এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 28 জানুয়ারী 2013 15:18

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের শ্রেষ্ঠত্বের কিছু দিক

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের শ্রেষ্ঠত্বের কিছু দিক

ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিশ্বের বিপ্লবগুলোর ইতিহাসে এক অনন্য বিপ্লব। একদল সমাজতাত্ত্বিক ও বিশ্লেষক প্রথম দিকে মনে করতেন এ বিপ্লব রুশ বা ফরাসি বিপ্লবের মতই একটি প্রচলিত ধারার বিপ্লব। ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল ১৭৮৯ সনে এবং রুশ বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল ১৯১৭ সালে। কিন্তু এ দু’টি বিপ্লবের জনসমর্থন ছিল সীমিত এবং সেই  সীমিত জনপ্রিয়তা ও গণ-সংশ্লিষ্টতাও বেশি দিন বজায় ছিল না। এ দুই বিপ্লবের লক্ষ্যগুলোও কখনও অর্জিত হয়নি। এ দুই বিপ্লবের সঙ্গে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের একটি বড় পার্থক্য হল, শেষোক্ত বিপ্লবের ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য।

 

অন্যদিকে রুশ বিপ্লব ছিল মার্কসবাদ ও লেনিনবাদ-ভিত্তিক। এ বিপ্লবের নেতারা ধর্মকে সমাজগুলোর জন্য আফিম-তুল্য ও অনগ্রসরতার বা পিছিয়ে পড়ার কারণ মনে করতেন। ফরাসি বিপ্লবের নেতারাও ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

 

এদিকে পাশ্চাত্যের কথিত উদারনৈতিকতাবাদ বা লিবারেলিজম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের কোনো কোনো দিকে সফল হলেও ইতিবাচক নৈতিক মূল্যবোধ এবং মানবীয় মূল্যবোধের প্রসারে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

ফলে পাশ্চাত্যে হতাশা ও মানসিক রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। আর এ নিয়ে পাশ্চাত্যের বহ চিন্তাবিদও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

 

বিশিষ্ট মার্কিন রাজনীতিবিদ ব্রেজনস্কি পাশ্চাত্যের কথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিপদ সম্পর্কে বলেছেন: "পাশ্চাত্যে লাগামহীন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের দাপট ভেতর থেকেই পশ্চিমা সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। যে বিষয়টি পরাশক্তি আমেরিকাকে ক্ষয়িষ্ণু করে তুলছে তা হল এই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ।" কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে তা হল,ইসলামী শিক্ষার দিকে ফিরে যাওয়া। এটাই এ বিপ্লবের প্রাণ। অন্য কথায় এ বিপ্লবের ইসলামী চরিত্র ও জনগণের অব্যাহত সমর্থনই ইরানের ইসলামী বিপ্লব টিকে থাকার প্রধান কারণ। ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে ইরানে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী বিপ্লব। আর এ বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (র.) ইরানকে উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে এগিয়ে নেয়ার পথ সুগম করেন এবং অতীতের ঐতিহাসিক অনগ্রসরতা পুষিয়ে দেয়ার  পথ খুলে দেন।  ইসলাম যে গণমুখী শাসন-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম ইরানের ইসলামী রাষ্ট্র তা স্পষ্ট করেছে।

 

এ প্রসঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী শিক্ষা বিষয়ের অধ্যাপক অধ্যাপক হামিদ আলগার লিখেছেন:  "ফরাসি ও রুশ বিপ্লবের সঙ্গে ইরানি বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হল, শেষোক্তটির ধর্মীয় পটভূমি বা শেকড়। ধর্মই ছিল ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রধান চালিকা-শক্তি। এ বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ বা ফুলকি উত্থিত হয়েছিল মসজিদ থেকে এবং শেষ পর্যন্ত তা ইসলামী বিপ্লবকে বিজয়ী করে।"   

 

ইরানের ইসলামী বিপ্লবে জনগণের অংশগ্রহণের মাত্রা ছিল অন্য যে কোনো বিপ্লবের চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক। ফরাসি বিপ্লবের পক্ষে জাগরণ মূলত প্যারিস অঞ্চলেই সীমিত ছিল। এ বিপ্লবের সমর্থকদের বেশির ভাগই ছিলেন অভিজাত ও বুর্জোয়া শ্রেণীর মানুষ।

 

রুশ বিপ্লবের সমর্থক-কর্মীরাও ছিলেন শ্রমিক, সেনা ও বলশেভিক দলের সদস্যরা। আর এ বিপ্লবের পক্ষে ততপরতা ছিল মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গ অঞ্চলে সীমিত। কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লবে সারা দেশের সব শ্রেণীর জনগণ অংশ নিয়েছে। অন্যদিকে ফরাসি, রুশ ও চীনা বিপ্লবে জনগণের অংশগ্রহণ এত ব্যাপক ছিল না, বরং  জনগণের অনৈক্যের কারণে এ বিপ্লবগুলো গৃহযুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করেছিল।

 

আইরিশ লেখক ফ্রেড হলিডে'র মতে, জনগণের বিপুল অংশকে আকৃষ্ট করার দিক থেকে ইরানের ইসলামী বিপ্লব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপ্লব।

 

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর পরই এ বিপ্লবের নেতারা রাষ্ট্রের নতুন কাঠামোর ব্যাপারে জনগণের মতামত চেয়েছেন। অন্যদিকে রুশ ও ফরাসি বিপ্লবের নেতারা জনগণের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করা সত্ত্বেও সরকারি পদে আসীন হওয়ার পর জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেয়ার পরিবর্তে নিজেদের ক্ষমতা স্থায়ী করার ও সম্পদ জমা করার কাজেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

 

ফরাসি বিপ্লবের মূল নেতারা শ্রেণী স্বার্থ রক্ষার কাজেই ব্যস্ত ছিলেন। পার্থিব স্বার্থ হাসিলই ছিল তাদের লক্ষ্য। তাই এ বিপ্লবের প্রধান নেতাদের কোনো পরিচিতি ছিল না। রুশ বিপ্লবের ক্ষেত্রেও ১৯১৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট নেতা ছিল না। এরপর যারা নেতা হন, সেইসব নেতা, যেমন, লেনিন, ট্রটস্কি, স্ট্যালিন, বুখারিন প্রমুখ নেতারা পরিচিতি অর্জন করলেও তাদের জন-সমর্থন ছিল না। জনগণ জানতোই না যে লেনিন কে।

 

কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেনী (র.) রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উভয় দিক থেকেই ছিলেন ইরানের বেশিরভাগ মানুষের নয়নমনি। তিনি ছিলেন একাধারে ইসলামী বিপ্লবের রূপকার, আদর্শিক দিক-নির্দেশক, স্থপতি, পরিচালক ও সংঘটক। লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন, আপোষহীন, নির্ভীক, দূরদর্শী এবং দৃঢ়-মনোবল বা আত্মবিশ্বাসের অধিকারী। প্রবল বাধা-বিপত্তি ও শত্রুতা ইসলামী বিপ্লবের নেতৃবৃন্দের গভীর ঈমান ও জনগণের প্রতি তাদের ভালবাসায় কোনো ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। 

 

বিশ্বের অন্য বিপ্লবগুলো ছিল মূলত অর্থনৈতিক লক্ষ্য-ভিত্তিক। ফরাসি বিপ্লব তৎকালীন রাজতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্যে সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু বিপ্লবীরা মাত্র তিন চার বছরের মধ্যে একটি চরমপন্থি গ্রুপের হাতে নির্মূল হয়। ১৭৮৯ সাল থেকে ১৮০০ সন অর্থাৎ মাত্র ১১-১২ বছরের মধ্যে তিনটি গ্রুপ একে একে ক্ষমতাসীন হয়। এই গ্রুপগুলো তাদের পূর্ববর্তী গ্রুপগুলোকে নির্মূল করেছিল। ফলে যে গণ-বিপ্লব বহু মানুষের ত্যাগ ও প্রাণের বিনিময়ে রাজতন্ত্রকে উৎখাত করেছিল সেই দেশটিতে পুনরায় রাজতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থা কায়েম হয়।  আসলে মহান ফরাসি বিপ্লব নিজ লক্ষ্যে অবিচল থাকার মত ও বিপ্লবকে জনগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত এবং অব্যাহত রাখার মত ক্ষমতার অধিকারী ছিল না।

 

লক্ষ্যচ্যুত আরেকটি বিপ্লবের দৃষ্টান্ত হল রুশ বিপ্লব। এ বিপ্লবের একটি আদর্শিক ভিত্তিও ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন হবে জনগণের শাসন-ভিত্তিক এবং এ রাষ্ট্র জনগণের চাহিদা পূরণে বাধ্য থাকবে, এ বিপ্লবের শুরুতে এমন দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯১৭ সালে সংঘটিত রুশ বিপ্লবের পাঁচ ছয় বছর পরই ভিন্ন পথে মোড় নেয় ওই বিপ্লব এবং সরকারের হিসেবে-নিকেশ থেকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রকৃত অর্থেই বাদ পড়ে।

 

কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ক্ষেত্রে এ ধরনের লক্ষ্যচ্যুতি বা বিচ্যুতি দেখা যায় না।  এ প্রসঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেছেন: ইসলাম-প্রেম, ন্যায়-কামীতা, সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা, দেশের স্বাধীনতা রক্ষা, মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং মজলুম মানুষের প্রতি সহায়তার কারণে এ বিপ্লব সঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসহ উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করাও ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম লক্ষ্য। আর এইসব লক্ষ্য অর্জনে ইরান ব্যাপক সাফল্য অর্জন করছে।

 

পাশ্চাত্যের কথিত গণতান্ত্রিক বা লিবারেল বিপ্লবগুলো ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে সামাজিক ন্যায়-বিচারকে বর্জন করেছে ফলে সেখানে বেড়েছে বৈষম্য। অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নামে বহু দেশে  চাপিয়ে দেয়া হয়েছে সহিংস একনায়কতন্ত্র ও কেড়ে নেয়া হয়েছে ব্যক্তি-স্বাধীনতা। অথচ ইরানের ইসলামী বিপ্লব ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও সামাজিক সুবিচারের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার কথা বলে। এভাবে বলা যায়, ইরানের ইসলামী বিপ্লব এর উদ্ভব ও বিকাশ, সংগ্রাম এবং লক্ষ্যের দিক থেকে বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করেছে।  #

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন