এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 ফেব্রুয়ারী 2013 18:25

এক মহান বিপ্লবের অবিশ্বাস্য কিছু সাফল্য

এক মহান বিপ্লবের অবিশ্বাস্য কিছু সাফল্য এক মহান বিপ্লবের অবিশ্বাস্য কিছু সাফল্য

ইরানের ইসলামী বিপ্লব আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নানা সমীকরণ বা হিসেব -নিকেশ পাল্টে দিয়েছে।  কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের খ্যাতি যে কেবল এ জন্যই তা নয়। বিপ্লবের পর ইসলামী ইরান গত ৩৪ বছরে সামগ্রীক উন্নয়ন ও নিরাপত্তা খাতেও হয়ে উঠেছে জাতিগুলোর জন্য উদীয়মান আদর্শ।  নির্যাতিত জাতিগুলোর জন্য এ বিপ্লবী দেশটি হয়ে উঠেছে মুক্তিকামী গণ-জাগরণের আদর্শ। ঘরোয়া ক্ষেত্রেও এই বিপ্লব ও ইসলামী সরকার-ব্যবস্থা ইরানি জাতির জন্য খুলে দিয়েছে সেবা ও উন্নয়নের বহুমুখী দিগন্ত। এইসব সাফল্য অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মত নানা সুপরিসর খাতে বিস্তৃত হয়েছে। অথচ ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার মত প্রধান জাতীয় খাতগুলোসহ সাধারণ অনেক খাতও ছিল  পাশ্চাত্যের ওপর এবং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। আর সে সময় ইরানের কোনো খাতের ওপরই কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা ছিল না।

 

 

ইসলামী বিপ্লব ইরানের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন উপহার দিয়েছে তা হল আড়াই হাজার বছরের পুরনো রাজতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থার অবসান। এ বিপ্লবের ফলে ইরানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গণমুখী ও জনগণের অংশগ্রহণ-ভিত্তিক ইসলামী শাসন ব্যবস্থা। ইসলামী বিপ্লবের আগ পর্যন্ত পশ্চিমা শাসন-ব্যবস্থা ও লিবারেল রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণাই ছিল বিশ্বে প্রচলিত গণতন্ত্রের একমাত্র  আদর্শ।  পশ্চিমা সরকারগুলো রাজনীতি ও ধর্মের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা-ভিত্তিক এই আদর্শকেই জাতিগুলোর ওপর তাদের নব্য বা পুরনো উপনিবেশ টিকিয়ে রাখার এবং শোষণ জিইয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এভাবে পশ্চিমা পুঁজিবাদীরা গণতন্ত্রের মোড়কেই তাদের উপনিবেশ ও শোষণকে বৈধতা  দিয়ে আসছে।

 

 

অথচ খোদায়ী ধর্মগুলোর মূল লক্ষ্যই হল একত্ববাদ ও আল্লাহর ইবাদতের ভিত্তিতে মানব-জাতির সার্বিক বিকাশ বা উন্নয়ন ঘটানো এবং কুফর ও শির্কের মত নানা পাপাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা।

 

 

আসলে বঞ্চিত ও মজলুম জনগণের সহায়-সম্পদ লুটপাটের লক্ষ্যেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো ধর্মনিরপেক্ষ শাসন-ব্যবস্থা চালু করেছে। তারা ধর্মীয় শিক্ষা থেকে বহু মানুষকে দূরে রেখে মুসলিম দেশগুলোর চিন্তাগত, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও জাতীয় নানা ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লব ও ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে বিচ্ছিন্নতার ধারণাকে ভুল বলে প্রমাণিত করেছে ও এ নীতিকে কার্যক্ষেত্রে ব্যর্থ করে দিয়েছে। এই মহান বিপ্লব ইসলামী আন্দোলনকে একটি সুশৃঙ্খল  বিশ্ব-আন্দোলনে রূপান্তরিত করেছে।

 

মরহুম ইমাম খোমেনী (র.) ইরানের জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করেছিলেন। তাদের প্রতি ইমামের ছিল গভীর আস্থা। আর এ জন্যই তিনি জনগণকে তাদের পছন্দের শাসন-ব্যবস্থা বেছে নেয়ার সুযোগ তথা নির্বাচনের অধিকার দিয়েছিলেন। আর ইরানের জনগণ গণভোটের মাধ্যমে ইসলামী শাসন-ব্যবস্থাকেই তাদের পছন্দের শাসন-ব্যবস্থা বলে রায় দেন। ইসলামী বিপ্লবের পর মাত্র দুই মাস অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। 

 

 

একই বছরে অনুষ্ঠিত হয় ইরানের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর এটাও বিপ্লবের আরেকটি বড় সাফল্য। এর পর থেকে ইরানে প্রায় প্রতি বছরই অনুষ্ঠিত হচ্ছে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচন। এইসব নির্বাচনে দেশটির বেশির ভাগ নাগরিক অংশ নিচ্ছেন এবং আগামী জুন মাসে অনুষ্ঠিত হবে ১১ তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রতি চার বছর পর পর ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

 

 

ইরানের ইসলামী বিপ্লব মূলত একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব। দেশটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে গভীর পরিবর্তন সূচিত হওয়ায় অন্য অনেক খাতে অর্জিত হয়েছে বড় ধরনের সাফল্য।

 

নব্য-উপনিবেশবাদীরা অনুন্নত করে রাখা জাতি বা দেশগুলোর সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য এইসব দেশগুলোর ওপর সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিয়েছে। এই সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের অন্যতম পন্থা হল, মুসলমানদেরকে তাদের মূল সংস্কৃতি তথা ইসলামী সংস্কৃতি থেকে দূরে রাখা। এ প্রসঙ্গে মরহুম ইমাম খোমেনী (র.) বলেছেন, অনুন্নত করে রাখা জাতিগুলোসহ মুসলিম জাতিগুলোর একটি শ্রেণীর কাছে পাশ্চাত্য এত জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে ধরা দিয়েছে যে মনে হয় যেন তাদের কাছে পাশ্চাত্য ছাড়া অন্য সব কিছুই অস্তিত্বহীন। আর চিন্তাগত এই দাসত্বই ইরানি জাতিসহ এই জাতিগুলোর বেশিরভাগ দুর্দশার মূল কারণ। 

 

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর ইসলামী সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও নানা গণমাধ্যম, যেমন- রেডিও-টিভি, পত্র-পত্রিকা, চলচ্চিত্র, থিয়েটার—এই সবই এখন ইসলামী সমাজের সাংস্কৃতিক উন্নয়নের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে। বিপ্লবত্তোর ইরানে গড়ে উঠেছে গণ-শিক্ষা কর্মসূচি। উচ্চতর ও মাধ্যমিক শিক্ষা খাতেও ঘটেছে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি। গণ-শিক্ষা কর্মসূচির সুবাদে ইসলামী ইরানে এখন কেউই অশিক্ষিত বা অক্ষর-জ্ঞানহীন নয়। হাজার হাজার হাইস্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছড়িয়ে দিচ্ছে সাধারণ শিক্ষাসহ উচ্চতর শিক্ষার আলো। বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ ইরানি ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছেন। প্রতি বছর দশ লাখেরও বেশি ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে প্রবেশ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করতে ইচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আসন সংখ্যা সমান হয়ে পড়ায় ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থাও উঠিয়ে দেয়ার চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। এরিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি বিভাগে পরীক্ষা ছাড়াই ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করার পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।

 

 

ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানের জাতীয় আয়ের প্রধান ও একমাত্র উতসটি ছিল জ্বালানী তেল। ফলে দেশটির অর্থনীতি ছিল বেশ দুর্বল। বিপ্লব-পূর্ব ইরানের শিল্প-কারখানাগুলো ছিল স্রেফ সংযোজনের শিল্প। আর এইসব কারখানাও ছিল পশ্চিমা শিল্প ও  পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরশীল। কৃষিখাতেও উতপাদন ছিল খুবই নগণ্য বা সামান্য। ফলে গ্রাম অঞ্চলের নাগরিকরা ব্যাপক হারে শহরে চলে আসছিল। তেহরানের মত বড় বড় শহরগুলোর আশপাশে গড়ে উঠেছিল দরিদ্র পল্লী বা বস্তি।

 

বর্তমানে বেশ কয়েকটি জরুরি শস্য উতপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে ইরান। ইসলামী বিপ্লবের পর দেশটিতে কৃষি জমির পরিমাণও যেমন বেড়েছে সেই সঙ্গে বেড়েছে উতপাদনও। অর্থাত এক হেক্টর জমিতে আগে যে ফসল উতপাদিত হত এখন সেই জমিতে উতপাদিত হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি ফসল। দেশটি এখন এক কোটি ৪০ লাখ টনেরও বেশি গম উতপাদন করে গম খাতে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। এ ছাড়াও ইরান এখন কয়েকটি শস্য ও ফল উতপাদনে বিশ্বের দশটি শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় রয়েছে।

 

ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের তেল শিল্পেও ঘটেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। তেল শোধন ও উত্তোলনসহ এ শিল্পের সব বিভাগ এখন ইরানি বিশেষজ্ঞরাই পরিচালনা করেন। অথচ বিপ্লবের আগে এই শিল্প ছিল পুরোপুরি পাশ্চাত্যের ওপর নির্ভরশীল। গত তিন দশকে ইরানি বিশেষজ্ঞদের প্রচেষ্টায় ৫০ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেলের নতুন রিজার্ভ ইরানের জ্বালানী তেলের রিজার্ভে যুক্ত হয়েছে। ইরান এখন তেলের রিজার্ভ বা মজুদের দিক থেকে বিশ্বের ৫ টি শীর্ষ দেশের তালিকায় রয়েছে। গ্যাস উত্তোলন ও ব্যবহারের দিক থেকেও ইরানে ঘটেছে ব্যাপক অগ্রগতি। ইরানের ৯০ শতাংশ মানুষের ঘরে এখন গ্যাসের লাইন বা সংযোগ রয়েছে। ফলে আবাসিক ঘর-বাড়ীগুলোতেও শীত-তাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ বিপ্লবের আগে কেবল বড় বড় শহরের অংশ বিশেষে গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল। 

 

ইরান তার জ্বালানী তেলের মজুদ দীর্ঘদিন ধরে রাখতে ও এই সম্পদকে ভবিষ্যতেও ব্যবহারের জন্য গড়ে তুলেছে পেট্রো-কেমিক্যাল শিল্প। বর্তমানে পেট্রোকেমিক্যাল নানা পণ্য রপ্তানি করে ইরান বছরে আয় করছে ২০০০ কোটি ডলার।

 

 

পাশ্চাত্যের সার্বিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অত্যাধুনিক সামরিক শিল্পসহ উন্নত শিল্প প্রযুক্তি খাতে ইরানের অগ্রগতি অপেক্ষাকৃত বেশি অবিশ্বাস্য। ইরান এখন বিদ্যুত উতপাদন  ও ওষুধ তৈরিসহ শান্তিপূর্ণ  নানা কাজে ব্যবহারের জন্য নিজেই  ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে। পরমাণু জ্বালানী উতপাদন চক্র গড়ে তোলার কাজও পুরোপুরি আয়ত্ত করেছেন ইরানের বিজ্ঞানীরা। বিশ্বের হাতে গোনা অল্প কয়েকটি দেশ এই প্রযুক্তির অধিকারী। এ ছাড়াও মহাকাশ গবেষণা, ক্লোনিং, স্টেম-সেল  বা মৌলিক কোষ বিভাজন, এইডসের মত দুরারোগ্য নানা রোগের ওষুধ আবিষ্কার এবং ন্যানো প্রযুক্তি খাতে ইরানের সাফল্য পাশ্চাত্যকে হতবাক করে দিয়েছে। ইরান মহাকাশে বেশ কয়েকটি কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়েছে। সম্প্রতি দেশটি মহাকাশে বানর পাঠিয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে মানুষ পাঠাবে বলেও দৃঢ় আশাবাদী।

 

আর এসব সাফল্যই হল ইসলামী বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট কল্যাণকর নানা ব্যবস্থার সুফল।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন