এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 30 জানুয়ারী 2014 12:12

ইরানের ইসলামী বিপ্লব: ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য

অনেকের মনেই আজও একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, আর তাহলো ইরানের ইসলামী বিপ্লবী নেতৃত্বের বৈশিষ্টগুলো কী ছিল? বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ.) কোন কোন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিশ্বের শয়তানী শক্তিকে পরাস্ত করে ইসলামী বিপ্লব সফল করতে সক্ষম হয়েছিলেন? এখানে এসব বিষয়েই বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

 

ইরান তখন ইতিহাসের কঠিনতম সময় অতিবাহিত করছিল। বাস্তবিক অর্থে এ দেশে তখন মানবাধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা বলে কিছুই ছিল না। রাজতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে ‘টু’ শব্দটি পর্যন্ত করার সাহস ছিল না কারো। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এমনি একটি জাতির মুক্তির দূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন হযরত ইমাম খোমেনী (রহ.)। তারই নেতৃত্বে পতন ঘটে আড়াই হাজার বছরের রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের। ইমাম খোমেনী (রহ.)’র আন্দোলনের প্রভাব কেবল ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই বরং তা গোটা বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার ভিতকে নাড়া দিয়েছে। ইমাম খোমেনী (রহ.)-র মতো দৃঢ়চেতা নেতা ছিলেন বলেই পাশ্চাত্য-সমর্থিত প্রচণ্ড শক্তিধর স্বৈরসরকারকে উতখাত করা সম্ভব হয়েছিল। ইরানে ইমাম খোমেনী (রহ.)’র উপস্থিতিটাই ছিল রাজতান্ত্রিক সরকারের জন্য একটা বড় আতঙ্ক। এ কারণে তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। দীর্ঘ ১৫ বছরের নির্বাসন শেষে ইমাম খোমেনী (রহ.) যেদিন দেশে ফেরেন, তার ১০ দিন পরই ঘটে মহান ইসলামী বিপ্লব।

 

ইমাম খোমেনী (রহ.) প্রধান দু’টি লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইসলামী বিপ্লব সফল করেন এবং দেশে ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। এর একটি হলো- ইসলামভিত্তিক আদর্শ সমাজ গঠন। আর অপরটি হলো- আল্লাহতায়ালা মানুষকে পৃথিবীতে নিজের প্রতিনিধি বলে যে ঘোষণা দিয়েছেন, সেই মর্যাদায় উত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা। ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব না হলে এ দু’টি লক্ষ্য সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ইসলাম ধর্মমতে, একজন নেতা হবেন ধর্মবিশেষজ্ঞ ও দূরদর্শী। যে কোন সমাজের জন্যই সব কিছুর আগে একজন সুযোগ্য নেতা জরুরি। ইমাম খোমেনী (রহ.) ছিলেন তেমনি একজন নেতা, যিনি কেবল আল্লাহর ওপর নির্ভর করতেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই ছিল তার সব কাজের প্রধান উদ্দেশ্য। তিনি ছিলেন ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে। দুনিয়া, আখিরাত, মানুষ এবং সৃষ্টির লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের বিষয়ে ঐশী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিলেন এই মহান নেতা। তিনি মানুষকে আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার  উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দিতে চেয়েছেন।

 

ইমাম খোমেনী (রহ.)-র দৃষ্টিতে এ পৃথিবীর সব কিছুই কেবল ততক্ষণ পর্যন্তই গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান, যতক্ষণ পর্যন্ত তা আল্লাহর নৈকট্যলাভ ও ঐশী কল্যাণের মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগে। ‘নেতৃত্ব’ কেবল তখনি গুরুত্বপূর্ণ যখন তা আল্লাহর সৃষ্টির সেবা করার দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হয়। ইমাম খোমেনী (রহ.) বিশ্বাস করতেন- শাসন-কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহর। এ কারণে তিনি বহুবার বলেছেন, আমাকে সেবক বলবেন। সর্বোচ্চ নেতা বলার চেয়ে এটা বলাই ভালো। তিনি মানুষকে অত্যন্ত পবিত্র ও সম্মানজনক সত্ত্বা বলে মনে করতেন। তার মতে, প্রতিটি মানুষের ভেতরে সত্য পথকে উপলব্ধি করার এবং সেই পথে চলার ক্ষমতা রয়েছে। এ কারণে তিনি মানুষকে সজাগ ও সচেতন করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ইরানি জাতিকে সঠিকভাবে চিনতে পেরেছিলেন হযরত ইমাম খোমেনী (রহ.)।

 

 মিশরের খ্যাতনামা সাংবাদিক হাসানাইন হেইকালকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, ‘ আমি গোটা জাতিকে চিনি। আমি তাদের ভেতরের খবর জানি এবং তাদের ভাষাতেই আমি কথা বলি। আমি জানি তাদের মনের ভেতর এখন কি বিরাজ করছে। আমি দেশের সব দুর্বল পয়েন্টগুলো সম্পর্কে অবহিত। গত অর্ধ শতকের ঘটনাবলীর স্বাক্ষী আমি। ইরানি জাতির দুর্দশার কারণ যে ভীতি-আতঙ্ক, তা আমি জানতাম।’

 

ইমাম খোমেনী (রহ.) শুধু যে, দেশ ও দেশের মানুষকেই সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তাই নয়,  তিনি শত্রুকেও সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। তিনি  আমেরিকাকে প্রধান শত্রু বলে মনে করতেন। তিনি বলেছেন, ইরানসহ মুসলিম জাতিগুলোর সব দুঃখ-দুর্দশার মূলে রয়েছে আমেরিকা। ইমাম খোমেনী(রহ.) জুলুম ও দূর্নীতির সঙ্গে কখনোই আপোষ করেননি। অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে তিনি নবী-রাসূলদের দায়িত্বের ধারাবাহিকতা হিসেবে মনে করতেন। তিনি বলতেন, দুর্নীতিবাজ শক্তির সঙ্গে আপোষ না করার কারণে যারা সমালোচনা করে,তারা সব কিছুকেই বৈষয়িক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে। তার মতে, জালিম সরকারগুরোর সঙ্গে আপোষের অর্থ হলো মানব সমাজের ওপর জুলুম করা। এ কারণে নানা হুমকি ও চাপের মুখেও অন্যায় ও জুলুমের কাছে মাথানত করেননি ইমাম খোমেনী (রহ.)।

 

ইমাম খোমেনী (রহ.) ছিলেন ইসলামের পথে অকুতোভয় সৈনিক। আল্লাহ ছাড়া কাউকেই তিনি ভয় করতেন না। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমি কখনোই ভীত-সন্ত্রস্ত হইনি। আমি আমার জীবনকে মুসলমানদের রক্ষার জন্যই প্রস্তুত করেছি এবং আমি এখন শাহাদাতের জন্য অপেক্ষা করছি।’ রাসূল (সা.)-র দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ইমাম খোমেনী মনে করতেন, যেসব শক্তিধর দেশ কখনোই জুলুম ও বঞ্চনার তিক্ত স্বাদ পায়নি, সেগুলোর পক্ষ থেকে সাহায্য আসার অপেক্ষায় মুসলমানদের থাকা উচিত নয়। যে কেউই ইমাম খোমেনী (রহ.)-র জীবন প্রণালী সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলে এটা উপলব্ধি করতে পারবে যে, এই নেতার পুরো জীবন ছিল ইসলামভিত্তিক। তিনি সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। বিশ্বজুড়ে বিলাসিতার যে প্রবণতা চলছে, সেটাকে তিনি কখনোই পরোয়া করেননি। ৮ বছর ধরে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন ইমাম খোমেনী। কিন্তু বিলাসিতা ও অহঙ্কার তাকে ছুঁতে পারেনি।

 

তিনি ছিলেন নম্র, বিনয়ী ও ভারসাম্যপূর্ণ। পৃথিবীর চাকচিক্যে প্রভাবিত হননি ইমাম খোমেনী। ইরানের বিপ্লব সফল করার জন্য তিনি কখনোই কৃতিত্ব নিতেন না। তিনি বলতেন, ইসলামী বিপ্লব আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ। তিনি ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ে অহঙ্কারী না হতে জনগণকে সব সময় পরামর্শ দিতেন এবং এ জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। ইমাম খোমেনী (রহ.) দেশের জনগণের স্বার্থ ও কল্যাণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন এবং তাদের কল্যাণের জন্য সব সময় চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। দেশের নেতা-কর্মীদের যখন পরামর্শ দিতেন, তখন জনগণের সেবা করার গুরুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। তারই নেতৃত্বের পথ ধরে আজ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এগিয়ে গেছে বহু দূর। তিনি আজও ইরানের সব নেতার আদর্শ। #  

 

রেডিও তেহরান/এসএ/এআর/৩০

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন