এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শুক্রবার, 11 মার্চ 2016 13:45

ইতিহাসের অন্ধগলিতে আমরা, সংকট উত্তরণের উপায় নিয়ে ভাবনা

রফিকুল ইসলাম রিমন রফিকুল ইসলাম রিমন

রফিকুল ইসলাম রিমন: বহমান এ সময়টাকে ‘ইতিহাসের অন্ধগলি’ বলে আখ্যা দিলে অনেকে হয়ত বলবেন, এ শুধু কি ইতিহাসের অন্ধগলি? যারপর নাই এক খারাপ সময়। অনেকে ভালো থাকার অভিনয় করেন। কারণ তিনি সরকারি দলের লোক অথবা সরকারের বড় আমলা। একটা বিষয়কে অভিনয় তখনই বলা যায় যখন স্বভাব সুলভ এবং স্বাভাবিক আচরণের বাইরে গিয়ে কিছু করতে হয়। "ইতিহাস আপনা থেকেই ফিরে আসে" এ কথাটা বোধকরি বর্তমান সময়ের জন্য প্রযোজ্য হবে না। কারণ এ সময়ে এমন কোনো দিক নেই যে দিকটাতে ইতিহাস সৃষ্টি বা তৈরি হয়নি। মানুষ এ ইতিহাস ভুলবে বলে অন্তত আমার মনে হয় না। এ ইতিহাস মুছে যাবে না, ফিরে আসার প্রশ্নতো অনেক পরে। পিলখানা ট্রাজেডির কথা এ সময়ে জন্ম নিয়ে যে ভুলে যাবে তাকে

স্বাভাবিক মানুষ জ্ঞান করা যাবে না। তেমনিভাবে কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর লাশ কার চোখকে ফাঁকি দিতে পারবে? ফেলানী নামটা উচ্চারণ হলেই হৃদয় চোখে ভাসতে থাকবে অভাগা সেই কিশোরীর লাশ।

 

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকার পল্টনে ঘটে যাওয়া তেমনি একটি কলংকিত অধ্যায়। যাতে রক্তাক্ত হয়েছে পল্টন, কলুষিত হয়েছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, বিপন্ন হয়েছে মানবতা, কলংকিত হয়েছে দেশ, ধ্বংস হয়েছে মনুষ্যত্ববোধ আর বিকশিত হয়েছে প্রতিহিংসা, নির্মমতা, নৃশংসতা, বর্বরতা আর উগ্র রাজনীতি। যে নির্মমতা আর পৈশচিকতা হয়তোবা হার মানিয়েছে আইয়ামে জাহেলিয়াতকেও। ক্ষুণ্ন হয়েছে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বা আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মানুষের মর্যাদা। যে আচরণ পশুর সাথে পশুও করে না, শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিরোধের কারণে সে অমানবিক, হিংস্র ও পৈশাচিক আচরণ করেছে মানুষের সাথে মানুষ। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সে লোমহর্ষক, বর্বর ও নৃশংসতার দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়েছে গোটা দেশ, থমকে দাঁড়িয়েছিল কোটি কোটি মানুষ, হতভম্ভ বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল দেশের আপামর জনতা। মানুষ যেন তার চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না সে কি স্বপ্নের মধ্যে আছে না বাস্তবে তা দেখছে! এটা কি মানুষের কাজ না মানুষরূপী কোনো অমানুষ দৈত্য দানবের কাজ। এ ঘটনা শুধু বাংলাদেশের নয়, গোটা বিশ্বের বিবেকবান মানুষের হৃদয় নাড়া দিয়েছে।

জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব থেকে শুরু করে সারা বিশ্বে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। অবাক হয়েছে বিশ্ববিবেক। ঘৃণা ও নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে অসংখ্য দেশ। এওকি মানুষ ভুলবে? অন্তত মানুষতো ভুলতে পারবে না।

 

অমানুষ আমার লেখার বাইরেই থাক। কারণ অমানুষরা সহজেই ভুলে যাবে রানা প্লাজায় চাপা পড়া শত সহস্র ভালোবাসার কথা। একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় যদি অযুত অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দেয় তাহলে তাকে ইতিহাস ভুলবে কি করে? তার সাথে যদি সরকারের দায়িত্বশীল কোনো মন্ত্রী ‘ঝাঁকি তত্ত্ব’ আবিষ্কার করেন আর এক একটি বিল্ডিং ঝাঁকি দিয়ে ফেলে দেন সে রকম মুখরোচক ইতিহাস জেগে রবে যুগ যুগ। কারণ ইতিহাসতো জেগে রয়, মানুষের প্রয়োজনে বেরিয়ে আসে।

 

যেদিন প্রয়োজনের দেমাগ কেউ সহ্য করতে না পারবে সেদিন আর মেঘে ঢাকা থাকবে না সাগর-রুনির হত্যার রহস্য। সাগর-রুনির শিশুপুত্র মেঘ বিষন্ন আঁধারীর মত নষ্ট এ সময়কে মনে রাখবে। তদন্তের সেই ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটামকেও ভুলে যাবে না। যেমন করে ভুলতে পারবে না এমপি’র গুলিতে গুলিবিদ্ধ শিশু সৌরভের বাবা মা। নষ্ট এ সময় ক্ষমা করেনি মায়ের পেটে থাকা নবজাতককে। যে কিনা পৃথিবীর আলোই দেখল না, তার আগেই ভাগ্যে জুটে গেল গুলি। মাতৃ জঠরের নবজাতক যার হাতে অনিরাপদ তার হাতকে ইতিহাস ভুলে যাবে? আপনি বিশ্বাস করতে পারেন, আমি না। আপনি বিশ্বাস করতেই পারেন চাপাতির আঘাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারানো বিশ্বজিতের কথা মানুষ ভুলে যাবে। কিন্তু তার মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন তারাও কি ভুলবে?

 

শিক্ষা সংস্কৃতির ইতিহাস আরো মুখরোচক, আরো গ্লানীময়, আরো অনৈতিক। ফেসবুকে বসে আগামীকালের প্রশ্নপত্র ডাউনলোড করার ইতিহাস ক’জন ছাত্র ভুলতে পারবে? কজনইবা ভুলতে পারবে পরীক্ষা না দিয়ে ‘এ’ প্লাস পাওয়া সেই অদম্য মেধাবীর কথা। মেডিক্যাল বা বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাতো এখন অনেকটা গা সওয়া। এমনি করে দিনকে দিন নষ্ট সময়ের সময়লিপি বেড়েই চলেছে।

 

সম্প্রতি মায়ের ‘মসৃন’ আঘাতে দুই শিশু মৃত্যুর ঘটনা আরেকটি জঘন্য ইতিহাস। ‘মসৃন’ আঘাত বললাম এজন্য যে, মা শব্দটি যেখানে বিরাজমান সেখানে সন্তানের জন্য আঘাতটাও মসৃন বা সহ্য করার মত। দুই শিশু মারা গেছে এটা তাদের বদান্যতা। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে তাদের বেঁচে থাকাটা মায়ের জন্য সুখকর হবে না অথবা মহান সৃষ্টিকর্তা এ দৃশ্য সহ্য করতে পারেননি বলে দ্রুত আজরাঈল (আ.)কে পাঠিয়েছিলেন একজন মা’কে নিষ্কৃতি দিতে। এমন ঠাণ্ডা মাথার মা যে কিনা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন, তাই খুব ঠাণ্ডা মাথায় সন্তানদের পরপারে পাঠালেন! আপনি বা আপনারা যদি বলেন এই ইতিহাসও মানুষ ভুলে যেতে ভুল করবে না। তাহলে এই আমাকে একজন অসহায় বাবা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারব না।

 

অবশ্য অসহায়ত্বের দহনে প্রতিদিন দগ্ধ হয় আমার মত প্রতিটি মা, বাবা, অভিভাবক। ভাবতে থাকে কি করে এই অন্ধগলি থেকে ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দেয়া যায়। যে সমাজের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং সংস্কৃতি সবকিছুর চারিদিকে অনৈতিক উন্মাদনা। নৈতিকতা যেখানে বিবর্জিত একটি বিষয়। সে সমাজের গতিপথ পাল্টে দেয়া সহজ কথা নয়। তবে এই আমি আপনি চেষ্টায় রত হলে খুব সহজেই তা সম্ভব। আসুন আমি আপনি যে পরিবারে আছি সে পরিবারটিকে পাল্টে দেই। নৈতিকতার চাদরে আবৃত করে রাখি, দেখবেন আস্তে আস্তে পুরো সমাজ, পুরো দেশ পাল্টে যাবে। অর্থবিত্তের চেয়ে নৈতিক শক্তি অনেক বেশি শক্তিশালী, অদম্য, অজেয়। এই শক্তিতে বলীয়ান হলেই কেবল সকল মুক্তি সম্ভব।#

 

লেখক: কবি, কথা সাহিত্যিক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

( মতামতে প্রকাশিত বক্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব, রেডিও তেহরানের সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভূক্ত নয়।)

 

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন