এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 17 এপ্রিল 2016 11:17

‘ভাইরাস আক্রান্ত’ ওআইসি কি প্যাড সর্বস্ব সংগঠনে পরিণত হতে যাচ্ছে?

আনোয়ারুল হক আনোয়ার আনোয়ারুল হক আনোয়ার

আনোয়ারুল হক আনোয়ার : বিশ্বের ১৬০ কোটি মুসলমানের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) কি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে? না কি অন্য কারো এজন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর রয়েছে? এ প্রশ্নটি সচেতন মহলের। বসনিয়ায় স্বাধীনতাকামী মুসলমানদের পাখির ন্যায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। নারী-শিশু কাউকে রেহাই দেয়নি নরপিশাচ সার্ব বাহিনী। বিশ্বের প্রধান সমস্যা ফিলিস্তিন ইস্যু। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি যুগ যুগ ধরে পথে ঘাটে অবস্থান করছে। মিয়ানমারে কয়েক লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলমানকে নিজ মাতৃভুমি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। উগ্র বৌদ্ধরা হাজার হাজার নিরীহ নিরপরাধ রোহিঙ্গা মুসলমানকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় যেভাবে রক্তের হোলি খেলা চলছে-তাতে ওআইসি কি ভূমিকা পালন করেছে? আরো অনেক অভিযোগ রয়েছে যা স্বল্প পরিসরে শেষ করা যাবে না। সর্বশেষ তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে তীব্র মতবিরোধের কারণে বিবৃতি পড়ে শোনানো হয়নি। আর এটা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ওআইসি মারাত্মক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে।

 

ওআইসি গঠন

১৯৬৭ সালে ৬ দিনের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে কয়েকটি মুসলিম দেশ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এসময় ইসরাইল বিস্তীর্ণ আরব ভূমি দখল করে নেয়। ১৯৬৯ সালের ২১ আগস্ট ইসরাইল জেরুজালেমে অবস্থিত পবিত্র মসজিদুল আকসায় অগ্নিসংযোগ করে। এ ঘটনায় মুসলিম বিশ্বে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। এরপর মিশরের রাজধানী কায়রোতে ১৪টি আরব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা জরুরী বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রস্তাব করেন যে, যেহেতু ঘটনাটি মুসলিম বিশ্বের জন্য স্পর্শকাতর তাই সকল মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে শীর্ষ বৈঠকের আয়োজন করা হোক। বৈঠকে সৌদি আরব, ইরান, পাকিস্তান, মরক্কো, মালয়েশিয়া, সোমালিয়া ও নাইজারকে নিয়ে প্রস্তুতি কমিটি গঠিত হয়। যার সুবাদে একই বছরের ২২-২৫ সেপ্টেম্বর মরক্কোর রাজধানী রাবাতে ২৫টি মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৬৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ওআইসি গঠিত হয়।

 

ওআইসি’র উদ্দেশ্য

৭টি উদ্দেশ্য নিয়ে ওআইসি গঠিত হয়। এর সদর দফতর সৌদি আরবের জেদ্দায় অবস্থিত। (১) সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে ইসলামী সংহতি বৃদ্ধি করা। (২) বর্ণ বৈষম্যের মূলোৎপাটন এবং উপনিবেশবাদ বিলোপের চেষ্টা অব্যাহত রাখা। (৩) সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রসমূহে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা সুসংহত করা এবং আন্তর্জাতিক ফোরাম সমূহে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করা। (৪) আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি প্রয়োজনীয় সমর্থন প্রদান করা। (৫) পবিত্র স্থানসমূহের নিরাপত্তা বিধানের সংগ্রামকে সমন্বিত ও সুসংহত করা, ফিলিস্তিনি জনগণের নায্য সংগ্রামকে সমর্থন করা, তাদের অধিকার আদায় মাতৃভূমি রক্ষার কাজে সাহায্য প্রদান করা। (৬) মুসলমানদের মান মর্যাদা, স্বাধীনতা ও জাতীয় অধিকার সংরক্ষণের সকল সংগ্রামে মুসলিম জনগণকে শক্তি যোগানো। (৭) সদস্য রাষ্ট্রসমূহ এবং অন্যান্য দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও সমঝোতা বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা।

 

ওআইসি ভাইরাসে আক্রান্ত হবার লক্ষণসমূহ:

১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আরব দেশগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির প্রেক্ষাপটে মূলতঃ সংস্থাটি গঠিত হয়। পরবর্তীতে বিশ্বে মুসলিম দেশের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের শ্লোগানটিও বেগবান হয়। এরপর থেকে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘর্ষে ওআইসি প্যালেস্টাইন মুক্তি সংগঠনগুলোকে অকুন্ঠ সমর্থন প্রদান করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার যুবক ফিলিস্তিনি ভাইদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু এক সময় রহস্যজনক কারণে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়। তখন ইসরাইলি বাহিনী ফিলিস্তিনি জাতির উপর বর্বরোচিত হামলা শুরু করলে আত্মরক্ষার্থে ‘হিজবুল্লাহ গেরিলা সংগঠন’ আত্মপ্রকাশ করে ইসরাইলের বিরুদ্ধে বীরের ন্যায় রুখে দাঁড়ায়। ফিলিস্তিনিদের নির্বিচারে হত্যা, দখলদারিত্ব বন্ধ এবং স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ওআইসি’র তরফ থেকে এ যাবত দেড় শতাধিকবার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তেমনিভাবে বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশে আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও ওআইসি তেমন কোন জোরালো ভূমিকা রাখেনি। অর্থাৎ ‘নিন্দা’ ও ‘আহবান’ দু’টি শব্দ ব্যবহার করে নিজেদের কর্তব্য সম্পাদন করেছে।

 

ওআইসির গঠনতন্ত্রের (৬) ধারায় বলা হয়েছে যে, মুসলমানদের মান মর্যাদা, স্বাধীনতা ও জাতীয় অধিকার সংরক্ষণের সকল সংগ্রামে মুসলিম জনগণকে শক্তি যোগানো। কিন্তু দুঃখ হয়, যখন দেখি ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইয়েমেন, ইরাক ও সিরিয়াসহ কয়েকটি দেশকে ধ্বংস করার জন্য সৌদি আরবের নেতৃত্বে আইএসআইএল প্রতিষ্ঠিত হয়। আমেরিকা ও ইসরাইল বিদ্রোহীদের ট্রেনিংসহ সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করে আসছে। তখন ওআইসি প্রভাবশালী একাধিক দেশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। ন্যাটোর একমাত্র সদস্যদেশ তুরস্কের সাথে ইসরাইলের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক রয়েছে। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথেও ইসরাইলের বেশ দহরম-মহরম আজ কারো অজানা নয়। উপসাগরীয় রাজা-বাদশারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে পশ্চিমা দেশে। সৌদি গোয়েন্দা মন্ত্রীর সাথে যখন ইসরাইলি গোয়েন্দা মন্ত্রীর বৈঠকের খবর জানতে পারি-তখন ওআইসি নামক সংস্থাটির নীরবতার লজ্জা রাখি কোথায়?

 

কয়েকমাস পূর্বে বেশ তাড়াহুড়া করে সৌদি আরবের নেতৃত্বে মুসলিম সামরিক জোট গঠনের উদ্দেশ্য কী? এ জোটের রূপরেখা কী? কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে মুসলিম সামরিক জোট? ইরানের সাথে বৃহৎ ৬ জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পাদিত পারমানবিক চুক্তি বানচাল করার জন্য সৌদি আরবসহ কতিপয় উপসাগরীয় দেশ কোমর বেঁধে নেমেছিল কেন? তাদের স্বার্থ কী? চুক্তির বিরোধিতা করতে পারে ইসরাইল। কিন্তু সৌদিদের এত মাথাব্যথা কেন? নাকি তারা আমেরিকা-ইসরাইলি এজেন্ডা বাস্তবায়নের মিশনে নেমেছে?

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের সর্বত্র মুসলিম নামধারী যতগুলো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে তার নেপথ্যে রয়েছে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। আজ ফিলিস্তিনি জাতি নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই কেন? উত্তর একটাই- আর তা হচ্ছে, মুসলিম দেশেগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ওআইসি এখন মারাত্মক ভাইরাসে আক্রান্ত। ভাইরাস তাড়াতে না পারলে শুধু ওআইসি কেন উপরন্তু কোন সংস্থাই মুসলমানদের উপকারে আসবে না। যখন নিজেদের মধ্যে কোন ‘এজেন্ট’ প্রবেশ করে তখন আর ভালো কী আশা করা যায়।

 

সামরিক শাসন জারির পর পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল জিয়াউল হককে পশ্চিমা সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিল ‘মার্শাল-ল কী? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ”যখন কোন জাতি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়-তখন উক্ত ভাইরাস দূর করতে শরীরে এক জাতীয় ভ্যাক্সিন প্রয়োগ করতে হয়। এটাকে বলে মার্শাল-ল” । তাই ওআইসির ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী কতিপয় দেশের শরীর থেকে ভাইরাস দূর করতে না পারলে সংস্থাটি প্যাড সর্বস্ব সংগঠনে পরিণত হবে। এটাই নির্মম বাস্তবতা।

 

লেখক : সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক ইনকিলাব এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক গবেষক

 

(মতামত প্রকাশিত বক্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব, রেডিও তেহরানের সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভূক্ত নাও হতে পারে।)

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন