এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 16 ফেব্রুয়ারী 2011 13:09

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয় বার্ষিকী-২০১১

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয় বার্ষিকী-২০১১
বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামী বিপ্লবের সাফল্য

ইসলামী বিপ্লবের ৩২ তম বিজয় বার্ষিকী উপলক্ষ্যে "বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামী বিপ্লবের সাফল্য" শীর্ষক বিশেষ আলোচনার আসর থেকে আপনাদের সবাইকে জানাচ্ছি সালাম ও শুভেচ্ছা। গত ৩২ বছরে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর নানা বাধা ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সৃষ্টিশীলতার মন্ত্রে উজ্জ্বীবিত ইরানী জাতি এবং বিশেষ করে এর যুব প্রজন্ম বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দর্শনীয় বা অসাধারণ অনেক সাফল্য অর্জন করেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতির দৃষ্টান্ত হিসেবে চিকিৎসাসেবায় মৌলিক কোষ বা স্টেম সেল গবেষণা, ক্লোনিং পদ্ধতিতে উন্নত জাতের পশু জন্ম দেয়া, মহাশুন্য গবেষণা ও উপগ্রহ পাঠানোর প্রযুক্তি, এইডসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ওষুধ আবিস্কার, কৃষি ও মাছ চাষের ক্ষেত্রে জেনেটিক প্রযুক্তির ব্যবহার, লেজার ও ন্যানো টেকনোলজি প্রভৃতি খাতে ইরানের অবিশ্বাস্য সাফল্য বিশ্ববাসীকে অভিভূত করেছে।


অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইরান এখন বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ১৬ টি দেশের অন্তর্ভূক্ত। ইরানের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ছয়েরও বেশি। তেল-বহির্ভূত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানী বৃদ্ধি, পুঁজি বিনিয়োগের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতি এবং দেশীয় শিল্প উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির দিক থেকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় ১০টি দেশের অন্তর্ভূক্ত।


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের গবেষণা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইরান কিভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরছি। গত বছর অর্থাৎ ২০১০ সালে ইরানের বৈজ্ঞানিক প্রোডাক্টশন রেকর্ডের সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ৩১৯ টি। ১৯৯০ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ১৮৭ টি এবং ২০০০ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৮৭। ২০০৯ সালে ইরানের বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ বা প্রডাক্টশনের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৯৭৮ টি এবং এইসব রেকর্ড বা নিবন্ধ ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স ইনস্টিটিউটে নথীবদ্ধ হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে ইরানের সায়েন্টিফিক প্রোডাকশন বেড়েছে এক হাজার ৩৪১।
ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর প্রথম কয়েক বছরে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০। সেখান থেকে গবেষণামূলক ও বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের সংখ্যা ১৩ হাজারে উন্নীত হওয়ায় এই খাতে যে কত দ্রুত ইরানের অগ্রগতি ঘটছে তা স্পষ্ট।


চিকিৎসা খাতে সায়েন্টিফিক প্রোডাকশনের দিক থেকে বিশ্বে ইরানের অবস্থান একুশতম। ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান রয়েছে প্রথম স্থানে। ইরানী বিশেষজ্ঞরা ইস্পাত শিল্প, গাড়ী নির্মাণ শিল্প, তেল শোধনাগার নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ, বাঁধ নির্মাণ ও ন্যানো প্রযুক্তি খাতে তাদের দক্ষতা এবং শ্রম অন্য দেশে রপ্তানীও করছেন।
গত কয়েক বছরে মহাশুণ্য ও সামরিক শিল্প ক্ষেত্রেও ইরানের অগ্রগতি ছিল অবিশ্বাস্য।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি নিজস্ব প্রযুক্তির স্যাটেলাইট উদ্বোধন করেছে ইরান। ইসলামী বিপ্লবের বিজয় বার্ষিকী উপলক্ষে ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ফাজর, রাসাদ, আমিরকাবির ও জাফার নামে চারটি স্যাটেলাইটের উদ্বোধন করেন।


ফাজর হচ্ছে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে তৈরি প্রথম স্যাটেলাইট যা উপবৃত্তাকার কক্ষপথের তিনশ' থেকে সাড়ে চারশ' কিলোমিটার এবং বৃত্তাকার কক্ষপথের সাড়ে চারশ' কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান পরিবর্তন করতে পারবে।
সম্প্রতি "বিজিনেস মনিটর ইন্টারন্যাশনাল" তার সাম্প্রতিক সংখ্যায় জানিয়েছে, ওষুধ শিল্পে ইরানের প্রবৃদ্ধি হয়েছে শতকরা ১৫ ভাগ এবং আগামী বছরগুলোতেও ইরানের এ খাতে প্রবৃদ্ধির ওই উচ্চহার বজায় থাকবে। বিশ্বে ইরানের ওষুধ রপ্তানীও বাড়বে বলে ওই রিপোর্টে জানানো হয়েছে। ইরানে ইস্পাত উৎপাদনেও ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। ২০১০ সালে এ খাতে ইরানের উৎপাদন ছিল প্রায় ১২ মিলিয়ন বা এক কোটি ২০ লক্ষ টন, প্রবৃদ্ধির হার ছিল শতকরা ৯ দশমিক পাঁচ। বিজনেস মনিটর ইন্টারন্যাশনাল ইস্পাত খাতে ইরানের উৎপাদন বৃদ্ধির পরিমাণ সম্পর্কে যে ঘোষণা দিয়েছিল ইরান তার চেয়েও এক মিলিয়ন বা দশ লাখ টন বেশি ইস্পাত উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে।

 

অর্থনৈতিক সাময়িকী মিড নিউজ জানিয়েছে, ইরানের হাতে এখন যেসব প্রকল্প রয়েছে সেগুলোর আর্থিক মূল্য ৩১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। এ ক্ষেত্রে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ইরান। গত কয়েক বছরে সামগ্রীকভাবে এ অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক নানা প্রকল্পের মূল্য হ্রাস পেলেও এ অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশের অর্থনৈতিক প্রকল্পের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। ইরানের প্রকল্পগুলোর মূল্য বেড়েছে ২০০ কোটি ডলার। এক্ষেত্রে ইরানের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে শতকরা ৭ ভাগ।


ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী প্রায়ই এটা উল্লেখ করছেন যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ নানা ক্ষেত্রে ইরানের অসাধারণ অগ্রগতি ইরানী জাতির আরো উচ্চতর ক্ষমতা এবং সম্ভাবনা তুলে ধরছে, কিন্তু গত তিন দশকের এসব অগ্রগতি পুরো পথের বা বৃহত্তর অগ্রগতির সূচনা মাত্র। ইরান আরো বড় সাফল্য বা সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছার চিন্তা করছে। ইরানীরা যে সৃষ্টিশীল এবং উদ্ভাবনী ক্ষেত্রে অসাধারণ যোগ্যতা রাখে তা গত ৩১ বছরে প্রমাণিত হয়েছে। তাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আয়ত্ত্বের আন্দোলন জ্ঞান-বিজ্ঞান খাতে জিহাদের সমতুল্য।

 

ইরানকে একঘরে করার বিরতিহীন মার্কিন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মার্কিন ও পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩১ বছর আগের ইরানের অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত পরিস্থিতির সাথে দেশটির এসব খাতের বর্তমান অবস্থা তুলনা করলে দেখা যায়, এইসব ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে ইরানে এবং ইরানের বর্তমান অবস্থার সাথে ৩১ বছর আগের অবস্থার কোনো তুলনাই হয় না। বিশ্ব ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্ব উন্নয়ন রিপোর্টে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনীতির ১৫ টি সূচকের মধ্যে ১৩ টির মধ্যেই ইরান ভাল অবস্থায় রয়েছে। অথচ গত ৩১ বছর ধরে ইরান যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের অনেক নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা সব সময়ই বজায় ছিল এবং এখনও তা বহাল রয়েছে। কিন্তু অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে একটি সংগ্রামী জাতির অগ্রগতি যে রোখা যায় না, ইরানী জাতির দর্শনীয় অগ্রগতি তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।
সম্প্রতি মার্কিন সাময়িকী "ফরেন পলিসি" জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে না বলে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবক ও পরিকল্পনাকারীরা খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা যেমনটি বলেছেন, ইরান কখনও তার বর্তমান সাফল্যগুলোকে যথেষ্ট ভাববে না, সার্বিক অগ্রগতি ও সাফল্যের শীর্ষে না পৌছা পর্যন্ত বিজ্ঞানসহ অন্যান্য খাতে ইরানী জাতির উন্নয়ন বা অগ্রগতির জিহাদ অব্যাহত থাকবে। #

 

ইরানী সংস্কৃতিতে ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব

সংস্কৃতি হচ্ছে একটা সভ্যতার প্রাণ, আত্মা এবং বহিঃপ্রকাশ। সংস্কৃতি এবং চিন্তা-চেতনা মূর্তমান হয়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোভেদে রূপ পরিগ্রহ করে সভ্যতার জন্ম দেয়। অব্শ্য সভ্যতা এবং সংস্কৃতির মধ্যকার সীমারেখা নির্ধারণ করা বা একটি থেকে আরেকটিকে আলাদা করা বেশ দুরূহ একটি কাজ।

সংস্কৃতির সংজ্ঞার্থ নিরূপণের জন্যে বহু চিন্তাবিদ ও লেখক ব্যাপক লেখালেখি করেছেন। কেউ কেউ মনে করেন জ্ঞান-গরিমা,বিশ্বাস,শিল্প-সাহিত্য, নৈতিকতা, আচার-অনুষ্ঠানসহ মানুষের মাধ্যমে অর্জিত সকল সক্ষমতার সমন্বিত রূপ হচ্ছে সংস্কৃতি। অনেকে আবার মানুষের সকল সৃষ্টি ও উৎপাদনকে সংস্কৃতি বলে মনে করেন এবং সেগুলোকে প্রাকৃতিক উৎপাদনগুলোর মোকাবেলায় স্থাপন করেন। তবে নতুন সংজ্ঞায় একটি সভ্যতার সফটওয়্যার বিভাগকে সংস্কৃতি বলে অভিহিত করা হয়। আর সফটওয়্যার মানুষের সচেতন চিন্তারই ফসল। অনেক বিপ্লবের ক্ষেত্রেও সংস্কৃতির মৌলিক প্রভাব রয়েছে। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের নেপথ্য চালিকাশক্তি ও কারণ বিশ্লেষণ করে বহু গবেষক বলেছেন সাংস্কৃতিক শক্তি বিশেষ করে জনগণের ধর্মীয় চিন্তা ইসলামী বিপ্লবের নেপথ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

 

মাইকেল ফিশার একটি বই লিখেছেন ‘ইরান,ধর্মীয় বিতর্ক থেকে বিপ্লব' নামে। এই বইতে তিনি বলেছেন ইরানে বিপ্লব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কারণ যতোটা কাজ করেছে, বিপ্লবের ধরন ও সংগঠিত হবার স্থানের দিক থেকে বিক্ষোভের ধর্মীয় ঐতিহ্যই তার চেয়ে বেশি কাজ করেছে বলে মনে হয়। ফিশারসহ আরো অনেক লেখকই মনে করেন শাহের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলোর নেতিবাচক প্রভাব সামাজিক বিভিন্ন গোষ্ঠির ওপর ব্যাপকভাবে পড়েছে। এছাড়া ইরানী সমাজে স্বাধীনতাহীনতা ভীষণভাবে অনুভূত হচ্ছিল;যার ফলে মানুষের মাঝে বিপ্লবী একটা চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। ইসলামী সেই বিপ্লবী চেতনার ফলেই ইসলামী বিপ্লব বিজয় লাভ করে। এখানে একটি প্রশ্ন নিশ্চয়ই মনে জাগতে পারে, তাহলো ইরানে বিপ্লব বিজয়পূর্ব সমাজে এমন কী পরিস্থিতি বিরাজ করছিল যে পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে জনগণ স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘটাতে বাধ্য হলো?

 

শাহী আমলের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা এবং বিদেশী সংস্কৃতির অনুসরণের চেষ্টা চালানো-পাহলভি সরকারের পতনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। পাহলভির আমলে সর্বত্র বিশেষ করে শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্রগুলোতে ইরানের আবহমান সংস্কৃতিতে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রাধান্য ছিল। পশ্চিমাদের সাথে এই সরকারের সম্পর্কের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকটি ছিল সংস্কৃতির পশ্চিমায়ন যার প্রতিফলন বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়েছিল। সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মাদ আলি রাহমাতিনিয়া এ সম্পর্কে বলেছেনঃ পাহলাভির শাসনামলে বিশেষ করে বিংশ শতাব্দির দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শুরু করে পরবর্তী দশকগুলোতে ইরানী জনগণের ইসলামী সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করা হয়েছিল এবং এ সময়টাতে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার বিদেশী সংস্কৃতি বিশেষ করে পশ্চিমাদের সংস্কৃতি ইরানের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। ইরানের প্রাচীন স্বৈরাচারী সরকারের সাংস্কৃতিক কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি আরো বলেনঃ ‘পাহলভি সরকারের শাসনামলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডগুলো নিয়ে বিশেষ করে মিউজিক, সিনেমা, থিয়েটার, বইপুস্তক ইত্যাদি বিষয় যদি পর্যালোচনা করা হয় তাহলে দেখা যাবে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই লাগামহীন বেলেল্লাপনার উল্লম্ফন। এদের কোনো একটি ক্ষেত্রেও ইসলামী কিংবা ইরানী সংস্কৃতির আদর্শের লেশমাত্রও অবশিষ্ট ছিল না। এ বিষয়টিই ধীরে ধীরে পাহলভি সরকারের পতনের আন্দোলনে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছে মারাত্মকভাবে।'

 

ইরানের ইসলামী সংস্কৃতি বিরোধী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শাহ সরকার প্রকাশ্যে ইসলাম বিদ্বেষী নীতির চর্চা করতো। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে ইসলামী মূল্যবোধের বিরুদ্ধে সরাসরি অবমাননা করতো। মিউজিকের ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য সকল প্রকার বেলেল্লাপনার চর্চা করছিল। পাহলভি সরকার জনগণকে ধর্মীয় বিশ্বাসের মৌলিক ভিত্তিগুলো থেকে দূরে সরিয়ে রাখারও চেষ্টা করেছিল। উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং ইসলাম-পূর্ব যুগের সংস্কৃতি চর্চার পরিকল্পনাও ছিল শাহের কর্মসূচিতে। এই পরিকল্পনার অধীনে ইরানের প্রাচীন ইতিহাস বিশেষ করে ইসলাম পূর্বযুগের ইতিহাস, ধর্ম ও মূল্যবোধগুলোকে তুলে ধরা হতো যাতে ইসলাম ধর্মের উন্নত মূল্যবোধগুলো ধামাচাপা পড়ে যায় আর ধর্ম যেন ধূলিমলিন একটা আবরণের মতো পড়ে থাকে। শিরায শিল্প উৎসবের মতো জমকালো অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে জনগণের সংস্কৃতির প্রতি বিদ্রুপ করা হতো, কেননা এই সাংস্কৃতিক আয়োজনে লজ্জা-শরমের সকল আবরণই সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এইসব আয়োজন ইরানী জনগোষ্ঠির মাঝে বিদ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জাগিয়ে তুলেছিল।

 

জনগণ এ ক্ষেত্রে তাদের পূর্বেকার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছে। যেহেতু তারা তাদের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক টানাপোড়েন থেকে মুক্তি পাবার লক্ষ্যে আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের শরণাপন্ন হতো, তাই শাহী শাসনের বিরুদ্ধে লড়বার জন্যেও সেই আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ববর্গের কাছে গেলেন যাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন মরহুম ইমাম খোমেনি (রহ)। ১৯৬০ এবং সত্তরের দশকে ইমাম খোমেনী (রহ) ইরানে বিদেশী সংস্কৃতির বেলেল্লাপনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে জনগণও সুসংহত হয় এবং ধীরে ধীরে তাদের বিক্ষোভ বিস্তৃতি লাভ করে। পশ্চিমা চিন্তাবিদ মিশেল ফুকো ইরানের বিপ্লবের ওপর একটি বই লিখেছেন ‘ইরানী বিপ্লবের অবিসংবাদিত নেতা' নামে। ঐ বইতে তিনি ইসলামী বিপ্লবকে সর্বপ্রথম আধুনিক বিপ্লব বলে অভিহিত করে লিখেছেনঃ কোনো দল গঠন ছাড়াই বিপ্লব অনুষ্ঠিত হয়েছে যা একেবারেই নজিরবিহীন একটি ঘটনা। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইসলামী বিপ্লব হচ্ছে সাংস্কৃতিক অবক্ষয় এবং সামাজিক মূল্যবোধ ধ্বংসের বিরুদ্ধে জনগণের সচেতন প্রতিরোধ ও প্রতিক্রিয়া।

 

আসলে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সবচেয়ে বড়ো অর্জন হলো ব্যক্তিগত হতাশার বিলোপ এবং সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের উন্মেষ। সংস্কারের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম এবং সর্বপ্রধান যে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয় তাহলো দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিশ্বাস। ইমাম খোমেনী (রহ) জনগণকে এই দুটি বিষয় অর্থাৎ সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস এবং ইরানী ও ইসলামী মূল্যবোধের দিকে ধাবিত করেছেন। সাংস্কৃতিক এই স্বাধীনতার ফলে জনগণ তাদের আত্ম পরিচয় ফিরে পেয়েছে, তাদের বিশ্বাস, সাহিত্য, ভাষা, আচার অনুষ্ঠান, তাদের নিজস্ব লিপি ইত্যাদির মূল্য উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং সেইসাথে এগুলোকে সংরক্ষণ করার জন্যে প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা চালানোর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছে। ইসলামী বিধি-বিধানের ব্যাপারে মনোযোগী হবার ফলে ইরানের জনগণ তাদের হারানো সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের হারানো মূল্যবোধগুলো ফিরে পেয়েছে। ধীরে ধীরে পশ্চিমা অপসংস্কৃতির ছোবল থেকেও নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছে। তাদের মাঝে এই বিশ্বাস পাকাপোক্ত হয়েছে যে ইসলামের একটা স্বাধীন এবং স্বতন্ত্র সংস্কৃতি রয়েছে। পশ্চিমাদের কাছ থেকে তাই তাদের কিছু গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই,প্রয়োজন নেই তাদের অনুসরণ করারও। এই বোধ ছড়িয়ে পড়ুক সমগ্র মুসলিম বিশ্বে।

 

নবীজির আদর্শপুষ্ট ইসলামী বিপ্লব

নবী-রাসূলগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে যেসব গুরুদায়িত্ব নিয়ে এসেছেন তার মধ্যে কয়েকটি হলো মূর্খতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা, শিরকের বিরুদ্ধে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা, জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, মানুষের অধিকারের সীমা লঙ্ঘন এবং সর্বপ্রকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা ইত্যাদি। ইসলামের নবীও অত্যাচার, বৈষম্য এবং মূখর্তার কবল থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার সংগ্রাম থেকে এক মুহূর্তও বিরত ছিলেন না। রাসূলে খোদা (সা) মানুষের অতি ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তম সমস্যা সম্পর্কেও সবোর্ত্তম বিধান নিয়ে এসেছেন। ন্যায় ও মানবিকতার মাধ্যমে তিনি মানুষকে সর্বোৎকৃষ্ট পথে পরিচালিত করেছেন। নবীজীর সেইসব শিক্ষার আলোকে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইরানের ইসলামী বিপ্লব।


পয়গাম্বরদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল ন্যায়কামিতা এবং জুলুমের অবসান ঘটানো। পবিত্র কোরআনের সূরা হাদিদের ২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেনঃ "আমি আমার রসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি,যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্যে সংগ্রাম করে। নবী-রাসূলগণ পাপ, অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিলেন সদা তৎপর। কারণ আত্মার এসব কদর্যতা নির্মল ও নিষ্কলুষ পবিত্র জীবনকে আল্লাহতা'লা ফলপূর্ণ এবং শক্তিশালী বৃক্ষের সাথে তুলনা করে পবিত্র কোরআনে বলেছেনঃ তুমি কি লক্ষ্য কর নি,আল্লাহ তা'আলা কেমন উপমা বর্ণনা করেছেনঃ পবিত্র বাক্য হলো পবিত্র বৃক্ষের মত, তার শিকড় মজবুত এবং শাখা আকাশে উত্থিত এই বৃক্ষ আল্লাহর অনুমতিক্রমে যে কোনো সময় ফল দেয়। আল্লাহ মানুষের জন্যে দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন-যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।' রাসূলে খোদা (সা)ও তাঁর রেসালাতকে ফলপ্রসূ করে তোলার উদ্দেশ্যে ঐ পবিত্র বৃক্ষকে ফলবান করে তোলার মতো উপযুক্ত করে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।


উল্লেখ্য, যে মূতার যুদ্ধে মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়েছিল মুসলমানরা। কিন্তু ঐ যুদ্ধে মুসলমানরা পরাজিত হয়েছিল এবং প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হবার কারণে মুসলমানরা কান্নাকাটি করেছিল। নবীজী সেই মূতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলেছেনঃ চোখের পানি ঢেলো না! কেননা আমার উম্মাত এমন একটি বাগানের মতো যার মালিক ঐ বাগানের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় স্থাপনার ভিত্তিভূমি রচনা করেছে, অতিরিক্ত শাখাগুলোকে কেটে ফেলেছে। তারপর এই বাগান ফলবান হয়েছে।


ইরানের ইসলামী বিপ্লব নবীজীর সেই লক্ষ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্যেটি পরিচালিত ন্যায়কামী জনতার সচেতন আন্দোলনের ফসল। নবীজীর শিক্ষার আলোকেই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল এবং পরিণতিতে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। আর এই বিপ্লবের প্রভাব পড়েছিল বিশ্বব্যাপী।অবশ্য এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার,বিপ্লব যদি যথার্থ এবং যৌক্তিক হয়,তাহলে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো চারপাশকে সে প্রকম্পিত করবেই। ইসলামী বিপ্লবের ফলে পুনরায় নবীজীর আদর্শ এবং দ্বীনি চিন্তা-চেতনার দিকে মানুষ ঝুঁকেছে এবং ইরানে ইসলামী সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবার ফলে বিশ্ববাসী আবারো প্রকৃত ইসলামের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পেয়েছে।

 

ইমাম খোমেনী (রহ) ইসলামের পুনর্জাগরণে রাসূলে খোদার বিপ্লবী পন্থারই অনুসরণ করেছেন। রাসুলে খোদার পথ বলতে বোঝায় পরিপূর্ণ ইমান আর নিষ্ঠাবানদের আন্দোলন, যে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ। ইমাম খোমেনীও বলেছিলেনঃ আমাদের উচিত তাবৎ মূর্খতা আর কুসংস্কারের জাল ছিন্ন করে মুহাম্মাদ (সা) এর খাঁটি ইসলামের ঝর্ণাধারায় অবগাহন করা। কেননা পৃথিবীতে আজ সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়টি হচ্ছে এই ইসলাম। জনগণ বিপ্লবের এই মহান নেতার চেহারায় দেখতে পেয়েছে সততা আর পবিত্রতার নুর।বিশ্ববাসীদের অনেকেই এই নুর দেখে আকৃষ্ট হয়েছেন। ফিলিপিাইনের মিন্দানাও দ্বীপের অধিবাসী নওমুসলিম মহিলা হাজেরা সিনসাওয়াত এ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ ইরানের ইসলামী বিপ্লব বার্ষিকীতে টিভি পর্দায় ইমাম খোমেনী (রহ) এর ছবি দেখছিলাম, তিনি গাছের নিচে নামায পড়ছেন। নামাযে তাঁর এতো আন্তরিকতা আর নিষ্ঠা দেখছিলাম যে আমি খুবই আকৃষ্ট হয়ে পড়লাম। সিদ্ধান্ত নিলাম এই লোকের চিন্তাদর্শ নিয়ে পড়ালেখা করবো,কারণ আমি জানতে চাচ্ছিলাম এমন কী চিন্তাধারা রয়েছে যা একজন মানুষকে এভাবে পরিপূর্ণ আধ্যাত্মিক,আন্তরিক আর নিষ্ঠাবান করে তুলতে পারে। আমার দৃষ্টিতে ইমাম খোমেনী (রহ) নবীজীর সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। যে সময় মার্কিন ইসলাম এবং আরবের ইসলামের মতো ইসলামের বহুরকম ব্যাখ্যা প্রচলিত ছিল, সে সময় ইমাম খোমেনী (রহ) নবীজীর প্রতিষ্ঠিত প্রকৃত এবং যথার্থ ইসলামকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।


ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ফলে উম্মাতে ইসলামীর মাঝে ইসলামের পরিচয় ও সম্মান বৃদ্ধি পেতে থাকে। কেননা ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি হিসেবে ইমাম খোমেনী (রহ) যে বার্তা দিয়েছেন তা ছিল সর্বশেষ নবীর মহামূল্যবান ও খাঁটি শিক্ষার আলোকে উদ্ভাসিত। ঐ বার্তায় সত্যকামী মানুষের অস্তিত্বের অন্যতম উপাদান হিসেবে সম্মান ও মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। অন্যভাবে বলা যায়, ইসলামী বিপ্লবের প্রভাবে মুসলিম উম্মাহর মাঝে নতুন এক জোয়ারের সৃষ্টি হয়েছিল। এই বিপ্লব পুনরায় ইসলামকে উজ্জীবিত করেছে এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মুসলমানদের পরিচয় আবারো প্রতিষ্ঠিত করেছে। নবী কারিম (সা) মানুষের সম্মান ও মর্যাদা এবং তাদের সামাজিক অধিকার বিশেষ করে নারীদেরকে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি নারীদের মানবীয় মর্যাদার কথা বলেছেন এবং তাদের স্বাধীনতা ও মালিকানার অধিকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। ইসলামী বিপ্লব রাসূলের সেই শিক্ষার আলোকে নারীদেরকে তাদের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।


ইরানের মুসলিম নারীরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যেভাবে অংশগ্রহণ করছে তা নবীজীর ঐ শিক্ষারই প্রতিফলন। ইমাম খোমেনী (রহ) নবীজীর স্বরূপকে বিশ্বের সামনে বিস্তৃত পরিসরে তুলে ধরেছেন। ইমামের আচার-আচরণে মানুষ নবীজীর ব্যক্তিগত, প্রার্থনাগত, সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক চিত্র লক্ষ্য করেছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র মানুষকে আহ্বান জানায় একত্ববাদের পতাকাতলে, মুক্তচিন্তার দিকে, আধ্যাত্মিকতার দিকে এবং মানুষের অধিকার ও এখতিয়ারের দিকে। ইমাম খোমেনী (রহ) এ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ মানুষের জীবনের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সকল ক্ষেত্রে যদি আল্লাহর প্রতি ইমান এবং তাঁর আদেশ নিষেধের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে বর্তমান বিশ্বের জটিলতম সমস্যাও অত্যন্ত সহজেই সমাধান করা যাবে। পৃথিবী আজ যেরকম অচলাবস্থায় পড়েছে নবীদের পরিচালিত আদর্শের কাছে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই।

 

ইসলামী ইরানের নারী সমাজের অগ্রগতি

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিপ্লবের সাথে এ বিপ্লবের পার্থক্যের প্রধান দিকগুলোর মধ্যে নারী-পুরুষের মানবীয় মর্যাদার প্রতি গুরুত্ব অন্যতম। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) মানুষকে নিজস্ব প্রতিভা ও সুপ্ত গুণাবলী বিকশিত করতে বলতেন। তিনি কেবল মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার এবং তাঁর আনুগত্য করার পরামর্শ দিতেন মানুষকে।


ইসলাম মানবীয় মর্যাদাকে খুবই গুরুত্ব দেয়। এ ধর্মের দৃষ্টিতে মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষ তার ক্ষমতা ও প্রতিভার বলে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হবার যোগ্যতা রাখে। মানুষ মহান আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধানে মানবীয় মর্যাদার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ সংবিধানের ২১তম ধারায় সকল ক্ষেত্রে নারীর অধিকার নিশ্চিত করাকে সরকারের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধারায় আরো বলা হয়েছে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিককে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মানবীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ দিতে হবে। ইরানের বিশ সালা উন্নয়ন কর্মসূচীতে আধ্যাত্মিক ও পার্থিব বা বস্তুগত ক্ষেত্রসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অবস্থান উন্নত করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।


ইরানের ইসলামী বিপ্লব নারী সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। এ বিপ্লবের পর থেকেই সকল ক্ষেত্রেই নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়। ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) নারীকে উচ্চতর মর্যাদা দিতেন এবং এমনকি সমাজে পুরুষের তুলনায় নারীর ভূমিকা বেশি বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, নারী সমাজই একটি জাতিকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে, আর তাকে এ কাজ থেকে বিরত রাখা হলে জাতি পরাজয় ও অধঃপতনের শিকার হবে। তিনি বলতেন, নারীই সমাজে সব কল্যাণের উৎস এবং সমাজের সৌভাগ্য ও অধঃপতন নির্ভর করে নারীর ওপর। এটা স্পষ্ট, মুসলিম নারীর মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা ইরানের নারী সমাজের মর্যাদাকে উন্নত করেছে। আর এই উন্নত চিন্তাধারা বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)। তিনি তাঁর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ওসিয়তনামায় নারী সমাজকে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার গর্ব বলে উল্লেখ করেছেন।


সমাজের অপরিহার্য অংশ নারীর অধিকার রক্ষার জন্য সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতির আলোকে আইন প্রণীত হয়। ইরানে ইসলামী শিক্ষার আলোকেই নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত এবং তাদের যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ দেয়া হয়েছে। ইরানের নারী ও পরিবার বিষয়ক সংস্থার প্রধান বেগম মরিয়ম মুজতাহিদজাদেহ মনে করেন মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র দিক নিদের্শনার ফলে ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানে নারী সমাজের জন্য এক নুতন যুগ সূচিত হয়েছে। এরই আলোকে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের উন্নয়নের জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা লক্ষনীয় বলে তিনি মনে করেন।
শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যের আলোকে ইসলামী ইরানে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার রয়েছে। পড়াশুনা, চাকরী, মালিকানা ও ভোটাধিকারসহ সব ক্ষেত্রেই মেয়েরা পুরুষের সমান অধিকার ভোগ করছে এবং এগিয়ে যাচ্ছে পুরুষের সমপর্যায়ে বা অনেক ক্ষেত্রে তারা বেশি এগিয়ে গেছে পুরুষের তুলনায়।


ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানে নারীকে কেবল পণ্য বলে ভাবা হত। ইরানী নারী সমাজ বিজাতীয় চিন্তার জালে বন্দি হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের নারী পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ, শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ও দেশগড়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক মাত্রায় ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন লেখক ও অনুবাদক পল স্পার্কম্যান ইরানী নারী সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রে সঠিক চিত্র তুলে ধরার জন্য "দা" নামক একটি বইয়ের অনুবাদ করেছেন। এ বইয়ে প্রতিরক্ষা যুদ্ধ সম্পর্কে এক ইরানী নারীর স্মৃতিচারণ তুলে ধরা হয়েছে। স্পার্কম্যান বলেছেন, "ইরানী সমাজের সর্বত্র নারীর সক্রিয় ভূমিকা দেখা যায়। আমার বিশ্বাস ইরানী মেয়েরা পুরুষের চেয়ে বেশি ক্ষমতাধর। তাই আমি ইরানের নারী সমাজ সম্পর্কে বিশ্ববাসীর কাছে সঠিক ছবি তুলে ধরার জন্য "দ্য" বইটির অনুবাদ করেছি।"

 

ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানে শিক্ষিত নারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। কিন্তু বিপ্লবের পর সাংস্কৃতিক পরিবেশ অনুকূল হওয়ায় সাধারণ ও উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে ইরানী নারীর উপস্থিতি বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা নানা পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করছেন। বর্তমানে ইরানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শতকরা ৬০ ভাগ শিক্ষার্থী নারী। উদ্ভাবন ও আবিস্কারের ওপর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ব্যাপক গুরুত্ব দেয়ায় ইরানে গড়ে উঠছে অনেক মহিলা বিজ্ঞানী এবং বিশ্বের বিভিন্ন বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে ইরানী মেয়েরা দেশের সম্মান বৃদ্ধি করেছেন। মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা জাতির এবং বিশেষ করে নারীর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেয়ায় এইসব সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে মনে করেন ইরানের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ডক্টর নাসরিন সুলতানখাহ। জ্যোতির্বিদ্যা প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক জয়ী "এলাহে স'দাত নাক্বিব" এ বিষয়ে আরো গবেষণায় আগ্রহী। সাফল্যের শীর্ষ চূড়াগুলো জয়ের জন্য তিনি ইরানী যুব সমাজকে আত্মবিশ্বাসী ও নিজস্ব প্রতিভার বিকাশে মনোযোগী হওয়ার ডাক দিয়েছেন।


স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ক্ষেত্রেও ইরানী নারীর সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। বর্তমানে ইরানের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা মন্ত্রী ডাক্তার মার্জিয়া দাস্তজেরদি একজন মহিলা ডাক্তার। তিনি ইরানে নারী চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বলেছেন, ইরানে ডাক্তারদের শতকরা ৪৯ ভাগই মহিলা এবং শতকরা ৪০ ভাগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও শতকরা ত্রিশ ভাগ বড় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মহিলা। প্রসূতির সেবাসহ বিভিন্ন রোগের মোকাবেলায় নারীর চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য নানা সুযোগ বা ব্যবস্থা করে দিয়েছে ইরানের ইসলামী সরকার। মেরুদন্ডের ক্ষয়ক্ষতিজনিত রোগের ক্ষেত্রে ইরানের শীর্ষস্থানীয় ডাক্তারদের একজন হলেন ফাতেমা ফিরুজি। যুদ্ধাহত সেনাদের কষ্ট দেখে তিনি তার সহযোগীদের নিয়ে এ বিষয়ে গবেষণার উদ্যোগ নেন এবং সাফল্য অর্জন করেন। তিনি নিজে যুদ্ধাহত একজন পঙ্গু সেনার মেরুদন্ড মেরামত করতে সক্ষম হন । ফলে ১৮ বছর পঙ্গু থাকার পর ওই সেনা সুস্থ হন। এরপর এ বিষয়ে আরো গভীর গবেষণায় উৎসাহিত হন ফাতেমা ফিরুজি ও তার সহযোগী ডাক্তাররা।


এটা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানী নারীর সাফল্যের কেবল একটি দৃষ্টান্ত। ইরানে পারিবারিক বিচার সংক্রান্ত আদালতে মহিলারা উপদেষ্টার কাজ করছেন। ফলে মহিলা ও শিশুদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ইরানী নারীর সাফল্য দর্শনীয়। সচিব ও উচ্চ পদস্থ উপদেষ্টা পর্যায়ে অধিষ্ঠিত হয়েছেন অনেক ইরানী মহিলা। ইরানের মহিলা সাংসদদের প্রচেষ্টার ফলে চাকরিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে ইরানী নারীর উন্নয়ন এবং সুরক্ষার জন্য নানা আইন পাশ হয়েছে।
মোট কথা, ইসলামী শিক্ষার আলোকে শালীনতা ও সম্ভ্রম বজায় রেখে ইরানী নারী ঘরে-বাইরে গৌরবময় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছেন। মুসলিম বিশ্বের মহিলাদের জন্য ইরানের নারী সমাজ তাই অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

 

ইমাম খোমেনী (রহ.) এর স্বদেশ প্রত্যার্বতন দিবস

ফার্সি বাহমান মাসের বারো তারিখ। ইরানের গণসংগ্রামের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। এইদিন ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম খোমেনী (রহ) ১৫ বছর নির্বাসনে কাটানোর পর প্রিয় জন্মভূমির প্রিয় মাটিতে পা রাখেন। ইরানের স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় ইমামকে বহনকারী বিমান যখন মেহরাবাদ বিমানবন্দরে অবতরণ করে শত শত সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার, ভিডিওগ্রাফার ঐতিহাসিক ঐ মুহূর্তগুলোকে ধারণ করার জন্যে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে।


ইমাম যে পথ মাড়িয়ে ইসলামী বিপ্লবের অমর শহীদদের মাযার বেহেশতে যাহরায় গিয়েছিলেন, বিমানবন্দর থেকে সেই মাযার পর্যন্ত দীর্ঘ পথ ফুল দিয়ে ঢেকে দিয়েছিল ইরানের ইমামপ্রিয় জনতা। ইমামকে স্বাগত জানানোর জন্যে সেদিন তেত্রিশ কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে প্রায় আট মিলিয়ন বা আশি লক্ষ লোক সমবেত হয়েছিল। জাঁকজমকপূর্ণ ঐ সংবর্ধনা কিংবা জনতার উপস্থিতি-উভয় দিক থেকেই ইতিহাসের সর্ববৃহৎ স্বাগত আয়োজন ছিল এটি। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট লেখক ডক্টর আব্বাস আলি আমিদ যানজনি বিপ্লবের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেনঃ ‘ইরানের জনগণের ঐতিহাসিক ঐ সংগ্রামে সবসময়ই স্বৈরাচারী শাহের অত্যাচার নির্যাতনের আশঙ্কা ছিল এবং জনগণও সবসময় মনের ভেতর সেই ভয় লালন করতো। কিন্তু যেদিন ইমাম খোমেনী (রহ)কে স্বাগত জানানোর জন্যে জনগণ প্রস্তুতি নিলো সেদিন যেন সকল শক্তি ভয়মুক্ত হলো। জনগণের মনে কিংবা চেহারায় আর কোনো ভয়ের চিহ্ন দেখা গেল না। ইমামকে স্বাগত জানানোর জন্যে যে-ই রাজপথে নেমে এসেছিল,মনে হচ্ছিলো সে যেন সবচেয়ে ভালো জায়গায় যাচ্ছিলো,এধরনের সঞ্জীবনী প্রেরণায় উজ্জীবিত ছিল তাদের মন। বাহমানের বারো তারিখে তাই বাসাগুলো খালি হয়ে গিয়েছিল। ইমাম যখন ইরানে প্রবেশ করলেন,মানুষ এক রকম প্রশান্তি বোধ করছিল।'


ইমাম খোমেনী (রহ) মেহরাবাদ বিমানবন্দর থেকে সরাসরি বিপ্লবী শহীদদের মাযার বেহেশতে যাহরায় চলে যান এবং আল্লাহর পথের মুজাহিদদের মাযার যিয়ারত করেন। সেখানে তিনি ঐতিহাসিক এক বক্তৃতা দেন। ঐ বক্তব্যে তিনি শাহের মাধ্যমে নির্বাচনকৃত প্রধানমন্ত্রী শাপুর বখতিয়ারকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে দৃঢ়তার সাথে বলেনঃ ‘আমি এই জাতির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করবো।' ইরানে ইমামের বরকতপূর্ণ উপস্থিতির ফলে দশ দিনের ব্যবধানে ইসলামী বিপ্লব বিজয় লাভ করে। বর্তমানে অমরা ইসলামী বিপ্লবের চতুর্থ দশকে রয়েছি। বিপ্লব বিজয়ের চতুর্থ দশকে দাঁড়িয়ে আমরা বিশ্বব্যাপী এই বিপ্লবের প্রভাব,মর্যাদা এবং সম্মান লক্ষ্য করছি, লক্ষ্য করছি ইরানের ইসলামী বিপ্লব এখনো কেমন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।


বিশ্বব্যাপী সংঘটিত বিপ্লবগুলোকে প্রভাবশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা যায়। ইরানে যে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে তাকে চিন্তাদর্শ ও আধ্যাত্মিকতার বিচারে সমকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো বিপ্লব বলে উল্লেখ করা যায়। বিগত দুই শতাব্দিতে যেসব বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে সেসবের তুলনায় ইরানের ইসলামী বিপ্লব বহু দিক থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্টমণ্ডিত। ইরানের সবোর্চ্চ নেতা আয়াতুল্লহিল উজমা খামেনেয়ীর মতে ‘ইরানে ইসলামী বিপ্লবের আবির্ভাবটাই এই নয়া দিগন্ত উন্মোচনকারী।' এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই সমগ্র বিশ্বব্যাপী তার যে প্রভাব পড়েছে সেইসব নিয়ে সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞমহল ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছেন। এই বিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যে দিকটির প্রতি অনেকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন তাহলো বিপ্লবের নেতৃত্ব। যিনি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি হলেন ইমাম খোমেনী (রহ)। অত্যন্ত বিচক্ষণ, মেধাবি, দূরদর্শী, সচেতন এবং তাকওয়াসম্পন্ন নেতা ছিলেন তিনি। তাঁর পরহেজহগারী এবং আধ্যাত্মিকতার চূড়া অন্য কারো পক্ষ্যেই স্পর্শ করা সম্ভব ছিল না। দ্বীনী দায়িত্বের অনুভূতিই তাঁকে বিপ্লবের ময়দানে যেতে বাধ্য করেছে। আর সেই বিপ্লব তাঁকে ইতিহাসে বিখ্যাত করে রেখেছে।


মানব জীবনেতিহাসে নতুন একটি যুগের সুসংবাদ দিয়েছেন ইমাম খোমেনী (রহ)। নতুন এই যুগে ধর্মের উপাদান অন্যান্য বহু উপাদানের সাথে মানুষের জীবনের সাথে যুক্ত হয়েছে। ইসলামী বিপ্লবের মতো বিশাল এবং অনন্য একটি বিপ্লব বিজয়ের পেছনে যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নেপথ্য শক্তি হিসেবে কাজ করেছে,সেসবের মধ্যে অন্যতম হলো আল্লাহর সাথে ইমামের আন্তরিক এবং গভীর সম্পর্ক। পার্থিব জগতের বিভিন্ন পরাশক্তির বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে গিয়ে একমাত্র ঐশী শক্তির ওপর নির্ভর করে নতুন এবং স্বাধীন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং নতুন একটি ধর্মীয় ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন ইমাম খোমেনী (রহ)। তাঁর ঐ ধর্মীয় ব্যবস্থা অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে, পৃথিবীর সুদূর প্রান্তেও ওই বিপ্লবের প্রভাব পড়ে।ইমাম খোমেনী (রহ) বিশ্বাসীর সামনে নতুন যে রাজনৈতিক আদর্শ উপস্থাপন করেন সমগ্র বিশ্ব এবং মানবতার জন্যে সেখানে নতুন কিছু পথ-নির্দেশনা ও বার্তা ছিল। রাজনৈতিক ঐ আদর্শে আধ্যাত্মিকতা এবং রাজনীতি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। স্বয়ং ইমামও ছিলেন ব্যক্তিগতভাবে এইসব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।


ইসলামী বিপ্লবের ৩২ বছর পর আজও ইরানের ইসলামী বিপ্লব যে দৃঢ়তা নিয়ে কার্যকর এবং অটল রয়েছে, তা থেকেই বোঝা যায় যে, এই বিপ্লবের উৎস তথাকথিত অভ্যুত্থান থেকে বহু উর্ধ্বে। বিশ্ব রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ করে বিশ্বের বৃহৎ দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় সংলাপে এখন ইসলামী ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও মর্যাদা নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। এখন দাম্ভিক শক্তিগুলোর আধিপত্যবাদী রাজনীতির সামনে ইসলামী বিপ্লব একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলামী সভ্যতার জাগরণের যে চেষ্টা প্রচেষ্টা, আন্তজার্তিক বিভিন্ন উপলক্ষ্যে মুসলমানদের প্রতি যে সম্মান ও মর্যাদা কিংবা ইসলামী জাগরণ এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধগুলোর যে কর্তৃত্ব লক্ষ্য করা যাচ্ছে সেই সবই ইসলামী বিপ্লবেরই বিশ্বজনীন প্রতিফলন। বিপ্লবের এই প্রতিফলনের কথা স্বীকার করেছেন বিশিষ্ট মার্কিন চিন্তাবিদ জর্জ ভিগেলও।


স্পেনিশ দার্শনিক প্রফেসর ইসমাইল কিলবাস ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব সম্পর্কে বলেছেনঃ দ্বীন পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে আধ্যাত্মিকতার সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে এবং বিশ্ব মুক্তির জন্যে এবং তার সামাজিক সম্পর্ককে সুন্দর করার জন্যে আধ্যাত্মিকতার সৌন্দর্য এবং ধর্মীয় শক্তির প্রতি ব্যাপকভাবে ঝুকেঁ পড়েছে।এসবই ইসলামী বিপ্লবের প্রতি ইমাম খোমেনী (রহ) এর আহ্বানের ফলেই সূচিত হয়েছে। বৃটিশ বুদ্ধিজীবী ও সমাজ বিজ্ঞানী অ্যান্থনি গিদাঞ্জ বলেছেনঃ আগে তিনজন বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানী অর্থাৎ মার্কস, দুর্কিম এবং মার্কস বেভারের মতাদর্শে কিঞ্চিত মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দেখা যেত বিশ্ববাসী তাদের সেক্যুলারিজমের দিকেই ঝুঁকছে এবং ধর্ম থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে।কিন্তু আশির দশকের শুরু থেকে ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর থেকে বিপরীত ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অর্থাৎ বিশ্ববাসী উল্টো বরং ধর্মের দিকেই ঝুঁকতে শুরু করেছে। # {jcomments on}

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন