এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 02 ফেব্রুয়ারী 2013 18:24

ইসলামী বিপ্লব: শক্তিমত্তা ও নিরাপত্তার প্রতীক

তৎকালীন দুই মেরু কেন্দ্রীক বিশ্ব ব্যবস্থায় ‘প্রাচ্যও নয় - পাশ্চাত্যও নয়’ -এই নীতির ভিত্তিতেই ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়। ওই বিপ্লব গোটা বিশ্বে এমন এক কম্পনের সৃষ্টি করে, যা মধ্যপ্রাচ্যও পারস্য উপসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব হিসাব-নিকাশকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। একারণে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা সর্বশক্তি দিয়ে ওঠে পড়ে লাগে। ইরানের রাজধানী তেহরানে ‘গুপ্তচরদের আখড়া’ হিসেবে খ্যাত তৎকালীন মার্কিন দূতাবাসের ওপর বিপ্লবী ছাত্ররা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার পর ওয়াশিংটনের বিদ্বেষী তৎপরতা প্রকাশ্য রূপ লাভ করে। অবরোধসহ নানা ধরনের চাপ বাড়ানো হয় এবং ইরাকের তৎকালীন শাসক সাদ্দামের মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়। চাপিয়ে দেয়া ৮ বছরের ওই যুদ্ধে সাদ্দামকে সর্বাত্বক সহযোগিতা দেয় আমেরিকা।

 

ওই যুদ্ধে ইরান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নিজের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থানে অটল থাকে। পাশাপাশি ইরান ওই যুদ্ধের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শত্রুদের বিরুদ্ধে অভেদ্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছে। পাশাপাশি ইরান প্রকৃত শত্রু ও মিত্রকে চিনতে সক্ষম হয়েছে। ইসলামী দেশ ইরান প্রথম থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল এবং এখনও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলোর সব অপততপরতার প্রতিবাদ জান্নাচ্ছে তেহরান। পাশাপাশি নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টাও চলছে একই গতিতে। অর্থনীতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও শিল্প ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের সর্বাত্মক অবরোধ সত্ত্বেও ইরান প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। প্রতিরক্ষা শিল্পে চোখ ধাঁধানো উন্নয়ন করেছে তেহরান।

 

বিশ্বের তেল ও গ্যাস সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষকরে পারস্য উপসাগরীয় এলাকা অন্যতম। আমেরিকাসহ বিজাতীয় শক্তিগুলো বিশ্বের জ্বালানির উতসগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণের জন্য সব সময় মরিয়া ছিল এবং সব সময় তারা এ চেষ্টা চালিয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটেন তেল ও গ্যাস সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর ওপর আধিপত্য পাকাপোক্ত করার চেষ্টা শুরু করে এবং পরবর্তীতে ব্রিটেনের পাশাপাশি আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া ও চীন  ওই আধিপত্যকামী ততপরতায় যোগ দেয়। এ লক্ষ্যে তারা তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোতে গণভিত্তিহীন ও দুর্বল সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালায়। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষকরে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে দৃষ্টি দিলে এ বাস্তবতা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাশ্চাত্য তাদের অশুভ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য আঞ্চলিক বিরোধ উস্কে দেয়ার নীতিও বাস্তবায়ন করছে। গণভিত্তিহীন সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলে ওই সব দেশের জাতীয় সম্পদ হরণ করছে তারা।

 

তেল ও গ্যাস সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে আমেরিকা পারস্য উপসাগরেযুদ্ধ জাহাজ মোতায়েন করে রেখেছে। তারা বলছে, পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই তারা সামরিক সরঞ্জাম ও সৈন্য মোতায়েন করেছে। এ জন্য তারা এ অঞ্চলে কৃত্রিম সংকটও সৃষ্টি করছে।  আমেরিকা আন্তর্জাতিক আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে আসলে পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তাকে হুমকিগ্রস্ত করছে। এ অবস্থায় ইরান নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গোটা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা ঘোষণা করেছে। ইরানের এ ঘোষণায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে আমেরিকাসহ গোটা পাশ্চাত্য। ইরান নানা অবরোধ ও চাপ সত্ত্বেও নিজের প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়িয়েছে। ইরান বলছে, তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা মুসলিম বিশ্বেরই শক্তি। বাস্তবতা হলো, ইরানের স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনী এখন শত্রুদের জন্য বড় আতঙ্ক।

 

ইরান শত্রুদের আগ্রাসন মোকাবেলায় প্রতিরক্ষাসহ সব ক্ষেত্রেই স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য কাজ করছে।এরই মধ্যে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হয়ে ওঠেছে। বর্তমানে ইরানের অভ্যন্তরেই সব প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি হচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্র, জঙ্গী বিমান, হেলিকপ্টার, ড্রোন, যুদ্ধ জাহাজ, সাবমেরিন,  কামান, রকেট লাঞ্চার, টর্পেডোসহ সব সামরিক সরঞ্জাম গণহারে বানানো হচ্ছে। বিমান ও রাডার ব্যবস্থার খুচরা যন্ত্রাংশের জন্যেও অন্য দেশের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। সামরিক সরঞ্জাম তৈরি ছাড়াও পুরণো মডেলের যুদ্ধাস্ত্র মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের ক্ষেত্রেও ইরানি বিজ্ঞানীদের সাফল্য উল্লেখ করার মতো। ইলেকট্রনিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে এরইমধ্যে সাফল্যের নিদর্শন রেখেছে। ইরানের ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ইউনিট এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি মার্কিন ড্রোন আটক করেছে। এরমধ্য দিয়ে ইলেকট্রনিক যুদ্ধে ইরানের শক্তি-সামর্থ্য ফুটে ওঠেছে। এর ফলে ইরান এখন শত্রুর যে কোনো আগ্রাসনের মোকাবেলায় পূর্ণ প্রস্তুত ও আত্মবিশ্বাসী।

 

এধরনের আত্মবিশ্বাসের ভিত্তিতেই ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আহমাদ ওয়াহিদি মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে যৌথ সামরিক বাহিনী গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন, বিশ্বের যেকোনো জায়গায় নিপীড়িত মানুষের অধিকার রক্ষায় যৌথ এবাহিনী কাজ করবে। ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, "মুসলমানদের অবশ্যই তৃতীয় শ্রেণীর শক্তি হওয়া উচিত নয়। মুসলমানদের উন্নতমানের সামরিক শক্তিতে পরিণত হওয়া উচিত যাতে কোনো আগ্রাসী শক্তি মুসলিম দেশগুলোতে হস্তক্ষেপ করার সাহস না পায়।" যেসব শক্তি মুসলিম দেশগুলোকে পেছনে রাখতে চায়, মুসলমানদের মধ্যকার ঐক্য সেসব শত্রু দেশকে হতাশ করবে বলেও উল্লেখ করেন জেনারেল ওয়াহিদি। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্য মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে শেয়ার করতে ইরান প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি ঘোষণা করেন।

 

ইরানের উন্নয়ন ও অগ্রগতি রুখে দিতে শত্রুরা ইসলামী বিপ্লবের প্রথম থেকেই দেশটির বিজ্ঞানীদের হত্যার মতো নানা ঘৃণ্য পন্থা অনুসরণ করছে।  পাশাপাশি অবরোধ কঠোর থেকে কঠোরতর করে চলেছে। কিন্তু ইরানের ইসলামী সরকার ও জনগণের ঈমানী শক্তি ও দৃঢ় মনোবল দেশটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করছে। ইরান নিজের ভূমি, আকাশ ও পানি সীমায় পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। পাশাপাশি আতঙ্কগ্রস্ত শত্রুদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই।  এসব ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও ইরান সব ক্ষেত্রেই ব্যাপক উন্নতি লাভ করছে, বিপ্লবের আগে যা ছিল কল্পনাতীত।

 

রাজনৈতিক অঙ্গনেও ইরানের অগ্রগতি লক্ষণীয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দৃঢ়তার সঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ বক্তব্য রেখে চলেছে তেহরান। কাঁপিয়ে দিচ্ছে ইহুদিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীসহ জুলুমবাজদের ভীত।

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়িও এ সম্পর্কে বলেছেন, ইরানি জাতি বিশেষ করে তরুণ সমাজ ও সশস্ত্র বাহিনী ইসলামী ইরানকে রক্ষায় প্রস্তুত রয়েছে এবং তারা অতীতের চেয়ে আরো বেশি শক্তি অর্জন করেছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জনগণ ও সশস্ত্র বাহনীর দৃঢ় মনোবল ও প্রস্তুতি শত্রুদের মনে এমন ভীতির সঞ্চার করেছে যে,তারা ইরানের ওপর হামলার কথা ভাবতেও পারে না।

 

এসব বিষয় থেকে এখন এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ইরান ভবিষ্যতেও শত্রুদের সব ষড়যন্ত্র নস্যাত করে উন্নয়নের পথে যাত্রা অব্যাহত রাখবে এবং সব ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হবে।#

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন