এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 02 ফেব্রুয়ারী 2012 11:22

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয় বার্ষিকী-২০১২


বিচিত্র হুমকি সত্ত্বেও বিপ্লবের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১২ সালে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের চৌত্রিশ বছর পূর্ণ হলো। বিজয় বার্ষিকী উপলক্ষে আপনাদের সবার প্রতি রইলো আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ। যতোই দিন যাচ্ছে ইসলামী বিপ্লবের ভিত ততোই দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হচ্ছে এবং বিপ্লব বিস্তৃতি পাচ্ছে। বিপ্লব বার্ষিকীর মিছিলে জনতার স্বতস্ফূর্ত এবং সানন্দ অংশগ্রহণই তার প্রমাণ। ইসলামী স্বরূপই তার উন্নয়ন, বিকাশ ও দৃঢ়তার কারণ। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে তার প্রভাব থেকে আরো অনুমিত হয় যে ইসলামী বিপ্লবের উৎসগুলো যুগান্তকরী এবং চিরন্তন। বিংশ শতাব্দিতে আরো যেসব বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লব সেগুলোর চেয়ে আলাদা। এই বিপ্লবের একটা ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক পরিচিতি রয়েছে।

 

বিশ্ব যখন দুই শিবিরে বিভক্ত ছিল সে সময় ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়। একটি শিবির ছিল প্রাচ্যের বৃহৎ শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নকেন্দ্রিক, যারা দ্বীনকে আফিমের সঙ্গে তুলনা করেছিল। এদের অনুসৃত ব্যবস্থা ছিল মার্কসবাদ। অপর শিবিরটি ছিল পাশ্চাত্যের বৃহৎ শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক। তাদের অনুসৃত আদর্শ ছিল লিবারেলিজম। তারাও দ্বীনকে মনে করতো বিশেষ এবং ব্যক্তিগত ব্যাপার। লিবারেলিজম হিউম্যানিজমের ওপর প্রতিষ্ঠিত আর হিউম্যানিজমে ধর্মের কোনো স্থান নেই। সেজন্যেই দুই পরাশক্তির আদর্শের বাইরে স্বৈরতন্ত্র বিরোধী, সাংস্কৃতিক এবং দ্বীনী আদর্শে দীপ্ত ইরানের ইসলামী বিপ্লব ছিল এক বিশাল ঘটনা। ইসলামী বিপ্লব সম্পর্কে সবচেয়ে সুন্দর এবং অর্থবহ বাক্যটি উচ্চারণ করেছেন বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ) স্বয়ং। তিনি বলেছেনঃ "ইসলামী বিপ্লব ছিল নূরের বিস্ফোরণ।"

 

পশ্চিমা তাত্ত্বিক ও চিন্তাবিদরা ইসলামী বিপ্লবকে দুই শিবিরে বিভক্ত বিশ্বে 'রাজনৈতিক ভূমিকম্প' বলে অভিহিত করেছেন, যে ভূমিকম্প সমগ্র বিশ্বকে জটিল আবর্তে ফেলে দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী অত্যাচারের শাসন কায়েম হয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শিবিরে না হয় রুশ শিবিরে প্রবেশ করেছিল। রুশ মানে প্রাচ্য আর যুক্তরাষ্ট্র মানে পাশ্চাত্য শিবির-এই দু'য়ের বাইরে থাকার কোনো সুযোগই ছিল না তখন। ন্যাটো এবং ওয়ারশ' সামরিক জোট ছিল এই দুই অত্যাচারী শিবিরের রক্ষক। তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশেই এই দুই শিবিরের কোনো একটির বাইরে গিয়ে কোনো ঘটনা সফলভাবে ঘটানোর সুযোগ ছিল না। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে নিরাপদ ও স্থিতিশীল অঞ্চল ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল "প্রাচ্য নয়, পাশ্চাত্য নয়" শ্লোগান দিয়ে।

 

ইমাম খোমেনী (রহ.)এর আন্দোলন ছিল সবসময়ই সরাসরি রেজা শাহ এবং ইম্পেরিয়ালিজমের বিরুদ্ধে। বিংশ শতাব্দিতে এটাই ছিল সর্বপ্রথম কোনো ঘটনা যে,একজন আলেম বিদেশী আধিপত্যবাদ এবং স্বদেশী স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ধর্মভিত্তিক আন্দোলনের পতাকা উড়িয়েছেন। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের আগে বিশ্বব্যাপী পশ্চিমা ইম্পেরিয়ালিজমের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী আন্দোলনগুলো হয়েছিল প্রাচ্যের মার্কসবাদী সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায়। অপরদিকে কমিউনিস্ট স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে উঠতো লিবারেলিজমের আদর্শপুষ্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায়। কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লব এই দুই পরাশক্তির বাইরে সংঘটিত হওয়ায় বিপ্লব ছিল তাদের স্বার্থে চরম আঘাত। এ কারণেই ঐ দুই পরাশক্তি এবং তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে ইসলামী বিপ্লব ছিল মস্ত বড়ো হুমকি। অভিন্ন এই হুমকি তাই দুই পরাশক্তিকে ইসলামী বিপ্লব বিরোধী আন্দোলনে অলিখিত এক ঐক্যে আবদ্ধ করে।

 

সোভিয়েতপন্থী তুদেহ পার্টিসহ ইরানের বামপন্থী দলগুলো শুরু থেকেই ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে থাকে। তারা ইরানের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে গৃহযুদ্ধ বাধানোরও চেষ্টা করে। কিন্তু ইরানী জনগণের দূরদর্শিতা ও সচেতনতার কারণে বামপন্থীদের সশস্ত্র ঐ বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়ে যায়। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও বিপ্লবের শুরু থেকেই স্বাধীনতা ও মুক্তির শ্লোগান তুলে ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে শত্রুতা ও ষড়যন্ত্র শুরু করে। নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী বিপ্লবকে অঙ্কুরেই ধ্বংস করে দিতে তারা রাজনৈতিক কিংবা সামরিক কোনো পথই কাজে লাগাতে বাকি রাখে নি। মুক্তির শ্লোগান দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাজতন্ত্রকামীদের প্রতি তাদের সমর্থন জানায় এবং ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব ঘটানোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যখন তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালিয়ে প্রমাণ করেছিল ঐ দূতাবাস ছিল গোয়েন্দাবৃত্তির আখড়া,তখন থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্মুখী শত্রুতার মাত্রা ব্যাপক বেড়ে যায়।

 

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক,সামরিক এবং অর্থনৈতিক সকল পন্থাকে কাজে লাগান। কার্টার তেহরানে মার্কিন গোয়েন্দা আখড়া ভেঙ্গে দেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে ইরানের সাথে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সার্বিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের সিদ্ধান্ত নেন। আমেরিকার ঐ অর্থনেতিক অবরোধের বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনী (রহ.)এর প্রতিক্রিয়া ছিল তাদের জন্যে যথেষ্ট শিক্ষণীয়।ইমাম ১৯৭৯ সালের ১৬ই ডিসেম্বরে বলেছিলেনঃ "আমরা এরপর থেকে বিদেশীদেরকে আর আমাদের দেশে এসে মাতবরি করতে দেবো না,আমাদের দেশের জন্যে আমরাই যথেষ্ট।" তারা যতোই চাপ সৃষ্টি করুক,কিংবা অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের জন্যে যতো নীলনকশাই করুক, আমরা ঐ অবরোধের তোয়াক্কা করি না।" ইমাম খোমেনী (রহ) জিমি কার্টারের উদ্দেশ্যে বলেনঃ "বিশ্ব কি মিঃ কার্টারের অধীনে যে যখন তিনি বলবেন অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে হবে সবাইকে তা মেনে নিয়ে বলতে হবে জ্বি আমরা অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করবো। এটাই হলো পরাশক্তিগুলোর অনুর্বর মস্তিষ্কের প্রমাণ যে তারা মনে করে যেহেতু আমরা শক্তির অধিকারী,তাই সমগ্র বিশ্বের জনগণ বা সমগ্র বিশ্বই আমাদের অনুগত।" ১৯৭৯ সালের শেষের দিনগুলোতে ইমাম খোমেনী (রহ) বলেছিলেনঃ "আমাদের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হলে আমরা আরো বেশি তৎপর হবো,তাতে আমাদেরই কল্যাণ হবে। করুক অবরোধ,তাতে কেউ ভয় পাবেন না।" সত্যি সত্যিই মার্কিনীদের অবরোধের কোনো প্রভাবই ইমামের কিংবা জনগণের সিদ্ধান্তের ওপর পড়ে নি।তারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আগের মতোই প্রতিরোধ চালিয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের সাদ্দামের মাধ্যমে ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়,রাশিয়াও তাতে সহযোগিতা করে।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বপ্রথম সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ ছিল সেই যুদ্ধ। শাহের বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ সংগ্রামের পর সাদ্দামের চাপিয়ে দেওয়া ঐ যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী বিপ্লবকে দুর্বল করে দেয়া। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। ইসলামী বিপ্লবকে রক্ষা করতে গিয়ে যদিও ইরান তাঁর লক্ষ লক্ষ সাহসী যুবককে হারিয়েছে-যার ফলে ইরানের ভিত্তিমূলে চরম আঘাত লেগেছে-তারপরও চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও ইসলামী বিপ্লব বিশাল এবং মূল্যবান অনেক কিছু অর্জন করেছে। সেই অর্জন হলো স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরতা, উন্নতি ও অগ্রগতির পথে এবং যুদ্ধ বিধ্বস্ত স্বদেশ গঠনের ব্যাপারে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস। আজ চৌত্রিশ বছর পর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরানের বিচিত্র অগ্রগতিই প্রমাণ করে ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ ছিল নিষ্ফল ও অকার্যকর। বিজয় বার্ষিকীর মিছিলে কোটি কোটি জনতার ঢল সে কথারই সাক্ষ্য দেয়। সেইসাথে উত্তর আফ্রিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইসলামী গণজাগরণ প্রমাণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয় ইরানের ইসলামী বিপ্লবই দিকে দিকে ইসলামের আলো ছড়াচ্ছে। ফলে পশ্চিমারা ইরানী জনগণের ওপর যতোবেশি চাপ সৃষ্টি করবে ইরানের জনগণ ততোবেশি ইসলামী বিপ্লবের সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াবে। এই শিক্ষা শত্রুদের সচেতন করে তুলুক।

    বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতি

ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর থেকেই ইরানের ওপর নেমে আসে চতুর্মুখী বিপর্যয়। ইরাকের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া আট বছরের যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি। এ ধরনের অবরোধ আরোপিত হতে হতে বিগত ত্রিশ বছরে ইরানের এসব গা সওয়া হয়ে গেছে। অবরোধ আর নিষেধাজ্ঞা এখন আর ইরানের ওপর কার্যকরী নয়। তার প্রমাণ বিগত তিন দশকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরানের বিচিত্র অর্জন। মহাশূন্য গবেষণা আর প্রতিরক্ষা শিল্পের ক্ষেত্রেও ইরানের অগ্রগতি অসাধারণ। বিপ্লবের আদর্শের ওপর অটল থেকে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেলে আল্লাহ যে সহযোগিতা করেন, তার প্রমাণ ইরানের এসব উন্নয়ন ও সাফল্য।

 

চতুর্মুখী অবরোধ আর নিষেধাজ্ঞার মাঝে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরানের অর্জন এক কথায় চোখ ধাঁধানো। মহাশূন্য গবেষণা, আকাশপথ, ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেক্ট্রনিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, এন্টি এয়ারক্র্যাফট, সমুদ্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রভৃতি ক্ষেত্রে ইরানের সাফল্য প্রমাণ করে যে অবরোধ কোনো প্রভাবই ফেলতে পারে নি ইরানের ওপর। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে ইরানের নিজস্ব বিজ্ঞানীরাই তাদের মেধা ও প্রতিভা দিয়ে এগুলো তৈরি করেছে। সমুদ্র ভ্রমণের জন্যে বিশেষ বিমান প্রকল্প, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি, নতুন প্রজন্মের পাইলটবিহীন বিমান বা ড্রোন তৈরি, স্যাটেলাইট পরিবাহী ক্ষেপণাস্ত্র এবং মহাশূন্য প্রকল্প, টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম ডেভেলপমেন্টসহ ইলেক্ট্রনিক ক্ষেত্রে বিচিত্র অগ্রগতি ইত্যাদি ইরানী বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের নিজস্ব অর্জন যা প্রদর্শিত হচ্ছে এবারের আলোকিত দশ প্রভাতে।

 

ইরান স্যাটেলাইট পরিবাহী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক তৈরি প্রকল্পে ব্যাপক উন্নয়ন ও অগ্রগতি লাভ করেছে। ইরান এখন বিশ্বের মহাকাশ বিষয়ক গবেষণায় এগারো সদস্য বিশিষ্ট সংস্থার সদস্য। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়েও ইরানের অগ্রগতি অপরিসীম। জাতিসংঘ সংস্থা ইউনিসেফ, ইউএনএফপিএ এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা হু ইরানের এই অগ্রগতিকে অনুমোদন দিয়েছে। ইরানে এখন মাতৃ মৃত্যুর হার একেবারে কম। এছাড়া গত এক দশকে ইরান ঔষধ তৈরির ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি লাভ করেছে। ক্যান্সার চিকিৎসায় ইরানের নতুন নতুন আবিষ্কার, প্লাজমা তৈরিতে ইরানের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, মূলকোষ তৈরি, ক্লোনিং প্রযুক্তিতে সাফল্য ইত্যাদি এখন একান্তই স্থানীয় প্রযুক্তিতে পরিণত হয়েছে। এসবের বাইরেও ন্যানো টেকনোলজিতে ইরানের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। চিকিৎসা এবং পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে এই প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপক।

 

ন্যানো প্রযুক্তিতে বিশ্বে ইরানের অবস্থান এখন বিশের মধ্যে রয়েছে। ন্যানো প্রযুক্তিতে তৈরি ইরানের বিচিত্র ব্যবসায়িক পণ্য সামগ্রী এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানীও হচ্ছে। ঔষধ শিল্পেও ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহারে ইরানের ব্যাপক সাফল্য রয়েছে। ডায়াবেটিক ক্ষতের চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্যে এনজিপার্স এবং এইডস প্রতিরোধের জন্যে আইমড খুবই উল্লেখযোগ্য দুটি আবিষ্কার। এইসব আবিষ্কার এটাই প্রমাণ করছে যে, ইরানের ওপর জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা সত্ত্বেও সকল ক্ষেত্রেই ইরানের উন্নতি ও অগ্রগতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয় এখন চতুর্থ দশকে পড়েছে। আশা করা যায় এই দশকে ইরান জ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সাফল্যের নতুন নতুন চূড়ায় আরোহন করবে।

 


মানব জীবনের উন্নয়নে এখন পরমাণু বিষয়ক জ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। সেজন্যে প্রত্যেক জাতির জন্যেই শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি অর্জন অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ।ইরানের জন্যে সুখের এবং গর্বের বিষয় যে তারা জটিল এই প্রযুক্তি অর্জন করে ফেলেছে এমনকি পরমাণু জ্বালানী চক্র অর্জনের ক্ষেত্রেও ইরানী বিজ্ঞানীরা সফল হয়েছেন। পরমাণু জ্বালানী তৈরির সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে ইরান এখন বাণিজ্যিকভাবে পরমাণু জ্বালানী উৎপাদনের বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।এরিমধ্যে অনেকটা অগ্রসরও হয়েছে। যেমন ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা পরমাণু জ্বালানী চক্রের বৃহৎ প্রকল্পের প্রাথমিক পর্বে ইস্ফাহানে উসিএফ কারখানা চালু করেছে। আরাকে হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টর প্রজেক্ট চালু করেছে। গত বছর কোমে ফোদোর্ পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রও স্থাপন করা হয়েছে।এসব প্রকল্পই অবশ্য আইএইএ'র তত্ত্বাবধানে চলছে। ইতোমধ্যে ইরান উচ্চ মাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে অ্যানার্জি ক্যাপসুল এবং জ্বালানী দণ্ড তৈরিতেও সফল হয়েছে। এ সব সাফল্য ইরানের সক্ষমতার প্রমাণ ছাড়াও তাদের দূরদর্শী ভবিষ্যৎ চিন্তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।


পরমাণ সংক্রান্ত জ্ঞান কেবল জ্বালানীর নিশ্চয়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং পরমাণু বিজ্ঞানের ক্ষেত্র আরো ব্যাপক বিস্তৃত। চিকিৎসাসহ গবেষণামূলক রি-অ্যাক্টরের ক্ষেত্রেও পরমাণুর ব্যবহার রয়েছে। ইরানী বিশেষজ্ঞরা বর্তমানে এ নিয়ে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইরানে এখন প্রয়োজনীয় রেডিও মেডিসিনের নব্বুই থেকে পঁচানব্বুই ভাগ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। কৃষি এবং উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার করে ইরানী বিজ্ঞানীরা ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন।ইরান সাফল্যের সাথে অ্যাটমকি স্মেল্টিং প্লান্টও নির্মাণ করেছে। এদিক থেকে বিশ্বের পাঁচটি দেশের মধ্যে ইরান একটি। ইরান ইতোমধ্যে অপরিশোধিত ইউরেনিয়াম বা ইয়েলো কেক তৈরির ক্ষেত্রেও স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এ থেকেই বোঝা যায় পরমাণু প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরান কতদূর অগ্রসর হয়েছে।

 

১৯৫৮ সালে ইরান আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ'র সদস্য হয়েছে। ১৯৬৮ সালেও ইরান নন প্রলিফারেশান ট্রিয়েটি বা এন.পি.টি' চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। গত চার বছরে ইরান নতুন প্রজন্মের সেন্ট্রিফিউজ এবং পরমাণু জ্বালানী উৎপাদন চক্রের ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। নাতাঞ্জ, ইস্ফাহান, আরাক এবং ফোদোর্ পরমাণু স্থাপনায় এগুলো উৎপাদিত হয়েছে। এক্ষেত্রে ইরানের আরেকটি বড়ো ধরনের সাফল্য হলো বিশ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করণ। তেহরানের মেডিক্যাল রিঅ্যাক্টর চক্র নিশ্চিত করতে গিয়েই এই সাফল্য পেয়েছে ইরান। তেহরানের চিকিৎসা বিষয়ক একটি গবেষণা কেন্দ্রের রিঅ্যাক্টরের জন্যে বিশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন ছিল। গত বছর দুয়েক আগে প্রয়োজনীয় ঐ উচ্চ মাত্রার ইউরেনিয়াম বিদেশ থেকে আনা হতো। কেননা ইরানের অন্তত বিশ হাজার মেগাওয়াট পরমাণু বিদ্যুত উৎপাদনের জন্যে স্থাপিত প্রায় বিশটি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্যে ত্রিশ হাজার টন পরমাণু জ্বালানী প্রয়োজন। কিন্তু পশ্চিমারা অবরোধ আরোপের অজুহাতে এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে ঐ রিঅ্যাক্টরের জন্যে জ্বালানী নিশ্চিত করতে বাধা দেয়। পশ্চিমারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করায় ইরান বাধ্য হয়ে নিজেরাই উচ্চ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে থাকে।

 

ইরানের এই অগ্রগতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কতিপয় পশ্চিমা দেশ উঠেপড়ে লেগে গেছে ইরানের উন্নয়নকে দমিয়ে রাখার জন্যে। ইরান যদিও সকল কাজই আইএইএ'র পরিদর্শকদের তত্ত্বাবধানেই আঞ্জাম দিয়ে আসছে তারপরও ঐ দেশগুলো ইরানের ওপর সরাসরি এবং নিরাপত্তা পরিষদকে দিয়েও অবেরোধ আরোপ করেছে। কিন্তু এনপিটি'তে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ইরান কোনো অবরোধেই গা করে নি। তারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। সেইসাথে বলে এসেছে অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে কোনোরকম ছাড় দেবে না ইরান। এ কারণেই এখন ইরানের বিরুদ্ধে বিচিত্র পন্থায় শুরু হয়েছে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। পশ্চিমারা যতোই ইরানের অধিকার আদায়ের পথে বাধার সৃষ্টি করতে চাইবে ইরান ততোই উন্নতির শীর্ষ চূড়ার দিকে এগিয়ে যাবে। পশ্চিমারা যে অনবরত ব্যর্থই হচ্ছে ইরানের এইসব সাফল্যই তা প্রমাণ করার জন্যে যথেষ্ট।

 

ইসলামী বিপ্লব পরবর্তীকালে ইরানী সমাজে নারীদের ভূমিকা

সমাজে নারীদের অবস্থান নিশ্চিত করা আজকাল মৌলিক একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সুখের বিষয় যে ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর ইসলামের নূরানি শিক্ষার আলোকে নারীদের উচ্চ অবস্থান ও মর্যাদার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বয়ং সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীও বলেছেন, নারীদের মর্যাদার বিষয়টি ইরানের মৌলিক একটি বিষয় হিসেবে গণ্য। সমাজ এবং পরিবারে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে এখানে আমরা আলোচনার প্রয়াস পাবো।

 

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে এখন নারীকে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সমাজ এবং পরিবার-এই দুই ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীল বলে গণ্য করা হয়। এর ফলে সমাজের উন্নয়নে নারীদের সক্ষমতার বিষয়টি ফুটে ওঠে। নারীদের মানবীয় মর্যাদার বিষয়টি ইসলামে সুরক্ষিত। ঔদার্যের প্রতীক নারীরা হলো সমাজ এবং পরিবারের ভিত্তি স্থাপনকারী। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হলে দেখা যাবে সামাজিক বিচিত্র কার্যক্রমে নারী সমাজের উপস্থিতি পরিবার গঠনের পথে বাধার কোনো কারণ নয়। সামাজিক সুস্থতার ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকাই সর্বাধিক এবং গুরুত্বপূর্ণ। নারীদের ব্যাপারে গভীর এবং উন্নত দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ইরানের সবোর্চ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী পরিবারকে একটি সমাজের মূলকোষের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি মনে করেন, এই মূলকোষ যদি সুস্থ স্বাভাবিক থাকে তাহলে সমাজও সুস্থ থাকবে। প্রাণবন্ত, উদ্দীপ্ত ও সুস্থ একটি পরিবার ব্যবস্থা ছাড়া কোনো একটি দেশ বিশেষ করে মুসলিম রাষ্ট্র উন্নতি অগ্রগতি লাভ করতে পারে না।

 

পশ্চিমা দেশগুলোতে এখন সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হলো পরিবারের দায়িত্বশীল সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তারা পরিবারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিংবা মৌলিক কোনো ব্যবস্থা বলে মনেই করে না। তাছাড়া তারা নারীকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন সত্ত্বা হিসেবেই দেখে। সবোর্চ্চ নেতার মতে, তারা আসলে পরিবার ব্যবস্থা সম্পর্কে জবাবদিহিতার বিষয়টিকেই কৌশলে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছে। তাঁর দৃষ্টিতে পরিবার ব্যবস্থাটা পশ্চিমাদের একটি দুর্বল দিক। পশ্চিমা সমাজে পরিবারের কেন্দ্রবিন্দুতে নারীর অবস্থানটি সেভাবে নেই, নারীকে বস্তুত পরিবারকেন্দ্রিকতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্নয়ন ও বিকাশের ভিত্তি হিসেবে সামাজিক দু'টি ব্যবস্থা মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকৃত। একটি হলো বিয়ে অপরটি পরিবার। অথচ আজকাল পশ্চিমা সমাজে বিয়ে না করা এবং অবিবাহিত থাকার ব্যাপারে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনাধর্মী প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এ কারণে পশ্চিমা সমাজে অবিবাহিত পরিবারের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।

 

পক্ষান্তরে ইরানের ইসলামী সমাজে বিয়ে হলো একটা পবিত্র ও সামাজিক বন্ধন যার মূল প্রোথিত রয়েছে ইসলামের নীতিমালার ভিত্তির ওপর। নবী করিম (সা.) বিয়েকে মানুষের ইমানের পরিপূর্ণতার কারণ বলে উল্লেখ করেছেন এবং বিয়েকে তাঁর সুন্নাত বলে ঘোষণা করেছেন। মহান এবং পবিত্র এই সম্পর্কটিকে কোনোভাবেই যেন বিবাহ বহির্ভুতভাবে গড়ে না ওঠে সে বিষয়টির ওপর সবোর্চ্চ নেতা যথাসম্ভব গুরুত্ব দিয়েছেন। এ জন্যেই তিনি বিয়ের ক্ষেত্রে সহজতার কথা বলেছেন সবসময়,বিয়েকে যেন কঠিন শর্ত আরোপ করে অসম্ভব করে তোলা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে বলেছেন তিনি।কারণ বিয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো আন্তরিক ও ভালোবাসাপূর্ণ পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে পরিবার গঠন করা। পবিত্র কোরআনের সূরা রূমের একুশ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ "আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সংগিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।"

 

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে মনে করা হয় নারী হলো পরিবারের প্রশান্তির উৎস। এই দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু পারিবারিক নিরাপত্তা বিধানে পুরুষের ভূমিকার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কারণটা হলো একটি পরিবারে নারী এবং পুরুষের ভূমিকা পরস্পর পরিপূরক। একটি পরিবারে যদি নারীর প্রশান্তিদায়ক ভূমিকা আর পুরুষের নিরাপত্তা বিধানের ভূমিকা পারস্পরিক সঙ্গতিপূর্ণ হয় তাহলে তাদের মাঝে প্রেম এবং ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে। এই সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকলে ঘরের বাইরের সমস্যাগুলো নারীর পক্ষে সহনশীল হবে এবং নারীও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।


দুঃখজনকভাবে পাশ্চাত্যে নারীরা কেবল পুরুষের ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। সবোর্চ্চ নেতা বলেন, নারী এবং পরিবার সম্পর্কে পশ্চিমাদের সবচেয়ে বড়ো জুলুম হলো নারীকে মূল্যায়নে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। ইসলামী বিপ্লবের নেতা বলেন, "নারীর সম্মান ও মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে পশ্চিমা নীতি। পাশ্চাত্যে বিশেষ করে আমেরিকা এবং ইউরোপের উত্তরের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে এমন কিছু কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে যেখানে নারীকে পুরুষের যৌন ভোগের সামগ্রী হিসেবে প্রদর্শনী করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে পত্র পত্রিকা, ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কেউ এ ব্যাপারে প্রতিবাদও জানাচ্ছে না, বিষয়টা স্বাভাবিক একটা ব্যাপার যেন। নারীর সম্মান ও মর্যাদার ওপরে এর চেয়ে আর বড়ো আঘাত কী হতে পারে? এই ভুল সাংস্কৃতিক চর্চার মোকাবেলায় নিষ্ক্রিয় থাকা ঠিক নয়। নারী এবং পরিবারের ক্ষেত্রে পশ্চিমারা মারাত্মক গোমরাহি এবং বিচ্যুতির মাঝে রয়েছে। কেবল পরিবারই নয় বরং নারীর ব্যক্তিত্ব, নারীর নিজস্ব পরিচয় সম্পর্কেও পশ্চিমারা এক অদ্ভুত গোমরাহির মাজে নিমজ্জিত রয়েছে।" কিন্তু নারীদের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে মানবিক। ইসলামে মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষ সমান। এখানে একর পরে অপরের শ্রেষ্ঠত্ব তাকওয়ার ওপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে ইসলামের শ্রেষ্ঠ ক'জন নারীর কথা উল্লেখ করেন সর্বোচ্চ নেতা। এঁরা হলেন হযরত ফাতেমাতুয যাহরা (সা), হযরত যেয়নাব (সা) এবং হযরত মারিয়াম (সা) সহ আরো অনেক মহিয়সী রমনী, যাঁরা কালের অনেক পুরুষের চেয়েও শ্রেষ্ঠত্ব এবং মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।


ইরানে এখন নারীরা ঘরের কাজ সামলানোর পাশাপাশি সমাজে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। পরিবারে নারীদের ভূমিকা বলতে দু'টি দায়িত্ব বোঝায়, একটি হলো স্ত্রীর দায়িত্ব, অপরটি মাতৃত্বের। এর কোনোটিকেই ছোটো করে দেখার সুযোগ নেই। কেননা ঘরকন্নাকে আল্লাহর পথে জেহাদ করার সমান বলে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সমাজে একজন পুরুষকে যদি উত্তম ভূমিকায় দেখতে চাই তাহলে তার ঘরের অভ্যন্তরে নারীকে হতে হবে উত্তম স্ত্রী। ঘরের দায়িত্বের পাশাপাশি একজন নারী সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। এটা প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ইসলাম স্বীকৃতি দিয়ে গেছে। যদিও পশ্চিমা সবেমাত্র শুরু করেছে।

 

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর সমাজে নারীদের ব্যাপক তৎপরতা বেড়েছে। সমাজের সকল ক্ষেত্রেই নারীরা এখন তাদের মেধা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন। ডঃ পল স্প্রাখম্যান নামের মার্কিন এক লেখক ও অনুবাদক ফার্সি উপন্যাস 'দ্য' অনুবাদ করেছেন। এই উপন্যাসটির মূল বিষয় হলো যুদ্ধ সম্পর্কে এক ইরানী নারীর বিচিত্র স্মৃতিচারণ। অনুবাদ করার পেছনে ডঃ পলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেনঃ "ইরানে যখন ভ্রমণ করেছিলাম, দেখেছিলাম সমাজে ইরানী নারীরা ব্যাপকভাবে তৎপর। আমি বিশ্বাস করি ইরানী নারীরা পুরুষদের চেয়েও অনেক বেশি কর্মক্ষম। এজন্যেই আমি চেয়েছি ইরানী নারীদের প্রকৃত স্বরূপ পৃথিবীবাসীর সামনে তুলে ধরবো।" ইরানে এখন উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীদের শতকরা হার ৬৮ ভাগ। নারীশিক্ষার হার এখন আশি শতাংশ যা বিপ্লবপূর্বকালে ছিল মাত্র ৩৪ শতাংশ। এসবই ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের সুফল।

 

আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর দৃষ্টিতে ইরানের ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা

বিশ্বের নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান পাশ্চাত্যের নানা বাধা ও অবিরাম শত্রুতা সত্ত্বেও উচ্চতর লক্ষ্যগুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং বিপ্লবী ইরানের ভবিষ্যত খুবই উজ্জ্বল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাও এসব সত্য বা বাস্তবতা প্রায়ই তুলে ধরছেন। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের তেত্রিশ বছর পূর্তির প্রাক্কালে তার এ সংক্রান্ত কিছু মন্তব্য নিয়েই আমাদের এ বিশেষ আলোচনা।

 

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয় সমসাময়িক যুগের এক মহাবিস্ময়কর ঘটনা। যে যুগে বিশ্বের সরকারগুলো হয় পাশ্চাত্য অথবা সোভিয়েত ব্লকের ওপর নির্ভরশীল ছিল সে যুগে ইরানের সচেতন ও বিপ্লবী জাতি মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ.)'র নেতৃত্বে একটি স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় সফল হয়। মহান আল্লাহর ইচ্ছায় মরহুম ইমামের দূরদর্শী নেতৃত্বে পরিচালিত গণ-আন্দোলনের জোয়ারে ধ্বসে পড়ে আড়াই হাজার বছরের পুরনো রাজতন্ত্র। ওই ঘটনার তেত্রিশ বছর পরও ইসলামী ইরানের অগ্রযাত্রা নানা ক্ষেত্রে অব্যাহত রয়েছে। পাশ্চাত্যের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, সন্ত্রাস ও নানা ধরণের বাধা সত্ত্বেও বিজ্ঞান, সামরিক ও অর্থনীতির অনেক ক্ষেত্রসহ বিভিন্ন খাতে অবিশ্বাস্য বা অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে বিপ্লবী এই দেশ। একইসাথে ইসলামী ইরান সাম্রাজ্যবাদ ও জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রামের শ্রেষ্ঠ আদর্শে পরিণত হয়েছে।

 

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ন্যায়কামীতা, স্বাধীনতা, সম্মান ও অগ্রগতির কথা সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ.)'র নেতৃত্বে ইরানের জনগণ এসব লক্ষ্যই অর্জন করতে চেয়েছে। বিগত তেত্রিশ বছরে ইরান এসব লক্ষ্য অর্জনে অনেকাংশেই সফল হয়েছে। এ সংক্রান্ত সাফল্যগুলো মূল্যায়ন করে ইরানকে গৌরবময় অগ্রযাত্রার এ পথ অব্যাহত রাখতে হবে বলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মনে করেন। বর্তমান যুগে ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিশ্বের জাতিগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী আদর্শ হিসেবে আলোচিত।
হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, "সাম্প্রতিক সময়ে যেসব দেশে গণ-বিপ্লব হয়েছে এবং যেসব দেশ বিপ্লবের সম্মুখীন সেসব দেশে আমাদের উন্নত অবস্থা, উন্নত তৎপরতা ও সম্মান প্রভাব ফেলছে।"


ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মতে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তিনটি প্রধান লক্ষ্য হল একটি ইসলামী রাষ্ট্র, ইসলামী সমাজ ও ঐক্যবদ্ধ বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহ গঠন, আর এ লক্ষ্যগুলো পবিত্র ইসলাম ধর্মেরই মহান লক্ষ্য। হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) যখন আবির্ভূত(মহান আল্লাহ তাঁর আবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন) হবেন তখনই ঐক্যবদ্ধ ও আদর্শ মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। সে সময় মুসলমানরা ভৌগোলিক সীমানাবিহীন ঐক্যবদ্ধ ও অভিন্ন জাতিতে পরিণত হবে।
হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী মনে করেন একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামী বিপ্লবের প্রাথমিক প্রধান লক্ষ্যটি অর্জিত হয়েছিল। তার মতে, ইরানের জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকায় এবং মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ.)'র দূরদর্শী নেতৃত্বের সুবাদে এ মহান লক্ষ্যটি অর্জিত হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্রের নানা সংস্থা ও বুনিয়াদী প্রতিষ্ঠানগুলো ইসলামী বিধান ও নীতিমালা অনুযায়ী গঠিত হয়। ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধানও প্রণীত হয় ইসলামের মুক্তিকামী শিক্ষার ভিত্তিতে।

 

ইসলামী সরকার গঠন ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রক্রিয়ার একটি অংশ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দৃষ্টিতে ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে ওঠার জন্য এর কর্মকর্তাদের হতে হবে আত্মগঠিত, খোদাভীরু ও তাদের তৎপরতা হবে ইসলামের দিক-নির্দেশনা-ভিত্তিক। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এ প্রসঙ্গে ইসলামী ইরানের কর্মকর্তাদের পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, "আমরা যারা দায়িত্বশীল তাদেরকে অবশ্যই আত্মগঠিত বা আত্ম-সংশোধিত হতে হবে, নিয়মিত আত্ম-সমালোচনার কষ্টি পাথরে নিজেকে যাচাই করতে হবে, আমরা একে-অপরকে সত্যের দিকে আহ্বান জানাব, একে অপরকে আনন্দিত করব, আমরা হব একে-অপরের আয়না, আমরা আমাদের দোষ-ত্রুটি আন্তরিকতার সাথে পরস্পরের কাছে তুলে ধরব, ভুল-ত্রুটি সংশোধনের উদ্যোগ নেব এবং নিজেকে দিনকে দিন আরো উন্নত করব। সব দায়িত্বশীলকে এই নিয়তে দায়িত্ব নিতে হবে যে তারা মানুষের সেবার জন্য একজন সৎ বান্দার দায়িত্ব বা ভূমিকা পালন করতে চান। আর কর্মকর্তাদের সবাই এভাবে এগিয়ে আসলে তখনই তা হবে প্রকৃত ইসলামী সরকার।"

 

আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী মনে করেন, ইসলামী রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদেরকে ধর্মীয় ও নৈতিক মানদণ্ডের দৃষ্টিতে ন্যুনতম যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে। তিনি মনে করেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান বর্তমানে ইসলামী সরকার গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। আর এর পরবর্তী পর্যায়টি হল ইসলামী সমাজ গড়ে তোলা। ইসলাম মানুষের জন্য যেসব সৌভাগ্যের ব্যবস্থা করে রেখেছে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সেগুলো গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।

 

আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর মতে, ইরানের ইসলামী সরকার ও জনগণ এমন এক সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে যেখানে গুরুত্ব পাবে স্বাধীকার হারা মানুষের অধিকার পাওয়ার প্রশ্ন, ন্যায় বিচার ও সার্বিক অগ্রগতি এবং আত্ম-উন্নয়নে জনগণের ভূমিকা রাখার অধিকার। দারিদ্র, ক্ষুধা ও বঞ্চনা হতে মুক্তিসহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি এবং এক কথায় সব দিকে অগ্রসর হওয়ার মত গতিশীল ও স্থবিরতাহীন সমাজ গঠন করাই তাদের উদ্দেশ্য বলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মনে করেন। অবশ্য প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এ ধরণের সমাজ এখনও ইরানে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে তিনি স্বীকার করেছেন।

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মতে, ইসলামী সমাজে মানুষের আধ্যাত্মিকতার বিকাশ জরুরি যাতে তারা আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হতে পারে। কারণ, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে আমার এবাদতের উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি।' (সূরা জারিয়াত-৫৬) মানুষ এভাবে আল্লাহর নৈকট্য ও পূর্ণতা অর্জন করবে-এটাই মানব সৃষ্টির ঐশী উদ্দেশ্য।
তিনি এটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও অগ্রগতি-এসব শব্দকে আমরা ইসলামী অর্থেই বলে থাকি, পশ্চিমা অর্থে নয়। যেমন, পাশ্চাত্যে স্বাধীনতা মানেই বল্গাহীনতা, অবাধ যৌনাচারের স্বাধীনতা প্রভৃতিকে বোঝানো হয় এবং অর্থনৈতিক ন্যায় বিচার বলতে বৈষম্যমূলক পুঁজিবাদকে বোঝানো হয় যার ফলে সেখানে জটিল অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে।

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মতে, স্বাধীনতা, নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও অগ্রগতির মত বিষয়গুলো প্রাচীন যুগ হতেই মানুষের প্রকৃতিগত আদর্শ। তাই এগুলো চিরনতুন ও চিরসবুজ। আর এ জন্যই এসব বৈশিষ্ট্যে ভরপুর ইসলামী সমাজ কখনও মলিন বা পুরনো হয়না। মানুষ সব সময়ই এসব আদর্শ নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়, আর তারা এসব ক্ষেত্রে যতই অগ্রসর হোক না কেন তারপরও আরো এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে। আর এ জন্যই তিনি মনে করেন, ইরানের ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা যৌবনের প্রফুল্লতা, সদা-অগ্রসরতা, ও চির-অম্লানতার মত গুণের অধিকারী এবং দেশটির ভবিষ্যতও এইসব একই গুণে প্রজ্জ্বোল থাকবে। ইরানের ইসলামী ব্যবস্থা সৃষ্টিশীল। এর লক্ষ্যগুলো সুনির্দিষ্ট হলেও যুগের চাহিদা অনুযায়ী সেগুলো অর্জনের পন্থায় পরিবর্তনশীলতার অবকাশ রয়েছে। যেমন, কখনও এমন হতে পারে যে মানুষ কোনো নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছার জন্য কখনও বাসে, কখনও ট্রেনে বা কখনও নৌকায় বা কখনও বিমানে চড়তে বাধ্য হয়। কিন্তু মূল লক্ষ্য অপরিবর্তনীয়। এ প্রসঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ইরানে প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে তার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের কাছে হস্তান্তরের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেন।

  ইমাম খোমেনী (রহ.) এর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন   পহেলা ফেব্রুয়ারি মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ.) এর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭৯ সালের এই দিনে ইমাম যখন ফ্রান্স ছেড়ে আসছিলেন তখন ফ্রান্সের জনগণের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বার্তায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছিলেন এবং বিদায় নিয়েছিলেন। রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় দিক থেকে শতাব্দির শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বকে নিয়ে বিমান যখন ইরানের উদ্দেশ্যে আকাশে উড়লো, ইমাম তখন নামায পড়লেন এবং দুটি কম্বলের ওপর আরাম করছিলেন। কোনোরকম উদ্বেগ ছিল না তাঁর মাঝে। অথচ তাঁর বিমানটি আকাশেই অপহৃত হওয়ার আশঙ্কা ছিল কিংবা বিমানটিকে ধ্বংসও করে দেওয়ার ভয় ছিল। তিনি এ ধরনের চিন্তার উর্ধ্বে ছিলেন যদিও সবাই তাঁর ব্যাপারে ছিলেন উদ্বিগ্ন।  

১৯৭৯ সালের শীতের মাঝামাঝিতে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ইমাম খোমেনী (রহ.) যখন বীরত্ব ও মর্যাদার শিরোপা পরে ইরানে প্রবেশ করলেন, তখনো ভাবাই যাচ্ছিলো না যে এতোটা দ্রুততার সাথে, মাত্র দশ দিন পরেই বিপ্লব বিজয় ঘটে যাবে। তাগুতি শক্তি এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা ভেবেছিল বিপ্লবী ঐ আন্দোলনকে দমন পীড়নের মাধ্যমে স্তব্ধ করে দিতে পারবে। ক'মাস আগেও তারা ভাবতে পারেনি এরকম বিশাল গণআন্দোলনের বিপ্লবী জোয়ার সৃষ্টি হবে। ১৯৭৮ সালের আগস্ট মাসে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ইরান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেছে এভাবেঃ "ইরানে বিপ্লবের পরিস্থিতি নেই কিংবা ব্প্লিবপূর্ব অবস্থাও বিরাজ করছে না।" মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিআইএ.ও তাদের মূল্যায়নে বলেছে "আশা করা যায় শাহ আরো দশ বছর পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে।"

 

মার্কিন বিশিষ্ট তাত্ত্বিক ও রাজনীতিবিদ জর্জ বাল ইসলামী বিপ্লব বিজয় রোধ করার লক্ষ্যে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে বলেন,এর মধ্য থেকে একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেই ইরানের আন্দোলন নিয়ন্ত্রিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ইরানের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনই বরং অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কম ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় এবং ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারিতে আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে এবং ইমাম খোমেনী (রহ.) এর দূরদর্শী নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লব বিজয় লাভ করে।
আসলে ইরানে ইমাম খোমেনী (রহ.) এর জাঁকজমকপূর্ণ প্রবেশ এবং তাকেঁ স্বাগত জানানোর জন্যে কয়েক মিলিয়ন লোকের সমাবেশ সত্যিকার অর্থেই একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। তাঁর প্রতি জনগণের এই অপরিসীম আস্থা ও শ্রদ্ধার কারণে ইমামও জনগণকে সঠিক পথে পরিচালিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়েছিলেন।

 

ইমামকে স্বাগত জানানোর মাধ্যমে আরো যে বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে তাহলো ইরানী জনতার উত্থান বা জাগরণ কোনো হুজোগ ছিল না, তারা জেনে শুনে বুঝে অত্যন্ত সচেতনভাবেই বিপ্লবী আন্দোলন করেছে এবং আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জনের জন্যে ইমামের নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা ছিল অত্যন্ত গভীর এবং দৃঢ়।
অল্প সময়ের ব্যবধানেই বিশাল এই বিপ্লব বিজয় লাভ করে এবং ইসলামী বিপ্লবের আলোকিত দশটি প্রভাত ঐতিহাসিক মর্যাদা পায়। এই বিজয়ের ব্যাখ্যা সম্পর্কে ইমাম খোমেনী (রহ.) বলেছেনঃ "সমাজে এমন একটা আত্মিক পরিবর্তন সৃষ্টি হয়, যাকে মোযেজা না বলে আল্লাহর ইচ্ছা বলাই ভালো, অন্য কোনো শব্দে তাকে নামাঙ্কিত করা চলে না।"

 

ফরাশি ফটোগ্রাফার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা প্যাট্রিক চাওভেল ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং আরবদের সাথে ইসরাইলের ছয় দিনের যুদ্ধের ছবি তোলা ও ডকুমেন্টারি তৈরির জন্যে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছেন। এই ফটোগ্রাফার নোফেল লুশাতুতে ইমাম খোমেনী (রহ.) এর সাথে দেখা করেছিলেন। তারপর ইরানেও এসেছিলেন এবং জনগণের বিশাল গণ আন্দোলনের কালজয়ী কিছু ছবিও তুলেছিলেন। এই প্যাট্রিক চাওভেল ইমাম খোমেনী (রহ.) সম্পর্কে বলেছিলেনঃ "সেই প্রথম যখন আয়াতুল্লাকে দেখেছিলাম, বুঝতে পেরেছিলাম তিনি বিজয়ী হবেন। আমি সেই বয়সে যতো ব্যক্তিত্বকে দেখেছি, ইমাম ছিলেন তাদেঁর চেয়ে একেবারেই আলাদা। তাঁর চেহারায় যেরকম তেজস্বিতা লক্ষ্য করেছি সেরকম অন্য কারো মাঝে দেখিনি। তাঁর বিপ্লবও ছিল-অন্য যতো বিপ্লবের ছবি আমি গ্রহণ করেছি,সেসব বিপ্লবের চেয়ে-একেবারেই ভিন্ন। ইরানের জনগণ দৃঢ় সিদ্ধান্তে অটুট ছিল কিন্তু মোটেই উত্তেজিত ছিল না।"

 

বিপ্লব বিজয়ের ফলে ইমাম খাঁটি ইসলামী দর্শন ও চিন্তার আলোকে একদিকে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী মতাদর্শকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেন, অপরদিকে মুসলিম বিশ্বে ইসলামের পরিচয় আর সমগ্র বিশ্বে ইসলামের আধ্যাত্মিক পরিচয়কে জীবিত করে তোলেন। এর লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেছেনঃ "লক্ষ্য হলো আমাদের দেশটি হবে একটি ইসলামী দেশ। আমাদের দেশ কোরআন, নবী কারিম (সা) এবং আওলিয়ায়ে কেরামের নির্দেশনায় নিয়ন্ত্রিত হবে।" সে সময়কার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ মিশেল জনসন এ বিপ্লব সম্পর্কে বলেছিলেনঃ "ইরানের বিপ্লব খ্রিস্টিয় ষোড়শ শতাব্দির পর থেকে পশ্চিমাদের ওপর মুসলমানদের সর্বপ্রথম বিজয়। এই বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো এর নেপথ্য প্রেরণা বা চালিকাশক্তি ছিল ইসলাম, সোস্যালিজম, কমিউনিজম, ক্যাপিটালিজম, ন্যাশনালিজমের মতো কোনো মতবাদের বিন্দুমাত্র প্রভাব এই বিপ্লবের ওপর ছিল না।" ইসলামের যে এতো শক্তি রয়েছে, সে ব্যাপারে পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিগুলো টের পেলো। বিশ্বব্যাপী ইসলামের মর্যাদা ও প্রাণ পুনরায় উজ্জীবিত হয়ে উঠলো। সেজন্যে আধিপত্যকামী শক্তিগুলো ইসলামের বিরুদ্ধে, ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে বিচিত্র ষড়যন্ত্র শুরু করে দেয়। সুখের বিষয় হলো এতসব ষড়যন্ত্রের পরও মানুষ ইসলামে দীক্ষিত হচ্ছে এবং ইসলামী আন্দোলন বিশ্বব্যাপী দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।


বর্তমান বিশ্বে ইরানের ইসলামী বিপ্লবই একমাত্র স্বাধীন বিপ্লব যা বিভিন্ন দেশের মাঝে অন্যায় ও জুলুমের মোকাবেলায় প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে সমাদৃত। সেইসঙ্গে যারা আধিপত্যবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জেহাদ বা সংগ্রাম করতে চায় তাদের অনুসরণীয় আদর্শে পরিণত হয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লব। তুরস্কের বিশিষ্ট লেখিকা "মিস বিনায তুপ্রাক" তুরস্কের মুসলিম গণমাধ্যমগুলোতে ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে মেনে নেওয়া" শীর্ষক এক প্রবন্ধে লিখেছেনঃ "ইরানের ইসলামী বিপ্লব ইম্পেরিয়ালিজমের নাগপাশে আটক অপরাপর মুসলিম দেশগুলোর জন্যে একটি আদর্শ নমুনা হিসেবে বিশ্বমুসলিমসহ বিশ্বের সরকারগুলোর সামনে প্রমাণ করেছে যে, নিজেদের শক্তি সামর্থ ও স্বার্থচিন্তার ভিত্তিতে পরাশক্তিগুলোর প্রভাবমুক্ত হয়ে একটি মুক্ত ও স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ইমাম সবসময় চাইতেন কেবল ইরান নয় সকল মুসলিম দেশই নিজেদেরকে পাশ্চাত্য চিন্তাচেতনা থেকে মুক্ত করুক এবং নিজস্ব সমৃদ্ধ সংস্কৃতির সাথে,নিজেদের মৌলিকত্বের সাথে ভালোভাবে পরিচিত হোক, নিজেরা নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে চিনুক এবং তা অন্যদেরকেও চেনাক।

 

বিপ্লবের মাধ্যমে তিনি মূলত মুসলমানদের অন্তরে আত্মবিশ্বাসের বীজ রোপণ করেছেন। আত্মবিশ্বাস সম্পর্কে তিনি বলেছেনঃ আমরা তরুণদের এমনকি বৃদ্ধ ও বুদ্ধিজীবীদেরদের চিন্তায় এ বিশ্বাস বদ্ধমূল করে দিতে চাই যে, আমরা নিজেরা মানুষ,আমাদের উচিত নয় সকল জিনিসের জন্যেই অন্যদের কাছে হাত বাড়িয়ে দেওয়া। যদি আপনাদের এই আত্মবিশ্বাস থাকে যে আমরাও মানুষ এবং আমাদেরও চিন্তাশক্তি রয়েছে তাহলে সাফল্য অবশ্যম্ভাবী।" ইমামের এই বাস্তব আশাবাদ সবার জন্যে প্রেরণা ও উৎসাহ সঞ্চারী হয়ে উঠুক-এই প্রত্যাশায় শেষ করছি আজকের আলোচনা।

 

{jcomments on}

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন