এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 30 জানুয়ারী 2013 11:56

জনগণের সচেতন উপস্থিতিই বিপ্লবের অগ্রযাত্রার প্রাণ

 জনগণের সচেতন উপস্থিতিই বিপ্লবের অগ্রযাত্রার প্রাণ

ইরানের জনগণ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে তাঁদের অধিকার প্রয়োগ ও অভিমত প্রকাশের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ রচনা করার পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারেও নিজেদের রায় ও দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করে থাকে। এটা এমন এক নাগরিক অধিকার যা প্রয়োগে করার মাধ্যমেই তারা ধর্মভিত্তিক জনগণের শাসন ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেছিল। বর্তমানেও দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অত্যাসন্ন। ইরানের জনগণ তাই একজন সৎ ও যোগ্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করার চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে বিপ্লব তার গতিতে এখনো এগিয়ে যাচ্ছে। বিপ্লবের আরো বিভিন্ন দিক নিয়ে এখানো আলোচনা করা হলো :

 

শাহী শাসনামলে ইরানে নিযুক্ত সর্বশেষ ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ছিলেন অ্যান্থনি পার্সন্স। তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেনঃ ‘পাহলভি সরকার প্রধান দু’টি শক্তিমূলের ওপর টিকে ছিল। একটি হলো তার সেনাবাহিনী আর অপরটি সাভাক নামের নিরাপত্তা বাহিনী।’ স্বৈরাচারী শাহের শাসনের পৃষ্ঠপোষক একটি দেশের প্রতিনিধি হিসেবে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত এই ডে স্বীকারোক্তি দিলেন, তা থেকেই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়ে যায় যে, শাহের আমলে জনগণের কোনো স্বাধীনতা তো ছিলই না, এমনকি দেশের কোনো ব্যাপারেই তাদের কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল না। শাহের হুকুমাতও জনগণের শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিলো না। আর এটাই ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনকে ইরানে তার চারাগাছ রোপণ করার সুযোগ এনে দেয়। যার ফলে ইসলামী সরকার ব্যবস্থার সাথে জনগণের আন্তরিকতা, একাত্মতা এবং সহযোগিতার জোয়ার সৃষ্টি হয়। শাহের ঐ ভ্রান্ত নীতি এবং দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই শেষ পর্যন্ত পাহলভি শাসনের পতন ঘটে।

 

ইসলামী বিপ্লবের জাঁকজমকপূর্ণ বিজয়ের দু’ মাসও অতিক্রান্ত হয় নি, অথচ ইরানের শতকরা ৯৮ ভাগ জনগণ দেশে অনুষ্ঠিত গণভোটে ইসলামী শাসনের পক্ষে ইতিবাচক রায় দিয়ে ইসলামী শাসন ব্যবস্থাকেই দেশ পরিচালনার জন্যে নির্বাচন করেছে। এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের গণভোটে উপস্থিতির ঘটনা যেমন ইরানের ইতিহাসে বিরল, তেমনি ইসলামী বিপ্লবের সূচনা থেকেই এভাবে জনগণ তাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ বা ভূমিকা রেখে এসেছে। ইতোপূর্বে বিশ্বব্যাপী যেসব বিপ্লবের ঘটনা ঘটেছে সেসব বিপ্লব থেকে ইরানের বিপ্লবের অনন্য ও স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যটিই ছিল বিপ্লব প্রক্রিয়ায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। বিপ্লবী আন্দোলনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইরানের সর্বস্তরের জনগণ নির্ভীকচিত্তে এগিয়ে এসেছে। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত অন্যত্র যেসব বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল সেসব বিপ্লবে অংশ গ্রহণ করেছিল নির্দিষ্ট দু’ একটি শ্রেণী বা গোষ্ঠির লোকজন। এরা ছিল সাধারণত শ্রমিক শ্রেণী, গ্রামীণ কৃষক শ্রেণী কিংবা বুজোর্য়া শ্রেণী (ফ্রান্সে)।

 

কিন্তু ইরানের বিপ্লবের ক্ষেত্রে এই চিত্রটি ঠিক উল্টো অর্থাৎ স্বৈরাচারী শাহের ঘনিষ্ঠ মহলের গুটিকয় লোকজন- যারা শাহের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের স্বার্থ উদ্ধারে লিপ্ত ছিল-তারা ছাড়া সমগ্র ইরানী জাতিই এক্যবদ্ধভাবে বিপ্লবী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কৃষিজীবী শ্রেণী, শ্রমিক শ্রেণী, শিল্প কল কারখানার কর্মচারী, সরকারী অফিস আদালতের কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ, শহর কিংবা গ্রামের ছাত্ররা সবাই দেশের সর্বত্র একসাথে অভ্যুত্থান করেছিল, আন্দোলন সংগ্রাম করেছিল। এভাবে যে চমৎকার বিষয়টি উঠে আসে তাহলো- সর্বস্তরের জনগণের মাঝে ঐক্যের বন্ধন গড়ে উঠলো। এই ঐক্য স্বৈরাচারী মনোভাব বিরোধী স্বাধীন ঐক্য, এ ঐক্য ধর্মীয় শক্তিশালী অনুভূতি আর মানসিকতার ঐক্য। যুগ যুগ ধরে ইরানের জনগণ ছিল বিচিত্র অত্যাচারে পিষ্ট। বিদেশীদের হস্তক্ষেপ আর আধিপত্যের চাপে অতীষ্ঠ। জাতীয় সম্পদ লুট করে নিয়ে যেত যেই ভিনদেশী দস্যুরা, তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল ইরানী জাতি। কেননা তাদের কোনো কথা বলার স্বাধীনতা ছিল না, ব্যাপক বৈষম্যের শিকার ছিল তারা। দেশের নীতি ছিল বিদেশীদের স্বার্থের অনুকূল। এইরকম পরিস্থিতির অবসান ঘটেছিল ইমামের নেতৃত্বে জনতার বিপ্লবী আন্দোলনের ফলে।                             

 

ইমাম খোমেনী (রহ) এর নেতৃত্বে ইসলামী যে আন্দোলন চলছিল সেই আন্দোলনের প্রতি জনগণ অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিল। এর একটা কারণ ছিল জনগণ বা চাইতো ইমামের আন্দোলনের লক্ষ্য উদ্দেশ্যের সাথে তা ছিল সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ কারণেই বিপ্লবী আন্দোলনের প্রতি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছিল যে কারণে বিজয় ত্বরান্বিত হয়েছিল। ইমামও জনগণের চাওয়া পাওয়াকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতেন এবং বিপ্লবী আন্দোলনকে জনগণেরই আন্দোলন বলে মনে করতেন। বিপ্লবের আগে এবং পরে সবসময়ই ইমাম জনগণের উপস্থিতি এবং ভূমিকাকে গুরুত্বের সাথে দেখতেন। তিনি জনগণকে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা এবং দায়িত্বশীলদের জন্যে শ্রেষ্ঠ নিয়ামত বলে মনে করতেন এবং সকল কর্মকর্তাকে জনগণের সেবায় নিয়েঅজিত হবার জন্যে আহ্বান জানাতেন। এ প্রসঙ্গে ইমামের গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণী এ রকমঃ “দেশের জনগণই এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছিল এবং এরপরেও জনগণই আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।” 

 

ইমাম খোমেনী (রহ) আরো বলেছেনঃ  জনগণ এই বিপ্লবকে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে সুরক্ষা করেছে এবং বিপ্লবকে সমুন্নত রাখতে জান প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করেছে। এর একটি প্রমাণ হলো ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দামের চাপিয়ে দেওয়া আট বছরের যুদ্ধে-যাকে পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ নামে অভিহিত করা হয়-ইরানের যুবক ও তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি।  ইরানের ইসলামী বিপ্লব সে সময় একেবারেই শ্বেতশুভ্র চারাগাছটির মতো। বিপ্লব কেবল শক্তি অর্জন করছিল। ঠিক সে সময় অর্থাৎ ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে ইরাকের বাথ পার্টির শত্রুদের অকস্মাৎ আক্রমণ শুরু হয়ে যায় বিপ্লব বিজয়ের নতুন ঐ উদ্ভিদটিকে ধ্বংস করে দেওয়ার লক্ষ্যে। মার্কিন নেতৃত্বে শত্রুরা বিচিত্র ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল বিপ্লবকে নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্যে। তারা ঐক্যবদ্ধভাবে বিপ্লবের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগে গিয়েছিল। সে সময় ইরানের হাতে তেমন কোনো অস্ত্র শস্ত্রও ছিল না। কিন্তু ইরানের জনগণ ছিল ইস্পাত কঠিন মনোবলের অধিকারী। সেইসাথে তারা ছিল অসম্ভব ইসলাম প্রিয় এবং দেশপ্রেমিক। এ কারণেই আট বছর ধরে যুদ্ধ করেও ইরানের এক ইঞ্চি মাটিও শত্রুরা দখল করতে পারেনি। যদিও শত্রুরা সবাই একত্রিত হয়ে ইরাকের সাদ্দামকে সর্বশক্তি দিয়ে সহায়তা করেছিল। সেইসব মহিয়সী ও বীরাঙ্গনা নারীদের স্মরণ না করে উপায় নেই যাঁরা নিজেদের সন্তানদেরকে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে নির্বিঘ্নে রণাঙ্গনে পাঠিয়ে দিতে কুণ্ঠা বোধ করেন নি। তাঁরা আশুরার দিন কারবালায় ইমাম হোসাইন (আ) এর পরিজনদের মধ্যকার নারীদের মতোই অকুতোভয়ে ধৈর্য ধরেছিলেন। ইমাম খোমেনী (রহ) এর মতো দূরদর্শী নেতৃত্ব আর জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন যদি সেদিন পাওয়া না যেত তাহলে বিপ্লবের নামটি ছাড়া আজ তার কিছুই অবশিষ্ট থাকতো না।

 

ইমাম খোমেনী (রহ) এর পর হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীও সঠিক এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব দিয়ে, জনসমর্থন নিয়ে বিপ্লবের সেই অগ্রযাত্রাকে আজো বেগবান রেখেছেন। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি বিচিত্র অবরোধ আরোপ করেও তাই শত্রুরা ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়নি। বরং এই বিপ্লবের প্রভাব সমগ্র মুসলিম বিশ্বকেই আলোড়িত করেছে, আন্দেলিত করেছে। #

 

রেডিও তেহরান/এনএম/এআর/৩০

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন