এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 02 এপ্রিল 2016 15:09

ঢালিউড বুড়িগঙ্গা, টালিউড যমুনা, ভরসা যৌথ প্রযোজনা

আহমেদ তেপান্তর আহমেদ তেপান্তর

আহমেদ তেপান্তর: ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে বাংলা সিনেমার স্থান যে তলানিতে ঠেকেছে তা বোঝা গেল চলতি বছরের ৬৩তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে। গত ২৮ মার্চ পুরস্কার ঘোষণা শেষে দেখা গেল যৌথ প্রযোজনার ছবি প্রদেশের সেরা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছে। ভাবতেই অবাক লাগে এটা সেই কলকাতা টালিগঞ্জ যেখানে অভিনয় করা এক সময় বলিউড-লাহোরীদের আরাধ্য ছিল!

 

বিষয়টি টালিউডের জন্য হতাশার। এটি ভারতের আঞ্চলিক চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য দুঃখজনক। আরো বেশি দুঃখজনক কারণ বলিউড, তেলেগু ও তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে অনেক ছোট তবু এটি সমান্তরাল ও আর্ট ফিল্ম নির্মাণ করে বিশ্বব্যাপি আদৃত ‘ছিল’। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্মিক ঘটক, বিমল কর প্রমুখ জাতীয় ফিল্ম পুরস্কারসহ আন্তর্জাতিক পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। সে গৌরবের ধারাবাহিকতা ছিল আশির দশক পর্যন্ত। এরপর থেকে কেমন যে খেই হারিয়ে ফেলে টালিউড।

 

বলিউড তখন তাদের বাণিজ্যিক ধারাকে বিকশিত করতে বাজারজাতকরণ পদ্ধতিকে ঢেলে সাজায়। একই পথে তেলেগু-তামিল যখন এগিয়ে যেতে থাকে তখন টালিগঞ্জ স্বল্প বাজেট আর পূর্ব স্মৃতি আকঁড়ে ঢেকুর তোলে। ফলশ্রুতিতে ভালো নির্মাতা সংকট সেই সঙ্গে যোগ হয় অর্থলগ্নিকারী প্রযোজকের। চলতি বছরের ঘোষিত পুরস্কারের তালিকা দেখলেই টালিউডের সঙ্গে সমগ্র ভারতের একটা তুলনামূলক চিত্র আমরা দেখতে পাব-

 

সুজিত সরকার পরিচালিত ‘পিকু’ ছবিতে অনবদ্য অভিনয় করে তিনি এই পুরস্কার জিতে নেন। এর আগে ‘অগ্নিপথ’ (১৯৯০), ‘ব্ল্যাক’ (২০০৫) ও ‘পা’ (২০০৯) ছবির জন্য এই সম্মান অর্জন করে অমিতাভ। সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে গত বছর সাড়া ফেলে দেয়া এসএস রাজামৌলির ‘বাহুবলী : দ্য বিগিনিং’ ছবিটি। চলচ্চিত্র : বাহুবলী: দ্য বিগিনিং অভিনেতা : অমিতাভ বচ্চন (পিকু) অভিনেত্রী : কঙ্গনা রনৌত (তনু ওয়েডস মনু রিটার্নস) পরিচালক : সঞ্জয়লীলা বানসালি (বাজিরাও মাস্তানি) জনপ্রিয় বিনোদনমূলক ছবি : বজরঙ্গি ভাইজান পার্শ্ব অভিনেত্রী : তানভি আজমি (বাজিরাও মাস্তানি) পার্শ্ব অভিনেতা : সামুথিরাকানি (বিসারানাই) বাংলা ছবি : শঙ্খচিল হিন্দি ছবি : দম লাগা কে হেইশা নৃত্য পরিচালক : রেমো ডি’সুজা (গান: দিওয়ানি মাস্তানি, ছবি: বাজিরাও মাস্তানি) গায়িকা : মোনালি ঠাকুর (গান: মোহ মোহ কে ধাগে, ছবি: দম লাগা কে হেইশা) আবহ সংগীত : ইলাইয়া রাজা (থারাই থাপ্পাত্তাই) সংগীত পরিচালক : এম জয়াচন্দ্রন (কাথিরুন্নু কাথিরুন্নু, ছবি: ইনু নিন্তে মইদিন) সংলাপ রচয়িতা : জুহি চতুর্বেদি (পিকু) ও হিমাংশু শর্মা (তনু ওয়েডস মনু রিটার্নস) চিত্রনাট্যকার : জুহি চতুর্বেদি (পিকু) ও হিমাংশু শর্মা (তনু ওয়েডস মনু রিটার্নস) চিত্রগ্রাহক : সুদীপ চ্যাটার্জি (বাজিরাও মাস্তানি) পোশাক পরিকল্পনা ও রূপসজ্জাকর : নানক শাহ ফকির চলচ্চিত্র বান্ধব রাজ্য পুরস্কার : গুজরাট (স্পেশাল মেনশন উত্তর প্রদেশ ও কেরালা)।

 

এতে একমাত্র বাংলা সিনেমা হিসেবে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় গৌতম ঘোষের মুক্তি না পাওয়া সিনেমা ‘শঙ্খচিল’ সেরা বাংলা সিনেমার পুরস্কার পেয়েছে।

 

যেখানে এক সময়ের বলিউড কাপাঁনো মিঠুনের মতো ডাকসাইটের অভিনেতা চরিত্রের অভাবে বিগ-বাজেটের ছবিতে সেন্ট্রাল রোল পাচ্ছে না। একইভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত নাম নায়করাজ রাজ্জাক সিনেমার চেয়ে টেলিফিল্মেই আগ্রহী। অপরদিকে শক্তিমান অভিনেতা সৌমিত্র চ্যাটার্জি অল্প বাজেটের সুস্থধারায় নিজেকে উৎসর্গ করে একটা অংশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই পরিসংখ্যানে টালিউডের অবস্থান যমুনা আর ঢালিউডের অবস্থা মরতে বসা বুড়িগঙ্গাকেই নির্দেশ করে।

 

এদিকে, ঢালিউডের নির্ভরতার প্রতীক যখন শাকিব খান, অন্যরা তখন কিছু ছবি কিছু নাটক নিয়ে নিজেদের ব্যস্ত রাখছেন। রেখা-হেমা-শ্রীদেবীরা স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়ে রেসে আর আমাদের সুজাতা-সুচন্দা-কবরী-ববিতা-চম্পা-সুচরিতা-অরুনারা চরিত্রের অভাবে ভুগছে। এদের মধ্যে কেউ ছোটপর্দায় ব্যস্ত, কেউ হতাশায় নিমজ্জিত। তবে উল্লেখযোগ্য অংশ ধর্মকর্ম করে পাপমোচনে ব্যস্ত। নতুনরা অভিনয় দক্ষতা ছাড়াই আসছেন আর সংখ্যা বাড়াচ্ছেন, তাতে কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না।

 

এ ব্যাপারগুলোর দিকে আলোকপাত করে সম্প্রতি ঢালিউডের ব্যাপারে ছোট একটি প্রতিবেদন ছেপেছে প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট। তাতে- বাংলাদেশি সিনেমা কাল্পনিক ও স্বপ্নের ওপর ভর করে তৈরি হয়। এতে বাস্তব জীবন ও বাস্তবতার লেশ মাত্র থাকে না। জাঁকজমক আলোকসজ্জা, রঙ-বেরঙের কালার দিয়ে ভিন্ন একটা কাল্পনিক পরিবেশ তৈরি, বাস্তব জীবনের সাথে যার কোন মিল নেই বললেই চলে।’

 

অন্যদিকে টালিউডে প্রতিভাবান অভিনেতা-অভিনেত্রী বা ভালো গল্পের সংকট কোন কালেই ছিল না, আজও নেই। এরপও বাজার ছোট থেকে নিঃশেষ হবার পথে। তাই ভাষার মিল দেখিয়ে বাংলাদেশের দিকে হাত বাড়িয়েছে।

 

এ ব্যাপারে টালিউডি প্রযোজক-কলাকুশলীরা এবং নীতিনির্ধারকরা একটা সমান্তরাল জায়গায় পৌঁছালেও সেদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোর ব্রাক্ষ্মণীয় আচরণ পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটা টালিউডের প্রযোজক-পরিচালকরা স্বীকারও করে আশা করছেন দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হবে। যদিও রংচটা সংবাদ ছাড়া আহামরি সংবাদ তারা এখনো প্রকাশ করেননি। তাই ‘আশাবাদ’ কবে বাস্তবরূপ পাবে সেটা দেখার অপেক্ষায় বাংলাদেশ।

 

গত তিন দশক ধরে টালিউড অপরদিকে দুই দশক ধরে ঢালিউড একই সমস্যার মুখোমুখি। এই সমস্যা নিয়ে তাই টালিউডের আগ্রহ একটু বেশি কারণ ‘ভাষা-সংস্কৃতি’র মিল। এ ব্যাপারে তাই উভয়ের মধ্যে বহুবার আলোচনা হয়েছে। বেশকিছু যৌথ প্রযোজনার বিগ বাজেটের ছবি নির্মাণ হচ্ছে। শেষপর্যন্ত যৌথ প্রযোজনার বিপক্ষে অবস্থান নেয়া শাকিব খানও ‘শিকারী’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে উভয়ের সংকটের বাস্তবতা উপলব্ধি করেছেন। এটা সংকট বিবেচনায় অবশ্যই ইতিবাচক।

সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আলোচনাসভায়ও কিছু আশার কথা শোনালেন প্রসেনজিৎ। তার যুক্তি, ভারত ও বাংলাদেশের ফিল্মি বাজার মেলাতে পারলে বাঙালিও তাদের ‘বাহুবলী’ তৈরি করতে পারবে।

 

১২০ কোটির ছবি ‘বাহুবলী’ ব্যবসা করেছে অন্তত ৬০০ কোটি এমন প্রসঙ্গ টেনে এই অভিনেতা বলেন, টালিগঞ্জে ছবির বাজেট দেড়-দু’কোটি ছাড়ালেই প্রযোজকের নাভিশ্বাস ওঠে। বাংলাদেশে ৮০ লাখের বেশি টাকায় ছবি করার ঝুঁকি নেন খুব কম প্রযোজক। হলের সংখ্যা মাপলেও অন্ধ্র বা মহারাষ্ট্রের সঙ্গে এপার বাংলা ধারেকাছে আসে না। এখানে মাল্টিপ্লেক্স ২০-২৫টি। অন্ধ্র বা মহারাষ্ট্রে ১০০-র কাছাকাছি। ওপার বাংলার অবস্থাও তাই ১৫শ’ সিনেমা হলের জায়গায় নাক ভাসিয়ে আছে ৩শ’ সিনেমা। এর অধিকাংশ আবার অস্বাস্থকর। অথচ পুরো বিশ্বে বাংলাভাষীর সংখ্যা যে কোনো দক্ষিণ ভারতীয় ভাষার জনগোষ্ঠীর থেকে ঢের বেশি।

 

মিলনে বাধা হিসেবে রমেশ সিপ্পি-প্রসেনজিৎ-গৌতম ঘোষ-পিযুষ সাহারা দুই বাংলায় বাঙালির রাজনৈতিক বিভাজন সাংস্কৃতিক বিভাজনকে দায়ী করছেন। এই জটিলতা কাটাতে ভারত যতটুকু এগিয়ে আসছে ঠিক নীতিনির্ধারণ পরিস্কার না থাকায় বাংলাদেশ দ্বিধাদ্বন্দে। যদিও তথ্য মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর মনোভাব ইতিবাচক। সেই সুবাদে ভারতীয়দের দৌড়ঝাঁপ। তাতে অবশ্য নবীনদের বোঝানো গেলেও প্রবীনরা নিজেদের মতো থাকতে অনঢ়।

 

তবে যৌথ প্রযোজনায় জোর দিয়ে গৌতম ঘোষ মনে করেন, দুই বাংলায় একসঙ্গে ছবির মুক্তি ঘটাতে পারলে যে কোনও ছবিই লাভবান হবে। এ ব্যাপারটা এগিয়ে নিতে তারা বাংলাদেশের জাজ-ইমপ্রেস টেলিফিল্মকে বেশ ভালোমতোই পাশে পেয়েছে। #

 

লেখক: সাংবাদিক, চলচ্চিত্র পর্যালোচক।

এই ইমেইল ঠিকানাটি spambots থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। এটি দেখতে হলে আপনার জাভা স্ক্রিপ্ট সক্রিয় থাকতে হবে।

 

(মতামত বিভাগে প্রকাশিত বক্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব, রেডিও তেহরানের সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভূক্ত নয়।)

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন