এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 18 ফেব্রুয়ারী 2013 16:15

ইরানের ইসলামী বিপ্লব : বিশ্ব-বিপ্লবের পথিকৃৎ

ইরানের ইসলামী বিপ্লব : বিশ্ব-বিপ্লবের পথিকৃৎ

মার্কিন সরকারসহ পাশ্চাত্যের অনেক সরকার ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে পাশ্চাত্যের জন্য এক ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প বলে উল্লেখ করেছেন। এ বিপ্লবের ফলে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের মত স্পর্শকাতর অঞ্চলে তার অন্যতম প্রধান মিত্রকে চিরতরে হাতছাড়া করে। বিস্ফোরণ তুল্য এই বিপ্লব মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সরকারের অনুগত ও সেবাদাস সরকারগুলোকে নড়বড়ে এবং আতঙ্কিত করে তোলে।


ইসলামের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মূল বাণী হওয়ায় এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে তৃতীয় ও মুসলিম বিশ্বের নানা অঞ্চলে। ফলে এইসব দেশে শুরু হয়েছে ইসলামী জাগরণ।
ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পাশাপাশি নিকারাগুয়ায় মার্কিন পন্থী সেবাদাস সরকারেরও পতন ঘটে। ইরাকে ইসলামী জাগরণকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসানো হয় সাদ্দামকে। ফিলিস্তিনি ও লেবাননের জনগণ ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ে সবচেয়ে বেশি আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করেছিল। ফলে দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে লেবাননি ও ফিলিস্তিনি জনগণের জিহাদ শানিত হয়ে ওঠে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে মিশর, তিউনিশিয়া, আলজেরিয়া, সুদান, সৌদি আরব ও তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনগুলো আবারও চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

 


দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বিশ্ব ছিল মূলত দুই প্রধান পরাশক্তির নেতৃত্বাধীন। ন্যাটো এবং ওয়ার-'শ নামের দুই জোট বিশ্বকে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য নামের দুই শিবিরে বিভক্ত করে রেখেছিল। এ দুই বলয়ের বাইরে থেকে তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশে বা কোনো অঞ্চলে পরিবর্তন আনা ছিল অকল্পনীয় বিষয়। কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লব " প্রাচ্যও নয়, পাশ্চাত্যও নয়- ইসলামই শ্রেষ্ঠ", এই শ্লোগান  দিয়ে বিজয় অর্জন করে। অথচ এই ইরানকে পাশ্চাত্য ও  মার্কিন সরকার তাদের কর্তৃত্বাধীন অতি নিরাপদ অঞ্চল ও শান্তির দ্বীপ বলে আখ্যায়িত করেছিল।

 


মরহুম ইমাম খোমেনী (র.)'র নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন সরাসরি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হয় এবং মার্কিন সরকারের ওপর অনেক ক্ষেত্রেই বিজয়ী হয়।
ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের ফলে কমিউনিস্টদের এই দাবি অসার হয়ে পড়ে যে তারা সাম্রাজ্যবাদের বিরোধী। বরং ইসলাম যে জাতিগুলোর সংগ্রামের এক সুপরিসর ও গতিশীল শক্তি তা বিশ্বব্যাপী আলোচিত হতে থাকে ইরানের এই বিপ্লবের পর।  


 
স্বৈরশাসক শাহের পতন ছিল ইসলামের অলৌকিক শক্তিরই প্রকাশ। কারণ, গোটা পাশ্চাত্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার স্থানীয় দোসররা ছিল শাহের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তারা শাহের শাসন রক্ষার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা, জুলুম-নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল।


মরহুম ইমাম খোমেনী বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়ার সময় যেসব উচ্চতর  লক্ষ্যের কথা বলতেন এবং আল্লাহর ওয়াদা বাস্তবায়নের যে দৃঢ় আশাবাদ বা গভীর বিশ্বাসের কথা তুলে ধরতেন তা যে বাস্তবায়িত হবে শাহের শাসনের শেষের দিকেও পশ্চিমা বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের কাছে তা অকল্পনীয় বা পুরোপুরি অসম্ভব বলে মনে হত।  কিন্তু ১৯৭৯ সালের ১১ ই ফেব্রুয়ারি বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে আধুনিক যুগের প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার রক্তিম সূর্য উদিত হয় ইরানে।


ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে যে কেবল ইঙ্গ-মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্যই শত্রুতা শুরু করেছিল তা নয়, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন শক্তিগুলোও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ইসলামের পুনরুত্থানকে সহ্য করতে পারছিল না।


গুপ্তচরবৃত্তির আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত  তেহরানস্থ মার্কিন  দূতাবাস থেকে উদ্ধার করা গোপন দলিলই এর প্রমাণ। ওই দলিলে দেখা গেছে ইরানের ডান ও বামপন্থীরা ইসলামী বিপ্লবকে বানচাল করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।


 এ ছাড়াও ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দামের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের সময়ও প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সব শক্তি এবং তাদের স্থানীয় সেবাদাস সরকারগুলো ইসলামী ইরানের বিরুদ্ধেই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে। উভয় শিবিরই সাদ্দামকে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছে।


 কিন্তু ইমাম খোমেনী (র.)'র সতর্ক ও দূরদর্শী নেতৃত্ব ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সব ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেছে। এর কারণ, তিনি ইসলামী নীতিমালার ওপর নির্ভর করেছিলেন এবং মহান আল্লাহর ওপরই ভরসা করতেন। আর এ জন্যই বর্তমান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, এই বিপ্লবকে খোমেনী (র.)'র নাম ছাড়া বিশ্বের কোথাও পরিচিত করা যাবে না।


 
বিশ্বব্যাপী ইসলামের প্রকৃত বাণীকে ছড়িয়ে দেয়া ইরানের ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।   ইসলামী সংস্কৃতির বিস্তার ও মুসলমানদের সম্মান বৃদ্ধিও এ বিপ্লবের অন্যতম বড় টার্গেট। বিশ্বব্যাপী জাতিগুলোর জন্য  স্বাধীনতা, মুক্তি এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আরো কিছু মহান লক্ষ্যের অংশ। এ বিপ্লব দেশে দেশে মজলুমের পক্ষে ও জালিমের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নেয়ায় তা বিপ্লবীদের রক্তে আলোড়ন তুলেছে এবং দেশে দেশে  ইসলামী গণ-জাগরণের জোয়ার সৃষ্টি করেছে।   বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইসলামী গণ-জাগরণ এ বিপ্লবেরই সুদূরপ্রসারী প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করছে। এ বিপ্লবের ফলেই দেশে দেশে মুসলমানরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে।

 


ফিলিস্তিনিদের ইন্তিফাদা এবং লেবাননের জাগরণও ইসলামী বিপ্লবের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করছে। যে ইসরাইল ছিল মধ্যপ্রাচ্যে অপরাজেয় শক্তি সেই ইসরাইল লেবাননে তেত্রিশ দিনের যুদ্ধে এবং গাজায় ২২ ও ৮ দিনের যুদ্ধে লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হয়েছে। আর এসবই ইসলামী বিপ্লবের সুদূরপ্রসারী প্রভাবের দৃষ্টান্ত।


 
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আদর্শ ও মূল্যবোধগুলো আজো জীবন্ত। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর জুলুম, শোষণ ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ইসলামী ইরানের সংগ্রাম এখনও অব্যাহত রয়েছে। আর এ জন্যই এ অশুভ শক্তিগুলো ইরানের সার্বিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য নানা অজুহাতে চাপিয়ে দিচ্ছে বহুমুখী নিষেধাজ্ঞা। ইরানের ইসলামী বিপ্লব যাতে অন্য দেশগুলোর জন্য স্থায়ী আদর্শে পরিণত না হয় সে জন্য শয়তানের দোসর এই শক্তিগুলো আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু গত ৩৪ বছরে ইরানি জাতির দৃঢ় ঈমান, প্রতিরোধ ও ইস্পাত-কঠিন ঐক্য এবং ময়দানে জনগণের সক্রিয় ও সচেতন উপস্থিতি শয়তানের বন্ধুদের এইসব ষড়যন্ত্রকে বুমেরাং করে দিচ্ছে। পরমাণু, চিকিৎসা ও মহাকাশ গবেষণাসহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নানা খাতে এবং অর্থনীতি, বাণিজ্য ও  সামরিক খাতের মত নানা গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে ইরানের একের পর এক বিস্ময়কর নানা অগ্রগতিই এর প্রমাণ।


ইরানের বিপ্লবী জনগণ যেন এ বাক্যেরই প্রতিচ্ছবি-
আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান মোরা সে মুসলমান- /কিংবা ধর্মের পথে শহীদ যাহারা আমরা সেই সে জাতি/ সাম্য মৈত্রী এনেছি আমরা বিশ্বে করেছি জ্ঞাতি/ আমরা সেই সে জাতি / বাজনা (হাফিজ, রুমি ফেরদৌসির দেশ ইরান, আয়াতুল্লাহর দেশ ইরান ইসলামী ইনকিলাবের দেশ ইরান... )#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন