এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শুক্রবার, 06 মে 2016 10:43

পশ্চিমাদের জাতশত্রু উত্তর কোরিয়ার খুঁটির জোর কোথায়?

আনোয়ারুল হক আনোয়ার আনোয়ারুল হক আনোয়ার

আনোয়ারুল হক আনোয়ার: উত্তাল বিশ্ব রাজনীতির পরিমণ্ডলে সমাজতান্ত্রিক ও মার্কবাদী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ কমিউনিস্ট শাসিত উত্তর কোরিয়া এখন আলোচনার খোরাকে পরিণত হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার প্রতিপক্ষ অর্থাৎ মহা শক্তিধর রাষ্ট্রবর্গ দেশটির কর্মকাণ্ডে উৎকন্ঠিত। কিভাবে উত্তর কোরিয়ার লাগাম টেনে ধরা যায় তারও চেষ্টা তদবির চলছে সমান গতিতে। কিন্তু কিছুতেই সামাল দিতে পারছে না আমেরিকার নেতৃত্বাধীন মিত্ররা। একের পর এক পারমানবিক ও ক্ষেপনাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে উত্তর কোরিয়া বিশ্ব দরবারে জানান দিচ্ছে যে, বৃহৎ শক্তিবর্গ যদি মারণাস্ত্র নির্মাণ করতে পারে-তাহলে আমরা কি ছাগলের তৃতীয় বাচ্চা? আমরা কেন তা পারব না। অর্থাৎ দেশটি বুঝিয়ে দিচ্ছে- শত্রুর কাছে মাথানত করার ন্যুনতম সুযোগ উত্তর কোরিয়ার নেই।

 

১ লাখ ২০ হাজার ৫৩৮ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট দেশটির জনসংখ্যা ২ কোটি ৭৫ লাখ। বার্ষিক মাথাপিছু আয় ১৫’শ ডলার। খাদ্য ও জ্বালানি সংকট দেশটির প্রধান সমস্যা। একসময় অবিভক্ত কোরিয়া জাপানিদের দখলে ছিল। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হেরে জাপানিরা সোভিয়েত বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করে। ফলে অবিভক্ত কোরিয়া দ্বি-খণ্ডিত হয়ে ১৯৫০ সালে উত্তর কোরিয়া সমাজতান্ত্রিক ব্লকে এবং দক্ষিণ কোরিয়া পুঁজিবাদী ব্লক অর্থাৎ পশ্চিমা পুঁজিবাদী ক্লাবে যোগদান করে। তরুণ নেতা কিম জং ইল পূর্বসূরীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দেশ শাসন করছে। উত্তর কোরীয় সরকার সংবাদ প্রবাহে কঠোর নীতি অবলম্বন করে চলেছে। ফলে মাঝে মধ্যে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় দেশটি সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও সেগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। বিশ্বে ২টি দেশের ওপর পশ্চিমাদের গোয়েন্দাগিরি রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। একটি হচ্ছে উত্তর কোরিয়া এবং অপরটি ইরান। আকাশ, স্থল, নৌপথসহ অত্যাধুনিক গোয়েন্দা মিশন কাজ করছে দেশ দু’টির ওপর। এক্ষেত্রে ইরান সর্বক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন করলেও উত্তর কোরিয়ায় জ্বালানি ও খাদ্য সংকট রয়েছে। তারপরও দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় উত্তর কোরিয়া একাট্রা। দেশটির এক পাশে শক্তিধর প্রতিপক্ষ দক্ষিণ কোরিয়া এবং অপর দিকে রয়েছে শক্তিশালী জাপান। এ দুই শক্তিকে মোকাবেলা করার জন্য উত্তর কোরিয়া পারমানবিক ও হাইড্রোজেন বোমাসহ আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। এরইমধ্যে আমেরিকা তার মিত্র জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে নিয়ে সামরিক মহড়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে গিয়ে উল্টো বিপাকে পড়েছে। অর্থাৎ পীত সাগরে মিত্র দেশের সমন্বয়ে সামরিক মহড়ার আগে পরে উত্তর কোরিয়া তার উদ্ভাবিত মারণাস্ত্রের পরীক্ষা অব্যাহত রেখে শত্রু পক্ষকে হুঁশিয়ারি প্রদান করছে।

 

উত্তর কোরিয়ার সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে পশ্চিমারা চুলচেরা বিশ্লেষণ অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু কোনো কুলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না উপরন্তু অর্থকড়ি কিংবা লোভ দেখিয়ে সামরিক বাহিনীর লোকজনকে স্বপক্ষ ত্যাগ করানোর চেষ্টা চলছে সমান গতিতে। এতেও ফল হচ্ছে না। উপরন্তু উত্তর কোরীয় সরকার কর্তৃক আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে হামলা চালানোর পাল্টা হুমকি মার্কিন সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছে। পশ্চিমাদের উদ্যোগে দুই কোরিয়া একত্রীকরণের বেশ কয়েকটি প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। মূলতঃ দক্ষিণ কোরিয়া চাচ্ছে দুই কোরিয়া একত্রীভূত হলে উত্তর কোরিয়ার হুমকি ধমকি বন্ধ হবে। কেননা, ভূলক্রমেও যদি একবার উত্তর কোরিয়ার সাথে যুদ্ধ বেঁধে যায় তাহলে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হবে। তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তারা উত্তর কোরিয়াকে চটাতে চাইছে না। আমেরিকার দুই শত্রু চীন ও রাশিয়া এ সুযোগটি সহজেই লুফে নিয়েছে। তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে উত্তর কোরিয়াকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে আসছে। উত্তর কোরিয়ার সাথে চীন ও রাশিয়ার সরাসরি রেল সংযোগ রয়েছে। ফলে বিভিন্ন ইস্যুতে দেশটিকে তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না। এছাড়া উত্তর কোরিয়ার অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধকরণে দেশ দু’টির গ্রীন সিগন্যাল রয়েছে। চীন ও রাশিয়া মনে করে যে, উত্তর কোরিয়ার মাধ্যমে যদি আমেরিকা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে ব্যস্ত রাখা যায়-সেটাই উত্তম পন্থা। বাস্তবে সেটাই ঘটছে। আমেরিকাসহ তার মিত্ররা ভালো করে জানে উত্তর কোরিয়াকে চটালে এর পরিণতি হবে খুবই ভয়াবহ। তাই উত্তর কোরিয়ার হাঁকডাক নীরবে হজম করে যাচ্ছে মার্কিন মিত্ররা।

 

দীর্ঘদিন যাবত উত্তর কোরিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক অবরোধ নামক খড়গ ঝুলছে। সেজন্য অর্থনৈতিকভাবে অনেকটা দুর্বল হলেও প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারে দেশটি অকাতরে অর্থ ব্যয় করছে। পশ্চিমা অবরোধের কারণে উত্তর কোরিয়া অস্ত্র বিক্রি করতে না পারলেও প্রযুক্তি রফতানির দিকে ঝুঁকছে পড়ছে দেশটি। ধারণা করা হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ উত্তর কোরিয়া থেকে ক্ষেপনাস্ত্রের প্রযুক্তি ক্রয় করছে। আর তাতেই দেশটির রাজস্ব সংকট নিরসন হচ্ছে। ধারনা করা হচ্ছে, চীন ও রাশিয়া তাদের মিত্র দেশটিকে খাদ্য, জ্বালানি, অর্থ ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করছে।

 

আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা জাপান কখনো উত্তর কোরিয়া আক্রমন করবে না বলে আমার বিশ্বাস। কারণ উত্তর কোরিয়ার পারমানবিক অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে। ক্ষেপনাস্ত্র প্রযুক্তিতেও উত্তর কোরিয়া অনেকদূর এগিয়েছে। এখন আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার প্রহর গুনছে। ১২৫টি সাবমেরিন বহর, সেনা ও গোলন্দাজ ডিভিশনের পাশাপাশি বিমান বাহিনীর দক্ষতাও চোখে পড়ার মতো। সুতরাং কোরীয় উপদ্বীপে আপাতত যুদ্ধের কোনো সম্ভাবনা দেখা না গেলেও উভয় পক্ষের হুমকি পাল্টা হুমকি প্রত্যক্ষ করবে বিশ্ববাসী।

 

 

লেখক : সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার ও ব্যুরো চীফ, দৈনিক ইনকিলাব এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

(মতামত প্রকাশিত বক্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব, রেডিও তেহরানের সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভূক্ত নাও হতে পারে।)

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন