এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 28 জানুয়ারী 2013 14:31

ইমাম খোমেনী (রহ.) এর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস

ইমাম খোমেনী (রহ.) এর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস

ফার্সি বাহমান মাস মোতাবেক জানুয়ারির শেষ এবং ফেব্রুয়ারির শুরু-এই সময়টা ইরানীদের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণটা হলো দূরদর্শী আলেমে দ্বীন ইসলামী শিক্ষার আলোকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন। ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় স্থাপন করতে নজিরবিহীন এক বিপ্লবী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ফার্সি ১৩৫৭ সালের এই বাহমান মাসের ১২তম দিন অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি ইরানের জনগণের সংগ্রামের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক একটি ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ঘটনাটি হলো ইমাম খোমেনী (রহ.) এই দিনটিতে নিজের দেশের পবিত্র ভূমিতে ফিরে আসেন। তাঁর এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের মাত্র কয়েকদিন পরেই ইসলামী বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।

 

ইরানের জনগণ নিজস্ব ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বিভিন্ন উপলক্ষ পালন করে থাকে। সে অনুযায়ী ফার্সি ১২ই বাহমান ১৯৭৯ সালে ১লা ফেব্রুয়ারি হলেও এই বছর ৩১শে জানুয়ারিতে পড়েছে দিনটি। ইমামের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সেই দিনটি কয়েকটি কারণে ইতিহাসে বিখ্যাত। চৌদ্দটি বছর স্বদেশের বাইরে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর ইমাম দেশে ফিরেছেন। কোনো নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে সেদেশের জনগণ এতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেওয়ার ঘটনা একেবারেই বিরল। মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ ইমামকে স্বাগত জানাতে ভিড় করেছিল তেহরান বিমানবন্দর থেকে বেহেশতে যাহরা পর্যন্ত। বেহেশতে যাহ্‌রা হলো ইরানের সবচেয়ে বড় গোরস্তান-যেখানে হাজার হাজার শহীদসহ শুয়ে আছেন অসংখ্য পূণ্যবান আল্লাহর বান্দা।

 

বিমান বন্দর থেকে বেহেশতে যাহরা পর্যন্ত প্রায় ৩৩ কিলোমিটার লম্বা রাস্তা জুড়ে ছিল লোকে লোকারণ্য। ৬০ লক্ষের মতো মানুষ সেদিন বিশাল এই পথ জুড়ে মানব বন্ধন তৈরি করেছিল। তাদের সবার হাতে হাতে ছিল ফুল। কতোটা ভালোবাসলে মানুষ এভাবে তাদের নেতাকে এক নজর দেখার জন্যে বেরিয়ে আসে রাস্তায়-একবার ভেবেই দেখুন। আন্তরিকতা, ভালোবাসা, জনতার মিছিল, মানব বন্ধন, ফুলের তোড়া ইত্যাদি সবদিক থেকেই এই স্বাগত সমাবেশ ছিল ঐতিহাসিক। জাঁকজমকপূর্ণ স্বাগত মিছিল হিসেবে ইমামের অভ্যর্থনা ইতিহাসে নিবন্ধিত হয়ে আছে। ইমাম যখন দেশে ফিরলেন তখনো কিন্তু দেশে শাহী শাসন চলছে। অথচ ইমামের আধ্যাত্মিক প্রভাব এতো বেশি জনতার অন্তরে বিস্তার করেছিল যে তারা কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করলো না, দলে দলে নেমে এলো রাজপথে। শাহের সেনাদের রক্তচক্ষুকে ভ্রুক্ষেপই করল না। এটা সত্যিই অবিস্মরণীয় একটা ইতিহাস।

 

প্রত্যেকটি বিপ্লবেরই একটা অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো নেতৃত্বের প্রধান ভূমিকা অর্থাৎ আন্দোলনের নেতাই আন্দোলনের দিক নির্দেশনা দেবেন, যদিও বিভিন্ন পর্বে তার ধরণ বিভিন্ন রকম। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনেও ইমাম খোমেনী (রহ.) এর ভূমিকাটা ছিল একেবারেই স্বতন্ত্র এবং অনন্য সাধারণ। তিনি ইসলামী বিপ্লবের বীজ রোপনের প্রাথমিক কাজটি করেছিলেন সেই কোমের ধর্মতত্ত্ব চর্চা কেন্দ্র থেকেই। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে, ছাত্রদের পাঠ দিয়ে পুরো দেশে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করেন। ইমামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন মোহনীয় সেইসব বক্তৃতা ক্যাসেটে বন্দী হয়ে মসজিদ, দ্বীনী মাদ্রাসা, হোসাইনিয়া এবং এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে প্রচারিত হয়ে পড়ে। ইমামের বক্তৃতার ক্যাসেট শুনে জনগণ ইমামের প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এবং এভাবেই ইরানের জনগণের সাথে ইমামের গভীর সম্পর্ক বা সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে। এভাবে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৪ বছর পর একটা পরিণতিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়। ইমামের ছবি সম্বলিত পোস্টার এবং প্লে-কার্ড হাতে ইরানের জনগণ দেশজুড়ে যখন বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল করে, কায়েমি স্বার্থবাদী শাহী মহলের তখন টনক নড়ে।

 

এভাবে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাহী শাসনের অবসান ঘটিয়ে তার জায়গায় ধর্ম ভিত্তিক জনগণের শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। এটা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা কারো কাছেই অস্পষ্ট নয়, সকল চিন্তাবিদের দৃষ্টিতেই এ বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেই গৃহীত। ইমাম খোমেনী (রহ.) এর নজিরবিহীন নেতৃত্বে ইরানে যে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল সেটা সামগ্রিক দিক থেকেই শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে ছিল অনন্য সাধারণ।  ইমাম ছিলেন একদিকে বড় আলেম অর্থাৎ ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলন এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার খুঁটিনাটি সম্পর্কেও সদা সচেতন, অন্যদিকে আল্লাহর একজন অলি হিসেবে আধ্যাত্মিকতার সুষমায় ছিলেন পরিপূর্ণ। সেইসাথে সমকালীন বিশ্ব রাজনীতি এবং ইতিহাসের ব্যাপারে ছিলেন যথেষ্ট জ্ঞানী এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন। ইসলামী গণশাসন ব্যবস্থার রূপরেখাটি তিনিই তাঁর চিন্তাদর্শের আলোকে তৈরি করেছিলেন।

 

ইরানের বিখ্যাত দার্শনিক অধ্যাপক মোতাহহারি বলেছেনঃ “আমি ইমাম খোমেনীর অস্তিত্বে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক লক্ষ্য করেছি যা আমার ইমান বা বিশ্বাসকে আরো দৃঢ়তরো করেছে। একটি হলো ‘লক্ষ্যের ওপর দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাস’। তার মানে হলো যদি সমগ্র পৃথিবীও একত্রিত হয় তবুও তাঁকে তাঁর লক্ষ্য থেকে এক বিন্দুও সরানো সম্ভব নয়। দ্বিতীয় দিকটি হলো ‘মানুষের প্রতি আস্থা’ অর্থাৎ মানুষের ভালোবাসা ও আন্তরিকতার প্রতি আস্থা রাখা। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো সর্বাবস্থায় ‘আল্লাহর ওপর ইমান এবং ভরসা রাখা।’ এ কারণেই ইসলামী গণশাসন ব্যবস্থার রূপকার হিসেবে বিশ্ব বিশেষ করে ইরানের ইতিহাসে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হয়েছেন।

 

গত শতকে সাইয়্যেদ জামালুদ্দিন আসাদাবাদী, সাইয়্যেদ কুতুব, হাসানুল বান্না এবং তাঁদের মতো আরো বহু নেতা চেষ্টা করেছেন মুসলমানদেরকে অলস নিদ্রা থেকে জাগিয়ে তুলতে। কিন্তু একথা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই যে এক্ষেত্রে প্রধান এবং কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন হযরত ইমাম খোমেনী (রহ.)। ইমাম খোমেনীর আদর্শ এবং বিপ্লবের যে প্রভাব বিশ্বব্যাপী পড়েছিল সেরকম আর কোনো নেতার আদর্শ ছড়িয়ে পড়ে নি। এজন্যে বিশ্বব্যাপী তিনি সমাদৃতি পেয়েছিলেন এবং গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছিলেন। তাঁর সঠিক নেতৃত্বের কারণেই বিপ্লব বিজয়ের ৩৪ বছর পরও শত্রুদের শত ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে আজো সেই বিপ্লব তাঁর বিজয়ের পতাকা সমুন্নত রাখতে পেরেছে।

 

পরিশেষে ইমাম খোমেনী (রহ.) এর নেতৃত্ব সম্পর্কে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর একটি বক্তব্য তুলে ধরব। তিনি বলেছেনঃ “যে সময় সকল রাজনৈতিক শক্তি দ্বীন, আধ্যাত্মিকতা এবং নৈতিক মূল্যবোধগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল, ইমাম খোমেনী তখন সেই দ্বীন, আধ্যাত্মিকতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতেই একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন এবং ইসলামী নীতিমালার আলোকে সরকার ও রাজনীতি পরিচালনা করেন।”

 

 

রেডিও তেহরান/এনএম/এআর/২৮

 

 

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন