেরিকা ও ইসরাইল মনে করে যে, সিরিয়া ইসরাইলের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই তারা বাশার আল আসাদ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়। অপরদিকে আমেরিকার সাথে সুর মিলিয়ে সৌদি আরব, তুরস্ক, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সিরীয় বিদ্রোহীদের অস্ত্রশস্ত্র, অর্থকড়ি ও প্রশিক্ষণ সহায়তা দিয়ে আসছে। একই ভাবে ইয়েমেন, ইরাক ও লিবিয়াসহ কয়েকটি মুসলিম দেশে পশ্চিমারা থাবা বিস্তার করে চলেছে।

 

ইরানকে ধ্বংস করার জন্য ইসরাইল কিংবা আমেরিকার চাইতে উপসাগরীয় দেশগুলো বেশী উৎসাহী। ইরানের ওপর তিন দশকের আন্তর্জাতিক অবরোধকালে এরা ইরানের বিরুদ্ধে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করেছে। আবার উপসাগরীয় রাজা-বাদশাদের যারা অন্ধভাবে সমর্থন করে থাকে তাদের জন্য কোটি কোটি ডলারের প্যাকেজ রয়েছে। সিরিয়া, ইরাক, ইরান, ইয়েমেন ও আফগানিস্তানের ঘটনাবলীতে কয়েকটি মুসলিম দেশের সরাসরি ইন্ধন রয়েছে।

 

নাইন/ইলেভেনের পর পশ্চিমাদের কাছে মুসলমানরা সন্দেহভাজন জাতি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। নাইন/ইলেভেনের আসল ঘটনা এখন আর বিশ্ববাসীর অজানা নয়। এর পর থেকে মুসলমানদের কোনঠাসা করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে গোলযোগ সৃষ্টি করতে না পারলে বিভিন্ন অজুহাত দাঁড় করিয়ে সামরিক আগ্রাসন চালানো হচ্ছে। এসব অভিযানের ব্যয়ভারের একটা বিরাট অংশ যোগান দিচ্ছে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ।

 

সিরিয়া ইস্যু নিয়ে তুরস্ক ও সৌদি আরবের মাথাব্যথা কেন? উত্তরটা খুবই সহজ। আর তা হল সিরিয়ার সরকারকে ইসরাইল কিংবা আমেরিকা পছন্দ করে না। এ দু’টি দেশ লোক লজ্জার ভয়ে কখনো সিরিয়ায় হামলা চালাবে না। তাই তুরস্ক ও সৌদি আরবকে ভাড়া করা হয় সিরিয়ার বিরুদ্ধে। এখন শুধু বন্ধুকের ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে প্রভুর নির্দেশের অপেক্ষা করছে তুরস্ক-সৌদি আরব।

 

এখানেই শেষ নয়, গত দুই বছর এশিয়া মহাদেশে মুসলমানদের মধ্যে অতি কৌশলে মাজহাব নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। শিয়া-সুন্নী বিরোধে উসকানি এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য হামলায় কয়েক হাজার নীরিহ মুসলমান হতাহত হয়েছে। মসজিদে নামাজরত অবস্থায় কিংবা নামাজে জানাযা অনুষ্ঠানে হামলা চালানোর মত জঘন্য ঘটনা পরিচালিত হয়েছে। হামলাকারীরা অন্য ধর্মের কেউ নয়। মুসলমান নামধারী কিছু উগ্রপন্থি এসব ঘটনা ঘটিয়েছে। আর এদের মগজ ধোলাই করেছে মুসলিম বিরোধীরা। আইএসএস, আল নুসরা, বোকো হারাম, ওহাবী, সালাফী, তাকফিরি কিংবা তালেবান জঙ্গি গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড নিয়ে সারাবিশ্বে তোলপাড় চলছে। পশ্চিমারা তাদের প্রয়োজনে এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সৃষ্টি করে।

 

অবাক হবার বিষয় হচ্ছে, গত দেড় দশক ধরে আমি বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে একজন অমুসলিমকেও এসব সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে খুঁজে পাইনি। অর্থাৎ এক শ্রেণীর বিপদগামী মুসলিম যুবককে মগজ ধোলাই করে মুসলমানদের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করা হয়েছে। যার করুণ নির্মম পরিণতি আজ আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, নাইজেরিয়া, সোমালিয়ার জনগণ ভোগ করছে।

 

সিরিয়ায় গায়ে পড়ে যুদ্ধ করার যৌক্তিকতা নেই। যুক্তি কিংবা নীতিতে কারো সাথে ঐক্যমত হতে না পারলে দূরে থাকাই শ্রেয়। কিন্তু সিরিয়া নিয়ে তুরস্ক ও উপসাগরীয় মুসলিম দেশগুলোর উগ্রপন্থায় কারা উপকৃত হচ্ছে ? বিশ্বে ৬০টি মুসলিম দেশ রয়েছে। খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদেরও অনেক দেশ আছে। কিন্তু অধিকাংশ মুসলিম দেশ আজ একে অপরের বিরুদ্ধে রীতিমত কোমর বেঁধে নেমেছে। আগামীতে বিরোধ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবার আশংকা রয়েছে।

 

পরিস্থিতির এমন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে, কেউ কারো চেহারা পর্যন্ত দেখতে নারাজ। এতে মুসলিম দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মুসলমান জাতির দূর্ভাগ্য যে, গত আড়াই দশকে কয়েকটি মুসলিম দেশে সংঘঠিত সংঘাত, আগ্রাসন ও যুদ্ধ বিগ্রহে ত্রিশ লক্ষাধিক মানুষ নিহত চল্লিশ লক্ষাধিক আহত এবং আশি লক্ষাধিক উদ্বাস্তুর যন্ত্রণা বহন করছে। মুসলমানদের মধ্যে আত্মঘাতী লড়াইয়ে এক সময় শক্তি, অর্থ ও সামর্থ সব কিছু নিঃশেষ হয়ে যাবে। তখন ষড়যন্ত্রকারীরা সুযোগ বুঝে চূড়ান্ত খেলা শুরু করবে। অর্থাৎ তখন অনেক মুসলিম দেশ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হবে।

 

ব্রিটিশদের কাছে আমরা দুই শত বছর পরাধীন ছিলাম। ঠিক তেমনিভাবে আগামীতে বিবাদমান অনেক মুসলিম দেশ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্বদ্ধ হলে অবাক হাবার কিছুই থাকবে না। মধ্যপ্রাচ্য, কিংবা আফ্রিকার কোন মুসলিম দেশ ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা পাবে না। সুতরাং সময় এসেছে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য স্থাপন। ক্ষুদ্র স্বার্থ পরিহার করে বিশ্বের সকল মুসলিম দেশ একতাবদ্ধ হলে মহা দুর্যোগ থেকে নিজেরা নিস্তার পাবে। এর ব্যতিক্রম হলে আবার পূর্বের কথায় আসতে হচ্ছে, অন্যের দোষ দিয়ে লাভ কি? বিশ্বে মুসলমানরা মুসলমানদের ক্ষতি সাধন করছে।#

 

লেখক : সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক ইনকিলাব এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

 

(মতামত প্রকাশিত বক্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব, রেডিও তেহরানের সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভূক্ত নাও হতে পারে।)

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন