এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 29 অক্টোবার 2008 19:17

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক

 ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক - এক

তিন দশক আগে ইরানে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লব বিশ্বের বিপ্লবগুলোর ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। ইসলামী ও গণমানুষের এ বিপ্লব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রচলিত অনেক সমীকরণ বা হিসেবে-নিকেশ বদলে দিয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো বলেছিল, তারা এ বিপ্লবকে অংকুরেই বিনষ্ট করবে। কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লব অনেক চড়াই-উৎরাই সত্ত্বেও সগৌরবে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে এবং এ বিপ্লব বিশ্বে ইসলামী জাগরণের আদর্শে পরিণত হয়েছে। ইসলামী বৈশিষ্ট্য, শক্তিশালী ও সাহসী নেতৃত্ব এবং জনগণের প্রতিরোধ ও দৃঢ়তা মহতী এ বিপ্লবের টিকে থাকার মূল রহস্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন সর্বস্তরের মানুষ এমন অসাধারণ এক বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যে বিপ্লবের গণজোয়ারে ভেসে গিয়েছিল মার্কিন পরাশক্তি সমর্থিত বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাজা রেজা শাহ পাহলভীর ময়ুর সিংহাসন এবং এ মহাপরিবর্তনের প্রেক্ষাপট ও চালিকাশক্তিগুলোই বা কেমন ছিল?
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ইসলামী সভ্যতা যখন ধীরে ধীরে পতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন ইসলামের প্রগতিশীল চিন্তাধারা থেকে দূরে থাকাসহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কারণে মুসলমানরা তাদের অতীতের গতিশীলতা হারিয়ে ফেলে। মুসলমানদের অসচেতনতা ও স্থবিরতার সুযোগ নিয়ে পশ্চিমা শক্তিগুলো অধিকাংশ মুসলিম দেশে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় এবং তারা মুসলমানদের সম্পদ লুট করতে থাকে। ইসলামের সোনালী সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্রস্থল ইরানও একদিকে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিতে পিছিয়ে পড়তে থাকে, অন্যদিকে বিজাতীয়দের হস্তক্ষেপের ফলে অগ্রযাত্রা বা গতিশীলতা হারিয়ে ফেলে। পশ্চিমা দেশগুলো ইরানে লুণ্ঠণসহ ধ্বংসাত্মক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা অব্যাহত রাখায় ইরানীদের মধ্যে ইসলামী জাগরণ ও প্রতিরোধ আন্দোলনের ক্ষেত্র গড়ে উঠে।

পশ্চিমা শক্তিগুলো মুসলিম জাতিগুলোর সম্পদ লুণ্ঠণ ছাড়াও তাদের সংস্কৃতি, জাতীয় পরিচিতি ও আত্মবিশ্বাসকে নষ্ট করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে পিছিয়ে রাখার জন্য জন্য যা যা করা প্রয়োজন তার সব কিছুই করতে থাকে।
আর এ অবস্থায় মুসলিম বিশ্বের দূরবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন এক শ্রেণীর চিন্তাবিদ ও নেতা মুসলমানদের জাগিয়ে তোলার জন্য বা তাদেরকে সচেতন করার জন্য কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেন। কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপ সাময়িকভাবে কিছু প্রভাব ফেললেও মুসলিম বিশ্বের মৌলিক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় নি।
কিন্তু ১৯৭৯ সালে মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র নেতৃত্বে ইরানে যে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয় তা ছিল পশ্চিমা উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে এক প্রচন্ড ঝড় এবং গোটা মুসলিম উম্মাহকে জাগিয়ে তোলার জন্যে এ ধরনের একটি ঝড় বা বড় ধাক্কা জরুরী হয়ে পড়েছিল।
ইরানে পশ্চিমা সরকারগুলোর সরাসরি উপনিবেশ না থাকলেও ইরানী জনগণ তাদের দেশে এই উপনিবেশকামী সরকারগুলোর অশুভ প্রভাব বা হস্তক্ষেপ লক্ষ্য করছিল। প্রত্যক্ষভাবে না হলেও তারা পরোক্ষভাবে ইরানের জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠণ করতো। এ ধরনের পশ্চিমা সরকার ও বিশেষ করে মার্কিন সরকারের ওপর সহায়তায় ইরানে পাহলভী সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এবং এই স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রায় ৫০ বছর ধরে অব্যাহত থাকে।
বৃটেনের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯২১ সালে তাদেরই এজেন্ট রেজা খান ইরানের শাসন-ক্ষমতা দখল করেছিল। চার বছর পর ১৯২৫ সালে রেজা খান পাহলভি রাজতান্ত্রিক শাসনকে স্বীকৃতি দিতে ইরানের সংসদকে বাধ্য করে। এ সময় ইরাক ও ফিলিস্তিনসহ প্রথম মহাযুদ্ধে পরাজিত তুরস্কের ওসমানীয় খেলাফতের আওতাধীন মধ্যপ্রাচ্যের এক বিশাল অংশের ওপর বৃটেনের একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। উপনিবেশকামী বৃটেন তার হস্তক্ষেপ ও প্রভাব ইরানেও বিস্তৃত করে।
১৯৫১ সালে ইরানে তেল শিল্পের জাতীয়করণ আন্দোলন সফল হবার আগ পর্যন্ত এই দেশে বৃটেনের মোড়লীপনা ও হস্তক্ষেপ ছিল অপ্রতিহত। এর দুই বছর পর ১৯৫৩ সালের আগষ্ট মাসে বৃটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেক সরকারকে উৎখাতের মাধ্যমে রেজা খানের পুত্র মোহাম্মদ রেজাকে পুনরায় ক্ষমতায় বসানো হয়। এরপর থেকে মার্কিন সরকারই হয়ে পড়ে ইরানের দন্ড-মুন্ডের প্রধান কর্তা। ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের আগ পর্যন্ত এই অবস্থা অব্যাহত ছিল। রেজা খান ও তার পুত্র মোহাম্মদ রেজার মোট ৫৩ বছরের শাসনামলে ইরানের সরকার ছিল পুরোপুরি পশ্চিমা শক্তিগুলোর ওপর নির্ভরশীল। মোহাম্মদ রেজা অত্যন্ত ছোট-খাট বিষয়েও মার্কিন স্বার্থকে সব কিছুর ওপর প্রাধান্য দিতেন এবং পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ওয়াশিংটনের অন্ধ অনুসারী। সেযুগে মার্কিন সরকারের কথিত দুই স্তম্ভ-ভিত্তিক নিরাপত্তা নীতি বাস্তবায়নের দুই বাহু ছিল ইরান ও সৌদী আরব।
দখলদার ইসরাইলের সাথে শাহ সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ইরান সে সময় আরব দেশগুলোর পক্ষ থেকে তেল অবরোধের সম্মুখীন ইসরাইলকে নামমাত্র মূল্যে তেল সরবরাহ করতো। মার্কিন স্বার্থ রক্ষার জন্য শাহ সোভিয়েত বিরোধী জোট সেন্টোতে যোগ দিয়েছিলেন। ইরানের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোমার্কিন সরকারের মর্জি মোতাবেক নেয়া হতো । শাহের নীতি নির্ধারণী কাজে প্রধান ভূমিকা রাখতেন তেহরানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত। আর এসব কারণেই ইরানের জনগণ মার্কিন সরকারকে শাহের সমস্ত অপরাধ ও নির্যাতনের সহযোগি বলে মনে করতো।

১৯৭৩ সালে জ্বালানী তেলের দর ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার সময় মার্কিন সরকারের নির্দেশের কারণে শাহ তেলের অর্থের বিপুল অংশ সেনা বাহিনী ও অস্ত্র কেনার জন্য ব্যায় করেন। শাহ ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে ১২০০ কোটি ডলারের অস্ত্র কিনেছিলেন। অথচ এ সময় ইরানের জনগণের অধিকাংশই ছিল দরিদ্র এবং ইরানের জন্য যুদ্ধেরও কোনো হুমকি ছিল না। শাহ ভেবেছিলেন তার সেনাবাহিনী খুব শক্তিশালী ও অস্ত্রে সজ্জিত হলে তাকে কেউ কখনও ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে না। কিন্তু শাহ এটা বুঝতে পারেন নি যে সেনাবাহিনীতে জনগণের সহমর্মী সদস্যরা ইরানের ওপর বিজাতীয় শক্তিগুলোর মোড়লীপনা এবং জনগণের ওপর শাহের জুলুমতন্ত্রের বিরোধী ছিল।

ইরান তেল-সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়ায় বিজাতীয়দের লোলুপ দৃষ্টি সব সময়ই ইরানের ওপর নিবদ্ধ ছিল। শাহের আমলে জনগণের বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রথমে বৃটেন ও পরে মার্কিন সরকার ইরানের তেল সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করেছে। ইরানের তেলের আয়ের শতকরা ৪০ ভাগই চলে যেত মার্কিন কোম্পানীগুলোর পকেটে। সে সময় ইরান ইহুদিবাদী ইসরাইলের শতকরা ৬৫ ভাগ তেল এবং বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার শতকরা ৯৫ ভাগ তেলের যোগান দিত। শাহ তেলের অর্থ দিয়ে যেসব মার্কিন অস্ত্র কিনতেন সেগুলো পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য মার্কিন প্রশিক্ষক বা উপদেষ্টাদের উচ্চ হারে বেতন দিয়ে ইরানে রাখা হত। এ ধরনের উপদেষ্টা ও প্রশিক্ষকের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এ ছাড়াও শাহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও শিল্প প্রকল্পগুলোর কাজ ন্যস্ত করতেন ইউরোপীয় এবং মার্কিন কোম্পানীগুলোর ওপর। ফলে এসব শিল্প ও অর্থনৈতিক প্রকল্প চালু হবার পর সেগুলোর লাভের অর্থ যেত এইসব পশ্চিমা কোম্পানীর পকেটে।
অবশ্য শাহের আমলে বড় বড় অর্থনৈতিক ও শিল্প প্রকল্পগুলো জনকল্যাণে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতো না। এসব ছিল মূলতঃ প্রচারণা-সর্বস্ব। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপিকা নিক্কি কিড্ডি বিপ্লবের কারণ ও ফলাফল শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, শাহের শাসনামলে এমনসব অর্থনৈতিক শিল্প প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল যেগুলোকে কোনো প্রয়োজন ছাড়াই অতি বৃহৎ আকারে নির্মাণ করা হতো। ব্যায়বহুল এসব প্রকল্প অপচয় ও ক্ষতি ছাড়া অন্য কিছু বয়ে আনতো না।
অথচ এ সময় ইরানের জনগণের একটা বড় অংশই অভাবের সম্মুখীন ছিল। অন্যদিকে এ সময় শাহের চাটুকার, আত্মীয় স্বজন ও ভাড়াটে লোকেরা জনগণের তুলনায় বহু গুণ বেশী সুযোগ-সুবিধা পেতো।

অবশ্য শাহ জনগণকে ধোকা দেয়ার জন্য ১৯৬২ সালে অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু এ পরিকল্পনার ফলে কৃষি শিল্প অবহেলিত হয় এবং দরিদ্র কৃষক ও গ্রামবাসী বেকার হয়ে শহরমুখী হতে থাকেন। অন্যদিকে দেশের অধিকাংশ সম্পদ ও তেলের অর্থ কুক্ষিগত করেছিল শাহ এবং তার দরবারের লোকজন। অধ্যাপিকা কিড্ডি এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, নিঃসন্দেহে শাহের অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে কেবল বিশেষ এক শ্রেণী লাভবান হয়েছে এবং বঞ্চিত শ্রেণীর প্রাপ্য অর্থ চলে গেছে ঐ বিশেষ শ্রেণীর হাতে।
তাই এটা স্পষ্ট শাহের শাসনামলে একদিকে রূগ্ন অর্থনীতির কারণে শাহ ও তার অনুচরদের মাধ্যমে এবং অন্যদিকে পাশ্চাত্যের আধিপত্য থাকায় ইরানের জনগণ সাম্রাজ্যবাদীদের মাধ্যমে শোষিত হতো। এভাবে বলা যায় অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হবার অন্যতম প্রধান কারণ।#ই

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক - দুই

পাঠক ! গত আসরে আমরা ইসলামী বিপ্লব সমকালীন মুসলিম দেশগুলোর পরিস্থিতি এবং পশ্চিমা ঔপনিবেশিক আধিপত্য সম্পর্কে কথা বলেছিলাম। আরো বলার চেষ্টা করেছিলাম যে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ফলে বিশ্ব মুসলমানের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা এবং ইসলামী জাগরণের জোয়ার আসে। বিশ্বব্যাপী সেই জোয়ার ব্যাপক বিস্তৃতিও লাভ করে। যেসব কারণে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল যেমন পুলিশী শাসন,শাহের অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং তৎকালীন ইরানী সমাজে বিদ্যমান দারিদ্র্য ইত্যাদির প্রতিও ইঙ্গিত করেছিলাম। আজকের পর্বে আমরা ইরানী জনগণের ইসলামী আদর্শের প্রতি উদ্বুদ্ধ হওয়ার কারণ অর্থাৎ শাহের স্বৈরাচারী শাসন,মানবাধিকারের নির্লজ্জ লঙ্ঘন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো।
পাহলভি সরকার শুরু থেকেই দুটি ভিত্তির ওপর অটল ছিলো। একটি হলো বিদেশ-নির্ভরতা এবং অপরটি স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বদেশের জনগণের ওপর নির্যাতন। পাহলভি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রেজা খান ছিলো অসম্ভব বদমেজাজি এবং দাম্ভিক প্রকৃতির। তার ১৬ বছরের বাদশাহীকালে ইরানের জনগণের পিঠ একেবারে দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল। সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব বিরাজ করছিল। রেজা খানের ছেলে মুহাম্মাদ রেজা পাহলভি যদিও শুরুর দিকে বাবার মতো ত্রাস সৃষ্টির অবকাশ পায় নি,কিন্তু ১৯৫৩ সালে ইরানে তেলকে জাতীয় করণ নীতির বিরুদ্ধে ইঙ্গো-মার্কিন অভ্যুত্থানের পর মুহাম্মাদ রেজাও ইরানী জনগণের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করতে থাকে। যতোই দিন যেতে থাকে জনগণের ওপর নির্যাতনের মাত্রাও সীমা ছেড়ে যেতে থাকে।
জনগণের ওপর ধর-পাকড় আর বিচিত্র অত্যাচার-নির্যাতন চালানোর প্রধান মাধ্যম ছিলো শাহের গোয়েন্দা বাহিনী সাভাক। সাভাককে প্রশিক্ষণ দিতো মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনী সি.আই.এ. এবং ইসরাইলী গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদ। সাভাক জুলুম-অত্যাচারের অভিনব কৌশল, বন্দীদের ওপর নির্যাতনের নতুন নতুন কৌশল ইত্যাদি ঐ দুই গোয়েন্দা বাহিনীর কাছ থেকে আয়ত্ত্ব করেছিল। শাহের বন্দীশালাগুলোতে সরকার বিরোধী হাজার হাজার সংগ্রামীর ওপর এমন অকথ্য নির্যাতন চালানো হতো যে অনেক সময় ঐ অত্যাচারের জেরে বন্দীরা মারাও যেত। অবশ্য কেবলমাত্র রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণেই শাহের নির্যাতনের কবলে পড়তো না,বরং ছোটখাটো কারণেও জনগণকে গ্রেফতার করে নিয়ে অত্যাচার চালানো হতো। যেমন কেউ যদি শাহের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো কথা বলতো কিংবা কেউ যদি শাহ সরকার বিরোধী কোনো লেখকের বই পড়তো-ইত্যাদি কারণেও গ্রেফতার করে নিয়ে ব্যাপক নির্যাতন চালানো হতো।
শাহের এই স্বৈরাচারী আচরণের পৃষ্ঠপোষক ছিল পশ্চিমা সরকারগুলো বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারা শাহকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করতো। মজার ব্যাপার হলো,পশ্চিমা সরকারগুলো সবসময়ই মানবাধিকার,স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তি বলে দাবী করে থাকে,কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানী জনগণের মৌলিক কোনো একটি অধিকারও রক্ষা করা হতো না,তাদের ওপর ভীষণ রকম নির্যাতন চালানো হতো। এরকম একটি সরকারের প্রতি ওয়াশিংটন বারবার তাদের সমর্থন ঘোষনা করেছে। কেবল সমর্থনই নয় বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার সে সময় বলেছিলো-বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার বিস্তার লাভ করছে। ১৯৭৯ সালে ইরান সফরে এসে কার্টার শাহের উদ্দেশ্যে বলেছিলো-বিশ্বের ঝঞ্ঝাপীড়িত অঞ্চলগুলোর মাঝে ইরান হলো শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল একটি দ্বীপের মতো।
অথচ শাহের অত্যাচারে মানুষ অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। মানুষ কথা বলার অধিকার হারিয়ে বসেছিল। স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার অধিকারও তাদের ছিল না। শাহ সংবিধান পরিবর্তন করে তার ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছিল। তার নিজের গঠিত দুটি দলের বাইরে অন্য কোনো দল করার কারো অধিকার ছিল না। তার দলের সদস্য হতে সবাই বাধ্য ছিল। ইরানের পার্লামেন্ট তখন একটা ফরমায়েশি পার্লামেন্টে পরিবর্তিত হয়েছিল। হুকুমাত অর্থাৎ শাহ যাকে অনুমোদন দিতো সে-ই পার্লামেন্টের সদস্য হতো। এককথায় সারাদেশ জুড়ে কেবল শাহের ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটতো। ইরানী সমাজে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছিল না,দল করার স্বাধীনতা ছিল না,নির্বাচনের স্বাধীনতা ছিল না। তার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করলে তার পরিণতি ছিল ভয়াবহ।
১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে শাহ ইতালির বিশিষ্ট সাংবাদিক ওরিয়ানা ফাল্লাসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বীকারোক্তি করে বলেছিলেন যে, আমি পরিপূর্ণভাবে সচেতন যে,শাহ যেসব কাজ করে বা যেসব কথা বলে তার জন্যে জবাবদিহী করতে হবে না-এটা একেবারেই অপরিহার্য। এই সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে ভীষণ ঔদ্ধত্য দেখিয়ে শাহ বলেছিল-তার কাছে নাকি ওহী নাযিল হয় এবং সে আল্লাহর সাহায্য লাভ করে।
সবচে' আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল এই যে,শাহ ভাবতো ইরানের জনগণ তার অমানবিক নীতিগুলোকে সমর্থন করে। আসলে শাহের নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা বাহিনীগুলোও তার বিরুদ্ধে মানুষের অভ্যুত্থানের ব্যাপারে পূর্বাভাস দিতে পারে নি। তার মানে শাহ এবং তার সমর্থকেরা ইরানের প্রকৃত অবস্থাটা সঠিকভাবে বিশ্লেষণ বা উপলব্ধি করতে পারে নি। তারা এটাও বুঝে উঠতে পারে নি যে,ইরানের জনগণ শাহের পাশ্চাত্যনীতি নির্ভরতা বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগুলোকে কতোটা ঘৃণার চোখে দেখে। তাছাড়া ইসরাইলের সাথে শাহ সরকারের অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা ক্ষেত্রে অতি ঘনিষ্ঠতার কারণেও ইরানের জনগণ আরো বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল।
ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পেছনে আরো একটি বৃহৎ কারণ ছিল তাহলো ইরানী মুসলিম জনগোষ্ঠির ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানা এবং পাহলভি শাসনের সাংস্কৃতিক বেলেল্লাপনা। ইরানের শতকরা ৯৮ ভাগ জনগণ মুসলমান এবং ধর্মের প্রতি তাদের মৌলিক বিশ্বাসের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। তাই ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানার কারণে শাহের প্রতি মানুষ খুব সহজেই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পাহলভি সরকার প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ধর্মীয় বিশ্বাসের অবমাননা করে আসছিলো। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, পাহলভি সরকার ইমাম হোসাইন ( আ ) এর জন্যে শোকানুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল এবং মহিলাদের হিযাব পরার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। অবশ্য জনগণ পাশ্চাত্যপন্থী এইসব আদেশ কখনোই মেনে নেয় নি।
শাহ নিজে ছিল পাশ্চাত্যপন্থী এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুসারী। কিন্তু ইরান সংস্কৃতি এবং সভ্যতার দিক থেকে অনেক প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ ছিল বলে গণমাধ্যমগুলোর সাহায্যে শাহের পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রচারণা কাজে লাগে নি। ফরাশি ইসলাম বিশেষজ্ঞ ইয়ান রিচার্ড বিপ্লব-পূর্বকালে ইরানে শাহের বিরোধিতা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেছেন, ষাটের দশকের পর পাহলভি সরকারের পাশ্চাত্যপ্রীতির ব্যাপকতায় ইরানী জনগণ অসন্তুষ্ট হয়েছিলো। যারফলে ইরানী জনগণ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির দিকে ফিরে আসা এবং আত্মপরিচয় ফিরে পাবার তাকিদ অনুভব করেছিল। সে অনুযায়ী সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুন্ন রাখার বিষয়টিকে সবাই অগ্রাধিকার দিয়েছিল। শাহের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের এটাও অন্যতম একটা কারণ।
ইতিহাসের ক্ষেত্রে শাহ ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলাম-পূর্বকালের প্রচার প্রসারের চেষ্টা করতো। ইরানের প্রাচীন বাদশাহী শাসনের কথা গর্বের সাথে বলতো এবং নিজেকে তাদের স্থলাভিষিক্ত ভেবে আত্মতৃপ্তি বোধ করতো। ইরানে বাদশাহী শাসনের আড়াই হাজার বর্ষ পূর্তি উৎসব পালন উপলক্ষ্যে শাহ ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে বিদেশী বহু বাদশাহ ও প্রেসিডেন্টকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ঘটা করে উৎসব করেছিলো। অথচ ইরানের বৃহৎ জনগোষ্ঠি তখন দারিদ্র্যের কষাঘাতে লাঞ্ছিত হচ্ছিলো। ১৯৭৬ এ শাহ ইরানে প্রচলিত হিজরী ক্যালেন্ডার পরিবর্তন করে শাহানশাহী ক্যালেন্ডার চালু করেছিলো যাতে ইসলামের স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাসের সাথে মানুষের দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
শাহ ভেবেছিলো পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রচার-প্রসার ঘটিয়ে ইরানের মুসলিম জনগোষ্ঠিকে তাদের বিশ্বাস ও আত্মপরিচয় থেকে দূরে সরাতে পারবে। এই লক্ষ্যে শাহ তার বিরোধিতাকারী ইমাম খোমেনী (রহ) এর আলেম সমাজের বিরুদ্ধেও উঠে পড়ে লেগে গিয়েছিলো,তাদেরকে জেল-জুলুম ভোগ করতে হয়েছিলো। কিন্তু এর ফল হয়েছিলো উল্টো। মানুষ বরং শাহের বিরুদ্ধে আরো ক্ষেপে উঠেছিলো এবং ইসলামের প্রতি মানুষের আগ্রহ,সম্মান ও দীক্ষিত হবার ঘটনা বেড়ে গিয়েছিলো। স্বৈরাচারী শাহের বিরুদ্ধে মানুষ এবার সচেতন হয়ে উঠলো। তার অত্যাচারী শাসন থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে শুরু করলো মানুষ। সেইসাথে ইরানের মাটিতে বিদেশীদের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়ে উঠলো। এদিকে ইমাম খোমেনী (রহ) এর মতো আধ্যাত্মিক মহান এক ব্যক্তিত্বের সুদূরদর্শী নেতৃত্ব পেয়ে ইরানের আপামর জনগণ ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠলো। তারা একের পর এক শত্র"দের ষড়যন্ত্রগুলোকে নস্যাৎ করে দিয়ে অগ্রসর হয়ে যেতে লাগলো ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের উজ্জ্বল সূর্যোদয়ের দিকে।

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক - তিন

পাঠক! গত দুই আলোচনায় আমরা ইরানে সংঘটিত ইসলাম বিপ্লবের কিছু চালিকা শক্তি ও কারণ বা পটভূমি সম্পর্কে আলোচনা করেছি। যুগে যুগে বৈষয়িক বিভিন্ন কারণে বিপ্লব বা বিদ্রোহ হয়েছে। এটা ঠিক যে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পেছনে অর্থনৈতিক সংকট, স্বৈরাচার, পাশ্চাত্যের ওপর শাহের নির্ভরশীলতা এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যাসহ আরো কিছু সংকট চালিকা শক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু যে বিষয়টি এ বিপ্লবকে অন্য বিপ্লবগুলো থেকে স্বতন্ত্র করেছে তা হল, এ বিপ্লবের ইসলামী প্রকৃতি। এ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক জনগণের অংশগ্রহণ এবং মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র মতো দূরদর্শি ও দৃঢ়চেতা নেতার নেতৃত্ব ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে পরিপূর্ণতা ও বিজয় দান করে। আর এ কারণেই বিশ্লেষকরা ইসলাম, জনগণ ও নেতৃত্বকে ইরানের ইসলামী বিপ্লাবের তিনটি প্রধান ভিত্তি বলে মনে করেন।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র হিজরতের পরের দশকে ইরান মুসলিম জাহানের অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল। ইসলামের উচ্চতর মূল্যবোধ ইরানী জাতিকে এই ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করায় তারা দু-হাত বাড়িয়ে এ ধর্মকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করে নেয়। সেই প্রাথমিক যুগ থেকেই ইরানীরা ইসলামী জ্ঞানের বিকাশে এবং এ ধর্মের বিশ্বাস ও রীতি-নীতির সুরক্ষায় অন্য জাতিগুলোর তুলনায় বেশী কার্যকরি ভূমিকা রেখেছে। ইরানের জনগণের ধর্ম বিশ্বাস তথা ইসলামের বিরুদ্ধে ইরানের স্বৈরাচারি শাহ সরকারের অবস্থান এই দেশে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হবার অন্যতম প্রধান কারণ। ইসলামের প্রতি ইরানের জনগণের দৃঢ় বিশ্বাসের কারণে শুধু যে স্বৈরাচারি শাহ ও তার শাহীতন্ত্র বা রাজতন্ত্রের পতন ঘটেছে তা নয়, একইসাথে একটি ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথও সুগম হয়। কারণ, ইরানের জনগণ রাষ্ট্রীয় বা শাসন কাঠামো থেকে শুরু করে জীবনের সর্বস্তরে ইসলামী বিধান বাস্তবায়নের দাবী জানিয়ে আসছিল। ইসলাম ধর্ম অন্যায়, অবিচার, স্বৈরাচার ও বিজাতীয়দের শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের যে শিক্ষা দিয়েছে সে শিক্ষা ইরানের মহান ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ে অনির্বার বা অপরাজেয় চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
ইরানের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ অধ্যাপক আয়াতুল্লাহ মূর্তাজা মোতাহহারির মতে মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র মত একজন সংগ্রামী ও ইসলাম-বিশেষজ্ঞ আলেম ইরানের মুসলিম জাতির গণ-আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বলেই এ বিপ্লব ইসলামী বৈশিষ্ট্য বা চরিত্রের অধিকারী হয়েছে। যে কোনো বিপ্লব বা আন্দোলনে নেতৃত্বের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বহু জাগরণ ও বিপ্লব জনগণের মধ্যে সংঘবদ্ধতার অভাবে কিংবা এর নেতৃবৃন্দের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে পরাজিত হয়েছে অথবা স্থবির হয়ে পড়েছে। কিন্তু মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র মত বিচক্ষণ ও দৃঢ়চেতা নেতার নেতৃত্ব ছিল ইরানের ইসলামী বিপ্লবের জন্য শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক শহীদ মোতাহহারি বলেছেন, ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেনী (রঃ)'র সাফল্যের রহস্য হল তার সাহসিকতা, আন্তরিকতা ও দৃঢ়তা এবং স্বচ্ছ দূরদৃষ্টি। আর এসব গুণাবলী নিয়ে তিনি বিপ্লবকে ইসলামের গন্ডীতে এগিয়ে নেন। ইমাম খোমেনী (রঃ)'র সাথে জনগণের আত্মিক ও আন্তরিক সম্পর্ক এবং তাঁর প্রতি জনগণের শক্তিশালী আনুগত্য এ সংগ্রাম বা বিপ্লবকে শাহের শক্তিশালী শাসনব্যবস্থাকে অপেক্ষাকৃত কম সময়ের মধ্যে বিজয়ী করেছে।

ইমাম খোমেনী (রঃ)'র ছিলেন এমন একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব যার মধ্যে বহু উচ্চতর গুণাবলী ও যোগ্যতা স্বমহিমায় প্রকাশিত হয়েছে । তিনি ছিলেন একাধারে একজন শ্রেষ্ঠ ইসলামী আইন-বিশেষজ্ঞ বা ফক্বীহ, যুগের চাহিদা সম্পর্কে সচেতন এবং বিপুল সংখ্যক মুসলমানের জন্য শিরোধার্য বরেণ্য ইমাম। তিনি অত্যন্ত খ্যাতিমান আলেম ও শিক্ষকদের কাছে পড়াশুনা করেছিলেন এবং ইসলামের বিশেষায়িত ও গবেষণামূলক জ্ঞানে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। ইমাম খোমেনী (রঃ)'র ইরানের সবচেয়ে কঠোর সংগ্রামী আলেম হিসেবে ১৯৬০ এর দশকের প্রথম দিকেই স্বৈরাচারি শাহের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করেন। অন্য যে গুণটি তিনি বিশ্বনবী (সাঃ) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত (আঃ)'র জীবনী থেকে অনুসরণ করেছেন তা হলো সত্য বা উচিত-কথা বলার দূরন্ত সাহস এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে অকূতভয় সংগ্রাম । অন্যায় ও জুলুমের বিরোধিতার ক্ষেত্রে তিনি পরাশক্তিকেও বিন্দু মাত্র পরোয়া করেন নি। আর এ গুণটি তাকে ইরানের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতায় পরিণত করেছে। শাহ যখন তার প্রবল পরাক্রমের তুঙ্গে ছিলেন, তখনই ইমাম খোমেনী (রঃ) অকাট্য যুক্তির কশাঘাত হেনে শাহের ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দেন এবং অসম সাহসিকতা নিয়ে বিপ্লবের মহাতরীকে বাধার বিন্দ্যাচলগুলো ডিঙ্গিয়ে বিজয়ের কাঙ্ক্ষিত বন্দরে নিরাপদে পৌঁছে দেন।

মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র নেতৃত্বের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট হল কার্যক্ষেত্রে তার আন্তরিকতা। তিনি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং ইরানী জাতিকে মুক্ত করার জন্য সংগ্রামের ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি বহুবার তার সৎ-উদ্দেশ্য প্রমাণ করেছিলেন এবং এটা প্রমাণ করেছেন যে, ক্ষমতা ও সম্পদের প্রতি তার লোভ বা আগ্রহ নেই। পবিত্রতা ও আন্তরিকতা বা সততার জন্যেই মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) দেশে-বিদেশে এত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। সংকটের প্রচন্ডতা বা চাপের মুখেও তিনি কখনও আপোস করতেন না এবং কোনো ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব বা সিদ্ধান্তহীনতায় না ভুগে সবসময় সবচেয়ে ভালো পথটি বেছে নিতেন। সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে তার পুর্ণাঙ্গ জ্ঞান, সতর্কতা ও সচেতনতা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) ১৫ বছর ধরে ইরাক, তুরস্ক ও ফ্রান্সে নির্বাসিত থাকা সত্ত্বেও দেশের ক্ষমতাসীন সরকার, সংগ্রামী দল বা গ্রুপ ও জনগণের অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট এবং নির্ভুল তথ্য রাখতেন। এ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, ফিলিস্তিন সংকট ও ইসরাইলী আগ্রাসনের মত বিষয়গুলো সতর্কতার সাথে লক্ষ্য করতেন এবং মার্কিন ও ইসরাইলী আধিপত্যকামীতা সম্পর্কে মুসলিম জাহানকে সতর্ক করে দিতেন।

মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) অত্যন্ত সাদা-সিধে ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। বিদেশী দর্শনার্থি ও রাজনীতিবিদরা তার ক্ষুদ্র এবং সাদা-সিধে বাসভবন দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে থাকেন। অন্যদিকে অত্যন্ত জনদরদী ও বিনয়ী এই ইমাম বলতেন, আমাকে নেতা না বলে জনগণের খাদেম বলবেন।
রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনীতিবিদ হওয়া ছাড়াও মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) ছিলেন একজন উচ্চ পর্যায়ের আরেফ বা সাধক। ইমামের ইন্তেকালের পর প্রকাশিত তার আধ্যাত্মিক কবিতাগুলো এ মহান সাধকের উচ্চতর আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও সূক্ষ্ম বা কোমল মনের পরিচয় বহন করে। বর্তমান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) সম্পর্কে বলেছেন, মহানবী (সাঃ)'র বংশধর ও তাঁর পবিত্র বংশধারার অনুসারী এই ব্যক্তি মোজেজাপূর্ণ হাত এবং সাগরের মতো বিস্তৃত ও গভীর হৃদয় নিয়ে সুপথ-সন্ধানী যোগ্য জনগণের মধ্যে রহমতের নিদর্শন হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। এরপর তিনি তাদেরকে অর্থাৎ জনগণকে মহান আল্লাহর ফেরেশতাদের পাখায় বসালেন এবং তাদেরকে সম্মান ও মর্যাদার আসনে বসানোর চেষ্টা করেন।

আসলে ইরানের জনগণই মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র মতো একজন যোগ্য নেতাকে ইসলামী বিপ্লবের কান্ডারী হিসেবে বেছে নেয়। কারণ, তারা অতীতেও মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র মধ্যে সাহসিকতা, বিচক্ষণতা, সময়ের চাহিদা সম্পর্কে সচেতনতা এবং স্বৈরাচারি শাহ ও বিজাতীয় উপনিবেশবাদীদের প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তার কঠোর সিদ্ধান্তের ওপর অবিচলতা ও দৃঢ়তার প্রমাণ পেয়েছে। ইমাম খোমেনী (রঃ) ১৯৬১ সালে স্বৈরাচারি শাহের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য আন্দোলন শুরু করেন। শাহের প্রকৃত অবস্থা ফাঁস করার ব্যাপারে ইমামের বক্তব্য ও অবস্থান ইসলামী বিপ্লবের প্রথম স্ফুলিঙ্গকে প্রজ্জ্বলিত করেছিল এবং তার ঐসব বক্তব্য শুনে সমগ্র ইরানী জাতি সচেতন হয়। শাহ সরকার নিজের বিপদ আঁচ করতে পেরে ইমাম খোমেনী (রঃ)কে ১৯৬৩ সালে প্রথমে তুরস্কে ও পরে ইরাকে নির্বাসিত করে। এরকম স্পর্শকাতর সময়েও ইমাম খোমেনী (রঃ) মহান আল্লাহ ও জনগণের জন্য দায়িত্ব পালন করাকে জরুরী মনে করেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি জনগণের মধ্যে সচেতনতা ও জাগরণকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য অধ্যাবসায় ও অক্লান্ত পরিশ্রমের চরম পরাকাষ্ঠা দেখান। #

 

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক - চার

পাঠক! গত আসরে যেমনটি ইঙ্গিত দিয়েছিলাম যে,ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পেছনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি ছিল উল্লেখযোগ্য। এক, বিপ্লবটি ছিল ইসলামী। দুই, ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর সুযোগ্য নেতৃত্ব এবং তিন,জনগণ। আজকের আসরে আমরা ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পেছনে ইরানী জনগণের ভূমিকা পর্যালোচনা করার চেষ্টা করবো।
নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, সকল বিপ্লবই জনগণের চেষ্টা-প্রচেষ্টার ফলেই সংঘটিত হয়। তারপরও ইরানের ইসলামী বিপ্লবে জনগণের যেরকম স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল তা অন্য কোনো বিপ্লবের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় নি।
১৯৭৮ এবং ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে ইরানী জনগণের বৈপ্লবিক আন্দোলন ছিল ব্যাপক বিস্তৃত এবং সার্বজনীন। অন্যান্য বিপ্লবে সাধারণত যে শ্রেণীটির চাহিদা নিশ্চিত করে,সেই শ্রেণীটিই আন্দোলনে ভূমিকা রাখে। কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের ক্ষেত্রে মোটামুটি সকল শ্রেণীর মানুষই স্থানীয় স্বৈরাচারসহ বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। দল-মত-মাযহাব নির্বিশেষে ইরানের ইসলামী বিপ্লবে জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি সম্পর্কে ফরাশি বিশিষ্ট লেখক,সাংবাদিক এবং মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ এরিক রোলো বলেছেন, ইরানের বিপ্লবই একমাত্র ধর্মীয় বিপ্লব যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা পর্যন্ত একত্রে মিলেমিশে আন্দোলন করেছিল। বৃটিশ গবেষক এবং ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রেড হ্যালিডে শাহের বিরুদ্ধে জনগণের বিশাল বিক্ষোভকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো গণবিক্ষোভ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইরানের বিভিন্ন শহরে জনগণ বিশাল বিশাল মিছিল করে,শাহের সেনাদের নাকের ডগায় বিক্ষোভের পর বিক্ষোভ করে স্বৈরাচারী শাহের পতন নিশ্চিত করেছে। ইসলামী বিপ্লবে জনগণের উপস্থিতি এতো বিপুল পরিমাণ ছিল যে,বিপ্লব বিরোধিরা পর্যন্ত বিপ্লবের ঐ গণশক্তির কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। এটা থেকেই স্পষ্ট হয় যে,বিপ্লবের ব্যাপারে জনগণের পারস্পরিক ঐক্য এবং আন্তরিকতা যদি দৃঢ় না হতো তাহলে বিপ্লবের ভিত্তি এতো মজবুত হতো না। ইতিহাসের পাতায় দৃষ্টি রাখলে দেখা যাবে যে,মতপার্থক্য এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত বৈপরীত্যের কারণে বহু আন্দোলন মাঝপথে গিয়ে থেমে গেছে। কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লব এক্ষেত্রে ঐক্য ও সংহতির যেরকম ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছে তার নজির খুবই বিরল। ইরানের আপামর জনতা তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্যে এই ঐক্য থেকেই ''স্বাধীনতা, মুক্তি,ইসলামী প্রজাতন্ত্র'র মতো গণ-শ্লোগান দিতে উদ্দীপ্ত হয়েছে।
তবে জনগণকে সচেতন করে তুলতে এবং সংগঠিত করে তোলার ক্ষেত্রে ইরানের আলেম সমাজের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। কেননা ইরানের বিভিন্ন প্রান্তে আলেম সমাজের সচেতন উপস্থিতি ছিল এবং জনগণের কাছাকাছি থাকার কারণে আলেম সমাজের ওপর তাদের আস্থাও ছিল। ইরানী জনগণের একমুখী ঐক্য এবং সার্বজনীন অভ্যুত্থান বিশ্ববাসীর জন্যে আরেকটি দিক থেকে বিস্ময়কর। কেননা জনগণের জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষা এবং মনোবল এতো বেশি প্রবল ও শক্তিশালী ছিল যে, অল্প সময়ের মধ্যেই সশস্ত্র বাহিনী পরিবেষ্টিত এবং পরাশক্তিগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা সত্ত্বেও স্বৈরাচারী শাহের পতন ঘটেছিল। ফরাশি চিন্তাবিদ মিশেল ফুকো ইরানের ইসলামী বিপ্লব নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি বলেছেন, 'আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করতাম, জনগণের ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা বা প্রত্যয় অনেকটা খোদা কিংবা আত্মার মতোই অদৃশ্য, চোখে দেখা যায় না...কিন্তু আমরা তেহরানে এবং সমগ্র ইরানে একটি জাতির সামষ্টিক ইচ্ছা লক্ষ্য করেছি। এটা খুবই প্রশংসনীয় এবং বিরল একটি ঘটনা।'
ফ্রান্সের বিশিষ্ট সাংবাদিক পিয়ের ব্যালান্সে বিপ্লবী আন্দোলন চলাকালে তেহরানে ছিলেন। তিনি 'ইরান,আল্লাহর নামে বিপ্লব' নামক গ্রন্থে লিখেছেন, যে বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করেছে তাহলো একটি জাতির প্রায় সমস্ত মানুষ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে....যা সত্যিই অবাক করার মতো ব্যাপার। এরকমও দেখেছি,বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা দল বেঁধে এসে বলছে আমরা সবাই এক,সবাই কোরআনের সমর্থক,সবাই মুসলমান,আমাদের মাঝে কোনো ভেদাভেদ নেই।'
ইসলামী বিপ্লবের রূপকার এবং প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনী ( রহ ) সবসময়ই জনগণের ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করতেন। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ক্ষেত্রে এই ঐক্যের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, 'ইরানী জাতির বিশাল বিজয়ের পেছনে যে রহস্যটি লুকিয়ে আছে তাহলো, সমগ্র দেশজুড়ে সকল শ্রেণীর মানুষের কালেমার ঐক্য।' তিনি বলেন, এই আন্তরিক ঐক্য ছিল আল্লাহর একটা মোজেযা। বস্তুতই ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মৌলিক একটি বৈশিষ্ট্য ছিল ঐশী ধর্মের প্রতি জনগণের মৌলিক বিশ্বাস এবং ইসলামী নীতিমালাগুলো বাস্তবায়ন করার জন্যে তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা। আর ইসলামে বিশ্বাস ছিল ঐক্যের মূল চাবিকাঠি এবং শাহের পতনের লক্ষ্যে জনগণের আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি।
ইরানের বিপ্লবী জনগণ ইসলাম থেকে প্রতিরোধ এবং আত্মদানের সবক নিয়ে বাস্তবে তা কী করে কাজে লাগাতে হয় বিপ্লবী সংগ্রামে তারা তা দেখিয়ে দিয়েছে। মুসলিম যতো বীরের বিপ্লবী কাহিনী তারা শুনেছে ইরানের বিপ্লবী আন্দোলনের সময় ইতিহাসের সেই বাস্তব শিক্ষাগুলোকে কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়েছে। একটা জালেম এবং স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে আমরণ সংগ্রাম চালিয়ে শহীদ হবার শিক্ষা তারা পেয়েছিল। এই শাহাদাতকে তারা উচ্চ মানবিক মর্যাদায় উপনীত হবার সোপান বলে মনে করতো। সেজন্যেই তারা প্রাণবাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শাহ বিরোধী সংগ্রাম। শাহাদাতের মর্যাদাকে এতো উচ্চে তারা স্থান দিয়েছিল যে মৃত্যুকে তারা বিন্দুমাত্র ভয় করে নি।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বেশ লক্ষ্য করার মতো। তাহলো,যে-কোনো বিপ্লবের ক্ষেত্রেই আন্দোলনকারী জনগোষ্ঠির হাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র থাকে,যা দিয়ে তারা তাদের সামনের সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। কিন্তু ইরানের বিপ্লবী জনগোষ্ঠি ছিল নিরস্ত্র। তারা কেবলমাত্র ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর নির্দেশনা মেনে রাস্তায় রাস্তায় মিছিলের পর মিছিল, বিক্ষোভের পর বিক্ষোভ প্রদর্শন করে আন্দোলনের মশালকে প্রজ্জ্বলিত রেখেছিল। এই মশাল প্রজ্জ্বলিত রাখাটাই যথেষ্ট ছিল বিপ্লবের জন্যে, সহিংস আন্দোলনের প্রয়োজন ছিল না। বাস্তবেও তাই হলো। শাহ তার যেসব সশস্ত্র বাহিনীর শক্তির ওপর আস্থাশীল ছিল,দেখা গেল যে তারাই একটা সময়ে জনগণের কাতারে এসে দাঁড়িয়ে গেল। জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার কাছে শাহের বাহিনী আত্মসমর্পণ করলো। এ কারণেই সশস্ত্র সংঘর্ষ দীর্ঘায়িত হয় নি,অল্প ক'দিন মাত্র চলছিল।

ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পেছনে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল নেতৃত্ব। ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর মতো আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বের প্রতি সকলের আস্থা ছিল। জনগণ অত্যন্ত সচেতনভাবেই তাঁর নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিল। তাঁর সততা,নিষ্ঠা,নৈতকতা, আধ্যাত্মিকতা, বিশ্ব ও ইরানের সমস্যা সম্পর্কে তাঁর সচেতনতা ইত্যাদি সম্পর্কে জনগণের অভিজ্ঞতা ছিল। সেজন্যেই ইরানের জনগণ তাঁর কথায় জীবন দিতেও দ্বিধাবোধ করে নি। ইমামের সাথে জনগণের বস্তুতান্ত্রিক নয় আন্তরিক এবং আত্মিক দৃঢ় সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। এ কারণেই শত্র"দের ব্যাপক অপপ্রচারণা সত্ত্বেও জনগণ ইমামকে ছেড়ে যায় নি,শেষ নিঃশ্বাসটি পর্যন্ত তারা ইমামের সাথে ছিল। তাই ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর নেতৃত্বে যে বিপ্লব সংঘটিত হলো ইরানে,তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যেও আদর্শে পরিণত হয়েছে। #

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক - পাঁচ

পাঠক! ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার গত কয়েকটি পর্বে আমরা এ বিপ্লবের পটভূমি ও প্রেক্ষাপটগুলো সম্পর্কে আলোচনা করেছি। ইসলামী বিপ্লবের তিনটি মূল ভিত্তি তথা ইসলাম, নেতৃত্ব ও জনগণের ভূমিকা সম্পর্কেও আমরা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছি। এবারে আমরা এ বিপ্লব দানা বেঁধে ওঠার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, এর ধারাবাহিকতা এবং ইরানী জনগণের মাধ্যমে এ বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন সম্পর্কে আলোচনা করবো।
যেসব ঘটনা-প্রবাহ ১৯৭৯ সালের ১১ ই ফেব্রুয়ারীতে ইরানে ইসলামী বিপ্লবকে বিজয়ী করে সেসব ঘটনা ঘটতে এক বছর সময় লেগেছিল। কিন্তু এসব ঘটনার শেঁকড় প্রোথিত হয়েছিল কয়েক দশক আগে।
ইরানের মুসলিম জাতি সব সময়ই ছিল স্বাধীনতা ও মুক্তিকামী। জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং ন্যায়বিচারকামীতার উচ্চতর যে শিক্ষা ইসলাম এ জাতিকে দিয়েছে তা তাদের রক্তের সাথে মিশে ছিল। তাই দেখা যায় গত কয়েক শতকেও ইরানীরা অভ্যন্তরীন স্বৈরাচারি বা তাগুতি শক্তি এবং বিজাতীয় আধিপত্যকামীদের বিরুদ্ধে বার বার বিদ্রোহ করেছে। তিন দশক আগের ইসলামী বিপ্লব ছিল এসব জাগরণ বা বিদ্রোহের চূড়ান্ত পরিণত রূপ। আর এ চূড়ান্ত বিপ্লবের ফলে ইরানের মাটিতে অভ্যন্তরীণ স্বৈরাচার এবং বিজাতীয়দের হস্তক্ষেপ চিরতরে বন্ধ হয়েছে।

ইসলামী বিপ্লবের আগে বিংশ শতকে ইরানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে আন্দোলন হয়েছিল তা ছিল ১৯০৫ সালে সংঘটিত সাংবিধানিক আন্দোলন। এই সংগ্রামের লক্ষ্য ছিল রাজার ক্ষমতা সীমিত করার পাশাপাশি শাসন-ক্ষমতায় জনগণের ভূমিকা বৃদ্ধি করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাসহ ইরানে বিজাতীয়দের হস্তক্ষেপ নির্মূল করা। কিন্তু বিজাতীয় শক্তিগুলো সে সময় এ আন্দোলনের ভেতরে তাদের অনুচরদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে এর কোনো কোনো নেতার মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এর পাশাপাশি উপনিবেশবাদী বৃটেনের বিভিন্ন কূটচাল ও সাংবিধানিক আন্দোলনের লক্ষ্য সম্পর্কে জনগণের ধারণা না থাকায় আন্দোলনটি লক্ষ্যচ্যুত হয়ে যায়। এরপর স্বৈরাচারি ও একনায়ক রেজা খান ইরানের ক্ষমতা দখল করায় পুনরায় স্বৈরাচারী এবং নিপীড়নকামী শক্তির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। রেজা খানের পর তার পুত্র রেজা শাহ ইরানের ক্ষমতায় অসীন হয়ে স্বৈরশাসনের ধারা অব্যাহত রাখে।

বিংশ শতকে ইরানের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ গণ-আন্দোলন ছিল তেল শিল্পের জাতীয়করণ। ১৯৫০ সালে সংঘটিত এ আন্দোলন সফল হয়। এ গণ-জাগরণের লক্ষ্য ছিল ইরানে উপনিবেশবাদী বৃটেনের হস্তক্ষেপ, বিশেষ করে ইরানের তেল-সম্পদ ও এর আয়ের ওপর বৃটেনের মোড়লীপনা বন্ধ করা। প্রথমদিকে এ আন্দোলন সফল হলেও পরে আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতভেদ দেখা দিলে তা দূর্বল হয়ে পড়ে। এরপর ১৯৫৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের যৌথ ষড়যন্ত্রে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানে এ আন্দোলন বানচাল হয়ে যায়। ফলে ইরানের তেল-সম্পদের ওপর আবারও বিজাতীয়দের, বিশেষ করে মার্কিন সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ইরানের এ দুটি বড় আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় জনগণের অসচেতনতা বা পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের স্বচ্ছ ধারণা না থাকা এবং নেতৃবৃন্দের দূর্বলতা ও অসংঘবদ্ধতাই ছিল এ দুই গণজাগরণের মূল সমস্যা। মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) এ দুই আন্দোলনের এসব দূর্বল দিক সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলেন এবং তিনি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে দূরদর্শিতা নিয়ে বিশ্লেষণ করে ১৯৬০'র দশকের প্রথম দিকে মহান ইসলামী বিপ্লবের জন্য গণ- আন্দোলন শুরু করেন ।

মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) ১৯০২ সালে মধ্য ইরানের অন্যতম শহর খোমেইনের এক ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সাইয়েদ মোস্তফা খোমেনী (রঃ) ঐ অঞ্চলের জমিদারদের লুন্ঠণ, অত্যাচার ও প্রজা-পীড়নের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। এক্ষেত্রে কিছুটা সফল হবার পর জমিদারদের অনুচরের হাতে তিনি শাহাদত বরণ করেন। এভাবে ইমাম খোমেনী (রঃ) শৈশবেই জুলুম ও অবিচারের তিক্ততা সম্পর্কে সচেতন হয়েছিলেন। শৈশবে ইসলামী শাস্ত্রে পড়াশুনা শুরু করেন এবং এক্ষেত্রে অসাধারণ মেধা ও অধ্যাবসায়ের পরিচয় দিয়ে তিনি ৩৪ বছর বয়সেই ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ বা মুজতাহিদ হবার যোগ্যতা অর্জন করেন। মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) সব সময়ই স্বৈরাচারি শাহী শাসক ও তার অনুচরদের বিরোধিতা করতেন। কিন্তু পরিবেশকে অনুকূল দেখার পর ১৯৬১ সালে শাহের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সংগ্রাম বা গণ-আন্দোলন শুরু করেন। সে সময় শাহ প্রাদেশিক ও জেলা-সমিতি গঠনের আইনের অপব্যবহার করে ইরান থেকে ইসলাম-বিমোচনের বা ইসলাম নির্মূলের দ্বিতীয় দফা প্রচেষ্টা শুরুর উদ্যোগ নেন। কিন্তু মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) শাহের এ পদক্ষেপের পরিণতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার উদ্যোগ নেন এবং সমমনা আলেমদের নিয়ে এ ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে এগিয়ে আসেন।
১৯৬২ সালে মোঃ রেজা শাহ তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডীর পরামর্শে শ্বেত-বিপ্লব নাম দিয়ে তথাকথিত সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এ সংস্কারের উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে আরও বেশী মাত্রায় বিজাতীয় শক্তির দয়ার ওপর নির্ভরশীল করা এবং ইরানের অর্থনীতিকে আরো দূর্বল করা। কিন্তু মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) শাহের এই প্রতারণামূলক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেন। তিনি এ সংক্রান্ত গণভোটে অংশ না নিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। ইমামের আহ্বানে খুব অল্প সংখ্যক জনগণ এই গণভোটে অংশ নেয়ায় স্বৈরাচারি শাহ সরকার মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র ওপর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়।

এ ঘটনার কিছু দিন পর শাহের গোয়েন্দা বাহিনীর লোকজন ইরানীদের গণআন্দোলনের ধর্মীয় ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কোম শহরের ফায়জিয়া মাদ্রাসায় হামলা চালিয়ে ধর্মতত্ত্বের বেশ কয়েকজন ছাত্রকে শহীদ করে। ইমাম খোমেনী (রঃ) শাহের এই অপরাধের প্রতিক্রিয়ায় অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বক্তব্য রাখেন এবং তিনি জনগণকে জাগিয়ে তুলতে কাজ করার জন্য আলেম সমাজের প্রতি আহ্বান জানান। এই ভাষণের পর শাহ সরকার ইমামকে গ্রেফতার করে এবং বেশ কিছু দিন বন্দী রাখে।
মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)কে গ্রেফতারের প্রতিবাদে জনগণ ও আলেম সমাজে শাহ-বিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এই গণ-বিক্ষোভ দমন করতে শাহের নিরাপত্তা বাহিনী ও সেনারা ১৯৬৩ সালের জুন মাসের প্রথম দিকে কয়েক হাজার ব্যক্তিকে শহীদ করে। এভাবে ইরানী জাতি প্রমাণ করেছে যে তারা ইমাম খোমেনী (রঃ)কে প্রকৃত নেতা হিসেবে চিনতে পেরেছিল এবং তারা নিজ জীবন উৎসর্গ করে এই নেতাকে সমর্থন যুগিয়ে গেছেন।
মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) ছিলেন অক্লান্ত, অবিচলিত ও সদা-উদ্যমী নেতা। তাই তিনি কারাগার থেকে মুক্ত হবার পর পরই পবিত্র কোম শহরে ফিরে গিয়ে অত্যাচারী শাহের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করার কাজ অব্যাহত রাখেন। এরিমধ্যে শাহের রাবারস্ট্যাম্প বা ক্রীড়নক সংসদ ইরানের ভেতরে মার্কিন নাগরিকদের বিচারের উর্ধ্বে রাখা সংক্রান্ত ক্যাপিচুলেশান বিলটি অনুমোদন করলে জনগণ আবারও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) অত্যন্ত জোরালো ও নির্ভিকভাবে এই পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানান এবং ইরানী জাতিকে এভাবে অপমানিত করার ব্যাপারে শাহের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেন । এবার শাহ সরকার ইমামকে গ্রেফতার করে এবং ১৯৬৪ সালের চৌঠা নভেম্বর তাকে তুরস্কে ও এক বছর পর ইরাকে নির্বাসন দেয়।

শাহ-সরকার ভেবেছিল মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)কে নির্বাসনে পাঠালে তার সুচিত গণ-আন্দোলনের আগুন নিভে যাবে। কিন্তু দেখা গেছে এর ফলে ইমামের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং একজন বিপ্লবী ও যোগ্য নেতা হিসেবে তিনি জনগণের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন লাভ করেন।
ইরাকে নির্বাসনে থাকার সময়ও তিনি বিভিন্ন উপলক্ষ্যে শাহের বিভিন্ন অপকর্ম, জুলুম ও লুণ্ঠণের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করা অব্যাহত রাখেন। একইসাথে ইরানের ভেতরে শাহ-বিরোধী আন্দোলন গোপনে ও প্রকাশ্যে অব্যাহত ছিল। শহীদ আয়াতুল্লাহ মোতাহহারী, আয়াতুল্লাহ ত্বালেক্বানী, শহীদ আয়াতুল্লাহ বেহেশতী (রঃ)সহ আরো একদল সুযোগ্য আলেম এবং মুসলিম চিন্তাবিদ শাহের জুলুম সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি এসব জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ইসলামের চেতনায় জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। ফলে স্বৈরাচারী শাহ-সরকার আরও চিন্তিত হয়ে ওঠে। শাহ-সরকার গণ-জাগরণকে দমন করার জন্য বহু আলেম ও জনগণকে বন্দী করে তাদের ওপর নৃশংস নির্যাতন চালায় এবং এসব নির্যাতনে তাদের অনেকেই শাহাদত বরণ করেন। আয়াতুল্লাহ সায়িদী ও আয়াতুল্লাহ গাফফারী (রঃ) ছিলেন শহীদ আলেমদের মধ্যে অন্যতম।
মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র নির্বাসনের সময় কোনো কোনো দল শাহের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামও শুরু করেছিল। কিন্তু শাহের গোয়েন্দা সংস্থা সাভাকের সদস্যরা নির্মমভাবে তাদেরকে দমন করে। এ সময় ইমাম আন্দোলন অব্যাহত রাখার জন্য সহিংস পদ্ধতিকে বেছে নেন নি, তবে তিনি জনগণকে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দিতেন। কারণ, তিনি মনে করতেন কেবলমাত্র সচেতন জনতার প্রবল আন্দোলনের জোয়ারই শাহের ক্ষমতার ভিতকে নড়বড়ে করতে পারে।

মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) নির্বাসনে আছেন বলে জনগণ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে এবং তারা শাহ সরকারের অপকর্ম ও জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতামূলক তৎপরতার ব্যাপারে মাথা ঘামাতে আগ্রহী নয়-এই ধারণা নিয়ে স্বৈরাচারী শাহ-সরকার আরো অনেক অপরাধে লিপ্ত হয়। শাহ একদিকে জনগণের ওপর দমন-পীড়ন জোরদার করে এবং অন্যদিকে বিজাতীয়দের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি ও ইসলাম-বিদ্বেষী তৎপরতাও তীব্রতর করে তোলে। তেলের আয় থেকে অর্জিত বিপুল অর্থ-সম্পদের অধিকাংশ ব্যয় করা হত মার্কিন অস্ত্র কেনা এবং শাহের দরবারের জাকজমক বৃদ্ধি ও তার আত্মীয় স্বজনদের ভোগ-বিলাসের কাজে। অন্যদিকে জনগণের দারিদ্র ক্রমেই বাড়ছিল। ফলে শাহ-সরকারের বিরুদ্ধে পুঞ্জিভুত গণ-রোষ বিস্ফোরন্মুখ হয়ে ওঠে।
আর এমনই এক অবস্থায় ১৯৭৮ সালে শাহ-সরকার তেহরানের একটি দৈনিকে মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র প্রতি অবমাননাকর প্রবন্ধ ছাপালে তার প্রতিবাদে চূড়ান্ত বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ বা দাবানলের প্রাথমিক পর্যায়ের সুত্রপাত হয়। আর গণঅভ্যুত্থান ও গণ-রোষের এই দুনির্বার দাবানল ছড়িয়ে পড়লে সে আগুনের তাপেই চিরতরে পুড়ে যায় স্বৈরাচারি শাহের তখত-তাউস। #

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক - ছয়

সত্তুরের দশকের শেষের বছরগুলোতে ইরানের সমাজ আস্তে আস্তে বৃহৎ অভ্যুত্থানের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একদিকে আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ জনগণকে কোনঠাসা করে ফেলছিল,অন্যদিকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনী ( রহ ) সহ অন্যান্য মুসলিম বুদ্ধিজীবী এবং আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ববর্গ স্বৈরাচারী শাহ সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের জন্যে প্রস্তুত করে তুলেছিল। দুটি বিষয় ইসলামী বিপ্লবের এই প্রস্তুতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একটি হলো শাহী জান্তার ওপর অনাস্থা এবং জনগণের কাঙ্ক্ষিত সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন-এই দুটি বিষয়ই জনগণকে আন্দোলনের ব্যাপারে ব্যাপকভাবে উদ্দীপিত করে। জনগণও বুঝতে পেরেছিল যে শাহী ব্যবস্থার পতনই হবে স্বাধীনতা ও মুক্তি লাভের প্রাথমিক পদক্ষেপ। যাই হোক বিপ্লবের এই নেপথ্য পটভূমি স্মরণ রেখেই আজকের আলোচনা শুরু করবো।

১৯৭৮ সালের অক্টোবরে ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর ছেলে বিশিষ্ট আলেম আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোস্তফা খোমেনী ইরাকের পবিত্র নাজাফে সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মারা যান। ইরানের অধিকাংশ জনগণ ইমামের সন্তানের এই মৃত্যুকে ইরান ও ইরাকের সাবেক দুই স্বৈরশাসকের সহযোগিতার ফল বলে মনে করতো-যারা তাদের মতের বিরোধীদের দমন করার জন্যে ব্যাপকভাবে কুখ্যাতি লাভ করেছিল। যাই হোক,এই দুর্ঘটনার পর ইরানের জনগণ প্রায় সমগ্র ইরান জুড়ে শোক সমাবেশ করে এই ঘটনার ব্যাপক নিন্দা জানায়। এইসব শোক সমাবেশে দীর্ঘ সময় পর প্রথমবারের মতো ইমাম খোমেনী (রহ) এর নাম উচ্চারিত হয়। ঐ সময় পর্যন্ত বিশেষ কোনো সভা-সমিতিতে ইমাম খোমেনী (রহ) সম্পর্কে কথা বলা পর্যন্ত নিষিদ্ধ এবং বিপজ্জনক ছিল।

১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দের প্রাথমিক দিনগুলোতে শাহ সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি দৈনিকে ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর বিরুদ্ধে অবমাননামূলক লেখা ছাপা হয়। এই লেখা ছাপার পর হিতে বিপরীত হয়,অর্থাৎ ইরানের জনগণ ভীষণভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এবং ঐ পত্রিকার কপিতে আগুন লাগিয়ে জনগণ তাদের ক্ষোভের তীব্রতা প্রকাশ করে। পরদিন ইরানের জনগণ এবং আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বগণ ধর্মীয় নগরী কোমে শাহের বিরুদ্ধে তাঁদের প্রতিবাদী হাত উত্তোলন করে। কিন্তু শাহী জান্তা আলেমদের এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ব্যাপক রক্ত ঝরায়। বিক্ষোভকারীদের মধ্য থেকে বেশ কয়েকজন শহীদ এবং আহত হয়।
কোমে হতাহতের এই খবর অতি দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশ জুড়ে এবার শাহ বিরোধী বিক্ষোভের ঝড় ওঠে। ইসলামী একটি ঐতিহ্য বিশেষ করে ইরানে বেশ গুরুত্বের সাথে পালিত হয়,তা হলো মৃত ব্যক্তির চেহলাম অনুষ্ঠান। ফার্সি চেহেল মানে চল্লিশ অর্থাৎ মৃত্যুর ৪০ দিনের মাথায় এই অনুষ্ঠানটি করা হয়। বাংলাদেশে চেহলাম পরিভাষাটির পাশাপাশি চল্লিশা পরিভাষাটিও প্রচলিত আছে। কোমে শহীদদের এই চেহলাম অনুষ্ঠান সারা ইরান জুড়ে পালিত হয়। ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাব্রিয শহরে পালিত চেহলাম অনুষ্ঠানটি ছিল ব্যাপক কোলাহল ও জনরবমুখর। এমনিতেই জনগণ শাহী জান্তার এই নৃশংসতার কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে ছিল,তদুপরি শাহের জল্লাদ বাহিনী তাব্রিযের জনগণের ওপর মারাত্মক হামলা চালায়। জনগণও ঐ হামলা প্রতিহত করার চেষ্টা করে। পরিণতিতে বেশ ক'জন তাব্রিযি জনতা হতাহত হয় এবং শাহী জান্তার বেশ কটি অফিস বা স্থাপনা ধ্বংস হয়।
এভাবে ধীরে ধীরে মানুষ শাহী জান্তার বিরুদ্ধে সংগঠিত এবং ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। এই ঐক্য এক সময় শাহের পতনের লক্ষ্যে জাতীয় সংহতিতে রূপ নেয়। এর কিছুদিন পরই ছিল নওরোয। ইরানের নওরোয হলো তাদের সর্ব বৃহৎ জাতীয় উৎসব। ভীষণ জাঁকজমকের সাথে তারা এই উৎসব পালন করে থাকে। এ উপলক্ষ্যে তাই লম্বা ছুটিও থাকে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো শাহী নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ইরানের জনগণ এবারের নওরোযের জাতীয় উৎসবকে জাতীয় শোকানুষ্ঠান হিসেবে পালন করে।
তাব্রিযের শহীদদের চেহলাম অনুষ্ঠানের দিনও আরেক বিপর্যয়কর দুর্ঘটনা ঘটে। এই দুর্ঘটনা ঘটে ইয়ায্দ শহরে। ইয়ায্দ ইরানের কেন্দ্রীয় শহরগুলোর একটি। এখানেও তাব্রিযের মতোই বেশ কয়েকজন শাহ-বিরোধী বিক্ষোভকারী শাহাদাত লাভ করে। এখানকার বিক্ষোভকারীগণ শাহের কারাগারে আটক রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি এবং শাহের পদত্যাগ দাবী করে।

এভাবে একের পর এক দুর্ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সকল বৃহৎ শহরেই প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।জনগণ স্বৈরাচারী শাহের পদত্যাগ চেয়ে শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত করে তোলে ইরানের আকাশ-বাতাস। শাহের পতন গণদাবীতে পরিনত হয়।ইমাম খোমেনী (রহ) প্রয়োজনীয় মুহূর্তে জনগণের উদ্দেশ্যে প্রেরণাদায়ক বিবৃতি দিতে থাকেন। বিবৃতিতে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চালিয়ে যাবার জন্যে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন। এরকম উল্লেখযোগ্য একটি বিবৃতি হলো জুলাই আটাত্তুরের সংকলিত বিবৃতি। ঐ বিবৃতিতে ইসলামী বিপ্লবের নীতি-আদর্শ এবং আন্দোলন প্রক্রিয়ায় জনগণের করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এই বিবৃতিতে অমানবিক শাহী সরকারের সাথে সকল প্রকার সমঝোতা বা আপোষ করাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। অবশ্য ইমাম অপর এক বিবৃতিতে শাহের সামরিক ও আইন-শৃক্সক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনগণের ওপর হামলা চালানো থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন।

১৯৭৮ সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝিতে শাহী জান্তা ভয়াবহ নির্যাতন চালায়। এমনকি তারা ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর আবাদানের একটি সিনেমা হলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তাদের এই পাশবিক গণহত্যার শিকার হয় অন্তত ৩৮০ জন নিরীহ মানুষ। শাহ সরকার এই কাজটি করে গণহত্যার দায় বিপ্লবপন্থীদের কাঁধে চাপাতে চেয়েছিল। কিংবা তাতে লাভ হয় নি,সবাই দেখেছে এটা শাহের ভাড়াটে বাহিনীর কাজ। এই নৃশংস ঘটনার কিছুদিন পর মার্কিনপন্থী শাহের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জামশিদ অমুযগার বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেন। এই সময় রেযা শাহ পাহলভি জনগণকে ধোকা দেওয়ার জন্যে শরিফ ইমামীকে সরকার প্রধানের দায়িত্ব দেন। এই সরকারকে তখন জাতীয় সংহতির সরকার বলে অভিহিত করা হয়। একইভাবে শাহ ইরানের জাতীয় দিনপঞ্জীকে হিজরী সৌর ক্যালেন্ডার থেকে শাহানশাহী ক্যালেন্ডারে পরিবর্তন করে। এই ঘটনায় জনগণ আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে,যার ফলে শাহ তার এই সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বাধ্য হয়।
জাতীয় সংহতির সরকারের স্বরূপ উন্মোচিত হতে খুব একটা সময় লাগে নি। ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ঈদুল ফিতরের নামাযের পর মুসল্লিরা স্বতস্ফূর্তভাবে বিশাল মিছিল বের করে। তেহরানসহ সারা ইরানের প্রায় সকল ঈদগাহেই মুসল্লিরা ঐ মিছিল করে। মিছিলের শ্লোগানে তারা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবী জানায়। এর কিছুদিন পর জনগণ আরো বড়ো আকারের মিছিল বের করে। বিপ্লব ত্বরান্বিত হবার পথে এ ছিল অনেক বড়ো অগ্রগতি।১৯৭৮ সালের ৮ই সেপ্টেম্বরের ঐ মিছিলে শাহ হামলা চালায়। ঐ হামলা বহু লোক হতাহত হয়। মিছিলে নারী-শিশুসহ লক্ষাধিক লোক আভ্যন্তরীণ স্বৈরাচার এবং বিদেশী আধিপত্যবাদী শক্তির হাত থেকে স্বদেশের মুক্তি কামনা করে শ্লোগান দেয়। ঐ মিছিলের ওপর শাহী সেনারা আকাশ এবং স্থলভাগ থেকে হামলা চালায়। হামলায় অন্তত ৩ হাজার লোক শহীদ হয়। এই দিনটি ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাসে কালো জুমা এবং শহীদ দিবস বলে অভিহিত করা হয়েছে।

কালো জুমার গণহত্যার প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলো যদিও নীরব থেকেছে তারপরও বিশ্ববাসী কিন্তু ক্ষুব্ধ হয়েছে। এই ঘটনার পর শাহ সরকারের অভ্যন্তরে তো বটেই এমনকি শাহের পৃষ্ঠপোষকতাকারী পশ্চিমা দেশগুলোতেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সবাই আর আগের মতো একচেটিয়াভাবে শাহের গণবিরোধী নীতি পদ্ধতিকে সমর্থন না দিয়ে অনেকেই কঠোরতার পরিবর্তে কিছুটা নরম হবার মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থান প্রতিহত করার পরামর্শ দেয়। দ্বিতীয় পরামর্শটি শাহ অল্প সময়ের জন্যে গ্রহণ করে। এ সময় শাহ তার সংগঠিত দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল রিজারেকশন পার্টির বিলুপ্তি ঘোষণা করে। অবশ্য দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠিকে এই পার্টিকে ঘৃণার চোখে দেখতো। কারণ হলো এই পার্টি ছিল একক শাসন ক্ষমতা এবং স্বৈরাচারী শাসনের দৃষ্টান্ত।
যাই হোক এ রকম এক পরিস্থিতিতে শাহের হৃদ-স্পন্দন হিসেবে পরিচিত তেল শ্রমিকরাও শাহের নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে জনগণের কাতারে দাঁড়ালো এবং জনগণের সাথে হরতালে যোগ দিল। ইমাম খোমেনী ( রহ ) তেল শ্রমিকদের এই বৈপ্লবিক এবং বীরত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্যে তাদের প্রশংসা করে বিবৃতি দেন। এই সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে যা বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে। ঘটনাটি হলো ইরাকের তৎকালীন বাথ সরকারের সেনারা ইরানের শাহের সাথে আঁতাত করে ইরাকে নির্বাসিত ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর বাসভবন ঘেরাও করে। শাহ চেয়েছিল ইমামকে ইরাকের নাজাফ থেকে সরিয়ে দিতে। তাই তাঁকে সরানোর অজুহাত হিসেবে তৎকালীন ইরাকের প্রেসিডেন্ট ইমামকে বলেছিল-শাহের নির্যাতনের ব্যাপারে চুপ থাকতে হবে অথবা ইরাক ছেড়ে যেতে হবে। কিন্তু ইমাম বিপ্লবের নির্দেশনা দেওয়াকে নিজের দায়িত্ব বলে মনে করলেন। যেই আন্দোলনের জন্যে হাজার হাজার মানুষ শহীদ হয়েছে এবং প্রাণবাজি রেখে দেশের আপামর জনগণ আন্দোলন করে যাচ্ছে, সেই আন্দোলনের বিপ্লবী কর্মীদের ওপর অত্যাচারের ঘটনায় তিনি চুপ করে থাকতে পারেন না। তাই তিনি ইরাক ত্যাগ করাকেই নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করলেন। ইরাকের বাথ সরকার এবং শাহের ইমাম বিরোধী পদক্ষেপ থেকেই প্রমাণিত হয় যে তাঁর নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা এবং তাঁর বক্তব্য মানুষের ওপর কতোখানি প্রভাব বিস্তারকারী ছিল। ইমাম প্রথমে চেয়েছিলেন কুয়েতের দিকে যেতে। কিন্তু কুয়েত সরকারও তাঁকে বরণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। স্বৈরাচারী পাহলভি সরকার তখন ভেবেছিল এই কাজ করে বিপ্লবী আন্দোলনকে দমিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।

কিন্তু না। ইমাম শেষ পর্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে প্যারিসে যাবার সিদ্ধান্ত নেন এবং প্যারিসে যাবার পর বিপ্লবী আন্দোলনে অগ্রগতির ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা সংযোজিত হয়। স্বৈরাচারী শাহ ভেবেছিল প্যারিসে যাবার ফলে ইমামের সাথে জনগণের দুরত্ব সৃষ্টি হবে। অথচ ফলাফল হলো ঠিক বিপরীত। ইসলামী বিপ্লবের পক্ষে প্রচারণা চালানো এবং বিশ্ববাসীর সামনে শাহের স্বেচ্ছাচারিতা ও দমন-পীড়নের চিত্র তুলে ধরতে আরো বেশি সুযোগ সৃষ্টি হলো। পরবর্তী আসরে সে সম্পর্কে আরো নতুন নতুন তথ্যবহুল ইতিহাস তুলে ধরার ইচ্ছে রইলো।#

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক - সাত

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয় ফরাশি বিপ্লব বা রুশ বিপ্লবের তুলনায় কিছুটা দ্রুত সংঘটিত হয়েছিল। ইরানী জনগণের শাহ বিরোধী আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিচিত্র ঘটনা শেষ ছয় মাসে বিস্ময়কর দ্রুততার সাথে বিপ্লব বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। এইসব বিচিত্র ঘটনার একটি হলো বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ) কে ফ্রান্সে নির্বাসনে পাঠানো। এই ঘটনাটি বিপ্লব বিজয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।

প্যারিসের নিকটবর্তী নৌফেল লুশাতু গ্রামে অবস্থানকালে ইমাম আঞ্চলিক এবং পশ্চিমা সাংবাদিকদের বহু সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এবং ইরানী,অ-ইরানী বড়ো বড়ো অনেক ব্যক্তিত্ব তাঁর সাক্ষাতে গেছেন। আসলে দূরদর্শিতা এবং র্সক্ষ্ম চিন্তাশক্তির কারণে ইমাম প্যারিসে চার মাস অবস্থানকালে পাহলভি সরকারের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করার ক্ষেত্রে এবং ইসলামী বিপ্লবের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে ধারণা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এ সময় তেহরানসহ ইরানের অধিকাংশ বড়ো বড়ো শহরে সামরিক আইন বলবৎ ছিল। তারপরও মানুষ সেই সামরিক আইন উপেক্ষা করে শাহ বিরোধী বিক্ষোভ চালিয়ে গিয়েছিল। শাহের বাহিনী কেরমান জামে মসজিদে সেই শহরের পণেরো হাজারের মতো লোকের সমাবেশে আগুণ ধরিয়ে দিয়ে তাদের রক্ত মাটিতে ঝরিয়েছিল। তেহরানের কালো জুমার শহীদদের চেহলাম অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করতে এসেছিলো তারা।

অন্যদিকে, শাহের জন্মদিন উপলক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নসহ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ শাহকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়ে প্রমাণ করেছিল যে,তারা এখনো শাহ সরকারের ব্যাপারে আশাবাদী। এই আশাবাদ ব্যক্ত করে তারা আসলে জনগণের ওপর শাহের নির্যাতনের বিষয়টি উপেক্ষা করেছিল।যাই হোক,এই পরিস্থিতিতে শাহ ওয়াশিংটনের সাথে পরামর্শ করে জনতার বিরুদ্ধে দমন অভিযানের ক্ষেত্রে আরো কঠোর হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এভাবে ১৯৭৮ সালের ৪ নভেম্বরে শাহের বাহিনী স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের মিছিলের ওপর হামলা চালায়। ঐ হামলায় অন্তত ৬০ জন মারা গিয়েছিল। সেদিন থেকেই রেডিও-টিভির কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ হরতাল শুরু করে এবং সেনাবাহিনী শাহের পক্ষে প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ এই কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।

ছাত্র হত্যার ঘটনার পর শাহ টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তৃতায় প্রকাশ্যে তার ঐ ভুল স্বীকার করে এবং এর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। শাহ আরো ঘোষণা দেয় যে জেনারেল আযহারির প্রধানমন্ত্রীত্বে একটি সামরিক সামরিক গঠন করা হবে। সময়টা ছিল তখন মুহররম মাসের শুরু। মুহররম এমন একটি মাস যে মাসে নবীজীর প্রিয় নাতি ইমাম হোসাইন ( আ ) কায়েমি স্বার্থবাদীদের জুলুম-নির্যাতন ও স্বেচ্ছাচারী আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সঙ্গি-সাথীসহ নির্মমভাবে শাহাদাতবরণ করেছিলেন। আর এ কারণেই ইমাম হোসাইন ( আ ) হলেন ইরানের জনগণের সংগ্রামের আদর্শ। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ক্ষেত্রে এর যথার্থ বাস্তবতা একেবারেই সুস্পষ্ট।

ইমাম খোমেনী (রহ) মুহররম মাস উপলক্ষ্যে ইরানের সংগ্রামী জনতার উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বাণীতে বলেন মুহররম হলো তলোয়ারের ওপর রক্তের বিজয়ের মাস। তাই সংগ্রামী আন্দোলনকে আরো কঠোর ও বেগবান করতে হবে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এবং কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে সবাই এগিয়ে যেতে হবে। জালেম পাহলভি সরকার এবং স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের ভিত উপড়ে ফেলে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে-যেই শাসন ব্যবস্থা কায়েমের জন্যে ইরানের নির্যাতিত জনগণের উত্থান ঘটেছে। মজা ব্যাপার হলো ইরানের বিভিন্ন শহরে তখনো ছিল সামরিক শাসন। তা সত্ত্বেও জনগণ অভিনব কায়দায় রাতের বেলা নিজেদের বাড়ির ছাদে উঠে একই সময়ে একইসাথে ইসলামী বিপ্লবের পক্ষে এবং শাহের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিত। সামরিক শাসন সত্ত্বেও জনগণ নজিরবিহীনভাবে বীরত্ব দেখিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শাহ বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিল। আন্দোলনের তীব্রতায় এক সময় ইরানের প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয় এবং কার্যত সমগ্র দেশ অচল হয়ে পড়ে।
মুহররমের নবম দিনটি হলো তাসুয়া আর দশম দিনটি আশুরা। ইমাম হোসাইন ( আ ) এর শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এই দুটি দিনকে শোক-সন্তপ্ত ইরানী জাতি সাধারণত একটু ভিন্নভাবে পালন করে। এই দুটি দিনের প্রভাব তাদের ওপর এতো বেশি যে,তারা নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত থাকে। বিভিন্ন তথ্যপঞ্জী থেকে জানা যায়,সেবার দশই মুহররম অর্থাৎ আশুরার দিনে তেহরানের রাস্তায় প্রায় ৪০ লক্ষ জনতা সমবেত হয়েছিল এবং অন্যান্য শহরে সমবেত হয়েছিল ১ কোটি ৬০ লক্ষ লোক। অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে তারা শাহ বিরোধী বিক্ষোভ পালন করে। ঐ বিশাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠান থেকে শাহের পতন এবং ইসলামী হুকুমাত কায়েমের দাবী জানানো হয়। সমগ্র ইরান জুড়ে পালিত এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠানের ফলে শাহের ভিত কার্যত নড়বড়ে হয়ে যায়। ইমাম খোমেনী (রহ) এই বিশাল মিছিলকে গণভোট বলে অভিহিত করেন,যেই গণভোটে জনগণ দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা শাহকে চায় না।
শাহের বিরুদ্ধে ইরানী জনতার স্বতস্ফূর্ত অভ্যুত্থান দেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইরান পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্যে আমেরিকার গুয়াডলুপ দ্বীপে একটি বৈঠক আয়োজন করতে ফ্রান্স-বৃটেন এবং জার্মানীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল। ১৯৭৯ সালের ৩ জানুয়ারিতে এই গোপন বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে ইরান থেকে শাহের বের হওয়া,জাতীয় সরকার ধরনের একটি সরকার গঠন এবং ইরানে আমেরিকার পক্ষ থেকে প্রতিনিধি প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। পরের দিনই আমেরিকার উচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল রবার্ট হাইযার গোপনে ইরানে এসে মার্কিন দূতাবাসের সহযোগিতায় ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা করে।
আযহারির সরকার মাস দেড়েক টিকে ছিল। এই দেড় মাসে তারাও অনেক অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছিল জনগণের ওপর। তারপরও তারা কিছুতেই জনগণের বিশাল ও বিপ্লবী আন্দোলনকে দমন করতে পারে নি। সেজন্যে আমেরিকা গুয়াডলুপ বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আযহারীর স্থলে শাপুর বখতিয়ারকে বসায়। বখতিয়ার যখন শাসনভার গ্রহণ করে তখন ইরানের বহু শহর শাহের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। মূলত এ সময় সরকার পরিচালনার ক্ষমতা কার্যত সরকারের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। আমেরিকা এ সময় ভেবেছিল,শাহ যদি ইরান থেকে চলে যায় তাহলে জনগণ শান্ত হয়ে যাবে,কেননা জনগণ শাহকেই সমূহ অত্যাচার-নির্যাতনের জন্যে দায়ী বলে মনে করে।

জেনারেল হাইযার শাহের সাথে বহু আলাপ-আলোচনার পর তাকে ইরান ত্যাগ করতে রাজি করে। শাহ সবসময়ই মার্কিন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতো। এবারো তার ব্যতিক্রম হয় নি। অবশেষে ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারিতে শাহ ইরান ত্যাগ করে মিশরে চলে যায়। শাহের পলায়নের খবর প্রচারিত হবার পর সমগ্র ইরান জুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ইরানী জনগণ তাদের ঐক্য ও সংগ্রামী শক্তি দিয়ে,শাহাদাতের মতো জীবন ত্যাগ করে স্বৈরাচারী শাহকে ইরান থেকে তাড়াতে সক্ষম হয়েছিল। আমেরিকা বহুভাবে চেয়েছিল শাপুরকে জাতীয়তাবাদী রূপে তুলে ধরে তাকে ক্ষমতায় বসিয়ে রাখতে। কিন্তু জনগণ সচেতনভাবেই শাপুরকে প্রত্যাখ্যান করে বরং শ্লোগান তুলেছিল-শাহের পর এবার আমেরিকার পালা। এর কিছুদিন পর আসে ইমাম হোসাইন ( আ ) এর শাহাদাতের চেহলাম বার্ষিকী। সেদিনও জনগণ হোয়াইট হাউজের শাসকদের ভ্রান্ত নীতির বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়। বিশাল এই মিছিলের পর ইমাম খোমেনী (রহ) ঘোষণা দেন-রাজতন্ত্রের দিন ফুরিয়ে গেছে। শীঘ্রই তিনি ইরানে প্রত্যাবর্তন করবেন।
ইমামের প্রত্যাবর্তনের খবর বখতিয়ারের সরকার এবং আমেরিকার জন্যে নতুন সংকট নিয়ে আসে। সরকার ইমামের প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে দেশের বিমান বন্দরগুলো বন্ধ করে দেয়। মার্কিন দূত জেনারেল হাইযার গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ করার লক্ষ্যে এবার তার সর্বশেষ চেষ্টা চালালো। সে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাবার চেষ্টা করলো। কিন্তু ইমাম খোমেনী (রহ) একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পেতেন না। তাই সমূহ বিপদ জেনেও আল্লাহর ওপর ভরসা করে বিপ্লবকে কাছে থেকে দেখার লক্ষ্যে সকল প্রকার হুমকি-ধমকিকে উপেক্ষা করে ১৯৭৯ সালের ফেব্র"য়ারি মাসের ১ তারিখে ইরানে প্রত্যাবর্তন করেন। লক্ষ লক্ষ জনতা সেদিন যেভাবে ইমামকে স্বাগত জানিয়েছিল,তা থেকেই ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ব্যাপারে সকল দ্বিধা-সঙ্কোচের অবসান ঘটলো। তেহরানে ইমামের উপস্থিতি বিপ্লব বিজয়কে দ্বিগুণ ত্বরান্বিত করে।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কয়েকদিন পর ইমাম খোমেনী (রহ) মেহেদি বাযারগানকে অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। আগে থেকেই তিনি বিপ্লবের বিভিন্ন বিষয় সমাধানের লক্ষ্যে একটি বিপ্লবী পরিষদ গঠন করে রেখেছিলেন। ইরান এবং বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লবের আশঙ্কা ছিল। তাই পুনরায় লক্ষ লক্ষ জনগণ রাস্তায় রাস্তায় মিছিল করে সেই আশঙ্কা দূর করে দেয় এবং ইমাম কর্তৃক নিয়োজিত প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তাদের সমর্থন ঘোষণা করে। এদিকে বিমান বাহিনীর শত শত কর্মকর্তা তেহরানে অবস্থিত ইমামের বাসভবনে এসে তাঁর প্রতি তাদের আনুগত্য ঘোষণা করে। এই ঘটনায় শাহী জান্তাকে আরো বেশি ক্ষুব্ধ করে তোলে। তাই শাহের বিশেষ গার্ড বাহিনী বিমান বাহিনীর তেহরানস্থ সেনাক্যাম্পে হামলা চালায়। ফলে জনতা বিপ্লবী সেনাদের সমর্থনে এগিয়ে আসে এবং সরকারী ও সামরিক গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনায় একের পর এক বিজয় লাভ করে।

এভাবে ১১ ই ফেব্র"য়ারিতে বৃহৎ পরাশক্তিগুলোর মদদপুষ্ট পাহলভি সরকারের চূড়ান্ত পতন ঘটে। একটি জাতির ঈমানী শক্তি আর বীরত্বের কাছে হেরে গিয়ে পাহলভি রাজতন্ত্র দৃশ্যপট থেকে মুছে যায় আর সূচিত হয় গণতান্ত্রিক ও ইসলামী সরকার ব্যবস্থার এক নতুন আদর্শের। যে আদর্শ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়ে বিজয় লাভ করার বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত। এই দৃষ্টান্ত স্থাপনের পর পৃথিবী জুড়ে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। মুসলমানদের মাঝে আসে আত্মবিশ্বাস। বলদর্পী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার স্পৃহা জাগে বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে। এভাবে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। #

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক - আট

ইসলামী বিপ্লবের অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য ছিল জনসমর্থন এবং তাদের স্বতস্ফূর্ত উপস্থিতি। বিপ্লবের সমর্থনে ইরানের বিভিন্ন শহরের লোকজন এভাবেই ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল। বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার জনগণের বাইরেও আলেম সমাজের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইরানে ইসলামী শিক্ষা এবং মূল্যবোধের প্রবর্তক হলেন এই আলেম সমাজ। তাঁদের এই ইসলাম চর্চার মূল কেন্দ্র ছিল মসজিদ।

সমাজের মানুষের সাথে আলেমদের রয়েছে নীবিড় সংযোগ। তাই তাঁরা জনগণের সমস্যা ও দুঃখ-কষ্ট সম্পর্কে ভালোভাবেই জানেন। সেজন্যেই আপামর জনগণ তাঁদের প্রতি ছিলেন বিশ্বাসী এবং আস্থাশীল। জনগণ তাঁদের যে-কোনো সমস্যায় আলেমদের সাথে পরামর্শ করতেন। পারিবারিক জটিলতাও নিরসন করতেন। এভাবেই আলেম সমাজ জনগণের কাছে বিশ্বস্ততা অর্জন করেছিলেন। আলেম সমাজও নিপীড়িত জনতার পক্ষ অবলম্বন করে সবসময়ই সকল প্রকার বৈষম্যের বিরোধিতা করেছেন। কেননা ; অন্যায়-জুলুম এবং বৈষম্যের বিরোধিতা করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সেজন্যেই বিপ্লব-পূর্বকালে আলেম সমাজ শাহের সকল স্বেচ্ছাচারিতা,জুলুম-অত্যাচারের বিরোধিতা করে জনগণের অধিকার রক্ষায় কাজ করেছেন।

আলেমরা যেহেতু মানুষের মাঝেই বসবাস করতেন সেজন্যেই তাঁরা জনগণের দুঃখ-দুর্দশার কথা,অভাব-অভিযোগের কথা,বঞ্চনার কথা ভালো করে জানতেন। আলেমদের এই সৎ গুণাবলীর কারণে জনগণ তাঁদের বিপ্লবী কর্মসূচি আর আন্দোলনকে যথার্থভাবেই মেনে নিয়েছিলেন। ইমাম খোমেনী ( রহ ) কে এ কারণেই ইরানের জনগণ আদর্শ নেতৃত্ব আর শ্রদ্ধা-ভালোবাসার আসনে অভিষিক্ত করেছেন নির্দ্বিধায়। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতৃবৃন্দ ছিলেন অত্যন্ত সময় সচেতন। আলেমগণ ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর বিপ্লবী চিন্তার অনুসারী ছিলেন। ইমাম খোমেনী ( রহ ) যখন নির্বাসিত জীবনযাপন করছিলেন তখন এই আলেম সমাজ বিভিন্নভাবে ইমামের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন। তাঁরা ইমামের দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শকে অপরাপর আলেমদের মাঝে এবং বিপ্লবী জনগোষ্ঠির কাছে পৌঁছে দিতেন। এভাবেই আলেম সমাজ বিপ্লবের সাথে সম্পর্কিত তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে একটি গণমাধ্যমের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর নির্দেশনা অনুযায়ী সশস্ত্র সংগ্রাম নয় বরং জনগণকে সচেতন করে তোলাই ছিল শাহের বিরুদ্ধে আলেম সমাজের সংগ্রামের উপায়।

আলেমদের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র সবসময়ই ছিল মসজিদ। ইসলামী বিপ্লবের পূর্বে আলেমগণ গুরুত্বপূর্ণ এই কেন্দ্রে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দ্বীনের প্রচার ছাড়াও রাজনৈতিক এবং বিপ্লবী বিষয়গুলো তুলে ধরতেন। আসলে ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর নেতৃত্বে ইরানে যে বিপ্লব সংঘটিত হয়,সেই বিপ্লবের একটা বড়ো অর্জন ছিল ধর্মকে রাজনীতি থেকে অভিন্ন বা অবিচ্ছিন্ন রাখা। আলেমগণ নামাযের জামাত শেষে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানে যেমন শোকানুষ্ঠানে,ঈদের অনুষ্ঠানে কিংবা এ ধরনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিপ্লবী চিন্তা-চেতনার প্রচার চালাতেন। এর ভেতর আমেরিকা এবং শাহের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্যে সকল শ্রেণীর মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানিয়ে লেখা ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর বাণী পড়ে শোনানো হতো। জনগণ এবং শাহ-বিরোধী সকল জনশক্তি আলেম সমাজকে ঘিরে ঐক্যবদ্ধ হয়।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনী ( রহ ) সবসময়ই ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পেছনে মসজিদের ভূমিকার কথা স্মরণ করতেন। মার্কিন বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও মুসলিম চিন্তাবিদ হামিদ আলগার ইমামের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। ঐ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, "বিপ্লবের সকল পর্যায়েই আলেম সমাজের ভূমিকা ছিল অগ্রগামী....জনগণকে এই আলেম সমাজই সংগঠিত করেছিলেন.....বিপ্লবের শুরু থেকেই যদি আমরা এই আলেম সমাজকে দূরে সরিয়ে রাখতাম ,তাহলে আর বিপ্লব হতো না,কেননা জনগণ অন্য কারো কথা কানে তুলতো না...।" আমরা যেমনটি ইঙ্গিত করেছিলাম,মসজিদগুলোর ভূমিকা ছিলো ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মসজিদ যদিও মুসলমানদের ইবাদাতের স্থান,তবু ইসলামে পবিত্র এই স্থানটিকে জনসমাবেশসহ বিচিত্র কাজে ব্যবহার করা হয়। রাসূলে খোদা ( সা ) মানুষের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-কলকসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতেন এই মসজিদেই। কেবল তাই নয় ,রাসূল ( সা ) মুরব্বিদের সাথে পরামর্শ বৈঠক করতেন এই মসজিদে। বিভিন্ন রণাঙ্গনে উপস্থিত হবার জন্যে সেনাদের সংগঠিত করা এবং তাদেরকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজটিও করতেন এই মসজিদে।

ইরানে অন্যান্য মুসলিম দেশের মতোই মসজিদের সংখ্যা প্রচুর। এমনকি সুদূর গ্রামাঞ্চলেও আল্লাহর এই নিয়ামতপূর্ণ স্থানটির অস্তিত্ব রয়েছে। বিপ্লবী আন্দোলন চলাকালে-বিশেষত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদির সময়-এইসব মসজিদে জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি ছিলো। আর ধর্মীয় আলেম-ওলামাগণ বিশাল এই জনসমাবেশে যখন বক্তৃতা দিতেন তখন তাঁরা কায়েমি স্বার্থবাদ তথা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা ও কর্তব্য সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতেন। জনগণ সে সব বক্তব্য শুনে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ হতো। এভাবে এইসব সমাবেশের মাধ্যমে জনগণ সংগঠিত হতো বিশেষ করে শাহ বিরোধী বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে জনগণ অনুপ্রাণিত হতো।সুইজারল্যান্ডের বিশিষ্ট মুসলিম সাংবাদিক ও লেখক আহমদ হুবার বলেছেনঃ ইসলামী বিপ্লব সংগঠিত হবার পেছনে আন্দোলনের প্রতি অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে মসজিদের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ব্যাপারে পাশ্চাত্য একেবারেই ছিল অনবহিত। শাহ এবং মার্কিন সরকার যখন ব্যাপারটা বুঝতে পারলো, তখন আর তাদের কিছুই করার ছিল না।

জনগণকে সংগঠিত করা ছাড়াও তথ্য আদান-প্রদান এবং যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবেও মসজিদের ব্যবহার হতো। আলেমগণ এবং বিপ্লবী যুবকরা জনগণকে বিপ্লব সম্পর্কে সচেতন করে তুলতেন আর স্বৈরাচারী শাহ যে বিভিন্নভাবে জনগণের মাঝে বিচ্ছন্নতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে সে ব্যাপারেও সতর্ক করতেন। ইরানে মার্কিন কূটনীতিক জন স্ট্যাম্পল তাঁর লেখা "ইরান বিপ্লবের নেপথ্যে " নামক গ্রন্থে লিখেছেন,"বিপ্লব সংক্রান্ত বার্তা বিশ্বস্ততার সাথে এবং সবচে দ্রুত এক শহর থেকে আরেক শহরে পৌঁছানোর মাধ্যম ছিল মসজিদ। বিশ্বস্ত এবং উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন আলেমদের মাধ্যমেই এই কাজটি পরিচালিত হতো।" ইরানী প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা এবং যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর হামিদ মাওলানা বলেছেন-ইরানের ইসলামী বিপ্লব মসজিদের মাধ্যমে সংগঠিত এবং পরিচালিত হয়েছে।

ইমাম খোমেনী ( রহ ) মসজিদকে খন্দক বা পরিখা বলে অভিহিত করে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের প্রতি মসজিদে তৎপর উপস্থিতির আহ্বান জানিয়েছেন। সেইসাথে শাহ,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের নির্যাতন-নিপীড়নের কথা ফাঁস করে দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের নেপথ্যে আলেম সমাজ এবং মসজিদের ভূমিকার একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র লক্ষ্য করা যাবে ক্ষমতার মরীচিকা নামক গ্রন্থে। এই বইটি লিখেছেন ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের লেখক রবার্ট গ্রাহাম। তিনি লিখেছেন,বাস্তবতা হলো এই যে,ইরানের আলেম সমাজ জনগণের মাঝেই বসবাস করেন। সেজন্যেই জনগণের সাথে তাঁদের সম্পর্ক বা যোগাযোগ খুবই ঘনিষ্ট। তাই জনগণের চিন্তা-চেতনা,আবেগ-অনুভূতি সম্পর্কে তাঁরা অন্যদের চেয়ে বেশি জানেন এবং বোঝেন। আর মসজিদ হলো আপামর জনগণের জীবন প্রবাহের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখন আলেম সমাজ কোনো নীতি-আদর্শের বিরোধিতা করেন,তখন জনগণ তাঁদের ঐ দৃষ্টিভঙ্গিকে কঠিন পরিস্থিতির মাঝেও গ্রহণ করতে দ্বিধা করে না।
অন্যদিকে,আলেমদের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মসজিদ পদ্ধতি সর্বস্তরের জনগণের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপনের একটা বিশাল শক্তি হিসেবে কাজ করে। #

 

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক - আট

 

পাঠক! গত আসরে আমরা ইরানের ইসলামী বিপ্লবে বিভিন্ন শ্রেণীর জনগণের স্বতস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং বিপ্লব বিজয়ের ক্ষেত্রে আলেম সমাজের প্রভাবশালী ভূমিকার কথা বলার চেষ্টা করেছি। এর বাইরেও কিন্তু বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ দুটি শ্রেণীর যথেষ্ট অবদান ছিল। তাদের একটি হলো যুবক সম্প্রদায় এবং অপরটি নারী সমাজ। ইসলামী বিপ্লবের ক্ষেত্রে এই দুটি শ্রেণীর ভূমিকা নিয়ে আজকের আসরে আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো।

বিভিন্ন দেশে দেখা যায় যে,সাধারণত যুবক শ্রেণীকেই উদ্দীপনাময় শক্তি বলে মনে করা হয়ে থাকে। আসলেও তাই। সচেতন ও শিক্ষিত যুবকরাই সমাজের উন্নয়ন ও সৌভাগ্যের প্রতিভূ। পাহলভি শাসনামলে জনসংখ্যার বৃহদাংশই ছিল তরুণ। সে সময় যেহেতু ধ্বংসাত্মক শাসন চলছিল,সেজন্যে যুবক শ্রেণী তাদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও মর্যাদা হারিয়ে বসেছিল। স্বৈরাচারী শাহ তখন দেশে একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা হরণ করেছিল। অপরদিকে,শাহ সরকার চেষ্টা করতো যুবকদের চিন্তাশক্তিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে যাতে তারা দেশ নিয়ে ভাববার অবকাশ না পায়। এ লক্ষ্যেই শাহ সরকার যুবকদের জন্যে সামাজিক নীতি-নৈতিকতার সকল বন্ধন খুলে দিয়েছিল,যাতে যুবকরা সহজেই মূল্যবোধহীন পার্থিব জগতের মজা লুটতে পারে।

ইমাম খোমেনী (রহ) তাঁর দূরদৃষ্টি দিয়ে যুবকদের চরিত্র হননের এই পরিকল্পনার ক্ষতিকর দিকটি অনুভব করতে পেরে এ ব্যাপারে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছিলেন। ইমাম বলেছেন-তারা পরিকল্পিতভাবে আমাদের যুবকদেরকে চরিত্রহীনতার দিকে ঠেলে দিয়েছে যাতে তারা উদাসীন হয়ে পড়ে.....এই যুবকেরা যেন দেশ নিয়ে আর চিন্তাই করতে না পারে।
কিন্তু শাহের যেসব অনুচর নীতি-নৈতিকতাহীন এইসব কর্মসূচি বা প্রচারণার পরিকল্পনাকারী ছিল,যুবকদের ধর্মীয় অনুভূতি সম্পর্কে আসলে তাদের সঠিক ধারণা ছিল না। অবশ্য একদল যুবক শাহের প্রতারণার স্বীকার হয়েছিল ঠিকই,তবে বেশিরভাগ যুবকই পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন ছিল এবং শাহের প্রতারণার ফাঁদে তারা পা দেয় নি।

যুবকদের দৃষ্টিতে ইরানী যুবকদেরকে বিচ্যুতির পথে পরিচালিত করার কৌশলই ছিল পাহলভি শাসনের বিচ্যুতির সুস্পষ্ট নিদর্শন। শাহের এই অশুভ পরিকল্পনার জন্যে স্বয়ং যুবকরাই উল্টো শাহকে ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করেছিলো। যুবকদের এইসব বিষয়ে সচেতন করে তোলার ক্ষেত্রে বা তাদেরকে জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে ইমাম খোমেনী (রহ)সহ আরো অনেক বিপ্লবী ব্যক্তিত্বের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের তরুণ প্রজন্ম বিপ্লবী শ্লোগানগুলোর মধ্যে ইসলামের পরিচয়,ন্যায়কামিতা,স্বাধীনতার স্পৃহা,জুলুম অত্যাচারের নেতিবাচকতা ইত্যাদি বিষয় উপলব্ধি করতে পেরেছিল-যা তারা নিজেরাই কামনা করতো। ফলে বিপ্লবের যুব প্রজন্ম ধীরে ধীরে বিপ্লবমনা হয়ে ওঠে এবং বৃহৎ শক্তি হিসেবে বিপ্লবের বিশাল অঙ্গনে নিজেদের অস্তিত্বের স্বাক্ষর রাখে। ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দেই দেখা গেছে বিপ্লবী জনতার কাতারে ইরানী যুবকরাই অগ্রগামী।

যুবকরাও জনগণের মাঝে বিপ্লবী আমেজ সৃষ্টির ব্যাপারে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। বিপ্লব বিজয়ের ক্ষেত্রে তাই যুবকদের অবদান অনস্বীকার্য।বিশাল বিশাল যেসব মিছিল হয়েছিল বিপ্লবের আগে সেসব যুবকরাই আয়োজন করতো এবং বাস্তবায়ন করতো। এছাড়াও পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায় যুবকদের ওপর বিভিন্নরকম দায়িত্ব ছিল। বিপ্লব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যুবকরা তাদের ধর্মীয় ও জাতীয় পরিচয় খুঁজে পেয়েছিল এবং ভবিষ্যত ইরান গড়ার দায়িত্বানুভূতি তাদের মাঝে জেগে উঠেছিল। যুবকদের প্রতি ইমামের বিশ্বাস এবং ইমাম ও তাঁর নেতৃত্বের প্রতি যুবকদের আস্থা বিপ্লব পরবর্তীকালেও যুবক শ্রেণীকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী এবং দৃঢ় মনোবল হতে সাহায্য করেছে। বিপ্লবের পরবর্তী ক'বছরে মুমিন এবং বিপ্লবী যুবকদের মাঝে গণজাগরণ সৃষ্টি হয় এবং এই বীর যুবকরাই স্বৈরাচারী সাদ্দাম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বদেশের মর্যাদা রক্ষা করে।

 

বিভিন্ন দেশে সাধারণত যুবক বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত ছাত্রদেরকেই বোঝায় যারা দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাতা। যে-কোনো দেশেরই বিশ্ববিদ্যালয়ের যুবকরা হলো সেই দেশের সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে অন্যদের তুলনায় খানিকটা বেশি সচেতন। এ কারণেই জুলুম-অত্যাচার,অন্যায়-বৈষম্যের মোকাবেলায় যুবকরাই সবসময় সবার আগে এগিয়ে আসে। ইরানী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের ক্ষেত্রেও এই সত্য সমানভাবে প্রযোজ্য। বিপ্লবের আগে শাহ ইরানী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদেরকে তেল শিল্প জাতীয় করণের মতো ঘটনায় তাদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে চেষ্টা করেছিল সকল বিশ্ববিদ্যালয়কে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে। অন্যদিকে শাহ চেয়েছিল সমাজে অন্যায় এবং ফেৎনা-ফাসাদ ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের মাঝেও পশ্চিমা সংস্কৃতির বিস্তার ঘটাতে।
কিন্তু তাতে কাজ হয় নি, কেননা ছাত্ররা শাহের নির্যাতন,বৈষম্য এবং স্বেচ্ছাচারিতা যেমন প্রত্যক্ষ করেছে,তেমনি দারিদ্র্যের কষাঘাতে লাঞ্ছিত জনগোষ্ঠির হাহাকারও দেখেছে। সেজন্যে তারা শাহপন্থী না হয়ে বরং তার বিরোধিতা করেছে। তারা বরং শাহকে পশ্চিমাদের প্রতি বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্টের কাছে নতজানু হতে দেখে বিস্মিত হয়েছে।

ইতোমধ্যে বামপন্থী দলগুলো এবং ভিন্ন মতাবলম্বীরা এই সুযোগে শাহের বিরোধিতাকারীদেরকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর জন্যে উঠেপড়ে লেগে যায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের মাঝে মুসলিম ছাত্রদের সংখ্যা বেশি থাকায় এবং শহীদ আয়াতুল্লাহ মোতাহহারী,শহীদ মোফাত্তেহ,ডঃ শরিয়াতীর মতো ব্যক্তিত্ববর্গের প্রচেষ্টার ফলে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে ধর্মীয় বিষয়-আশয় চর্চাকারীদের জন্যে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ইরানী জনগণের অভ্যুত্থানের শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররা জনগণের কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শাহ বিরোধী জনসমাবেশের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো দুই অঙ্গনের বিদ্যান শ্রেণী অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসমাজ আর আলেম সমাজ এক কাতারে এসে দাঁড়ায়।

ইমাম খোমেনী (রহ) যুবকদেরকে মুসলিম দেশগুলোর জন্যে এবং ইসলামের জন্যে আশার সঞ্চারকারী সম্পদ বলে মন্তব্য করেন।তিনি আরো বলেছেন,অঙ্গীকারাবদ্ধ দৃঢ়চেতা যুবকরাই পারে ইসলামী উম্মত এবং বিভিন্ন দেশের মুক্তির জন্যে নৌকার মতো আশ্রয়স্থল বা মুক্তির উপায় হতে। যে-কোনো দেশেরই স্বাধীনতা, মুক্তি, উন্নয়ন প্রভৃতি সংশ্লিষ্ট দেশের যুব সম্প্রদায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম বা অবদানের কাছে ঋণী।
আরেকটি শ্রেণীর কথা আমরা বলেছি,বিপ্লব বিজয়ের পেছনে যাদের অবদান অনস্বীকার্য। ইরানের মূল জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হলো নারী। এই নারীরা জনসংখ্যার অপর অংশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। উদাহরণত বলা যায়, রেযা খান পাহলভি চেয়েছিল ইরানী নারীদেরকে হিজাব না পরতে বাধ্য করতে এবং ছলে-বলে-কৌশলে তাদেরকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে পশ্চিমা আদর্শ ও সংস্কৃতির অনুসারী হিসেবে গড়ে তুলতে। কিন্তু ইরানের মহিয়সী রমনীরা ইসলামী মূল্যবোধ বিরোধী পশ্চিমা সংস্কৃতিকে গ্রহণ না করে ইসলামের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রদর্শন করে বীরাঙ্গনার পরিচয় দিয়েছে। এদিকে ইমাম খোমেনী (রহ) তাঁর যথার্থ ও বিচক্ষণ নেতৃত্ব দিয়ে এবং সমাজে নারীদের যথাযথ স্থান কোথায় তা দেখিয়ে দিয়েছেন। নারীদেরকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে বিপ্লবের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী সমাজের করণীয় সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দিয়ে বিশাল এই নারী জনগোষ্ঠিকে তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন। নারী সমাজও তাদের নিজস্ব দায়িত্ব পালনে তৎপর হয়ে ওঠে। ইমাম খোমেনী (রহ) সমাজে নারীদের ভূমিকা সম্পর্কে বলেনঃ নারী হলো সমাজের শিক্ষক। নারীর আঁচলের নিচেই বেড়ে ওঠে মানুষ। নারীরা যথার্থ প্রশিক্ষণ দিয়ে মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে এবং যথার্থ প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তারা দেশকেও গড়ে তোলে। নারীর আঁচলেই থাকে সকল সৌভাগ্য ও সুখের চাবি।

শাহ বিরোধী বিক্ষোভে নারীদের স্বতস্ফূর্ত ও পর্যাপ্ত উপস্থিতি শাহ বাহিনীর কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। না,কেবল বিপ্লবী আন্দোলনেই যে তারা উপস্থিত ছিল তা নয়,বরং শাহ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্যে তাদের স্বামী-সন্তানদেরকেও উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর এ কারণেই ইমাম খোমেনী (রহ) বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকাকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন।

বিপ্লব বিজয়ের মধ্য দিয়ে ইরানী নারী সমাজ তাদের মূল পরিচয় ফিরে পেয়েছে। ইমাম খোমেনী (রহ) ইরানী নারী সমাজের সামনে নবীকন্যা ফাতেমা (সা), নবীজীর নাতনি হযরত যেয়নাব (সা) প্রমুখ মহিয়সী নারীদের আদর্শ তুলে ধরে তাদের অনুসরণের জন্যে অনুপ্রাণিত করেন। বিপ্লবের পর ফ্রান্সের বিশিষ্ট সাংবাদিক ইরান সফর করে লিখেছেন-ইরানে সবাই সামাজিক এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের জন্যে ইসলামী হুকুমাত কায়েমের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে লক্ষ্যনীয় একটি বিষয়টি হলো নারীরাও পুরুষদের পাশাপাশি অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে।

বিপ্লবের পরেও নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দামের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সময় এবং ইরান পুনর্গঠনের সময় তারা বহু দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে। এ ধরনের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে ইরানী নারীরা ইসলামী বিপ্লবের প্রতি খুব ভালোভাবেই তাদের আনুগত্য প্রদর্শন করেছেন। ইমাম খোমেনী (রহ) তাঁর উপদেশবাণীর শুরুতেই লিখেছেন-আমরা খুবই গর্বিত যে আমাদের তরুণ ও বৃদ্ধ নারী সমাজ তাঁদের মেধা ও মনন দিয়ে অর্থনীতি,সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখে যাচ্ছেন। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও ইসলাম এবং কোরআনের পথে কাজ করে যাচ্ছে।

অবশ্য ইরানের ইসলামী বিপ্লবে বলা যায় সর্বস্তরের মানুষই অংশগ্রহণ করেছিল। দেশ ও ইসলামের ব্যাপারে সবাই মোটামুটি নিজস্ব অবস্থান থেকে অবদান রেখেছিল। বিপ্লবের শুরু থেকে চলমান আন্দোলনের সময় আরো অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বের অবদানও অবশ্যস্বীকার্য।

 

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-১০

মানুষ যে যেই মতাদর্শেরই অনুসারী হোক না কেন, মহান ব্যক্তিত্বদের মহতী ভূমিকাকে অস্বীকার করতে পারে না। বরং তাদের উন্নত চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবের কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন। সেজন্যে বিভিন্ন বিপ্লব পর্যালোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বা বিষয়টি হলো বিপ্লবের মহান নায়কদের চেনা। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রমাণ করছে যে যথার্থ চিন্তা এবং সময় জ্ঞান বিপ্লবকে সেই শুরু থেকে বিজয় লাভ করা পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে গেছে এবং বিজয়ের পরও বিপ্লবের পরিপূর্ণতা বা সামগ্রিকতার জন্যে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করেছে।

ইমাম খোমেনী ( রহ ) ইসলামী বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা বা মূল স্থপতি। ইমাম যতদিন বিপ্লব নামক তরণীর কর্ণধার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন,ততোদিন বিপ্লবকে নস্যাৎ করার জন্যে দেশী-বিদেশী শত্র"দের ষড়যন্ত্র অথবা বিপ্লবকে তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করার শত চেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু ইমাম খোমেনী ( রহ ) যিনি বিপ্লবের চারাগাছে বহু আগে থেকেই পানি ঢেলে এসেছেন,তিনি সুচিন্তিত ও দূরদর্শী রাজনীতির আলোকে সচেতন পদক্ষেপ নিয়ে শত্রুদের সকল ষড়যন্ত্রই ব্যর্থ করে দেন। সমাজ বিজ্ঞানী এবং গবেষকগণ সেজন্যেই ইমামকে ইসলামী বিপ্লবের প্রাণ বা আত্মা বলে স্মরণ করেছেন। আমরা বিগত আসরগুলোতে ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর অবদান নিয়ে কথা বলেছিলাম। এখানে ইমাম খোমেনী ( রহ ) সম্পর্কে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর ছোট্ট অথচ অর্থবহ বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

সমকালীন বিশ্বের স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব অর্থাৎ রুহুল্লাহ খোমেইনী একজন সৎ জ্ঞানী, পরহেজগার,রাজনীতিতে দক্ষ মনীষী,নতুন চেতনার একজন মুমিন,প্রাগ্রসর একজন আরেফ বা আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব,ন্যায়নীতিবান শাসক এবং একজন ত্যাগী মুজাহিদ ছিলেন। ধর্মীয় দায়িত্বানুভূতিই তাঁকে ঐতিহাসিক বিপ্লবের আন্দোলন সংগ্রামের ময়দানে নিয়ে এসেছে। যেই বিপ্লব ব্যতিক্রমধর্মী কিছু ব্যক্তিত্বকে ছাড়া হয়তো ইতিহাসের পাতায় স্থান নাও পেতে পারতো কিংবা বিপ্লব বিজয়ও হয়তো নাও হতে পারতো। ইরানের আধ্যাত্মিক বিপ্লবে সবসময়ই মিম্বার এবং খোৎবা বার্তা পৌঁছানোর জন্যে বিশেষ একটা মাধ্যম ছিলো। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বিপ্লবী আলেমদের একটি দল ওয়াজ-নসীহত আর খুৎবা দিয়ে ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর সুরে সুর মিলিয়ে জনগণকে সচেতন করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্বৈরাচারী শাহের যে কোনো বৈধতা নেই জনগণকে তাঁরা তা বোঝাতেন।

মসজিদ-মাদ্রাসাসহ যেখানেই তাঁদের কথা বলা বা ওয়াজ করার সুযোগ হতো সেখানেই তাঁরা শাহের অনৈতিকতা আর ভয়াবহ দুর্নীতি সম্পর্কে জনগণকে ধারণা দিতেন। সেইসব মসজিদ-মাদ্রাসা বা প্রতিষ্ঠান আজ সেই মহান আলেমদের নামের স্মৃতি বহন করে চলেছে। যেমন হেদায়েত মসজিদ,এটি আয়াতুল্লাহ ত্বলেগনীর নামের সাথে সম্পৃক্ত। মরহুম আয়াতুল্লাহ ত্বলেগনী ইসলামী বিপ্লবের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন এবং ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর খুবই ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ছিলেন।

আয়াতুল্লাহ ত্বালেকানির রাজনৈতিক তৎপরতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে রেযা খান পাহলভির সময় থেকেই তিনি তাঁর সংগ্রাম শুরু করেছেন। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের অভ্যুত্থান পর্যন্ত তাঁর এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। ত্বালেকানী তেল শিল্পের জাতীয়করণ করার ঘটনাকে একজন সংগ্রামী আলেম হিসেবে সমর্থন করেন। এ সময় তিনি হেদায়েত মসজিদে কোরআনের তাফসিরের ক্লাস চালু করেন এবং এইসব ক্লাসে তিনি স্বৈরাচারী শাহের সমালোচনা করেন। এভাবেই হেদায়েত মসজিদ ধর্মীয় আলেম ও চিন্তাবিদগণের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়। শাহের অত্যাচার-জুলুম থেকে ইরানী জনগণকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে তার বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর নেতৃত্বে যে আন্দোলনটি গড়ে উঠেছিল,জনাব ত্বালেকানি সবসময়ই সেই আন্দোলনের প্রথম সারিতে ছিলেন। আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি তাঁর সমচিন্তার অনেকের সাথে একসাথে গ্রেফতার হয়ে বহুবার কারাগারে যান।

কারাগারে তাঁর ওপর ব্যাপক অত্যাচার নির্যাতন চালানো হয়,কিন্তু তারপরও তিনি তাঁর আদর্শের প্রতি ছিলেন অনড়-অটল,কোনোভাবেই তিনি আত্মসমর্পন করেন নি। তিনি কারাগারকে পড়ালেখা বা জ্ঞান চর্চার একটি কেন্দ্রে পরিণত করেন। সেখানে তিনি ক্লাস চালু করেন। কারাবাসীদেরকে এই ক্লাসের মাধ্যমে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন করে তোলার সুযোগ পান। "কোরআনের আলো" নামক কয়েকটি সূরার তাফসির গ্রন্থটি তিনি এই কারাগারেই লেখেন। ইসলামী বিপ্লবে আয়াতুল্লাহ ত্বালেকানির অবদান সম্পর্কে একটি প্রতিবেদনে এসেছেঃ আয়াতুল্লাহ ত্বালেকানির বাসায় ব্যাপক তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়। সারারাত তাঁর বাসায় লোকজন আসা-যাওয়া করে। তাদের সাথে অনেকের যোগাযোগও আছে। ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর পক্ষ থেকে বহু লোক তাঁর বাসায় যাওয়া-আসা করে। স্বৈরাচারী শাহ বিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার একটা কেন্দ্র হলো জনাব ত্বালেকানির বাসা।

আয়াতুল্লাহ শহীদ ডক্টর বেহেশতিও ইসলামী বিপ্লবী চিন্তার একজন স্থপতি। ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে সংগঠিত করার পেছনে তাঁর ছিল মৌলিক ভূমিকা। ইমাম খোমেনী (রহ) আন্দোলনের বা সংগ্রামের যে রূপরেখা এঁকে দিয়েছিলেন, আয়অতুল্লাহ শহীদ ডক্টর বেহেশতি সেই রূপরেখা অনুসরণ করেই তাঁর সকল চিন্তা-চেতনা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। তিনি ছিলেন বিপ্লবের কৌশল নির্ধারণকারীগণের একজন,সৎ চিন্তার লোক ছিলেন তিনি,ছিলেন অসম্ভব দূরদর্শী,মহৎ ও সচেতন ব্যক্তিত্ব। তাঁর সমাজ চিন্তা বা রাজনৈতিক চিন্তার মূল শেকড় ছিল ইসলামী শিক্ষার মূলে প্রোথিত। ডক্টর বেহেশতিকে বলা যায় একজন ইসলাম বিশেষজ্ঞ আলেম এবং সংস্কারক। তিনি ইসলামী নীতির আলোকে সামাজিক সংস্কারের চিন্তা করতেন। তাঁর দৃষ্টিতে ইসলাম একদিকে একটা আদর্শ ও জীবনব্যবস্থা অপরদিকে সরকার এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাও বটে।

তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়েই উপস্থাপন করেছেন। ইসলামী বিপ্লবের আদর্শিক পরিচয় রক্ষা করার জন্যে তিনি তাঁর বক্তব্য দিয়ে,লেখালেখি দিয়ে মানুষের ভেতরকার সংগ্রামী ও প্রত্যয়ী চেতনাকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করতেন। সংগ্রামী চেতনা জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে ডক্টর বেহেশতির ভূমিকা ছিল অনন্য সাধারণ। বিপ্লব-সংগ্রামের কঠোর দিনগুলোতে ইমামের সাথে তাঁর সম্পর্ক এবং তাঁর প্রতি ইমামের পরিপূর্ণ বিশ্বাস জনাব বেহেশতিকে বিপ্লবের ব্য্যাপারে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিত্বে পরিনত করেছে। সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিসহ অন্যান্য বিষয়ে তাঁর ছিল ব্যাপক দক্ষতা। তিনি বুদ্ধিজীবী মহলে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরে ইসলামকে একটি কার্যকরী ও যথার্থ দ্বীন হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং সেইসাথে ইমাম খোমেনী (রহ) এর চিন্তা-চেতনাগুলো যথার্থভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত।

শহীদ আয়াতুল্লাহ ডক্টর মোফাত্তেহ ছিলেন ইসলামী বিপ্লবী চিন্তা-চেতনার অধিকারী আরেক মহান ব্যক্তিত্ব। তিনি সবসময়ই ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ক্ষেত্রে গঠনমূলক ও সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করেছিলেন। আয়াতুল্লাহ মোফাত্তেহ পাহলভি সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রে সক্রিয় উপস্থিতি ছাড়াও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ছিল তাঁর উজ্জ্বল ভূমিকা। ডঃ বেহেশতি,মোঃ জাওয়াদ ব'হুনার,অধ্যাপক মোতাহহারীর মতো ইমাম খোমেনী (রহ) এর আদর্শ দীক্ষিত ব্যক্তিত্বদের সমপর্যায়ের ছিলেন ডঃ মোফাত্তেহ। তিনি ধর্মীয় বিকৃতিগুলোকে দূর করে সঠিক ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক প্রচেষ্টা চালান। মহান এইসব ধর্মীয় ব্যক্তিত্ববর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে বহু বই-পুস্তক লেখেন এবং সামাজিক দায়-দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি যুব সম্প্রদায়কে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রাখেন।

ডঃ মোফাত্তেহ তারুণ্যদীপ্ত মনের কারণে বিপ্লব বিজয়ের ক'বছর আগে থেকে তেহরানে অবস্থিত কোবা মসজিদটিকে বিপ্লবী এবং তরুণদের পদচারণায় মুখর একটি মিলনায়তনে পরিণত করেছেন। ফার্সি ১৩৫৭ সালে ঈদুল ফিতরের নামাযের জামাতের পর বিশাল যে মিছিলটি বেরিয়েছিল তেহরানের রাজপথে, তা ছিল বিপ্লবী এই আলেমেরই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এই মিছিলের সফল অভিজ্ঞতা থেকে পরবর্তীকালে ইরানের বিভিন্ন শহরে শহরে বড়ো বড়ো মিছিল করার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল। ফার্সি এ বছরেরই ১৬ই শাহরিভারে যে বিশাল মিছিলটি অনুষ্ঠিত হয়,তা-ও ছিল ঈদুল ফিতরের সেই মিছিলের অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন। এটি ছিল তেহরানবাসীদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বৃহত্তম মিছিল।

১৭ ই শাহরিভারের বিক্ষোভ মিছিলের ওপর স্বৈরাচারী শাহের অনুচররা যেভাবে হত্যা-নির্যাতন চালিয়েছে,ঐ নির্যাতনের ফলে শাহের পতন এবং ইসলামী বিপ্লব ত্বরান্বিত হয়েছিল। আয়াতুল্লাহ মোফাত্তেহ তাঁর সংগ্রামী সাথী আয়াতুল্লাহ বেহেশতি এবং অধ্যাপক মোতাহহারীকে সাথে নিয়ে "সংগ্রামী আলেম সমাজ" গঠন করেন যাতে বিপ্লবী বাহিনীকে যথার্থ দিক-নির্দেশনা দিতে পারেন। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ঘটনায় ইমাম খোমেনী (রহ) কে যে ঐতিহাসিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল,শহীদ মোফাত্তেহ ছিলেন ঐ সংবর্ধনা প্রদান কমিটির একজন সক্রিয় কর্মকর্তা। #

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-১১

পাঠক! বিগত আসরগুলোতে আমরা ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ক্ষেত্রে আলেম সমাজ, যুব সম্প্রদায়,নারী সমাজসহ আরো অনেক ব্যক্তিত্বের অবদান সম্পর্কে বলেছিলাম। গত আসরেও এ রকম কয়েকজন ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজো আমরা তারি ধারাবাহিকতায় আরো ক'জন ব্যক্তিত্বের অবদান সম্পর্কে কথা বলার চেষ্টা করবো।

নিঃসন্দেহে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর রাজনৈতিক, আত্মিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাব সমৃদ্ধ একজন ব্যক্তিত্ব যিনি বিপ্লব বিজয়ের লক্ষ্যে আন্দোলনকারীদের অন্যতম ছিলেন। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পবিত্র মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ইসলামী শিক্ষার হাতেখড়ি হয় তাঁরি সুযোগ্য পিতার কাছে। ১৯ বছর বয়সে তিনি কোমে যান এবং ইমাম খোমেনী (রহঃ),আয়াতুল্লাহ বুরুযার্দি এবং আল্লামা তাবাতাবাঈর মতো বিখ্যাত শিক্ষকদের কাছে ধর্মীয় উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন। কোমে আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর উপস্থিতি এবং ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর অভ্যুত্থান ছিল একই সময়ের ঘটনা। সময়টা ছিল ১৯৬০ এর দশকের শুরুর দিকে। যার ফলে আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ হন এবং তিনি হয়ে ওঠেন ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর অগ্রবর্তী সৈনিক। বিশেষত ইমামের চিন্তাগুলো কিংবা শাহ বিরোধী প্রচার চালানোর ক্ষেত্রে তিনি অগ্রবর্তী সৈনিকের দায়িত্ব পালন করেন।

ইমাম খোমেনী (রহঃ) কে যখন নির্বাসনে পাঠানো হয় তখন আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী তাঁর লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষাদান এবং প্রচারণা ও আন্দোলন -সংগ্রাম চালিয়ে যাবার দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়সহ তরুণ ও যুবকদের জন্যে তাঁর শিক্ষা বা দারস্গুলো ছিল খুবই আকর্ষণীয়। বিশেষ করে তিনি যেসব ক্লাস নিতেন সেসব ক্লাসে শাহী অপকর্ম আর দুর্নীতির চমৎকার চিত্র তুলে ধরতেন, সেইসাথে এইসব মোকাবেলায় স্বাধীনতা ও মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামী শিক্ষা ও করণীয়গুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিতেন। আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী তাঁর বক্তব্যের জন্যে বিশেষ করে স্বৈরাচারী শাহের অন্যায় ও দুর্নীতিগুলো সম্পর্কে জনগণকে সচেতন নকরে তোলার কারণে শাহের রোষানলে পড়েন। যার ফলে তাঁকে বেশ কয়েকবার গ্রেফতার করা হয় এবং কারাগারে খুব কষ্ট দেওয়া হয়।

সর্বশেষবার তাঁকে গ্রেফতার করা হয় ১৯৭৮ সালের শুরুর দিকে। সেবার তাঁকে গ্রেফতার করে সুদূর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ইরানে নির্বাসিত করা হয়। নির্বাসনের কয়েক মাস পর ইরানী জনগণের বিপ্লবী আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নির্বাসন থেকে ফিরে আসেন এবং বিপ্লবী বাহিনীকে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে মাশহাদ শহরে তিনি আত্মনিয়োজিত হন। আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী এই শহরে শহীদ আব্দুল করিম হাশেমী নেজাদের মতো ব্যক্তিদের সাথে নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বিস্তারের উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরী করেন।

ইমাম খোমেনী ( রহঃ ) বিজয়ীর বেশে তেহরানে ফিরে আসার পর বিপ্লব বিজয়ের প্রাক্কালে তিনি আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীসহ আরো কয়েকজন সংগ্রামী ব্যক্তিত্বকে বিপ্লবী পরিষদের সদস্য নিয়োগ করেন। বিপ্লব বিজয়ের পরেও আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী খুবই স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সবসময়ই তিনি ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর সহযোগী ছিলেন এবং তাঁর আনুকূল্যধন্য ছিলেন। ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর মৃত্যুর পর রাহবারের বিশেষজ্ঞ পরিষদের প্রতিনিধিগণ আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীকে রাহবারের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি বলে মনোনীত করেন এবং তাঁকেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সম্মানে ভূষিত করেন। ইসলামী বিপ্লবের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা এবং তাঁর নেতৃত্ব-কৌশল নিয়ে পরবর্তী কোনো আসরে কথা বলার চেষ্টা করবো।

ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী আরেকজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন শহীদ আয়াতুল্লাহ মুর্তযা মোতাহহারী। ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর অন্যতম একজন মেধাবি ছাত্র ছিলেন তিনি। তিনি একদিকে ছিলেন সুযোগ্য একজন বক্তা,ছিলেন একজন বিদগ্ধ লেখক এবং একজন মহান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের শুরু থেকে শহীদ মোতাহহারীর ইসলামী, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা ব্যাপক বি¯তৃতি পায়। বিশেষ করে এ সময় তিনি বিভিন্ন বই লিখে,প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখে শাহের নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করা বা জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৪ সালে শহীদ মোতাহহারী হোসাইনিয়া এরশাদ কেন্দ্রিক তাঁর কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করেন। কেননা এখানে বুদ্ধিজীবীগণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যাওয়া-আসা করতেন,সমবেত হতেন।

এই হোসাইনিয়াতে আলোচনা রেখে জনগণকে তিনি প্রকৃত ইসলামের চিন্তা-চেতনার প্রতি মনোযোগী করে তোলার চেষ্টা করতেন,সেইসাথে বিকৃত ইসলাম বা বেদয়াতকে ইসলামের চেহারা থেকে অপসারণ করার চেষ্টা করতেন। পশ্চিমাপন্থীদের বিচ্যুতি ও ভুল নীতির বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হন এবং চিন্তাশীলদেরকে পশ্চিমা নীতির বিপদ সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন। ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সমান উপস্থিতির ফলে এই দুই ধারার শিক্ষিতদের মাঝে যেই দূরত্ব ছিল দীর্ঘকাল,তা ঘুচে গিয়ে দুই শ্রেণীর মাঝে একধরনের সেতু রচিত হলো। মাদ্রাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররা তাঁর কাছে যাবার সুবাদে এই দুই ধারার ছাত্রদের মাঝে নৈকট্য সৃষ্টির সুযোগ হলো। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররা শহীদ মোতাহহারীর মাঝে ইসলাম সম্পর্কে জানার ব্যাপারে আস্থাবান হয়ে উঠলো। শহীদ মোতাহহারীও যুবকদেরকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার ব্যাপারে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করেছিলেন।

শহীদ মোতাহহারী ধর্মীয় চিন্তার পুনর্জাগরণ ঘটিয়ে এবং বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবি যুবকদেরকে ইসলামে দীক্ষিত করার মধ্য দিয়ে ধর্মতত্ত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে একটা সম্পর্ক সূত্র তৈরী করেছেন। বিপ্লব বিজয়ের আগে শহীদ মোতাহহারী প্যারিস সফরে গেলে ইমাম খোমেনী (রহঃ) তাঁকে বিপ্লবী পরিষদ গঠনের দায়িত্ব দেন। তাই তিনি ইরানে ফিরে এসে ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর সমচিন্তার আরো ৬ জনকে নিয়ে বিপ্লবী পরিষদ গঠন করেন। বিপ্লব বিজয়ের পর মোতাহহারী ছিলেন ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর সবচে বিশ্বস্ত এবং আস্থাবান উপদেষ্টাদের অন্যতম। বিপ্লব বিজয় পরবর্তীকালে ইসলামী সরকার ব্যবস্থায় তাঁর সৃজনশীল ভূমিকার ব্যাপারে সবাই আশাবাদী ছিল। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ২রা মে তারিখে সন্ত্রাসী মোনাফেকিন গোষ্ঠি তাঁকে শহীদ করার ফলে জনগণের সেই আশা ভঙ্গ হয়।

শহীদ মোতাহহারীর মতো আরেকজন স্বনামধন্য বিপ্লবী ও ত্যাগী ব্যক্তিত্ব এবং ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর ঘনিষ্টজন ছিলেন ডক্টর মোঃ জাওয়াদ ব'হুনার।তিনিও আয়াতুল্লাহ বুরুজার্দি,ইমাম খোমেনী (রহঃ) এবং আল্লামা তাবাতাবাঈর মতো বিখ্যাত শিক্ষকদের কাছে পড়ালেখা করেন। দ্বীনী পড়ালেখা শেষ করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট করেন। তিনিও যুবকদের আকৃষ্ট করা বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদেরকে ইসলামের সাথে পরিচয় করাবার জন্যে এবং ইসলামী বিপ্লবের ব্যাপারে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালান। মুক্তিকামী অপরাপর সংগ্রামীদের মতো তিনিও শাহের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা সাভাকের মাধ্যমে বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হন এবং কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে সাভাক তাঁর বাক-স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। বক্তৃতা দেওয়ার ব্যাপারে শাহ তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

বাধ্য হয়েই হুজ্জাতুল ইসলাম ব'হুনার লেখালেখিতে হাত দেন। বই লিখে এবং ক্লাস নিয়ে তিনি দ্বীনের তাবলীগী কাজ যেমন চালিয়ে যান তেমনি শাহের অন্যায়-জুলুম সম্পর্কেও সবাইকে সচেতন করে তোলার দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ডঃ বহুনার ১৯৮১ সালের ৩০ আগস্টে বিপ্লব বিরোধী সন্ত্রাসী মোনাফেকিন গোষ্ঠির হাতে শহীদ হন।

ইসলামী বিপ্লবের ব্যাপারে অত্যন্ত প্রভাব বিস্তারকারী অপর একজন ব্যক্তিত্ব হলেন আয়াতুল্লাহ আকবর হাশেমী রাফসানজানী। তরুণ বয়সেই তিনি কোমের ধর্মতত্ত্ব শিক্ষা কেন্দ্রে যান ইসলামী জ্ঞানের ঝর্ণাধারায় অবগাহন করতে। তিনি অতি দ্রুতই ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর বিপ্লবী আদর্শের সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করেন। ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর নির্বাসনকালে আয়াতুল্লাহ রাফসানজানী ইসলামের দাওয়াতী কাজের পাশাপাশি শাহ বিরোধী সংগ্রামও চালিয়ে যান। এ কারণেই তিনি বহুবার গ্রেফতার হন এবং কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। শাহের গোয়েন্দা বাহিনী সাভাক কারাগারে তাঁকে ভীষণ জ্বালাতন করে। আয়াতুল্লাহ হাশেমি রাফসানজানী ১৯৭৯ সালে বিপ্লব বিজয়ের কয়েক মাস আগে শাহের কারাগার থেকে মুক্তি পান এবং জনগণের সাথে শাহ বিরোধী সংগ্রামে যোগ দেন। ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর নির্দেশে আয়াতুল্লাহ হাশেমি রাফসানজানীকে বিপ্লবী পরিষদের সদস্য করা হয়। ইসলামী বিপ্লব বিজয় থেকে এখন পর্যন্ত আয়াতুল্লাহ হাশেমি রাফসানজানী প্রেসিডেন্ট এবং সংসদ স্পিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি সর্বোচ্চ নেতার বিশেষজ্ঞ পরিষদ এবং নীতি নির্ধারণী পরিষদ প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন।

এভাবে আরো অনেক বড়ো বড়ো ব্যক্তিত্ব বিপ্লব বিজয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু স্বল্প পরিসর এই আসরে আজ আর তাঁদের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করার সুযোগ নেই। এই মহান ব্যক্তিত্ববর্গ এবং আরো অনেক আলেম ও চিন্তাবিদ ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পথে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। সমগ্র বিশ্বেই তাঁদের এই আত্মত্যাগের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে এবং মুসলিম বিশ্বে ইসলামী জাগরণের ঢেউ লেগেছে। তাঁদেরকে সূরা ফুসসিলাতের ৩০ নম্বর আয়াতের যথার্থ প্রমাণ বলে উল্লেখ করা যায়।‘নিঃসন্দেহে যারা বলেছে আমাদের প্রতিপালক হলো এক আল্লাহ,তারপর তার ওপর অটল-অবিচল থেকেছে,ফেরেশতারা তাদের ওপর আবির্ভূত হয়ে বলে-ভয় করো না,দুঃখিত হয়ো না,তোমাদেরকে যেই বেহেশত প্রদানের প্রতিশ্র"তি দেওয়া হয়েছে তার সুসংবাদ দিচ্ছি।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-১২

পৃথিবীর যে-কোনো বিপ্লবেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকে। বড়ো বড়ো বিপ্লবের পেছনে থাকে বড়ো বড়ো লক্ষ্য ও আশা-আকাক্সক্ষা। বিপ্লব মূলত সেইসব লক্ষ্য বা আশা-আকাক্সক্ষারই বাস্তবায়ন ঘটায়। ইরানের ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লব ছিল তেমনি গভীর চিন্তাদৃষ্টি সম্পন্ন একটি সমৃদ্ধ বিপ্লব। এই বিপ্লবের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যগুলোর দিকে তাকালে দেখতে পাবো যে,এই বিপ্লবের লক্ষ্য কেবল ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়,বরং সমগ্র বিশ্বব্যাপী। আর এই বৈশিষ্ট্যটি মানুষের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মূল বৈশিষ্ট্যটাই হলো ইসলামী স্বরূপ। আসলে ইসলামী বিপ্লব তার ধর্মীয় পরিচিতির কারণে বিশ্বের অপরাপর বিপ্লব বা অভ্যুত্থান থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। বিপ্লবের অবশিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলোও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইসলামের অভ্যন্তরীণ ভাবধারায় প্রভাবিত। আধ্যাত্মিকতা, ইসলামী চিন্তা-চেতনার পুনর্জাগরণ,বলদর্পিতার বিরোধিতা, জনগণের শাসন ও ঐক্য কামনা ইত্যাদির মতো বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্যগুলো ইসলামী শিক্ষার শেকড়মূলে প্রোথিত। ইরানের বিপ্লবের ইসলামী বৈশিষ্ট্য থাকার কারণে বিপ্লব বিজয়-পরবর্তীকালে নতুন একটি সরকার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে যার দুটি বৈশিষ্ট্য-এক,গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা,দুই-ইসলামী শাসনব্যবস্থা। ইমাম খোমেনী (রহঃ) এ সম্পর্কে বলেছেন,ইরানের বিপ্লব সকল দিক থেকেই ছিল ইসলামী। অপরাপর বিপ্লব ছিল পার্থিব জগতের স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে,কিন্তু ইরানের বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল পার্থিব স্বার্থের অনেক উর্ধ্বে।

অবশ্য ইমাম খোমেনী (রহঃ) সবকিছুর উর্ধ্বে ইসলামকে একটি পরিপূর্ণ ও সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা হিসেবে দেখতেন। বহু মুসলিম দেশে ইসলামকে মনে করা হয় ব্যক্তিগত কিছু ইবাদাত-বন্দেগীর ধর্ম। ইসলামের সামাজিক বা রাজনৈতিক দিকটা তেমন উজ্জ্বল নয়। কিন্তু ইমাম খোমেনী (রহঃ) বিপ্লবের মূল বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্য হিসেবে এবং সামাজিক-রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনের দিক-নির্দেশক আদর্শ হিসেবে ইসলামকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরলেন। তিনি তাঁর উপদেশ বাণীতে লিখেছেন, "ইসলাম এমন একটি আদর্শ, যে আদর্শ একত্ববাদী চেতনা বিহীন আদর্শগুলোর বিপরীত। অর্থাৎ ব্যক্তিগত,সামাজিক,পার্থিব ও আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক,সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে ইসলামের সুস্পষ্ট বিধি-বিধান রয়েছে।"

অপরদিকে,ইসলাম হলো এমন একটি ধর্ম যে ধর্ম মৌলিকভাবেই জুলুম-অত্যাচারকে মানে না। ইসলামের এই বৈশিষ্ট্যটি ইরানের জনগণের মাঝে অভ্যন্তরীণ স্বৈরাচার আর বিদেশী উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার স্পৃহা জাগিয়েছে। জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করাটাকে ইমাম ইসলামের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেছেন। যে ইসলাম আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে,সেই ইসলামকেই তিনি প্রকৃত ও খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলাম বলে মনে করতেন,কেননা মহানবী (সা)ও তাই করেছিলেন। ইসলামের সুবিচার ও ন্যায়কামিতা ইরানের বিপ্লবে ব্যাপকভাবে উজ্জ্বল ছিল। আর আধিপত্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম ও পরাশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন চালিয়ে যাবার প্রবণতা কেবল ইরানেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এখন বিশ্বের প্রায় সকল মুসলিম দেশেই তা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

ইসলামী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনয়ী খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলামের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেছেন,খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলাম হলো সেই ইসলাম,যে ইসলাম ন্যায়-নীতি ও মর্যাদার ইসলাম,যে ইসলাম অসহায়-বঞ্চিত ও দুর্বলদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়,যে ইসলাম নিরীহ ও মজলুমদের অধিকার রক্ষা করে,যে ইসলাম শত্র"দের বিরুদ্ধে জেহাদ করতে বলে,ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টিকারী বলদর্পীদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। যে ইসলাম আধ্যাত্মিকতা,ফযীলত ও নৈতিকতাপূর্ণ,সেই ইসলামই হলো খাঁটি ইসলাম।

ইরানের বিপ্লব যে ইসলামকে ভিত্তি করে সংগঠিত হয়েছে,তা এখন ব্যাপক প্রশংসার অধিকারী। একটা বিশ্বজনীন আদর্শ হিসেবে,পরিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ আদর্শ হিসেবে মানুষকে বর্তমান সময়ের সকল সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম এই ইসলাম। অন্যভাবে বলা যায়,ইরানের ইসলামী বিপ্লব বস্তুবাদী মতবাদ বিশেষ করে লিবারেলিজম ও কমিউনিজমকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। ইমাম খোমেনী (রহঃ) সোভিয়েত ইউনিয়নের সবর্শেষ প্রেসিডেন্ট গর্বাচেভকে লেখা এক চিঠিতে কমিউনিজমের নিশ্চিত পতনের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। ইমামের ঐ পূর্বাভাসের কিছুদিন পরই কমিউনিজমের নিরব পতন ঘটে এবং তা ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। কমিউনিজমের অবর্তমানে পশ্চিমা লিবারেলিজম বিশ্বের একমাত্র মতাদর্শ হিসেবে নতুন প্রাণ সঞ্চারী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সমগ্র বিশ্বে লিবারেলিজম ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক মতবাদ। ইরানের ইসলামী বিপ্লবই সেই মতবাদের সামনে নতুন এক মতাদর্শ হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ায় যা বিশ্বব্যাপী ক্রম-উন্নয়নশীল ও বিস্তার-উন্মুখ। বিপ্লবের মাধ্যমে ইসলামও নতুন জীবন লাভ করে।

পশ্চিমা মতবাদগুলোর মোকাবেলায় ইসলাম একটি শক্তিশালী আদর্শ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার ব্যাপারে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা কিছুদিন আগে বলেছেন-কঠিন এক পরিস্থিতিতে ইসলামী আন্দোলন শুরু হয়েছিল। বিপ্লব বিজয়ের কল্যাণে শত্র"দের বিচিত্র ষড়যন্ত্র আর চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যেও আল্লাহর রহঃমতে আর জনগণের দৃঢ় মনোবলের ফলে ইসলামী আন্দোলন যতোই দিন যাচ্ছে ততোই শক্তিশালী হচ্ছে। এখন তো মার্ক্সিজমের কোনো নাম-গন্ধও আর অবশিষ্ট নেই। আর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক-সকল ক্ষেত্রেই লিবারেল ডেমোক্রেসির ধরাশায়ী অবস্থাও বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছে।

বর্তমান বিশ্বে পশ্চিমা মতবাদের ওপর ইসলামের শক্তি অর্জনের পেছনে প্রেরণাদায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে ইসলামী জাগরণের ঢেউ। আজকের মুসলিম বিশ্বে ইসলামী জাগরণের এই প্রেরণাটি অর্জিত হয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয় থেকে। আসলে মুসলিম বিশ্বে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাসহ আরো যেসব প্রয়োজনীয় সচেতনতা আসে তাহলো,বিপ্লবের ফলে মুসলমানরা তাদের নিজস্ব পরিচয় ফিরে পায় এবং মুসলমান সমাজে ইসলামী গণজাগরণ সৃষ্টি হয়। ইসলামী শিক্ষার আলোকে ইরানের জনগণও যখন উঠে দাঁড়ালো,তখন উপনিবেশবাদ আর স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাবার এক নতুন উদ্দীপনা তারা পেলো। আজ বিশ্বব্যাপী কেবল মুসলিম দেশেই নয় বরং পশ্চিমা দেশগুলোসহ অন্যান্য অমুসলিম দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানদের মাঝেও ইসলামের কালজয়ী শিক্ষার দিকে ফেরার প্রবণতা এবং ধর্মীয় চিন্তার প্রনর্জাগরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

পশ্চিমা সরকারগুলো ইসলামের এই পুনর্জাগরণকে নিজেদের স্বার্থের জন্যে বিপজ্জনক বলে মনে করছে। তাই তারা পাশ্চাত্যের সকল মানুষের সামনে ইসলামকে বিপজ্জনক বলে তুলে ধরার জন্যে তাদের সর্বপ্রকার সুযোগ-সুবিধাগুলোকে কাজে লাগাচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এ সম্পর্কে বলেন-ইরানে ইসলামী গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ইসলামী জাগরণ শুরু হবার পর থেকে পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়ে যায়। ইমাম খোমেনী (রহঃ) সবসময় ইসলামের পুনর্জাগরণ এবং সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টি স্পষ্ট হওয়াকে বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ অবদান বা অর্জন বলে মনে করতেন। অবশ্য বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইসলামের পুনর্জাগরণের পাশাপাশি আরেকটি লক্ষ্যও অর্জিত হয়েছে,তাহলো মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতি। আগেও যেমনটি বলা হয়েছে,ঐক্য এবং জনগণের আন্তরিকতা বিপ্লব বিজয়ের ক্ষেত্রে বৃহৎ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ইসলামী বিপ্লব তার চার দশকে এসে মুসলিম বিশ্বকে আরো শক্তিশালী করা এবং মুসলমানদের মাঝে আরো বেশি দৃঢ় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করার প্রেরণা জাগাচ্ছে।

ইসলাম সবসময়ই তার অনুসারীদের প্রতি ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছে। মুসলিম বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থাৎ পশ্চিমারা যখন ইসলামী দেশগুলোকে লুট করতে চাচ্ছে,তখন এই ঐক্যের গুরুত্ব মুসলিম সমাজে আরো বহুগুণ বেড়ে গেছে। এ কারণেই ইমাম খোমেনী (রহঃ) এবং আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী সবকিছুর উর্ধ্বে মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতির ওপর বেশি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ইমাম তাঁর এক ভাষণে বলেছেন-বিচ্ছিন্নতা আসে শয়তানের পক্ষ থেকে আর ঐক্য আসে মহান দয়াময় আল্লাহর পক্ষ থেকে সুগন্ধি সহকারে। তিনি আরো বলেছেন-মুসলমানরা তাদের ঈমানী দায়িত্ব তথা ইসলামের অনুশাসন অনুযায়ীই ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত যাতে তারা নিজেদের দেশে আধিপত্যবাদীদের হস্তক্ষেপকামী কালো হাত ভেঙ্গে দিতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যতোই অগ্রসর হবে, নিঃসন্দেহে শত্র"রা ততোই মুসলমানদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা ও মতপার্থক্য প্রতিষ্ঠার জন্যে উঠেপড়ে লেগে যাবে।

এ কারণেই আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী হুশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেছেন-মুসলমানদের উচিত শত্রুদের ষড়যন্ত্রমূলক প্রতারণার ফাঁদে পা না দেওয়া। সেইসাথে সচেতন থাকতে হবে মাযহাব কিংবা জাতিগত বিভেদের ধুয়া তুলে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির কোনোরকম অজুহাত তোলার যেন সুযোগ যেন শত্রু রা না পায়। ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা,স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রাম,বিপ্লবের অন্যতম দাবী মুসলমানদের ঐক্য ও জাগরণ ইত্যাদি মুসলিম বিশ্বে বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানকেই ফুটিয়ে তোলে।

 

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-১৩

যে-কোনো বিপ্লবেরই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো জালেম শাসকের পতন ঘটিয়ে বিপ্লবপন্থীদের আদর্শ অনুযায়ী সরকারব্যবস্থা কায়েম করা।ইরানের জনগণও শাহের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিল। মিছিলের পর মিছিলে শ্লোগান দিয়ে দিয়ে তারা তাদের এই লক্ষ্যের কথা জানিয়ে দিয়েছিল। সর্বপ্রথম ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নবী করীম ( সা ) এর সময়। বর্তমান সময়ে সেই ইসলামী সরকার ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯ সালে বিপ্লব বিজয়ের বেশ কয়েক বছর আে থেকেই তিনি ইসলামী শিক্ষা ও আদর্শের ভিত্তিতে সরকার গঠনের কথা বলে এসেছিলেন।

ইমাম খোমেনী ( রহঃ ) তাঁর লেখা বই ইসলামী শাসন ব্যবস্থায় ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে একটি সরকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা যুক্তি-প্রমাণ ও কোরআন-সুন্নাহর আলোকে তুলে ধরেন। তিনি উত্তরাধিকারী শাসন এবং স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থাকে প্রত্যাখান করে বলেছেন-সিংহাসনের উত্তরাধিকার এবং রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা সেই প্রত্যাখ্যাত ব্যবস্থা যেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শহীদ শ্রেষ্ঠ ইমাম হোসাইন (আ) বিদ্রোহ করে শহীদ হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন-ইসলামে ইবাদাত-বন্দেগির জন্যে যেমন বিধি-বিধান রয়েছে,তেমনি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাপারেও রয়েছে তার সুনির্দিষ্ট বিধান। এই বইতে তিনি বেলায়েতে ফকীহ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী তুলে ধরেন। যার ভিত্তিতে ইসলামী হুকুমাতের নেতৃত্বের গুণাবলীগুলো প্রকাশ পেয়েছে। এই গুণাবলীর মধ্যে রয়েছে ইসলাম সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ হওয়া, পরিচালনা বা নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতা থাকা,আভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক সকল বিষয়ে যথার্থ ধারণা ও সচেতনতা ইত্যাদি।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম হলো স্বাধীনতা ও মুক্তি কামনা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রাজতান্ত্রিক শাসন এবং কয়েক দশক ধরে স্বৈরাচারী শাহের শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হবার কারণে ইরানের জনগণ এমন একটি শাসন ব্যবস্থা কামনা করছিল,যেই শাসন ব্যবস্থায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনগণের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়। জনগণের দীর্ঘদিনের সেই আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ হয়েছে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের দুই মাসের মধ্যেই ইরানীরা ইসলামী শাসন ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হিসেবে বেছে নেওয়ার সেই সুযোগ পেয়েছিল। ১৯৭৯ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণ ইসলামী শাসন ব্যবস্থার পক্ষেই রায় দিয়েছিল। তার পরবর্তীকালেও ইরানের জনগণ বিভিন্ন নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেছে,সংসদ সদস্যদের নির্বাচন করেছে এবং নগর পরিষদ প্রতিনিধিদের নির্বাচন করেছে। সর্বোচ্চ নেতার বিশেষজ্ঞ পরিষদ সদস্য নির্বাচন করে জনগণ আসলে পরোক্ষভাবে বিপ্লবের নেতাও নির্বাচন করেন এবং তাঁর কর্মকাণ্ডের ওপরও নজর রাখার ব্যবস্থা করেন।

গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত ইরানের সংবিধান বৈধ স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করেছে। এই সংবিধানের ষষ্ঠ ধারায় বলা হয়েছে,গণরায়ের ভিত্তিতেই দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রম চলবে...সংবিধানের অপর একটি ধারায় সংবাদপত্র ও বিভিন্ন সংগঠনের স্বাধীনতার কথাও বলা হয়েছে,তবে সেই স্বাধীনতা যেন জনগণের স্বার্থ এবং ইসলামী বিধি-বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। অবশ্য ইসলামে যেই স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে সেই স্বাধীনতার সাথে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে বিদ্যমান স্বাধীনতার পার্থক্য রয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এ সম্পর্কে বলেছেন-ইসলামে স্বাধীনতা ঐশী সূত্রে গ্রথিত। পশ্চিমা লিবারেলিজমের সাথে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব পার্থক্য রয়েছে সেগুলো এই বৈশিষ্ট্য থেকেই উৎসারিত।

এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী স্বাধীনতা মানুষের প্রতি আল্লাহর একটি উপহার। কারো অধিকার নেই মানুষের সেই উপহার কেড়ে নেয়। মানুষের বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে-সে ধরনের স্বাধীনতাকে অপব্যবহার করা যাবে না। পাশ্চাত্যে লাগামহীন যৌনতা চর্চা আর বেলেল্লাপনার কারণে পারিবারিক ব্যবস্থা সেখানে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে। পশ্চিমা সমাজে স্বাধীনতার নামে অন্যদের মর্যাদা ও সম্মানে আঘাত হানা হয় এবং আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর অপরাধী কর্মকাণ্ডগুলোকে বৈধতা দেওয়া হয়।

ইসলামে আল্লাহ প্রদত্ত স্বাধীনতার ভিত্তিতে যেই গণতন্ত্রের বিধান ইসলামে রয়েছে,তার সাথে পশ্চিমা লিবারেলিজমের কোনো সম্পর্ক নেই। ইমাম খোমেনী (রহঃ) এ ব্যাপারে বলেন-হতে পারে আমরা যেই গণতন্ত্রের কথা বলছি সেই গণতন্ত্রের সাথে পশ্চিমা ডেমোক্রেসির আপাত মিল আছে,তবে যেই গণতন্ত্র আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাই,পাশ্চাত্যে তার অস্তিত্ব নেই এবং ইসলামী গণতন্ত্র পশ্চিমা গণতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি পরিপূর্ণ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাও এই সম্পর্কে বলেছেন-ইসলামী সরকার ব্যবস্থা তথা ধর্ম ভিত্তিক জনগণের শাসনব্যবস্থায় জনগণই নির্বাচন করে,সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। কেননা তারা যাদের নর্বাচন করে তাদেরকে সকল ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দেয়। কিন্তু তাদের এই নির্বাচন,এই চাওয়া-পাওয়া সবকিছুই আল্লাহর হেদায়েতের ছায়াতেই ঘটে। কোনোভাবেই জনগণ কল্যাণের পথ থেকে বিচ্যুত হয় না এবং সিরাতুল মুস্তাকিম বা সরল সঠিক পথ থেকে সরে যায় না।

পশ্চিমা গণতন্ত্র আর ইসলামী গণতন্ত্রের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটি হলো ন্যায় চিন্তার মধ্যে। ধর্ম ভিত্তিক জনগণের শাসন ব্যবস্থায় ন্যায় একটি মৌলিক ও কেন্দ্রীয় বিষয়। কারণ ইসলামে কোনোরকম বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এ কারণেই ন্যায়কামিতা ইরানের ইসলামী বিপ্লবেরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিগণিত। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ন্যায় সম্পর্কে বলেন-ইরানের জনগণ একটি ন্যায় ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রাম করেছে। ইসলামী গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার লক্ষ্যও তাই। তিনি বলেন,ন্যায়ের ছত্রছায়ায় জনগণ তাদের বস্তুগত উন্নতির পাশাপাশি আধ্যাত্মিক লক্ষ্যও অর্জন করতে সক্ষম।

বিপ্লবের মৌলিক আদর্শ ন্যায়কামিতা কেবল ইরানের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই আবদ্ধ নয় বরং তা আন্তর্জাতিক অঙ্গন তথা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ কারণেই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো এবং তাদের ইউরোপীয় মিত্রদেশের অন্যায় ও বৈষম্যমূলক নীতির বিরোধিতা করে এবং অত্যাচারিত ও অধিকৃত মজলুম জাতিগুলোকে সমর্থন জানায়। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান তাই সবসময়ই মজলুমদের সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্যে সকল মুসলমানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে। এই আহ্বান জানানোর ব্যাপারটাও এখন ইসলামী বিপ্লবের একটি বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ফিলিস্তিন,আফগানিস্তান,ইরাকসহ বিশ্বের যেসব দেশের মজলুম জনগণ বলদর্পী শক্তিগুলোর দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করছে,তাদেরকে সাধ্যমতো সহায়-সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ইমাম খোমেনী (রহঃ) এ সম্পর্কে বলেছিলেন-আমরা বিশ্বের সকল বঞ্চিত জনগোষ্ঠিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাবো,কেননা ইসলাম সকল বঞ্চিতদের পৃষ্ঠপোষক।

ইরানের জনগণের জন্যে বড়ো একটা সমস্যা ছিলো ইসলামী বিপ্লব-পূর্বকালে এখানে বিদেশীদের হস্তক্ষেপ ছিল ব্যাপক,যারফলে দেশের অভ্যন্তরে স্বাধীনতা বলতে কিছু ছিল না। সে কারণেই সবাই স্বাধীনতা চাচ্ছিল, আর বিপ্লব বিজয়ের মধ্য দিয়ে জনগণের সেই স্বাধীনতার সাধ পূরণ হয়। বর্তমানে ইরান যে বৃহৎ কোনো শক্তির নীতি অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নেয় না তা-ই নয় বরং পরাশক্তিগুলোর মানবতা বিরোধী যে-কোনো নীতির বিরুদ্ধে কঠোরভাবে রুখে দাঁড়ায়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এ সম্পর্কে বলেন-স্বাধীনতা মানে ইরানে এখন যার অস্তিত্ব বিরাজমান..কোনো পরাশক্তিই আমাদের কোনো একটি নিয়মনীতির ওপরও বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারে নি। আসলে ইরানী জাতি এবং ইরানের ইসলামী সরকার ব্যবস্থার মান-মর্যাদার রহঃস্যটি লুকিয়ে আছে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মধ্যে। অবশ্য এ কথা সত্য যে,অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে যথার্থ কর্মতৎপরতা চালাতে হয়। ইরান বিগত তিন দশকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে বৃহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

ইরানের বিশাল বিপ্লব একদিকে যেমন বিশ্বের মুসলমানদের মাঝে ইসলামী জাগরণের আহ্বান জানিয়েছে,তেমনি অমুসলিমদেরকেও নীতি-নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা থেকে সমৃদ্ধি অর্জনের পথে আহ্বান জানিয়েছে। পশ্চিমা মতবাদের ডামাডোলে যখন ধর্ম একেবারে কোনঠাসা অবস্থায় পড়ে ছিল এবং বিভিন্ন জাতি বস্তুবাদ,ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মতো ধর্মহীন আদর্শের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিল,তখন ইসলামী বিপ্লব সবাইকে আল্লাহর পথে আহ্বান জানিয়েছে। বিপ্লবের ত্রিশ বছর পর বিশ্বব্যাপী এই আহ্বান আরো জোরদার হয়েছে এবং বিপ্লবের অর্জনগুলোও সবার সামনে আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী মানুষ বস্তুবাদী মতবাদ,বৈষম্য আর অন্যায়-অত্যাচারে অতীষ্ঠ হয়ে গিয়ে আল্লাহর পথে,আধ্যাত্মিকতার দিকে চোখ ফিরিয়েছে।

ইমাম খোমেনী (রহঃ) এক সনময় বলেছিলেন-আমরা ইসলামী বিপ্লবের আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্যকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চাই। তাঁর এই বক্তব্যেরই প্রতিফলন যেন এখন ঘটতে শুরু করেছে। এখন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন,বিশ্ব পরিস্থিতি এখন পরিবর্তমান,সবাই এখন ধর্ম তথা স্রষ্টামুখী। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এই বিপ্লব মানুষের বস্তুগত চাহিদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষকে দেয় জুলুম-অত্যাচার ও বৈষম্য-মুক্ত এক উন্নত জীবন।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-১৪

পাঠক! আজকের আসরে আমরা ইসলামী বিপ্লবের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কথা বলার চেষ্টা করবো। বিশেষ করে ফরাশি এবং রুশ বিপ্লবের মতো বিশ্বের বৃহৎ বিপ্লবগুলোর সাথে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো।

বিশ্বের লেখক সম্প্রদায়, বিশ্লেষক মহল, বিশেষজ্ঞগণ ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে ১৭৮৯ সালে সংঘটিত ফরাশি বিপ্লব এবং ১৯১৭ সালে সংঘটিত রুশ বিপ্লবের সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক যেসব পরিবর্তন ঘটেছে, সেগুলোর মধ্যে ফরাশি বিপ্লব,রুশ বিপ্লব এবং ইরানের ইসলামী বিপ্লব গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। ফরাশি বিপ্লব এবং রুশ বিপ্লব ইতিহাসের পাতায় নিজেদের স্থান করে নিয়েছে এবং এই দুই বিপ্লবের গুরুত্ব ও মূল্যকে কেউই অস্বীকার করে নি। ফ্রান্সের জনগণ ১৭৮৯ সালে এবং রাশিয়ার জনগণ ১৯১৭ সালে নিজেদের দেশে ক্ষমতার পরিবর্তন দেখেছে। কিন্তু এই দুটি বিপ্লবের সাথে ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে আন্দোলনের ব্যাপকতা ও জনগণের স্বতস্ফূর্ত বিশাল উপস্থিতির দিক থেকে কোনোভাবেই তুলনা করা চলে না। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো,তবে তার আগে ইসলামী বিপ্লবের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো খানিকটা কথা বলা যাক।

ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ত্রিশ বছর পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময় ধরে বিপ্লব যে তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে অটুট রয়েছে তার কারণ হলো বিপ্লবের প্রতি জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন। শাহ বিরোধী বিপ্লব যখন তুঙ্গে তখন এমনকি বিপ্লব বিজয়ের শুরুর দিকেও প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের বিশেষজ্ঞরা বিপ্লবের ইসলামী পরিচয়কে বিপ্লবের মূলভিত্তি বা স্তম্ভ বলে মনে করতেন। এ কারণেই তারা দাবী করতেন ইরানের বিপ্লব তার ইসলামী পরিচয় রক্ষা করার জন্যে চাপাচাপি করলে- হয় তার পতন ঘটবে অথবা ভেতর থেকেই তার মধ্যে রূপান্তর ঘটবে। পশ্চিমারাও ভেবেছিল-সময়ের বাস্তবতায় বিপ্লবের যেই ইসলামী আত্মা রয়েছে,তার অবসান ঘটবে এবং ইসলামী বিপ্লব পশ্চিমা লিবারেল ডেমোক্রেসির পোশাক পরবে। এরকম একটি ভ্রান্ত ধারণার ওপর ভিত্তি করে পাশ্চাত্য বিপ্লব বিজয়ের শুরু থেকেই প্রচারণাগত ও রাজনৈতিক আগ্রাসন শুরু করে। তারা বলতে থাকে ইসলাম এবং প্রজাতন্ত্র সম্পূর্ণ আলাদা দুটি জিনিস। স্বতন্ত্র এই দুটি বিষয়কে মিলিয়ে একটি অভিন্ন শাসন ব্যবস্থায় পরিনত করা অসম্ভব ব্যাপার।

মজার ব্যাপার হলো পশ্চিমারা যেই ইসলামী পরিচয়কে বিপ্লবের জন্যে এবং সরকার ব্যবস্থার জন্যে অত্যন্ত দুর্বল একটি দিক বলে প্রচার করেছিল,বাস্তবে সেই দিকটাই বিপ্লবের অন্তর্নিহিত শক্তি এবং ইসলামী সরকার ব্যবস্থা টিকে থাকার মূল রহঃস্যে পরিনত হলো। বিপ্লব যে কেবল ইসলামী আদর্শ থেকে দূরে থাকে নি তা-ই নয়,বরং ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর নেতৃত্বে ইসলামই হয়ে উঠেছে ইসলামী সরকার ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। আর এই ব্যবস্থার ফলেই দেশের ঐতিহাসিক সকল পশ্চাদপদতা ও পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠে ইরান উন্নতি ও অগ্রগতির সোপানে পা রাখে। এই ইসলামী আদর্শ অনুসরণই অন্যান্য বিপ্লব থেকে ইরানের বিপ্লবকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। এই স্বাতন্ত্র্যের আরেকটি কারণ হলো ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে যে ধর্ম ভিত্তিক জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব-তা সুস্পষ্টভাবে প্রামাণ্য করে তোলা।

ধর্ম আর গণতন্ত্রের সমন্বয় করা সম্ভব নয়-এ ধরনের কথা বলে পশ্চিমারা ব্যাপক অপপ্রচারণা চালায়। তারা আরো বোঝানোর চেষ্টা করে যে ইসলাম একটি প্রাচীন ধর্ম,তাই এ ধর্ম যুগোপযোগি নয়। তাদের এই সমস্ত ভ্রান্ত যুক্তি আর প্রচারণা কোনো কাজেই আসে নি। ১৯৭৯ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে ইরানের জনগণ বুঝিয়ে দিয়েছে যে তারা ইসলামের ঐশী বিধি-বিধানের ভিত্তিতে একটি নতুন সরকার ব্যবস্থা চায়। কিন্তু ৩০ বছর আগের দুই মেরু কেন্দ্রিক বিশ্বে ইরানের আভ্যন্তরীণ কোনো কোনো বাম ও ডানপন্থী দল ইরানে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েমের বিরোধিতা করে। যারা ইরানী জনগণের বিপ্লবী আন্দোলনের ইসলামী পরিচয়কে অস্বীকার করতো না, তারাও ইসলামী গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার কথা বলতো। কিন্তু ইমাম খোমেনী (রহঃ) তাঁর দূরদর্শী চিন্তা দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে,ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে বা বিপক্ষে যা-ই বলা হোক না কেন,এসবই আসলে বিপ্লবের স্রোতোধারাকে বিচ্যুতির দিকে প্রবাহিত করার ষড়যন্ত্র। প্রাচ্য নয়,পাশ্চাত্যও নয়,ইসলামই শ্রেষ্ঠ-এই শ্লোগান যাতে বিস্তৃতি না পায়, সেজন্যে ইসলামী বিপ্লবকে বিচ্যুতির দিকে টেনে নেবার চেষ্টা চলবে। ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর দৃষ্টিতে বিপ্লবের মূল শ্লোগানগুলো ছিল এতোই মৌলিক, সেগুলো কোনোভাবেই লঙ্ঘন করা উচিত নয়। এরকম আরেকটি মৌলিক বিষয় ছিল এমন-জনগণ নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার ভোগ করবে। এই বৈশিষ্ট্যটি বিশ্বের অপরাপর বিপ্লবের সাথে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট করেছে। দেশের ভাগ্য বা ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ইরানী জনগণের ভূমিকা বিপ্লবের পর খুব দ্রুতই লক্ষ্য করা গেছে।

১৯৭৯ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত গণভোটে ইরানী জনগণ তাদের পছন্দের সরকার পদ্ধতি বেছে নেবার সুযোগ পায়। ঐ গণভোটেই প্রমাণিত হয়েছে ইসলামী বিপ্লব বিশ্বের অপরাপর বিপ্লবের তুলনায় সার্বিক দিক থেকেই আলাদা প্রকৃতির। ঐ গণভোট অনুষ্ঠান কেবল ইরানের ইতিহাসেই নয় বরং সমগ্র বিশ্বের সকল বিপ্লবের ইতিহাসেই নজিরবিহীন একটি ঘটনা। কেননা বিপ্লব বিজয়ের প্রায় দু'মাস পর অনুষ্ঠিত ঐ গণভোটে অংশগ্রহণকারী ইরানের শতকরা ৯৮.২ ভাগ ভোটার ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েমের পক্ষে মত দিয়েছে। বিশ্বের অন্য কোনো বিপ্লব বিজয়ের পর নতুন একটি শাসন ব্যবস্থার পক্ষে জনগণের মতামত চাওয়ার নজির ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

অন্যান্য বিপ্লবের কর্ণধাররা নতুন সরকার গঠনের পর প্রাসাদে উঠে গেলে কী করে তাদের ক্ষমতা বা শক্তি ধরে রাখা যায় সেই চিন্তাতেই সদাব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। কেউই সরকার ব্যবস্থা কী হবে-তা নিয়ে জনগণের মতামত চাওয়ার প্রয়োজনই বোধ করে নি। ইরানের ইসলামী বিপ্লবই কেবল এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহঃ) জনগণকে অনেক উর্ধ্বে স্থান দিয়েছিলেন। সেজন্যেই তাদের রায়কে এতোটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছিলেন। ফরাশি কিংবা রুশ বিপ্লব থেকে তাই ইরানের ইসলামী বিপ্লব সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। প্রাচীন ব্যবস্থাকে অপসারিত করে নতুনের ভিত্তি স্থাপন করাকে বিপ্লব বলা হয়। এই বিপ্লবকে দু'দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। প্রথমত বিপ্লবী আন্দোলনে জনগণের উপস্থিতির পরিমাণ এবং দ্বিতীয়ত যেই কায়েমি স্বার্থবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন করা হয় তার ক্ষমতা ও শক্তিমত্তার দিক থেকে। এই দুটি দিক থেকেও যদি ফরাশি ও রুশ বিপ্লবকে ইরানের বিপ্লবের সাথে তুলনা করা হয়,সেখানেও ইরানের ইসলামী বিপ্লবের স্বাতন্ত্র্য সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাবে।

বিপ্লবী আন্দোলন চলাকালে ফ্রান্স এবং রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল একেবারেই শোচনীয়। এই দুটি দেশ একের পর এক যুদ্ধে জড়িত হবার ফলে সামরিক দিক থেকেও তাদের অবস্থা ছিল নড়বড়ে। ১৭৮৯ সালে ফরাশি সরকার এমনকি জনগণকে রুটি পর্যন্ত সরবরাহ করতে অপারগ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়ার সামাজিক-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থাও ছিল খুবই করুণ,অস্থির ও অশান্ত। অপরদিকে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলন চলাকালে ইরানের শাহ সরকারের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই মজবুত। কারণ ১৯৭০ এর দশকে অবিশ্বাস্যরকমভাবে তেলের দাম বেড়ে গিয়েছিল। ফলে অর্থনৈতিক সক্ষমতা আর বৈদিশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল পাহলভি শাসনামলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো অবস্থানে। তাছাড়া পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল দুটি ঘাঁটির একটি ছিল ইরান। সেজন্যে আমেরিকাসহ তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে শাহী সরকারকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছিল।

শাহ সরকারের সম্মান ও মর্যাদা এমন পর্যায়ে ছিল যে,পশ্চিমারা তখন ইরানকে শান্ত দ্বীপ বলে অভিহিত করতো। সে কারণেই শাহ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করাটা ফরাশি ও রুশ বিপ্লবী আন্দোলনের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন ব্যাপার ছিল। কিন্তু সমগ্র ইরান জুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে আন্দোলন করে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছিল। অসম্ভব শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী শাহকে বিপ্লবী আন্দোলনের মাধ্যমে উৎখাত করার ঘটনাটাও অন্যান্য বিপ্লবের তুলনায় ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আরেকটি স্বাতন্ত্র্য।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-১৫

ফরাশি বিশিষ্ট চিন্তাবিদ রুযে গারুদি বলেছেন, ইরানের ইসলামী বিপ্লব সমাজ এবং মানুষের পূর্ণতার নতুন একটি আদর্শ দেখিয়েছে। এই আদর্শের সাথে দেশ ও জাতির অন্তরাত্মার বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে। আর এই বৈশিষ্ট্যই ইরানের ইসলামী বিপ্লব এবং ইসলামী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের শত্র"তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের দুটি শক্তিশালী ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে নতুন একটি ব্যবস্থার উত্থানের ফলে বিশ্বব্যাপী এক ধরনের পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামী বিপ্লবের ব্যাপক প্রভাবে অনেক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ যে-কোনো আন্তর্জাতিক বৈঠকেই এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ) তাঁর বিশ্বদৃষ্টি ও চিন্তাদর্শের আলোকে ইসলামকে বিশ্বমানবতার সামনে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বাস্তবেও ইরানে ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন আধিপত্যবাদী শক্তি থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থেকে কী করে একটি রাজনৈতিক আদর্শ স্বাধীনভাবে এবং শক্তিমত্তার সাথে কার্যক্রম চালাতে সক্ষম। ডক্টর মিশেল জনসন লন্ডন থেকে প্রকাশিত জি-ও পলিটিকান স্ট্রাটেজি সাময়িকীকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। ১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই সংখ্যায় তাঁর ঐ সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়। ঐ সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানের ইসলামী বিপ্লব সম্পর্কে তাঁর মতামত দিতে গিয়ে বলেছেন-ইরানের ইসলামী বিপ্লব ষোল শতকের পর পশ্চিমাদের ওপর মুসলমানদের প্রথম বিজয় হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এই বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো ইসলাম নির্ভরতা। বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে এই ইসলামী আদর্শই কাজ করেছে।

সমকালীন প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের অন্য কোনো মতবাদ যেমন ন্যাশনালিজম, ক্যাপিটালিজম,কমিউনিজম কিংবা সোস্যালিজমের মতো মতবাদগুলো এই বিপ্লবের ওপর বিন্দুমাত্র প্রভাবও খাটাতে পারে নি।
জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইয়াভেশ ওসভেস ইসলামী বিপ্লবের অর্থবহ একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-যে সময় বস্তুবাদের কর্তৃত্ব চলছিল, আধ্যাত্মিকতা বিরোধী চিন্তা ও বস্তুতান্ত্রিকতা যখন পুরো সমাজকে নিজস্ব বৃত্তে আবদ্ধ করে রেখেছিল,সে সময় ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার যে পুনর্জাগরণ এসেছে,তা ইমাম খোমেনী (রহ) এবং ইসলামী বিপ্লবের কাছে ঋণী।

ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ফলে ঔপনিবেশিক শক্তির বিশ্বরাজনীতিতে প্রচণ্ড ধাক্কা লাগে। কেননা বিশ্ববাসীর কানে ইসলামী বিপ্লবের সুস্পষ্ট যে বার্তাটি পৌঁছে যায়,তাহলো জুলুম-নির্যাতন ও আধিপত্যবাদী শক্তির মোকাবেলায় নীরব বসে থাকলে চলবে না,আধিপত্যবাদীদের সকল তন্ত্রমন্ত্র বিনাশ করতে হবে। আসলে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ফলে বিশ্ববাসীর সামনে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়। স্বাধীনতা ও মুক্তিকামী জনতা বিশেষ করে মুসলিম জাতি তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল। এই পরিবর্তন বহু চিন্তাবিদ ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের মনে ক'টি প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাহলো, কোন শক্তিবলে ইসলামী বিপ্লব সামাজিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এতো গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হলো ? এমনকি বিশ্বব্যাপী প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দুই বিশাল পরাশক্তির প্রভাব-বলয়কে পাশ কাটিয়ে কীভাবে ইসলামী বিপ্লব বিকশিত হয়? কিংবা কেবলমাত্র ইসলামের আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ ও বিশ্বাস কি বিপ্লবের মতো এতো বিশাল একটি ঘটনার জন্যে যথেষ্ট ছিল?

এইসব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে গবেষক ও বিশ্লেষকমহল ইসলামের মৌলিক নীতিমালা নিয়ে গবেষণায় লিপ্ত হয়ে পড়েন। মজার ব্যাপার হলো বিশেষজ্ঞগণ ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে একটি অভিন্ন বিষয়ে একমত হলেন। তা হলো ইসলামী বিপ্লব ইসলামের শিক্ষাগুলোর ভিত্তিতেই অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বিপ্লবের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক যে ভারসাম্য,তা-ও ইসলামী শিক্ষার মধ্যেই রয়েছে। এইসব শিক্ষার মূলে রয়েছে সামাজিক ন্যায়,স্বাধীনতা কামিতা, রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক,সাংস্কৃতিক এবং চিন্তাগত স্বাধীনতার মূল নীতিমালা। সমগ্র বিশ্ব যখন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দুটি প্রভাবশালী আদর্শের মাঝে বিলীনপ্রায়,একদিকে পুঁজিবাদ,অপরদিকে মার্কসবাদী চিন্তাদর্শের বাইরে যখন কেউ অন্যকিছু ভাবতেও পারছিলো না, ঠিক সে সময় ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটেছিল। বিশ্বটাই তখন মার্কসবাদী চিন্তাদর্শ ভিত্তিক কমিউনিজম এবং ধর্মনিরেপেক্ষতাবাদী পুঁজিবাদ-এই দুই শিবিরে বিভক্ত ছিল। এই দুই শক্তির প্রভাবের কাছে ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতার কোনো স্থানই ছিল না।

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দিতে যেসব নামকরা তত্ত্বের প্রচলন ছিল,সেগুলোর মাঝে মার্ক্সবাদ ছিল উল্লেখযোগ্য। এই তত্ত্বে বিশ্বাস করা হতো বস্তুবাদী অর্থনীতির ওপরই সবকিছু নির্ভরশীল। কিন্তু ইসলামী বিপ্লব সেই বিশ্বাসের ওপর আঘাত হেনেছে। ইসলাম এবং মার্ক্সিজমের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যগুলোকে তুলে ধরে মার্ক্সিজম তত্ত্বের অসারতা প্রমাণ করেছে। মার্কসবাদী বিশেষজ্ঞগণ তাই নিজেদের আদর্শ নিয়ে পুনর্বিবেচনায় অবতীর্ণ হয়। ইসলামী বিপ্লব পশ্চিমা পুঁজিবাদি ব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিল।

ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পরবর্তী কয়েক বছর অবশ্য প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য মতবাদ বিশ্লেষকগণ ইসলামী বিপ্লবের চিন্তাদর্শগত গভীরতার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারেন নি। কিন্তু ইসলাম বিপ্লব-পরবর্তীকালের ঘটনাপঞ্জী এবং সোভিয়েত রাশিয়ার কয়েকটি প্রজাতন্ত্রে সোস্যালিজম যখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়ে বিপর্যয়ের সম্মুখিন হলো,তখন গবেষকরা আরো গভীরভাবে ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব এবং বিশ্বপরিস্থিতি পর্যালোচনায় মনোনিবেশ করলেন। এদিকে ইমাম খোমেনী (রহ) সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভকে একটি চিঠি লেখেন। ১৯৮৮ সালে লেখা ঐতিহাসিক ঐ চিঠিতে ইমাম কমিউনিজমের পতনের ব্যাপারে পূর্বাভাস দেন এবং পুঁজিবাদের অন্তসার শূণ্যতার কথা বলেন। ইমামের পূর্বাভাস অনুযায়ী কমিউনিজমের পতন ঘটেছে এবং বর্তমানে পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোতে জনরোষ ক্রমশ তীব্র ও সুস্পষ্ট হচ্ছে। ফলে পশ্চিমা পুঁজিবাদী দর্শনও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

এভাবেই ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর একটি ঘটনা হিসেবে পরিগণিত হয়। ইসলামী সরকার ব্যবস্থার সাথে অপরাপর সরকার ব্যবস্থার পার্থক্য ছিল প্রচুর। তাই ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর ইরানের সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রেই পুরোপুরি পরিবর্তন সূচিত হয়। এরিফলে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর ঔপনিবেশবাদী চিন্তায় ধ্বস আসে। সেইসাথে পরাশক্তিগুলোর পরিপূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা লাভকারী ভীষণ শক্তিধর এক স্বৈরাচারী শাহী শাসনের অবসান ঘটে। কিন্তু তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হলো এই বিপ্লব বিশ্বের মুসলমানদের মাঝে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করেছে,বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোতে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবর্তনের গণজোয়ার বয়ে এনেছে।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক - ১৬

সমকালীন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে ইসলামী বিপ্লবকে বিভিন্ন দিক থেকে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইরানের জনগণ প্রমাণ করেছে যে তারা প্রতিরোধকারী সচেতন একটি জাতি এবং অন্যায় ও বৈষম্যপূর্ণ একটি বিশ্বেও তারা পরিবর্তিত নতুন পৃথিবী গড়তে পারেন। ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইসলাম ভিত্তিক নতুন একটি শাসন ব্যবস্থার উন্মেষ ঘটে। বিশ্বের বহু দেশ ও জাতির ওপর আন্তর্জাতিক এই ব্যবস্থার প্রভাব পড়ে। বিগত তিন দশকে এই প্রভাব আরো ব্যাপকতা লাভ করেছে এবং ইসলামী ইরান একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাপক সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। জার্মানীর বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ পিটার শুলাতুর বলেন, অতীতে পাশ্চাত্যের ভয় ছিল ইরান চরমপন্থীদের বিশৃঙ্খলার কেন্দ্রে পরিণত না হয়ে পড়ে। অথচ এটা ছিল একটা ভুল চিন্তা। ইরান বরং এখন বিশ্বের বুকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় ইরানের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বলা যায় ইরানই আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার মূল শক্তি। বিপ্লব পরবর্তীকালে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইরানের উন্নয়ন বেশ লক্ষণীয়। অন্যান্য যে-কোনো গণতান্ত্রিক দেশের মতো ইরানেও বিরোধী পক্ষ মত প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বাধীন। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ করে সমাজের অসহায় বঞ্চিত শ্রেণীর শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। কিন্তু বহির্বিশ্বে ইরানের এই অগ্রগতির বিষয়টি ভালোভাবে প্রচারিত হয় নি।

ইসলামী বিপ্লবকে ঐতিহাসিক পট পরিবর্তন এবং তিনটি চালিকাশক্তি দ্বীন,নেতৃত্ব , বিজয়ের নেপথ্য কারণ ও তার প্রবহমানতার মূল রহস্য হিসেবে মনে করা হয়। এগুলোর মাঝে যে বিষয়টি ঐ তিনটি উপাদানকে সংহত করেছে তা হলো ধর্মীয় উন্নত চিন্তা ও মূল্যবোধ। ইসলামী বিপ্লবকে বলা যায় আশুরার বিপ্লবী চেতনার ফল। আশুরার অনন্য শিক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ওপর। ইমাম হোসাইন (আ) সমাজে বিদ্যমান জুলুম-অত্যাচার,অন্যায় এবং তাবৎ বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন,ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনও হয়েছিল সমকালীন শাহী স্বৈরাচারের অন্যায়-অত্যাচার আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে। বিপ্লবের সেই হোসাইনী আদর্শ এখনো আভ্যন্তরীণ ও বহির্শত্র"র সকল ষড়যন্ত্র ও হুমকি ধমকি মোকাবেলার এক অপরিসীম শক্তিধর হাতিয়ার। বলা যায় ইসলামের ইতিহাসের বিশাল ঘটনাগুলো এবং ইসলামের আমূল পরিবর্তনশীল চিন্তা-চেতনা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে এবং ইসলামী ব্যবস্থার আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত উন্নতি বিধানও হয়েছিল।

ইমাম খোমেনী (রহ) ইসলামের মূল্যবোধগুলোকে জাগিয়ে তোলার স্বার্থে ফিকাহ বা ইসলামী নীতিমালাগুলোকে তার তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে বাস্তব ও ব্যবহারিক জগতে নিয়ে আসেন। তিনি নবীজীর আদর্শের একজন ছাত্রতুল্য অনুসারী ছিলেন। ইমাম আলী (আ) এবং তাঁর সন্তান ইমাম হোসাইন ( আ ) এর মতো মহান পূর্বসূরীদেরও আদর্শিক ছাত্র ছিলেন তিনি। তাঁদের উজ্জ্বল ও প্রাণসঞ্চারী আদর্শ অনুসরণের মধ্যেই বর্তমান যুগের মানুষের মুক্তির উপায় নিহিত রয়েছে বলে তিনি মনে করতেন। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের মধ্য দিয়ে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঈমানের পথে ফিরে আসার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি পেয়েছে। সিডনি মর্নিং হেরাল্ড নামক দৈনিকের একটি সংখ্যায় লেখা হয়েছে-ইসলাম এখন বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং বিভিন্ন দেশের সরকার ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে সারাবিশ্বেই ইসলামের জাগরণ তথা রাজনৈতিক আন্দোলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

আশুরা বিপ্লব হলো মানুষের উন্নত মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির একটা চমৎকার বিশ্বকোষ। ইমাম হোসাইন (আ) মানব সমাজকে এই বিশ্বকোষটি পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ধর্মের মূলে প্রত্যাবর্তন করা,বলদর্পী শক্তিগুলোর জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো,সমাজ সংস্কার ইত্যাদি আশুরা বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা,যা ইসলামী বিপ্লবকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। আশুরার এই প্রভাব সম্পর্কে ইমাম খোমেনী (রহ) বলেছেন-ইমাম হোসাইন (আ) যদি অভ্যুত্থান না ঘটাতেন, তাহলে আমরাও আজ বিজয় অর্জন করতে পারতাম না। ইসলামী বিপ্লব আশুরার আলোয় আলোকিত বৃহৎ ঐশী বিপ্লব।

ইসলামী বিপ্লব মুসলিম বিশ্বকে এই বাস্তব সত্য উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে যে, ইসলাম তার চিন্তাদর্শ ও বাস্তবতায় জীবিত আছে এবং এই ইসলাম বিভিন্ন দেশ ও জাতির স্বাধীনতা ও সম্মানের উৎস হবে। ইসলামী বিপ্লব পূর্ববর্তী কালে বহু দেশ ও জাতি বিশ্বাস করতো,ইসলামসহ অন্যান্য ধর্ম একইরকম। সব ধর্মই কিছু ব্যক্তিগত ইবাদাত-বন্দেগি আর নৈতিকতার কথা বলে। শাসন ব্যবস্থা বা রাজনৈতিক বিষয়-আশয় ধর্মীয় কর্মসূচির বাইরের জিনিস। ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের অল্প সময় পরেই এই ভুল ধারণার অপনোদন ঘটে এবং ইসলামের প্রকৃত চেহারা সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়। রাষ্ট্র পরিচালনা,অর্থনীতি, রাজনীতি,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক-প্রভৃতি ক্ষেত্রে যে ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে তাও সবার সামনে ফুটে ওঠে। ইসলাম আসলে সমাজে স্থিরতা ও আধ্যাত্মিকতার অনুপ্রেরণা দেয়। ইসলাম স্বেচ্ছাচারিতা ও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার পরিবর্তে স্বাধীনতা,চিন্তা-চেতনার মর্যাদা এবং মানুষের সামাজিক অধিকারকে প্রাধান্য দেয়।

বিপ্লব বিজয়ের ত্রিশ বছর পর বিশ্ববাসী এখন দেখছে,ইসলামী বিপ্লবের আধ্যাত্মিক বার্তাগুলো বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ইরানের ইসলামী ব্যবস্থা এমন একটি সমাজের জন্ম দিয়েছে , যে সমাজে আধ্যাত্মিকতা এবং বস্তুতান্ত্রিকতা পরস্পরে ভারসাম্যপূর্ণ। রাশিয়ার বিশিষ্ট চিন্তাবিদ এস.আকায়েফ তাঁর ইসলামী বিপ্লবের স্বরূপ ও তাৎপর্য নামক গ্রন্থে লিখেছেন, ইসলামী বিপ্লব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইসলামী আন্দোলনগুলোর মূল আদর্শ ও লক্ষ্য। তার মানে বিভিন্ন দেশ ও বিভিন্ন দলের অভিন্ন লক্ষ্য হলো মানুষের পারিবারিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জীবনকে ইসলামীকরণ করা এবং আধিপত্যকে অগ্রাহ্য করে তৃতীয় একটি পথের ঘোষণা দেওয়া যেই পথ সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের চেয়ে পুরোপুরি আলাদা। আর এই পথের পতাকাবাহী একমাত্র ইসলামী দেশ হলো ইরান। তাই পশ্চিমা শক্তিগুলো যে ইরানের ওপর অসন্তুষ্ট হবে-তাতে আর সন্দেহ কী!
নিঃসন্দেহে ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনের প্রভাব ধর্মীয় চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলেছে। দেশে দেশে এখন যেসব ইসলামী আন্দোলন লক্ষ্য করা যায়,তা থেকেই এই প্রভাবের বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়। ফিলিস্তিন, লেবাননের ইন্তিফাদা ও প্রতিরোধ আন্দোলনসহ অন্যান্য মুসলিম দেশেও এমন কিছু আন্দোলন লক্ষ্য করা যায় যেসব আন্দোলন ইসলামী বিপ্লবের ন্যায়-নীতিকামিতা এবং সত্যানুসন্ধানী বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ। ইসলামী বিপ্লবের অর্জনগুলো,আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো,আইডিয়াগুলো সবই এখন বিভিন্ন দেশ ও জাতির সামনে ইসলামের শক্তি ও সামর্থ্যরে মূল্যবান দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ) ইসলামের মুক্তিকামী ভূমিকা সম্পর্কে বলেন, "কোরআন এবং ইসলামে বিশ্বাসীগণ গর্বিত যে তাঁরা এমন এক ধর্মের অনুসারী,যে ধর্ম কোরআনের বিধান বাস্তবায়ন করতে চায় এবং যেসব মনগড়া মতবাদ মানুষের বিবেককে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় এবং তাগুতি শক্তির সেবাদাসে পরিণত করে,সেইসব দায়বদ্ধতা থেকে ইসলাম মানুষকে মুক্তি দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গর্বিত জাতির বিরুদ্ধে সর্বপ্রকার ষড়যন্ত্র করে এখন অপমানিত ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ইরানী জাতির জাগরণ এবং শাহী অত্যাচার-নিপীড়নের অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে ইসলামের নির্মল আলোয় যে তারা অবগাহিত হয়েছে-তা নিঃসন্দেহে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরোক্ষ সাহায্য ছাড়া কিছুতেই সম্ভব ছিল না। "

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক - ১৭

৩০ বছর আগে বিশ্বের দেশগুলো যখন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দুই পরাশক্তির আধিপত্যের অধীন ছিল,তখন ধর্ম শব্দটি রাজনীতিকদের দাপটে প্রায় বিস্মৃত ছিল। রাজনীতিবিদগণ তখন রাষ্ট্রব্যবস্থা কিংবা রাজনৈতিক কাঠামোয় ধর্মের উপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে ভাবতোই না। তাদের দৃষ্টিতে ধর্ম এবং রাজনীতি সম্পূর্ণ আলাদা দুটি জিনিসি। এরকম এক পরিস্থিতিতে হঠাৎ করেই বিশ্ব গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনার মুখোমুখি হলো। ইরান থেকে খবর এলো-কয়েক মিলিয়ন মানুষ বিক্ষোভ করে স্বৈরাচারী শাহের পতন এবং ইসলামী গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েমের দাবি জানায়। বিশ্ববাসীর সামনে ইরানের পরিস্থিতি সুস্পষ্ট হয় নি। বিশেষ করে ইরানে যে সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ইমাম খোমেনী (রহ) এর নেতৃত্ব এবং প্রভাবে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের মতো একটি বিশাল ঘটনা ঘটে গেল,সে খবর বিশ্ববাসীর কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে নি।

ইরানের ইসলামী বিপ্লব এতো দ্রুত বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলেছিল যে বিশেষজ্ঞমহল ভেবে উঠতে পারেন নি। লন্ডন থেকে প্রকাশিত টাইমস লিখেছে, ইরানে বিপ্লব এবং ধর্মীয় উত্থানের খবর বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ায় পশ্চিমা বিশ্ব নতুন করে ইসলামকে আবিষ্কার করলো। একটি মুসলিম দেশ প্রথমবারের মতো সফলভাবে পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিগুলোকে পরাস্ত করেছে। ইসলামী বিপ্লবের খবর অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এরফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বিশ্বের ভারসাম্যের ক্ষেত্রে নতুন চিন্তার উদ্রেক ঘটে এবং বহু উচিত-অনুচিত তথা ন্যায়বোধের পরিবর্তন ঘটে। আমেরিকার বিখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী নওম চমস্কি বলেছেন,ইরানের ইসলামী বিপ্লব প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে। ১৯৭৯ সালে আমেরিকার এই সীমা অতিক্রম করে স্বাধীনতা অর্জন করে।

ইসলামী বিপ্লব এমন কিছু মূল্যবোধ ও চিন্তাদর্শ উপস্থাপন করেছে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে যার কোনো মিল নেই। মুসলিম যুবকদের অনেকেই নিজেদের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটতে দেখেছেন এই বিপ্লবে। এ কারণেই বিশ্বব্যাপী ইসলামে দীক্ষিত হবার একটা জোয়ার এমনকি পাশ্চাত্যের দেশগুলোতেও লক্ষ্য করা গেছে। সেজন্যেই ইসলামী বিপ্লবের আধ্যাত্মিক সত্ত্বার প্রতি নজর না দিয়ে পশ্চিমা রাজনীতি বিশ্লেষকগণ ইসলামী বিপ্লবকে পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। মার্কিন চিন্তাবিদ স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছেন,১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবকে পশ্চিমা সভ্যতাগুলোর সাথে ইসলামের গোপন যুদ্ধ শুরু বলে মনে করা যায়।

মার্কিন এম.আই.টি. বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাবেকিল ফিশার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব সম্পর্কে বলেন,ইমাম খোমেনী (রহ) এর কাছে বিপ্লব কেবল একটা রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিপ্লব ছিল না,বরং একটা আধ্যাত্মিক এবং ইসলামী বিপ্লব ছিল যার ফলে, সরকার, শাসনব্যবস্থা এবং সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে যা ব্যাপক পরিবর্তন আসা উচিত। মানুষের জীবনযাত্রায়ও ইসলামী বিপ্লব পরিবর্তন আনবে। রুশ রাজনীতিবিদ সের্গেই বাবুরিন বিপ্লবে ইসলামের ভূমিকা সম্পর্কে বলেছেন-ইসলামী বিপ্লব কেবল ধর্মীয় কোনো বড়ো আন্দোলনই নয়,বরং মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্যে সামাজিক ন্যায় ভিত্তিক একটি রাজনৈতিক পট পরিবর্তন।

ইরানের ইসলামী বিপ্লব একটা সমাজের সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক অবস্থাকে পুরোপুরি পরিবর্তিত করে দিতে পেরেছে। ইরানের সামাজিক পরিবেশকে ভ্রাতৃত্ববোধ,সহমর্মিতা ও ত্যাগের আদর্শে উজ্জীবিত করে তুলতে পেরেছে। এ থেকে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি প্রমাণিত হলো,তাহলো নিরাপত্তা,ন্যায় এবং প্রকৃত সুখ-শান্তি সৎ নেতৃত্ব ও ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকে নিশ্চিত করা সম্ভব। কানাডার বিশিষ্ট মনীষী রবার্ট কোলেস্টোন ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব সম্পর্কে বলেছেন-আমি একজন পশ্চিমা অমুসলিম হিসেবে বলছি,এটা একটা অলৌকিক ঘটনা যে,একটা ঐশী ধর্ম এই আধুনিক বিশ্বে বিপ্লব ঘটিয়েছে এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

ইসলামী বিপ্লব গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতির প্রবর্তক। তা হলো অত্যাচারিত ও নিপীড়িত জাতিকে তাদের প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি এটাও স্মরণ করিয়ে দেয় যে,মানুষের সম্মান ও মর্যাদার বিষয়টি নির্ভর করে মুক্তি ও স্বাধীনতার ওপর। প্রত্যেক দেশেই এমন কিছু মেধা ও প্রতিভা থাকেন যারা নিজের দেশেই থাকেন অপরিচিত। তাদেরকে খুঁজে বের করে তাদের মেধা ও প্রতিভাকে বিকশিত করার সুযোগ দেওয়া উচিত। বিশ্বের বহু মুসলমান ইসলামী বিপ্লবের প্রভাবে প্রাণিত হয়েছেন এবং নতুন এই বিশ্বে বিপ্লবের নতুন প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।

ফরাশি বিশিষ্ট চিন্তাবিদ মিশেল ফুকো ইরানের ইসলামী বিপ্লব পরিদর্শনে এসেছিলেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং ইরানী জনগণের ঐক্য ও সংহতি দেখে তিনি অভিভূত হয়েছেন। তিনি তাঁর নি®প্রাণ বিশ্বের প্রাণ ইসলামী বিপ্লব নামক গ্রন্থে লিখেছেন-বাস্তবতা হলো এই বিপ্লবী ঘটনার উদাহরণ ইতিহাসে বিরল। কেননা এই বিপ্লবে পুরো একটি জাতির আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন দেখেছে। আমি জানিনা,আমার সাথে একমত হবে কি হবে না! কিন্তু আমি তেহরানে এবং সমগ্র ইরানে সমগ্র জাতির আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন দেখেছি। যে জাতি অক্লান্ত পরিশ্রম করে নিজেদের স্থায়ী ইচ্ছার প্রকাশ ঘটায়,আমাদের উচিত তাদের প্রতি সম্মান দেখানো। কেননা বিশ্বের অন্য কোথাও তা দেখা যায় না।

দৈনিক লিবারেশন পত্রিকার সাংবাদিক মিসেস ক্লার বেরির বলেন,ইরানের আন্দোলনের নিজস্ব এবং স্বতন্ত্র যুক্তি আছে। আমি উপলব্ধি করছি যে এই আন্দোলনের একটা লক্ষ্য আছে,যাকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যগামী একটি মানুষের পদক্ষেপের সাথে তুলনা করা যায়। ইরানীরা একাত্ম হয়ে মিছিল করে। তারা ব্যাপক পরিশ্রমী। তারা ক্লান্তও হয় আবার নতুন করে প্রশ্বাস নিয়ে পুনরায় কাজ শুরু করে। রুশ লেখক নিকোলা মিশিন ইমাম খোমেনী (রহ) সম্পর্কে লেখা তাঁর বইতে লিখেছেন-ইরানের ইসলামী বিপ্লব মানুষের অন্তর কেড়ে নিয়েছে। ইমাম খোমেনী (রহ) এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ইসলামী বিপ্লবের মূল্য ছিল এই যে,তিনি মার্কিন বিশ্বসাম্রাজ্যবাদকে উপেক্ষা করে বলেছেন-আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধ রয়েছে,সেটা হলো কোরআনের মূল্যবোধ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে পশ্চিমা গণতন্ত্রের চেয়ে ইসলামী গণতন্ত্র অনেক বেশি পরিপূর্ণ। বিশ্ববাসীকে তিনি বুঝিয়েছেন,মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু হলো আলকোরআন।এই কোরআন যার সাথে থাকে সে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।

আসলে বস্তুতন্ত্রের নাগপাশে আবদ্ধ পৃথিবীতে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ঔজ্জ্বল্য ছিল বিস্ময়কর একটি ঘটনা। বিপ্লব বিজয়ের ঘটনাকে ইমাম খোমেনী (রহ) মোজেযা বলে অভিহিত করে বলেছেন-সমাবে একটা আত্মিক পরিবর্তন এসেছে। আমি এটাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে মোজেযা ছাড়া অন্য কোনো নামে অভিহিত করতে পারছি না।বিশ্বব্যাপী বিপ্লব বিষয়ক গবেষক এবং সমাজ বিজ্ঞানী মিসেস স্কচপোল তেদা বলেছেন,বিদেশী পর্যবেক্ষকদের জন্যে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলন এবং শাহের পতন ছিল একটা আকস্মিক বিস্ময়।শাহের মিত্রদের থেকে শুরু করে সাংবাদিক,বুদ্ধিজীবী,রাজনীতিবিদ, সমাজ বিজ্ঞানী-সবাই বিপ্লবের ঘটনাকে অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার বলে মত দিয়েছেন।

ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ৩০ বছর পর বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন,ইসলামী বিপ্লব এখনো মানব সমাজের সেই আশা-আকাক্সক্ষাকে নিয়ে ক্রমাগত উন্নতির ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বিগত তিন দশকের অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হচ্ছে,ব্যাপক হুমকি ধমকি এবং প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ইরানকে তাদের মূল লক্ষ্য থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত করাও সম্ভব নয়। যেমনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মাধ্যমে ইরানের ওপর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেও কোনো কাজ হয় নি,উল্টো বরং বিপ্লবী চেতনা আরো বেগবান হয়েছে। #

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-১৮

 আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় ও নৈতিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে ইরানের ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। এ বিপ্লবের মূল বাণী ছিল আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং তার নির্দেশাবলী যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা। জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মজলুমের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অন্যতম মূলনীতি। এ কারণে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনি (রহ:) ইহুদীবাদীদের হাতে দখল হয়ে যাওয়া ফিলিস্তিনী ভূখন্ড পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানান। তার এ ঘোষণার ফলে নির্যাতিত ফিলিস্তিনী জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামে নতুন করে প্রেরণার সঞ্চার হয়। পরবর্তীতে ইসলামী ইরানের সংবিধানে বিশ্বের মজলুম জাতিগুলোর প্রতি সমর্থন জানানোর বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত হলে ফিলিস্তিনী জাতির সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানানো ইরানের অবশ্যম্ভাবী কর্তব্যে পরিণত হয়।

ইমাম খোমেনী (রহ:) প্রতি বছর রমজানের শেষ শুক্রবারকে ফিলিস্তিনী জাতির প্রতি সংহতি প্রকাশের দিন বলে ঘোষণা করেন যাতে বিশ্বের সব মানুষের সামনে ইসরাইলের স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে যায়। পশ্চিমা ও ইহুদীবাদী ষড়যন্ত্রের ফলে ইসরাইলের হাতে ফিলিস্তিনী ভূখন্ড জবরদখলের যে বিষয়টি বিশ্বের মানুষ প্রায় ভুলতে বসেছিল, সে বিষয়টি আবারো চাঙ্গা হয়। বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠিসহ স্বাধীনতাকামী সকল মানুষ ফিলিস্তিনী জাতির হারানো অধিকারের প্রতি সমর্থন জানানোর প্রেরণা অনুভব করে।

ইসলামী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এ সম্পর্কে বলেছেন, ইঙ্গোমার্কিন সরকার ও ইহুদীবাদী চক্র কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিন নামক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব পৃথীবির বুক থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। এখন ন্যায়বিচারকামী ও মানবাধিকারের রক্ষক প্রতিটি জাতির উচিত ফিলিস্তিনীরা যাতে ইহুদীবাদীদের কবল থেকে তাদের মাতৃভূমি পুনরুদ্ধার করতে পারে সে লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালানো। তিনি ফিলিস্তিনী জাতির অধিকারের প্রতি সমর্থন জানানোকে জিহাদের সাথে তুলনা করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরদের মতে, ফিলিস্তিনী জনগণ তাদের মাতৃভূমি উদ্ধারের লক্ষ্যে যে ইন্তিফাদা গণ আন্দোলন শুরু করেছে, ইরানের ইসলামী বিপ্লব হচ্ছে তার অনুপ্রেরণা। ইমাম খোমেনি (রহ:) বিপ্লব বিজয়ের অনেক আগে থেকে ফিলিস্তিনী জাতির অধিকারের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছিলেন। আর ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর ইরান জাতিসংঘের অধিবেশনসহ আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে ফিলিস্তিনী জাতির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করে। এ প্রচেষ্টা ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক পুর্তিতে এসে আরো জোরদার হয়েছে।

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি ইরানের সমর্থনের বিষয়টিকে ইহুদীবাদ নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা গণমাধ্যম ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। ফিলিস্তিনী সংগ্রামী দলগুলোকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠি হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের প্রতি ইরানের সমর্থনকে সন্ত্রাসবাদের প্রতি তেহরানের সমর্থন বলে প্রচার চালাচ্ছে। তবে তাদের ঐ প্রচারণা প্রমাণ করে দিচ্ছে ইসলামী বিপ্লব সফলভাবে মজলুম ফিলিস্তিনী জাতির প্রতি সমর্থন জানাতে পেরেছে। মিশরের ইসলামী আমল দলের মহাসচিব মুজদি হোসেইন বলেছেন, ইসলামী বিপ্লব কেবল ইরানী জাতিকে স্বাধীনতা দেয় নি, সেই সাথে ফিলিস্তিনসহ সকল পরাধিন জাতিকে আশার আলো দেখিয়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলো এখন উপলব্ধি করতে পারছে, ইহুদীবাদীদের সাথে সংলাপে বসে কোন লাভ নেই, বরং প্রতিরোধ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়াই মাতৃভূমি উদ্ধারের একমাত্র পথ।

ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পরপরই ইরান ইহুদীবাদী ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং তেহরানে নিযুক্ত ইসরাইলী দূতাবাসকে ফিলিস্তিনী দূতাবাসে রূপান্তরিত করে। ইরানের পার্লামেন্টে ফিলিস্তিন বিষয়ক স্থায়ী কমিটি রয়েছে। সেই সাথে মুসলিম দেশগুলোকে ফিলিস্তিনী জাতির প্রতি সমর্থন জানাতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ইরান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের এই প্রচেষ্টার ফলে ফিলিস্তিন সংকট এখন মুসলিম বিশ্বের অভিন্ন সংকটে পরিণত হয়েছে। শান্তি প্রক্রিয়ার নামে যে আপোষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইসরাইলের স্বার্থ হাসিল ও ফিলিস্তিনী জাতির অধিকারকে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হচ্ছিল সে প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করে দিয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লব। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত এ্যানাপোলিস সম্মেলনের ব্যর্থতা, লেবাননের হিযবুল্লাহর সাথে ৩৩ দিনের যুদ্ধে ইসরাইলের শোচনীয় পরাজয়ের পর বৃহৎ মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনার ভরাডুবি এবং সাম্প্রতিক গাজা যুদ্ধে হামাসের বিজয়- এসবই সম্ভব হয়েছে ইসলামী বিপ্লবের কল্যাণে। ফিলিস্তিনের ইসলামী জিহাদ আন্দোলনের শহীদ মহাসচিব ফাতহি শাকাকি বলেছিলেন : ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পরপরই গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনী জিহাদ আন্দোলনের প্রথম ঘাঁটি স্থাপিত হয়।
শ্রোতাবন্ধুরা, শুরুতেই যেমনটি বলেছিলাম আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা মুসলিম বিশ্বের ওপর ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব সম্পর্কে কথা বলবো। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পরপরই পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে যেসব প্রচারণা শুরু করে তার অন্যতম ছিল, ইরানী নেতৃবৃন্দ ইসলামী বিপ্লবকে অন্য দেশগুলোতে রপ্তানির চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাদের এই অভিযোগ ছিল সম্পূর্ণ ভুল। কারণ, যে কোন দেশের বিপ্লবের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় সেই দেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটের ওপর। আরেকটি দেশে হুবহু সে বিপ্লবের প্রতিস্থাপন সম্ভব নয়। তবে ইসলামী শিক্ষা ও চেতনার ওপর ভিত্তি করে সংঘটিত ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিশ্বের অন্যান্য দেশের ইসলামী আন্দোলনগুলোর ওপর যে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। বর্তমান যুগে ইসলামী বিপ্লব সম্ভব নয় বলে বিভিন্ন দেশের যে সব আন্দোলনকারী হতোদ্যম হয়ে পড়েছিলেন, তারা ইরানের বিপ্লবের পর আশার আলো দেখতে পেলেন।

ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ইরাক, আফগানিস্তান ও লেবাননে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। এমনকি ৮০র দশকে তুরস্কের ইসলাম বিদ্বেষী ধর্মনিরপেক্ষ শাসকগোষ্ঠিও সেদেশে ইরান বিপ্লবের প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পর তুরস্কে একের পর এক ইসলামপন্থী দল গঠন এবং সেসব দলের প্রতি জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ঘোষণা- এর সত্যতার প্রমাণ বহন করে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের গোড়ার দিকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের রেড আর্মি আফগানিস্তান দখল করে নেয়। কিন্তু একই ভাষাভাষি ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত আফগান জনগণ ইরানের বিপ্লব থেকে শিক্ষা নিয়ে তৎকালীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার সিদ্ধান্ত নেয়। ওদিকে সোভিয়েত নেতারা আফগানিস্তানের জনগণের জীবন থেকে ইসলাম মুছে ফেলে সেখানে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার অনুপ্রবেশ ঘটানোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু ইসলামের প্রতি আফগান জনগণের অনুরাগ এবং বিপ্লবের দেশ ইরানের সাথে আফগানিস্তানের সীমান্ত থাকার কারণে সোভিয়েত নেতাদের সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে থাকে। মরহুম আহমাদ শাহ মাসুদের মত মুজাহিদরা লাল বাহিনীর বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম করে আফগানিস্তানে রুশ শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন, তার পেছনেও ছিল ইরানের ইসলামী বিপ্লবের অনুপ্রেরণা।
লেবাননের হিযবুল্লাহ আন্দোলনকে বহির্বিশ্বে ইসলামী বিপ্লবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব হিসেবে উল্লেখ করা যায়। মধ্যপ্রাচ্যে লেবানন ও ইরানের অভিন্ন শত্রু ইসরাইলের অবস্থান, ৮০র দশকে লেবাননের ওপর ইসরাইলের আগ্রাসন এবং সে সময় লেবাননের জনগণের জন্য ইরানের মানবিক সাহায্য প্রেরণ- দুই দেশের জনগণকে অনেক কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। ইরানের বিপ্লবের আগে লেবাননের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এবং সেদেশে অবস্থানরত ফিলিস্তিনী আন্দোলনগুলো বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল। কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের পর লেবাননের রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসে এবং রাজনৈতিক দলগুলো মাওবাদী চিন্তাধারা বাদ দিয়ে ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এ সম্পর্কে এক ভাষণে বলেছেন, "আগে সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যকামী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা উঠলেই অবশ্যম্ভাবীরূপে সমাজবাদী চিন্তাধারার কথা চলে আসতো। কমিউনিজমের আশ্রয়ে না গিয়ে কেউ পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে কথা বলার চিন্তাও করতো না। কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পরে এই ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়। দেশে দেশে স্বাধীনতাকামী ও প্রতিরোধ আন্দোলন ইসলামী রূপ পেতে শুরু করে।

ইরানের প্রতিবেশী দেশ ইরাকের ওপরও ইসলামী বিপ্লবের সুনির্দিষ্ট প্রভাব পড়েছিল। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের এক বছরের মাথায় সাদ্দাম সরকার ইরানের ওপর যে হামলা চালিয়েছিল, তার অন্যতম কারণ ছিল দেশটির জনগণের ওপর এ বিপ্লবের প্রভাব প্রতিহত করা। ইরানের বিপ্লবী সরকারকে ধ্বংস করা কিংবা অন্তত দুর্বল করে ফেলার লক্ষ্যে সাদ্দাম ইরানের ওপর যে আগ্রাসন চালায়, তৎকালীন দুই পরাশক্তি আমেরিক ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সে আগ্রাসনে ইরাক সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দেয়। ইরানে আগ্রাসনের পাশাপাশি ইরাকের সাবেক সাদ্দাম সরকার নিজের দেশে সব ধরনের ইসলামী আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঐ যুদ্ধে সাদ্দাম পরাজিত হয় এবং দেশের ভেতরেও জনগণের ইসলামপ্রিয় মনোভাব প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়। ২০০৩ সালে সাদ্দাম সরকারের পতনের পর ইরাকী জনগণের ইসলামী পরিচয় নতুন করে বিশ্ববাসীর সামনে ফুটে ওঠে। অধিকাংশ ইরাকী তাদের সাবেক গোত্র ও গোষ্ঠিগত শ্লোগান ভুলে গিয়ে ইসলামী শ্লোগান তুলে ধরতে থাকে।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সীমিত থাকে নি। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের গণ আন্দোলনের সময় বহু মানুষকে "আল্লাহু আকবার" ধ্বণিতে শ্লোগান দিতে দেখা গেছে। প্রকৃতপক্ষে ইরানের ইসলামী বিপ্লব বাইরের আধিপত্যকামী শক্তি এবং দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সাম্রাজ্যবাদীদের ক্রীড়নক সরকারগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ইসলামী আন্দোলনগুলোর বিজয়ের যে পূর্বশর্তটি অবশ্যই মেনে চলতে হবে তা হচ্ছে, পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর নির্ভরতা এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে দৃঢ় প্রত্যয়। যে পূর্বশর্ত বাস্তবায়ন করেছিলেন ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনি (রহ:)।#

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-১৯

 মরহুম ইমাম খোমেনি (রহঃ) এর নেতৃত্বে ইরানে যে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, তার প্রভাব শুধুমাত্র ইরানের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে সীমিত ছিল না, বরং বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব পড়েছিল। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা এর আগেও আলোচনা করেছি। তবে ইসলামী বিপ্লবের বিজয় মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় কী ধরনের ভূমিকা রেখেছিল আজকের আসরে আমরা সেদিকে নজর দেবো। এছাড়া বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় চিন্তাধারার বিকাশে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ভূমিকা নিয়ে আমরা আসরের শেষভাবে কথা বলার চেষ্টা করবো।

বিভিন্ন ইসলামী শ্লোগান দিয়ে এবং ইসলামী লক্ষ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। ঐ বিপ্লব ইরানী জনগণের জীবনকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। তবে এ বিপ্লবের মহান লক্ষ্যগুলোর কথা মাথায় রেখে বিশেষজ্ঞরা তখন বলেছিলেন, এ বিপ্লবের প্রভাব সারা বিশ্বের ওপর পড়বে, বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহর ওপর গভীর রেখাপাত করবে। বিশেষজ্ঞদের সে ভবিষ্যদ্বাণী প্রমাণ হতে বেশী সময় লাগে নি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এ বিপ্লবের প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে।

ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের আগে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে তাল রেখে মুসলিম দেশগুলোতে ধর্মহীনতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রসার ঘটানো হচ্ছিল। মুসলিম দেশগুলোতে ধর্মের কথা যতটুকু বলা হতো, তা ছিল মানুষের ব্যক্তিজীবন কেন্দ্রীক। কিন্তু মহান ইরান বিপ্লব মুসলমানদের কাছে প্রকৃত ইসলামের বাণী পৌঁছে দিয়েছে এবং মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আগেও মুসলিম দেশগুলোর কোন কোন নেতা মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান জানালেও বিপ্লবের পর মুসলমানদের মধ্যে ধর্মের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পায় এবং তারা আত্মসচেতন হয়ে ওঠে। ইসলামী বিপ্লব গত তিন দশকে ইসলামের প্রকৃত শক্তি সম্পর্কে মুসলমানদের জাগ্রত করে প্রমাণ করেছে, প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের যে কোন মতাদর্শের তুলনায় ইসলামের অবস্থান অনেক ঊর্দ্ধে। মুসলমানদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বর্তমানে বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠি পশ্চিমা লিবারেলিযম বা উদার নৈতিকতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতে পরিণত হয়েছে এবং মুসলমানরা এখন নিজেদের মুসলমান বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করছে।
ইসলামী বিপ্লবের আরেকটি অর্জন হচ্ছে, এ বিপ্লব মুসলমানদেরকে নিজেদের প্রকৃত শত্রুকে সনাক্ত করার সুযোগ করে দিয়েছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান বিপ্লবের পর থেকেই বলে আসছে, পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে মার্কিন সরকার মুসলমানদের প্রধান শত্রু এবং অভিন্ন এ শত্রু মুসলমানদের সম্পদ লুণ্ঠনের কাজে ব্যস্ত রয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে সচেতনা বৃদ্ধির এ প্রচেষ্টার ফলে মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের কাছে এখন একথা স্পষ্ট যে, মার্কিন সরকার ও ইহুদীবাদী ইসরাইল মুসলিম উম্মাহর অভিন্ন শত্রু । মুসলিম দেশগুলোতে চালানো জনমত জরীপে দেখা গেছে, এসব দেশের জনগণ মার্কিণ সরকারকে ঘৃণা করে এবং ওয়াশিংটনের সাম্রাজ্যবাদী নীতির ঘোর বিরোধী। এ বিষয়টিকে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলে অভিহিত করা যায়।

ইরানের ইসলামী বিপ্লব জুলুম ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে একটি জাতির প্রতিরোধ ও আত্মবিশ্বাসের বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরেছে। ইরানী জনগণ ঐ বিপ্লবের মাধ্যমে কেবল স্বৈরাচারী শাহ সরকারকেই ক্ষমতাচ্যূত করে নি, সেই সাথে ইরানের ওপর থেকে মার্কিন সরকারের দুষ্ট প্রভাব খর্ব করে একটি স্বাধীন, নির্বাচিত ও ইসলামী সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। বর্তমানে ফিলিস্তিন, লেবানন, ইরাক ও আফগানিস্তানের পাশাপাশি আরো কয়েকটি অমুসলিম দেশে এ বিপ্লবের সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ইসলামী ইরানের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ইমাম খোমেনি (রহঃ) এ সম্পর্কে বলেন, "বিশ্ব মুসলিমকে একত্ববাদ ও ইসলামের সুমহান পতাকাতলে সমবেত করার জন্য আমরা বিপ্লব করেছি। আমরা আমাদের দেশ থেকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে বিতাড়িত করেছি এবং মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল সোনালী অতীত ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্র তৈরি করেছি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, মুসলিম দেশগুলোর ওপর কাফেরদের আধিপত্য খর্ব করে এসব দেশের মানুষকে প্রকৃত মুক্তি ও স্বাধীনতার স্বাদ উপহার দেয়া।"

মুসলমানদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ও তাদেরকে জাগিয়ে তোলা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ, কিন্তু এ থেকে সুফল পেতে হলে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ, ইসলামের শত্রুরা এ যাবত মুসলমানদের মধ্যকার অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বেশী ক্ষতি করেছে। এই অনৈক্যকে কাজে লাগিয়ে তারা মুসলিম দেশগুলোর ওপর নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী শাসন চাপিয়ে দিয়েছে অথবা মুসলিম দেশ দখল করে এসব দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করছে। ফিলিস্তিন, ইরাক ও আফগানিস্তানে আমরা এর স্পষ্ট উদাহরণ লক্ষ্য করছি। এ কারণে ইমাম খোমেনি (রহঃ) মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইসলামী বিপ্লবের অর্জন হিসেবে শিয়া ও সুন্নী মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এ পর্যায়ে আমরা বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় চিন্তাধারার বিকাশে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ভূমিকা নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করবো। ১৯৭০ এর দশকের শেষভাবে ইসলামী বিপ্লব চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে বস্তুবাদী চিন্তাধারার পরিবর্তে আধ্যাত্মিকতা এবং সংঘাতের পরিবর্তে সহমর্মীতা ও সহাবস্থানের প্রসঙ্গগুলি উঠে আসতে থাকে। ইসলামী শিক্ষা থেকে উৎসারিত বিপ্লবী চিন্তাধারা ধর্মীয় কাজেকর্মে প্রাণসঞ্চারণ করে এবং আল্লাহর সামনে মানুষের আত্মসমর্পনের বিষয়টিকে নতুন করে সবার সামনে তুলে ধরে। নতুন করে এ চেতনা জাগ্রত হয় যে, সৃষ্টিজগতে মানুষ কোন পন্য নয়, বরং সৃষ্টির সেরা জীব। ইরানের ইসলামী বিপ্লব মানব জীবনে বস্তুগত চাহিদার বিষয়টি অস্বীকার না করেই বিশ্ববাসীর কাছে এ বার্তা পৌঁছে দেয় যে, হযরত মুসা (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) ও সর্বশেষ রাসূল হযরত মোহাম্মাদ (সাঃ) যে সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, সে ধরনের সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।
ফরাসি সমাজ বিজ্ঞানী মিশেল ফুকো এ সম্পর্কে বলেছেন, আধ্যাত্মিকতা ছিল ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মূলভিত্তি। এ বিপ্লব পুরনো চিন্তাধারার প্রতি ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করেছে। এ বিশেষত্ব ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে বিশ্বের অন্যান্য বিপ্লব থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করেছে এবং নিজেই একটি আদর্শে পরিণত হয়েছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবে মুগ্ধ হয়ে মিশেল ফুকো এ বিপ্লবকে "প্রথম অত্যাধুনিক বিপ্লব" বলে অভিহিত করেছিলেন। এছাড়া তিনি অন্য এক লেখায় এ বিপ্লবকে "গণজাগরণের আধুনিকতম রূপ" বলে উল্লেখ করেন। প্রখ্যাত বৃটিশ সমাজ বিজ্ঞানী এন্টনি গিডেনস বলেছেন," কার্ল মার্কস, দুরকিম ও ভেবেরের মত বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানীরা তাদের সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ক তত্ত্বে মোটামুটি যে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছেন, তা হচ্ছে, মানব জীবন থেকে ধর্ম আস্তে আস্তে বাদ পড়ে যাচ্ছে এবং সেকুলারিযম বা ধর্মহীনতা ধর্মের যায়গাটি দখল করে নিচ্ছে। কিন্তু আশির দশকে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর আমরা ঐসব চিন্তাবিদের ভবিষ্যদ্বাণীর বিপরীত স্রোতধারা লক্ষ্য করেছি।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর পশ্চিমা গণমাধ্যম কথিত ইসলামী মৌলবাদ নামক পরিভাষা আবিস্কার করে। ইসলামী বিপ্লবের চেহারা বিকৃত করে তুলে ধরে চূড়ান্তভাবে ইসলামের ক্ষতি করার জন্য এ পরিভাষাটি পশ্চিমা চিন্তাবিদদের মুখ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বের হতে থাকে। তবে তাদের এই প্রচারণায় যে অনস্বীকার্য সত্যটি বেরিয়ে আসে তা হলো, বিশ্বব্যাপী ইসলামের প্রতি মানুষের ঝোঁক ও আগ্রহ বেড়ে গেছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। এর আগে মানব জীবন থেকে ধর্মকে বাদ দেয়ার বা রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা করার চেষ্টা শুরু হলেও এ সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ধর্মের কী কী ভূমিকা থাকতে পারে, তা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা শুরু হয় এবং অনেক বই প্রকাশিত হতে থাকে।

ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের কয়েক বছর পর পশ্চিমা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এ সিদ্ধান্তে উপনিত হয় যে, বিশ্বের দেশে দেশে ধর্মীয় চিন্তাধারার বিকাশ ঘটছে। মুসলিম দেশগুলোতে বিশেষ করে তরুন শ্রেনীর মধ্যে ধর্মীয় আচার আচরণ পালনের প্রবনতা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ধর্ম সম্পর্কে তারা নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। ইউরোপের মুসলমানরা এখন ইসলামকে নিজেদের পরিচয়ের প্রধান অবলম্বন বলে বেছে নিয়েছে। ১৯৭৯ সালে যেখানে স্বাধীন মুসলিম দেশের সংখ্যা ছিল ৪৬টি ১৯৯৭ সালে সে সংখ্যা বেড়ে গিয়ে ৫৬ টিতে দাঁড়ায়। বর্তমানে মুসলিম দেশগুলোর পাশাপাশি অমুসলিম দেশগুলির মানুষের মধ্যে এ উপলব্ধি সৃষ্টি হয়েছে যে, ধর্মই মানুষের জীবনযাপনের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট পথ নির্দেশ করেছে। মানুষ এখন নিজের অসংখ্য সমস্যা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে ধর্মের দিকে ছুটছে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, ইরানের ইসলামী বিপ্লব আধ্যাত্মিকতার জন্য তৃষ্ণার্ত হৃদয়গুলোকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে এবং মানবীয় ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে নব জাগরণ সৃষ্টি করেছে। আর এখানেই ইসলামী বিপ্লবের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। ইসলামী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী যেমনটি বলেছেন, আমরা যদি ইসলামী ও বিপ্লবী মূল্যবোধ বিস্তারের জন্য কোন কাজ নাও করি, তবুও প্রাণসঞ্জিবনী সুধার কারণে বিশ্বব্যাপী এর সুবাস ছড়িয়ে পড়বে।#

 ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-২০

বিপ্লব বিজয়ের শুরু থেকেই বিশ্বব্যাপী তার প্রভাবের বিষয়টি লক্ষ্যণীয় ছিল,এখন তিন দশক পরে তা যে আরো ব্যাপক গভীরতা লাভ করবে তাতে আর সন্দেহ কী! রাজনীতি বিশ্লেষকদের অনেকের মতে ইসলামী বিপ্লব আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এমন নতুন রাজনৈতিক আদর্শের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন,যেই আদর্শ ন্যায়কামিতা,ধর্মীয় গণতন্ত্র,মানব মর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে অনুপ্রাণিত করে। বিশেষ করে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর বিশ্বব্যাপী মুসলমান জনগোষ্ঠির মাঝে যেভাবে গণজাগরণের সৃষ্টি হয়েছে,তা থেকেই অনুমিত হয় যে,বিশ্বের বহু দেশ আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত হয়ে এখন ন্যায়প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশী। সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে নতুন যেই পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় তা ইসলামী বিপ্লবের ন্যায়কামিতা থেকেই অনুপ্রেরণা লাভ করেছে। কেননা ইসলামী বিপ্লব ঔপনিবেশিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে মানুষের আধ্যাত্মিকতার তৃষ্ণা মেটায়।

ইসলামী বিপ্লবের প্রভাবের বিষয়টিকে বিপ্লবের সমর্থক শত শত দলের উচ্ছাস,কিংবা ইমাম খোমেনী (রহ) এর অনুসারী বিপ্লবপন্থীদের ভালোবাসা কিংবা স্বাধীনতাকামী আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা ঠিক হবে না। কেননা, বিপ্লব বিজয়ের পর এখন ত্রিশ বছর পেরিয়ে গেছে। তাই ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব তাই চিন্তার অনেক গভীরে প্রোথিত। ইসলামী বিপ্লবের সূতিকাগার হিসেবে ইসলামের উন্নত চিন্তাদর্শের বিশ্বব্যাপী বিস্তারও বিপ্লবের গভীর প্রভাবের বিষয়ীট প্রমাণ করে। বিপ্লব বিজয়ের প্রথম দশকেই মিশর,পাকিস্তান, জর্দান, বাহরাইন, ইরাক, লেবানন, সৌদি আরব, তুরস্কসহ আরো অনেক দেশে ইসলামী বিপ্লবের প্রভাবে অনুপ্রাণিত হয়। এখনো বহু দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের মাঝে বিপ্লবের প্রেরণা জাগ্রত রয়েছে। বিশেষ করে লেবানন ও ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো ইসলামী বিপ্লবেরই প্রভাবপুষ্ট। এখানে একটি কথা বলা বোধ হয় অসঙ্গত হবে না যে,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রধান শত্রু । বিপ্লব বিজয়ের পর থেকে বিগত ত্রিশ বছরে আমেরিকা ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে বহু ষড়যন্ত্র করেছে। তারা ইসলামী ইরানকে তালেবান এবং আলকায়েদার মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠির কাতারে দাঁড় করানোর বহু চেষ্টা করেছে। নিজেরাই আলকায়েদা গোষ্ঠিকে গঠন করে ইসলামের উন্নত স্বরূপকে বিকৃত ও ধ্বংস করার পাঁয়তারা করেছে।

এছাড়াও ইহুদিবাদী ইসরাইল,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বৃটেনের গোয়েন্দা বাহিনী ইসলামী দেশগুলোতে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টির কাজে সদা তৎপর থেকেছে। মুসলিম দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠি যেন ইসলামী বিপ্লবের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ না হয় সেজন্যেই শত্রু পক্ষের গোয়েন্দারা ইসলামী বিপ্লবকে বিকৃত ও বিচ্যুতরূপে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনয়ী বহুবার বহুভাবে ইসলামী বিপ্লবের এইসব শত্র"দের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েছেন। তাঁর এই সতর্কতার ফলে ফিলিস্তিন এবং লেবাননের যুব প্রজন্ম সচেতনতার সাথে জাগ্রত হয়ে উঠেছে,বলদর্পী ও আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ইসলামী জাগরণের ফলেই ইহুদিবাদী ইসরাইল জেহাদি শক্তির কাছে বারবার পরাজিত হচ্ছে।

ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব ল্যাটিন আমেরিকার মুক্তি ও স্বাধীনতাকামী মার্কিন বিরোধী দেশগুলোতেও পড়েছে। কেননা ইসলামী বিপ্লব হলো আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম। আমরা যদি লক্ষ্য করি,তাহলে দেখবো যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর স্বাধীন নির্বাচনে তারাই ক্ষমতায় গেছে যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে মার্কিন নীতি বিরোধী এবং স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে হুগো চ্যাভেজ ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী নীতির বিরোধী। চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে ব্রাজিল,বলিভিয়া,চিলি,উরুগুয়ে,পেরু এবং নিকারাগুয়াতেও সেইসব রাজনীতিবিদরাই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন,যারা তাদের দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে দৃঢ় ও মজবুত করার নীতিতে বিশ্বাসী। পশ্চিমা এইসব রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক আদর্শ এখন নয়া বাম রাজনীতি নামে পরিচিতি পেয়েছে। তাদের এই রাজনীতির উদ্দেশ্য হলো তাদের দেশ থেকে মার্কিন অর্থনীতি ও রাজনৈতিক আধিপত্যের পরিসমাপ্তি ঘটানো।

বিগত দুই শতাব্দীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর এমনভাবে তাদের আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল যে,এই অঞ্চলটি আমেরিকার মুক্তাঙ্গন নামে অভিহিত হয়েছিল। কিন্তু এই মুক্তাঙ্গনের জনগোষ্ঠি এমনভাবে মার্কিন বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে যে,তাকে মুক্তাঙ্গনে ঝড় বলে অভিহিত করা হয়। আন্দোলনের ফলে ল্যাটিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্যে কম্পনের সৃষ্টি হয়। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলেও মার্কিন প্রভাবমুক্ত স্বাধীন দেশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হোয়াইট হাউট মোটেই সন্তুষ্ট নয়। বিশেষ করে তারা উদ্বিগ্ন এই জন্যে যে, আমেরিকার মুক্তাঙ্গন খ্যাত এ অঞ্চলে ইরানের ইসলামী গণতান্ত্রিক অর্থনীতি ও সরকার ব্যবস্থার উপস্থিতি রয়েছে।

১৯৭৯ সালের ফেব্র"য়ারিতে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর ইরান আমেরিকার নিরাপত্তা বলয় থেকে বেরিয়ে যায়। এরফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের আশেপাশের দেশগুলোকে নিয়ে আমেরিকা যে নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করেছেলি,তাতে ব্যাপক ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়। এ সময় ল্যাটিন আমেরিকার ও বেশকিছু দেশ-আমেরিকার সাথে যেসব দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল-তারাও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে রুষ্ট হলো। এদিকে চিলি স্বৈরাচারী পিনোশের সময় তেহরানে তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দেয়। ম্যাক্সিকোও একই পথে অগ্রসর হয়। কিন্তু কিউবা এবং নিকারাগুয়া এদের মাঝে ছিল ব্যতিক্রমী। কিউবা নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো ইরানে ইসলামী বিপ্লবকে স্বাগত জানায়। সে সময় হাভানায় ইরানী পার্লামেন্টের এক প্রতিনিধি দলের সাথে সাক্ষাতে মিঃ ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, ইরানী জাতি অবিশ্বাস্য এক ঘটনা ঘটিয়েছে,মার্কিন মদদপুষ্ট শক্তিশালী একটি সরকারকে উৎখাত করেছে।

নিকারাগুয়ার সান্দিনিৎসী বিপ্লবের নেতাও ইরানের বিপ্লবের সমর্থনে কথা বলেন। নিকারাগুয়া এবং ইরানের বিপ্লব ছিল সমসাময়িক। উভয় দেশই মার্কিন মদদপুষ্ট নিজ নিজ দেশের স্বৈরাচারী সরকারকে সমূলে উৎখাত করে স্বাধীনতা ও মুক্তি লাভ করেছিল। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের প্রথম ক'বছরে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর সাথে ইরানের সম্পর্ক তেমন জোরদার ছিল না। কিন্তু আশির দশকের দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিন,ব্রাজিল এবং উরুগুয়ের সাথে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ল্যাটিন আমেরিকার বহু দেশের সাথে ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবার পাশাপাশি আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের রাজনৈতিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে। শীতল যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে পরিবর্তন দেখা দেয়,তারফলে তেহরানের সাথে ল্যাটিন আমেরিকার বহু দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরী হয়।

শীতল যুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। দু'দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মৌলিক কিছু নিয়ম-নীতিতে আমূল পরিবর্তন সূচিত হয়। ইতোমধ্যে ইরানের ইসলামী বিপ্লবও আন্তর্জাতিক সমাজের কম শক্তিশালী কতিপয় দেশের সামনে নতুন একটি পরিবেশের জন্ম দেয়। অন্যভাবে বলা যায়,সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দুই পরাশক্তির বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজেদের স্বাধীনতা ও জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই পরিস্থিতি ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোকে নিজেদের ভূগোলের বাইরের দেশের সাথে যোগাযোগ করার সুযোগ এনে দেয়। এভাবেই আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্বাধীনতাকামী দেশগুলোর সাথে অভিন্ন লক্ষ্যাভিমুখি ইরানের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।

ল্যাটিন আমেরিকার বহু দেশ তখন হোয়াইট হাউজের নীতির অনুসারী ছিল।যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারা ইসলামী ইরানের ব্যাপারে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতো না। কিন্তু মার্কিন বিরোধী আঞ্চলিক কোনো কোনো দেশ এবং যেসব দেশ আমেরিকার তেমন বিরোধিতা করতো না,কিন্তু নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষায় ছিল বদ্ধপরিকর,তারা ইরানের সাথে সার্বিক দিক থেকে সম্পর্ক উন্নয়নকে সমীচীন ভাবলো। এইসব দেশের মধ্যে রয়েছে ব্র্রাজিল, ম্যাক্সিকো, পেরু, বলিভিয়া, নিকারাগুয়া, ভেনিজুয়েলা, কিউবা এবং প্যারাগুয়ে। সম্প্রতি হুগো চ্যাভেজ ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় ল্যাটিন আমেরিকার সাথে ইরানের সম্পর্ক আরো জোরদার হয়েছে। বলিভিয়া এবং নিকারাগুয়ার প্রেসিডেন্টবৃন্দও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের সাথে দ্রুত সম্পর্ক বৃদ্ধির ব্যাপারে আগ্রহ পোষণ করেছেন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী নীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হবার কারণেই মুক্তি ও স্বাধীনতাকামী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ইরানের ব্যাপারে ল্যাটিন আমেরিকার আগ্রহ বেড়ে গেছে। অপরদিকে ইরান হয়ে উঠেছে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে আঘাতকারী অজেয় শক্তি।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-২১

ইরানের ইসলামী গণতন্ত্র ইসলামের আধ্যাত্মিক,সাংস্কৃতিক,সামাজিক ও রাজনৈতিক সমৃদ্ধি ও শক্তির ওপর নির্ভর করে আধিপত্যবাদী ব্যবস্থা থেকে মুক্তি দিয়ে স্বাধীনতাকামী দেশ ও জাতিকে আশার আলো দেখিয়েছে। ইরানের বিশিষ্ট মনীষী শহীদ আয়াতুল্লাহ মুর্তেযা মোতাহহারী ইরানের ইসলামী বিপ্লবের শেকড় অন্বেষায় লিপ্ত হয়ে বিগত অর্ধশতাব্দীর ইরানের ঘটনাপঞ্জী নিয়ে গবেষণা করেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন শাহের বিরুদ্ধে ইরানী জনগণের সংগ্রাম অনেক পুরোণো।

এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক রাজনীতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদের প্রতিও তিনি ইঙ্গিত করেছেন। ইরানে ইঙ্গো-মার্কিন কর্তৃত্ব মোকাবিলা করার কারণে শাহ বিরোধী আন্দোলন ত্বরান্বিত হয়েছে। সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক লেখক জন ফোরান ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেছেন,ইমাম খোমেনী ( রহ ) আপোষহীনতার কারণে এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার কারণে ৭০ এর দশকে তিনি ইসলামকে একটি সংগ্রামী আদর্শ হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হন যা ছিল সমাজের বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠির জন্যে খুবই আকর্ষণীয়। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে আলোকোজ্জ্বল দশ প্রভাতের মেহমানদের উদ্দেশে বলদর্পী ও স্বৈরাচারী শক্তির বিরুদ্ধে ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব সম্পর্কে বলেছিলেন-ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর স্বৈরাচারী ও বলদর্পী শক্তির বিরুদ্ধে ইসলামের ডাকই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আহ্বান হিসেবে সোচ্চার হয়েছিল। মানবতার শত্র"রা ইসলামের এই সোচ্চার কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে।

আসলে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান বিপ্লব বিজয়ের পরের কয়েক বছর বলদর্পী শক্তি ও আধিপত্যবাদী ব্যবস্থার মোকাবেলা করার মতো মৌলিক কিছু পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্বকে পূর্ব-পশ্চিম দুই ভাগে ভাগ করার যেই প্রবণতা পরাশক্তিগুলোর মাঝে ছিল,তাতে আঘাত হানে। এরফলে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর আধিপত্যবাদ মোকাবেলায় নতুন এক প্রতিরোধ আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। লেবানন ও ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদী ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামী জাগরণের বিকাশ লাভ করে। ইরাক এবং আফগানিস্তানের মুক্তিকামী আন্দোলনগুলোও ইরানের সংগ্রামী আদর্শেরই প্রভাবপুষ্ট বৈ কি! বিপ্লবের শত্র"দের শত ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও ইরানের ইসলামী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। পক্ষান্তরে সোভিয়েত ইউনেয়নের ঐতিহাসিক কমিউনিস্ট শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটে।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিস্ট ব্যবস্থার পতনের পর মার্কিনীদের একক বিশ্বব্যবস্থার দাবীও চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন হয়। দুই দশক আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ইসলামী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যাপক হুমকি দিয়ে এবং ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে ইসলামী ইরানকে কোনঠাসা করার সমূহ চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু এ কাজে তারা কোনোভাবেই সফল হতে পারে নি। তাদের এই ব্যর্থতা বিশেষ করে পরমাণু শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে ইরানের সামনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিতে তাদের ব্যর্থতা বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। ইরানকে মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের জন্যে বিরাট হুমকি হিসেবে তুলে ধরার জন্যে নিরলস চেষ্টা করেও আমেরিকা ব্যর্থ হয়েছে। আমেরিকা যে ইরানের বিরুদ্ধে এবং ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে,তার একটা বড়ো কারণ হলো বিশ্ব এবং মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে আমেরিকার স্বার্থ চরিতার্থ করার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লব। বলদর্পী ও আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ইসলামী ইরানের সোচ্চার হবার বিষয়টি এখন আদর্শে পরিনত হয়েছে। আর মার্কিন বিরোধী এ বিপ্লবী আদর্শই আমেরিকার যতো গা জ্বালার কারণ।

পশ্চিমারা যে ইরানের ইসলামী গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা এবং বিপ্লবের বিরোধিতা করছে তার আরেকটি কারণ হলো,ইরানের ইসলামী বিপ্লব ইহুদিবাদী ইসরাইলের স্বরূপ বিশ্ববাসীর সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সেইসাথে ইসরাইল বিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রে ইরানের ইসলামী বিপ্লব ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের দুই দশক আগে থেকেই ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানী আপামর জনগণের আন্দোলন সংগ্রাম বিশেষ করে ফার্সি ১৫ ই খোরদাদ তথা ১৯৬৩ সালের জুনের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর কোমের জনগণ শাহের নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে সময় ইমাম খোমেনী (রহ) ইসরাইল ও আমেরিকার সাথে শাহের সম্পর্কের স্বরূপ জনতার সামনে তুলে ধরেন। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসলামী বিপ্লবের সবচে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনটি হলো,সত্য,ন্যায়ের পতাকা উড্ডীন করা এবং ইহুদিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ইসলামী গণজাগরণ সৃষ্টি করা।

ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করলে দেখা যাবে বিপ্লব বিজয়ের ফলে সারাবিশ্বেই ইসলামের পক্ষে একটা জোয়ার এসেছে। ঐ জোয়ারের ফলে সাম্রাজ্যবাদ এবং পশ্চিমা লিবোরেল ডেমোক্রেসি ইসলাম নামক নতুন একটি আদর্শের মুখোমুখি হয়। যেই আদর্শ ঈমান এবং আধ্যাত্মিকতার ভিত্তিতে মানুষের প্রয়োজন মেটায় এবং ধর্মনিরেপক্ষ চিন্তা ভিত্তিক রাজনীতিকে অস্বীকার করে ধর্ম,সংস্কৃৃতি ও মানব মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখায়। এটা এমন সময় ঘটে যখন ফুকুইয়ামার মতো চিন্তাবিদগণ ইতিহাসের পরিসমাপ্তি কিংবা হান্টিংটনের সভ্যতাগুলোর মাঝে সংঘাত নামক তত্ত্বের মাধ্যমে চেষ্টা করেছিলেন ইসলামী সভ্যতাগুলোকে হুমকিগ্রস্ত করতে।

পাঠক! আপনারা জানেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ এবং তার সরকার বহুবার বলেছে যে ইরানের পরমাণু তৎপরতা সবচে বড়ো সমস্যা। ইরান যদি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কাজ বন্ধ করে তাহলে আমেরিকা ইরানের সাথে দ্বিপাক্ষিক সমস্যা ও মতপার্থক্যগুলো দূর করার জন্যে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসতে আগ্রহী। কিন্তু ইরান বারবার বলেছে যে,পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার বৈধ অধিকার থেকে ইরান বিন্দুমাত্রও পিছু হটবে না। আসলে আমেরিকা বিগত ত্রিশ বছর ধরে নতুন নতুন অজুহাত দেখিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে শত্র"তা ও বৈষম্যমূলক নীতি অব্যাহত রেখেছে। তারা কখনো মানবাধিকারের প্রসঙ্গ টেনেছে,কখনোবা শান্তিপূর্ণ পরমাণু শক্তি অর্জনের প্রসঙ্গ টেনেছে। এইসব বিষয়কে তারা ইরানের বিরুদ্ধে তাদের বৈষম্যমূলক নীতি অব্যাহত রাখার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছে।

সেই ষাটের দশক থেকে তারা ইরানের ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে। ইরানের মুসলিম জনগোষ্ঠি আভ্যন্তরীণ স্বৈরাচার এবং পরাশক্তিগুলোর উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব বিজয় পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখে। বিপ্লব বিজয়ের পর আমেরিকা প্রকাশ্যেই ইসলামী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্র চালাতে থাকে। মার্কিন সহযোগিতায় ইরানের স্বৈরাচারী শাহ সরকার ১৯৬৩ সালের জুনে ইরানী জনগণের ইসলামী বিপ্লবী গণআন্দোলনকে অস্ত্রের মুখে স্তব্ধ করার চেষ্টা করে। সেদিন তারা তেহরান এবং কোম শহরে হাজার হাজার মুসলিম জনতাকে নির্বিচারে হত্যা করে। পণেরোই খোরদাদ খ্যাত এই অভ্যুত্থানের পর আমেরিকা প্রকাশ্যে ইরানের শাহ সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন ঘোষণা করে। আর আমেরিকাপন্থী প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমগুলো ইরানী জনগণের বিপ্লবী অভ্যুত্থানকে এক ও অভিন্ন সুরে শাহী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীলদের দাঙ্গা বলে উল্লেখ করেছে।

শাহের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ইরানী জনগণের সংগ্রাম যখন তুঙ্গে, তখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তেহরান এসে শাহের প্রতি তাদের সমর্থন ঘোষণা করেন। ফলে যে-কোনো মূল্যে তারা যে শাহকে রক্ষা করার চেষ্টা করবে-তাতে আর সন্দেহ কী! ১৯৭০ এর দশকে ইরান এবং সৌদিআরব মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রধান দুই খুঁটি হিসেবে পরিগণিত হয়। এ কারণে এই দুটি দেশ মার্কিন রাজনীতি এবং অস্ত্র সহযোগিতা সবচে বেশি পেয়েছিল। সে সময় শাহ ইরানের বিপ্লবী জনতাকে রাস্তায় রাস্তায় খুন করেছে। বিপ্লবী বন্দীদেরকে কারাগারে ফাঁসি দিয়েছে। ইরানের নিরীহ ইসলামপন্থী জনতার ওপর গণহত্যা চালিয়েছে। সে সময় কিন্তু আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনেনি। অথচ ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর শাহ পন্থী কতিপয় খুনি নেতার বিচার করার ফলে আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। সেই থেকে আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে ইসলামী ইরান মার্কিন সকল ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও সার্বিক ক্ষেত্রে উন্নতি এবং অগ্রগতি অর্জন করে যাচ্ছে। উমিদ নামের উপগ্রহ কক্ষপথে প্রেরণ সেই অগ্রগতিরই সাম্প্রতিক প্রকাশ।#

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক - ২২

বর্তমানে প্রযুক্তির কল্যাণে গণমাধ্যমের ব্যাপক বিকাশ ঘটার ফলে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও প্রচারণার গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে গেছে। এ যুদ্ধে কিছু শব্দ ও বাক্য বিধ্বংসী অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। দুঃখজনকভাবে এ যুদ্ধে পশ্চিমা গণমাধ্যম অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে তুলে ধরে এবং প্রকৃত ঘটনাকে পশ্চিমিকীকরণ করে উপস্থাপন করে। ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রচারণাগত হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল এ বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা। ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে যে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় তার লক্ষ্য ছিল জুলুম বা অন্যায়ের বিরোধিতা করে নির্যাতিত জনগোষ্ঠির পক্ষে কাজ করা। এছাড়া ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতা, আধ্যাত্মিকতার বিকাশ ও ধর্মভিত্তিক জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠাও ছিল এ বিপ্লবের অন্যতম উদ্দেশ্য। এ ধরনের শাসনব্যবস্থা সাফল্যের সাথে টিকে থাকলে তা অন্যান্য মুসলিম দেশের জন্য আদর্শে পরিণত হতে পারে ভেবে পশ্চিমারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। এ কারণে পশ্চিমা গণমাধ্যম ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে ব্যর্থ হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপনের চেষ্টা শুরু করে।

পশ্চিমা গণমাধ্যম ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার জন্য এদেশের জনগণের সাথে সরকারের দূরত্ব সৃষ্টি করার চেষ্টা চালায়। যখন একটি দেশের জনগণকে সেদেশের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই ঐ দেশের গণভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এছাড়া এসব গণমাধ্যমে ইরানী জনগণকেও দুভাগে বিভক্ত করার চেষ্টা চালায়। এ লক্ষ্যে তারা ইরানে মাযহাব, গোত্র ও বর্ণগত পার্থক্যগুলো বড় করে তুলে ধরে। কিন্তু ইরানী জনগণ রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং পশ্চিমাদের ধুর্তামি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সজাগ থাকায় তাদের এ প্রচারণা তেমন কোন কাজে আসে নি। এছাড়া পশ্চিমা গণমাধ্যম ইরানের ছোটখাটো দুর্বলতাগুলোকে বড় করে তুলে ধরে। মূদ্রাস্ফীতিসহ এ ধরনের ছোটখাটো অর্থনৈতিক সমস্যা বিশ্বের সব দেশেই কমবেশী বিদ্যমান। কিন্তু তারা ইরানের এ বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করে ইসলামী শাসনব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে।

পশ্চিমা গণমাধ্যম ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার জন্য তরুণ সমাজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও বিপ্লবী চেতনাকে টার্গেটে পরিণত করেছে। তারা ইসলামী বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোকে তরুণ সমাজের কাছে গুরুত্বহীন হিসেবে তুলে ধরে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে, বিপ্লব এমন কোন বিষয় নয় যে, তাকে সব কিছুর উর্দ্ধে তুলে ধরতে হবে। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে, তরুণ সমাজকে যদি ধর্মীয় বিশ্বাস ও বিপ্লবের চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া যায়, তবে তাদের মধ্যে পশ্চিমা চিন্তাধারা সহজে ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের মাধ্যমে বিপ্লবের ক্ষতি করার কাজে হাত দেয়া যাবে। এ কারণে তারা ইরানসহ গোটা মুসলিম বিশ্বের তরুণ সমাজের মধ্যে বল্গাহীন জীবন যাপন, অশ্লীলতা ও উশৃঙ্খলতার প্রসার ঘটাতে চায়। সিনেমা, স্যাটেলাইট চ্যানেল এবং অসংখ্য ইন্টারনেট সাইট পরিচালনার মাধ্যমে তারা এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইরানের বিরুদ্ধে এসব গণমাধ্যমের প্রচারণা থেমে নেই। ইরানের বিরুদ্ধে বিশ্বের অন্যান্য দেশকে ক্ষুব্ধ করে তোলার জন্য তেহরানের বিরুদ্ধে তারা নানা ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব অভিযোগের স্বপক্ষে তারা কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারে নি। পশ্চিমা গণমাধ্যম ইরানে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে মাঝেমধ্যেই প্রচার চালায়। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে কাউকে গ্রেফতার করা হলে বা খুনের দায়ে কারো ফাঁসি দেয়া হলে কিংবা আইন অমান্য করার কারণে কোন সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হলেই তাদের এ প্রচারণা তীব্রতর হয়ে ওঠে। অথচ এসব গণমাধ্যম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাক ও আফগানিস্তানের নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা কিংবা গাজা উপত্যকায় ইহুদীবাদী ইসরাইলের ভয়াবহ গণহত্যা সম্পর্কে তেমন কোন উচ্চবাচ্য করে না। পশ্চিমা গণমাধ্যমের আরেকটি কর্মসূচী হচ্ছে, ইরানকে বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরে ইরানের ওপর আধিপত্যকামী শক্তিগুলোর হামলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। তবে গতমাসে বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর বুশ প্রশাসনের তুলনায় ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের আশঙ্কা কমে যাওয়ার পর পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ তীব্রতর করেছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব প্রচারণায় তেমন কোন ফল তারা পায় নি। বিশ্বব্যাপী ইরানের ইসলামী বিপ্লবের জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অনেক দেশের ইসলামী আন্দোলন ইরানের বিপ্লবকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে। ইরানের ভেতরেও জনগণের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি আগের চেয়ে অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বোঝা যায়, গত ত্রিশ বছর ধরে পশ্চিমা গণমাধ্যমের ইরান বিরোধী প্রচারণা ব্যর্থ হয়েছে।

পাঠক! আসরের এ পর্যায়ে আমরা পরমাণু প্রযুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে ইরানের সাফল্য তুলে ধরবো। ২০০৬ সালের ৮ই এপ্রিল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ঘোষণা করেন, ইরান সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। ঐ দিনকে ইরানে জাতীয় পরমাণু প্রযুক্তি দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরমাণু প্রযুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে এতবড় অর্জন একদিনে অর্জিত হয়নি। আসলে ইরানে পরমাণু কর্মসূচী শুরু হয়েছিল ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ২৫ বছর আগে। সে সময় সাবেক শাহ সরকার মার্কিন সরকারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল। ১৯৫৬ সালে প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের পরমাণু বিষয়ক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর পরের বছর ইরান আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আই.এ.ই.এ'র সদস্যপদ লাভ করে। তার ১০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ১৯৬৭ সালে ইরানে ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পরমাণু চুল্লি স্থাপিত হয়।

১৯৬৮ সালে ইরান পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটিতে স্বাক্ষর করে এবং এর তিন বছর পর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ইরানে পরমাণু শক্তি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। সে সময় ইরান পারমাণবিক চুল্লি ক্রয় করার জন্য জার্মানী, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা শুরু করে। ঐ আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পরবর্তী ৬০ বছরের জন্য ঐ তিন পশ্চিমা দেশের পক্ষ থেকে ইরানকে পারমাণবিক জ্বালানী সরবরাহের নিশ্চয়তা প্রদান করা। আলোচনার এক পর্যায়ে ইরানের বুশাহরে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পরমাণু চুল্লি স্থাপনের ব্যাপারে ইরান ও জার্মানীর মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ফ্রান্সও ১৯৬৭ সালে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দারখুইন এলাকায় ৯০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পরমাণু চুল্লি স্থাপনের ব্যাপারে তেহরানের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে। এভাবে ইরানের সাবেক শাহ সরকার মার্কিন বলয়ের পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোর কাছ থেকে পরমাণু বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের মাধ্যমে ইরানের মার্কিন তাবেদার শাহ সরকারের পতনের পর পশ্চিমা দেশগুলো তেহরানের সাথে করা তাদের সব চুক্তি বাতিল করে।

ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর পশ্চিমা সমর্থন নিয়ে ইরাকের বাথ সরকার ইরানের ওপর হামলা চালালে দুই দেশের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়। ইরাকী জঙ্গীবিমান ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বুশাহর ও দারখুইন পারমাণবিক কেন্দ্রের ওপর উপর্যপুরি বোমাবর্ষণ করে। ইরানের ওপর ইরাকের চাপিয়ে দেয়া আট বছরের যুদ্ধ প্রমাণ করে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব ইরানকে জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় উন্নতি করতে তো দেবে না, উল্টো ততদিন পর্যন্ত ইরান যতখানি উন্নতি করেছিল, তাও ধ্বংস করে দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করবে। কিন্তু পশ্চিমাদের ঐ প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য ঐ যুদ্ধের পর ইরান তার পরমাণু কেন্দ্রগুলি পুনরায় চালু করা এবং নতুন নতুন স্থাপনা নির্মানের লক্ষ্যে রাশিয়ার সাথে আলোচনা শুরু করে। এ আলোচনায় বহু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালে ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে বুশাহর পরমাণু প্রকল্প চালু করার ব্যাপারে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির ভিত্তিতে বুশাহর পরমাণু প্রকল্পের কাজ পুনরায় শুরু হয়। আগামী বছর ঐ কেন্দ্র চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া এতদিনে ইরানে সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ও ইরানী বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে আরো বেশ কয়েকটি পরমাণু কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে।

ইরানের পরমাণু প্রযুক্তি অর্জনকে ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য বলে অভিহিত করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রেও ইরানকে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টার জন্য অভিযুক্ত করতে শুরু করে। ঐ বছর থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে সদিচ্ছার বহু প্রমাণ দেয়া সত্ত্বেও মার্কিন প্ররোচনায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর বিষয়টিকে আই.এ.ই.এ থেকে বের করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে নিয়ে যাওয়া হয়। ইরান ২০০৭ সালের আগস্ট মাসে আই.এ.ই.এ'র সকল প্রশ্নের জবাব দিয়ে ঐ সংস্থাকে সন্তুষ্ট করে। আই.এ.ই.এ'র মহাপরিচালক মোহাম্মাদ আল বারাদি গত ডিসেম্বরে এক প্রতিবেদনে চতুর্থবারের মত একথা স্বীকার করেন যে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচী সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং সামরিক কাজে ব্যবহারের লক্ষ্যে ঐ কর্মসূচী পরিচালিত হচ্ছে না। এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬টি গোয়েন্দা সংস্থাও ইরানের পরমাণু কর্মসূচী সম্পর্কে একই কথা উল্লেখ করেছিল। কিন্তু তারপরও মার্কিন সরকার ও তার ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপন করে যাচ্ছে। পশ্চিমাদের এই একগুঁয়ে আচরণ ইরানী জনগণকে তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে আরো দৃঢ়সংকল্প করে তুলেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।#

 

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক- ২৩

ইহুদিবাদী ইসরাইলী সেনাদেরকে এক সময় মনে করা হতো অপরাজেয়। ১৯৬৭ সালের জুনে ৬ দিনের যুদ্ধে ৩ টি আরব দেশের ওপর বিজয় লাভ করার ফলে ইসরাইলী সেনাদের ব্যাপারে এই রূপকথাটি চালু হয়ে গিয়েছিল। বহু আরব দেশের নেতৃবৃন্দ মনে করতো ইহুদিবাদী ইসরাইলী সেনাদেরকে মোকাবেলা করার ক্ষমতা কারো নেই। ইরানের ইসলামী বিপ্লব এই রূপকথার গল্পটিকে মিথ্যা বলে প্রমাণ করার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল। এ বিষয়টি নিয়ে আজ আমরা খানিকটা কথা বলার চেষ্টা করবো।

আরব দেশগুলোর এই রূপকথা চিন্তার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ইসরাইলী সেনারাও নিজেদেরকে অপরাজিত শক্তি বলে ভাবতে লাগলো। ইহুদিবাদী ইসরাইল এবং পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোও ইসরাইলীদের সাথে আরব দেশগুলোর পরাজয়ের বিষয়টিকে ফলাও করে আকারে প্রচার করার মাধ্যমে ইসরাইলী সেনাদেরকে অপরাজিত শক্তি বলে ভাববার অবকাশ করে দিলো। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলকে বহু বছর দখল করে রাখার পর ২০০০ সালে সেখান থেকে ইসরাইলী সেনাদের সরে আসতে বাধ্য হওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের দুর্বলতার বিষয়টি প্রকাশ পায়। কোনো সেনাবাহিনী নয়, ইসলামী সংহতি ও প্রতিরোধ বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে টিকে থাকতে না পেরে ইসরাইলী সেনারা ঐ এলাকা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। তারপর ২০০৬ সালে লেবাননের হিযবুল্লাহ বাহিনীর সাথে ৩৩ দিনের যুদ্ধে ইসরাইলী সেনাদের নির্মম পরাজয়ের কাহিনী তো অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। ৩৩ দিনের এই যুদ্ধটিও কোনো আরব দেশের সেনাবাহিনীর সাথে হয় নি। বরং হয়েছিল হিযবুল্লাহর মতো একদল সংগ্রামী প্রতিরোধ যোদ্ধার সাথে।

তাদের সাথে যুদ্ধ করে নাস্তানাবুদ হয়ে ইসরাইলী সেনারা লেবানন থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। বিশ্ববাসীর কাছে এটা ছিল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। ৩৩ দিনের ঐ যুদ্ধে বর্বর ইসরাইলী সেনাদের পরাজয়ের ফলে ইহুদিবাদী সরকারের শক্তিমূলে ব্যাপক নাড়া লাগলো। এই নাড়া ছিল ভয়াবহ ভূমিকম্পের মতো। আজ পর্যন্তও তারা সেই ধকল কেটে উঠতে পারেনি। ইসরাইলী সেনাদের দ্বিতীয় ভয়াবহ পরাজয়টি ঘটে ফিলিস্তিনের গাজার নিরীহ জনগোষ্ঠির ওপর ২২ দিনের নির্বিচার হামলায়।

ইসরাইলী সেনারা দেড় বছর ধরে সমগ্র গাজার ওপর সার্বিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছিল। খাদ্য,ওষুধ থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পর্যন্ত গাজায় প্রবশ করতে না দিয়ে ফিলিস্তিনীরকে দুর্বল করে তোলার ষড়যন্ত্র করেছিল। দেড় বছর অবরোধ করে রাখার পর তারা ভয়াবহ বোমা হামলা চালিয়ে গাজার অবকাঠামোকে ধ্বংস করে দেওয়ার পর ইসরাইলী স্থবাহিনী গাজা শহরে প্রবেশ করে। ইসরাইলী সেনারা ভেবেছিল দীর্ঘদিনের অবরোধ এবং ব্যাপক ভারি বোমা বর্ষণের ফলে গাজাবাসী ফিলিস্তিনীদের শক্তি সামর্থ লোপ পেয়েছে বিশেষ করে ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে ফলে ইসরাইলী বাহিনী গাজায় স্থল অভিযানে কোনোরকম প্রতিরোধের সম্মুখিন হবে না। অনেক আরব দেশের নেতৃবৃন্দও সেরকমটাই ভেবেছিল। অথচ ফিলিস্তিনের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস গাজায় লেবাননের হিযবুল্লাহর মতোই ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।

যেই ইসরাইলী সেনারা ১৯৬৭ সালে ৬ দিনের যুদ্ধে তিনটি আরব দেশকে পরাজিত করে তাদের আংশিক ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছিল, সেই ইসরাইলী সেনারাই ২২ দিনের নির্বিচার হামলা চালানোর পর গাজার দেয়ালের আড়ালে ভূপাতিত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে নিজেদের অক্ষমতা প্রকাশ করতে বাধ্য হলো এবং গাজা ছেড়ে পালালো। মজার ব্যাপার হলো লেবাননের হিযবুল্লাহর সাথে ৩৩ দিনের যুদ্ধে ইসরাইলের পরাজয়ের কথাই বলুন কিংবা হামাসের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সাথে ২২ দিনের যুদ্ধে ইসরাইলী সেনাদের পরাজয়ের কথাই বলুন-ইসরাইলী কর্মকর্তারা এবং তাদের পশ্চিমা মিত্ররা হিযবুল্লাহ এবং হামাসকে সমর সজ্জায় সজ্জিত করে তোলার জন্যে কিন্তু ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকেই দায়ী করলো। অবশ্য প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর বিজয়ের ক্ষেত্রে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রভাবকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে ইরান অস্ত্র দিয়ে প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকে সাহায্য করেছে বলে কেবল পশ্চিমা এবং ইসরাইলী মিডিয়াতেই এসেছে।

এটাও একটা পরিকল্পিত ব্যাপার। কারণ পশ্চিমারা বিশেষ করে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো বিদেশী সামরিক সাহায্য ছাড়া এরকম প্রতিরোধ চালাতে সক্ষম নয়। অথচ এটাও আরেকটা মিথ্যাচার। কেননা হিযবুল্লাহ এবং হামাস নেতৃবৃন্দ বহুবার বলেছেন যে, তাঁরা আধিপত্যবাদ বিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের ক্ষেত্রে তিন দশক পূর্ণ ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। ইরানও কোনোরকম রাখঢাক না করেই মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকে সমর্থন দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে।

অপরদিকে হিযবুল্লাহ মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ, ফিলিস্তিনের নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ইসমাঈল হানিয়া, ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান খালেদ মাশয়াল ইসরাইলী আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে প্রকাশ্যে তেহরানে এসেছিলেন এবং ইরানের পদস্থ কর্মকর্তাগণের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। ইসরাইলী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রে লেবানন এবং ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো যে ইসলামী ইরানকেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে-তাঁরা তাও গোপন করেন নি। ইরানও ফিলিস্তিনীদের ন্যায্য অধিকার যে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে-তাও কোনোরকম কূটনৈতিক মারপ্যাঁচ ছাড়াই স্পষ্ট করে বলে আসছে এবং তার বিরুদ্ধে যথাযথ প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে।

ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর গণভোট আয়োজনের মধ্য দিয়ে ইরানে প্রথমবারের মতো ধর্মভিত্তিক জনগণের শাসন বা ইসলামী গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা কায়েম করা হয়। ধর্মভিত্তিক জনগণের শাসন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করে সর্বোচ্চ নেতা বলেন,এই শাসন ব্যবস্থা ইসলামী শাসন ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে ভালো এবং সবচেয়ে উপযুক্ত ও কার্যকরী একটি ব্যবস্থা। ধর্মভিত্তিক জনগণের শাসন ব্যবস্থা এই সরকারের কর্মকর্তাদেরকে নিজেদের দায়িত্বের ব্যাপারে সদা সচেতন থাকার জন্যে সর্বোত্তম একটি আদর্শ। এই আদর্শের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো-গণরায়কে মেনে নেওয়া এবং জনগণের বৈধ দাবী-দাওয়া ও তাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানো। ইসলাম তার রাজনৈতিক এবং সামাজিক শিক্ষাদর্শের ভিত্তিতে এই দুটি ক্ষেত্রে জনগণের যথাযথ অধিকার রয়েছে বলে মনে করে। অন্যভাবে বলা যায় যে মানুষের অধিকার আদায়ের মূলনীতির ওপরই ইসলামী শাসন ব্যবস্থার ভিত্তিভূমি গড়ে উঠেছে।

ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের মার্চে ইরানে গণভোটের মধ্য দিয়ে ইসলামী গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রথম বসন্ত আসে। সেই থেকেই জনগণের রায় এবং তাদের চাহিদা ও অধিকার রক্ষার ইসলামী আদর্শ যথার্থভাবে সুরক্ষিত হয়ে আসছে। ইসলামী এবং গণতান্ত্রিক-বৈশিষ্ট্য দুটি সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সমান্তরালভাবে ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রে বাস্তবায়িত হয়ে আসছে। প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-ইরানের শাসনব্যবস্থা ইসলামী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। ইরানী জনগণ তাদের পুরোণো বিশ্বাস অনুযায়ী কোরানের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে তথা ইসলামী হুকুমাত কায়েমের পক্ষে ইমাম খোমেনী ( রহ ) আহুত গণভোটে রায় দিয়েছিল। সেই রায়ের ফলে যেই ইসলামী গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই ব্যবস্থা আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। #

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-২৪

ত্রিশ বছর আগে ইমাম খোমেনী (রহঃ)এর বিচক্ষণ নেতৃত্বে এবং ইরানী জনগণের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ইসলামী বিপ্লবের বিজয় হয়েছিল। স্বৈরাচারী শাহ সরকারের পতনের পর ইসলামী বিপ্লবের নেতার প্রথম কাজ দাঁড়ায় ইসলামী মানদন্ডের ওপর ভিত্তি করে একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিপ্লবের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বিপ্লব পরবর্তী সংকটাপন্ন পরিস্থিতির কারণে একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, বিশেষ করে একটি সংবিধান প্রণয়ন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অধিকাংশ সময় বিষয়টি দীর্ঘসূত্রিতার কারণে চাপা পড়ে যায়, অথবা বিপ্লবকে ব্যবহার করে পুনরায় একটি স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু ইমাম খোমেনী (রহঃ) অত্যন্ত বিচক্ষণা ও দুরদর্শিতার সাথে ঘোষণা করলেন, যত দ্রুত সম্ভব সংবিধান প্রণয়ন ও ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ কারণে বিপ্লব বিজয়ের প্রায় দেড় মাস পর ১৯৭৯ সালের ৩০শে মার্চ ইরানে সরকার ব্যবস্থা কী ধরনের হবে, সে ব্যাপারে এক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ঐ গণভোটে শতকরা ৯৮ ভাগেরও বেশী ইরানী "ইসলামী প্রজাতন্ত্রে"র পক্ষে রায় দেয়।

শাসনব্যবস্থার ধরন কী হবে তা নির্ধারিত হওয়ার পর শুরু হয় সংবিধান প্রণয়নের মত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। প্রথমে সংবিধানের খসড়া লিখিত হয়। এটিকে সুবিন্যস্ত করে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। এরপর সংবিধান বিশেষজ্ঞ পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯ সালের ১৯শে আগস্ট এ পরিষদের কার্যক্রম শুরুু হয়। ইমাম খোমেনী ঐ পরিষদকে লেখা এক চিঠিতে বলেন, ইরানের জনগণ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে রায় দিয়েছে, কাজেই আপনারা যে আইনই প্রণয়ন করবেন, তা যেন সম্পূর্ণ ইসলামী হয়। বিশেষজ্ঞ পরিষদ সংবিধানের খসড়ার ওপর গবেষণার কাজ শুরু করেন। এক্ষেত্রে তারা আলেম ওলামা, বুদ্ধিজীবি ও পন্ডিত ব্যক্তিদের পরামর্শ গ্রহণ করেন। অবশেষে খসড়া সংবিধানকে চূড়ান্ত রূপ দেয়ার পর ১৯৭৯ সালের ২রা ও ৩রা ডিসেম্বর সংবিধানের ব্যাপারে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং বিপুল ভোটে জনগণ ঐ সংবিধানের পক্ষে হ্যা ভোট দেয়। আর এভাবে ইরানে বিপ্লব বিজয়ের দশ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে একটি উন্নত, ইসলামী ও গণভিত্তিক সংবিধান প্রণীত হয়।

একটি দেশের সর্বোচ্চ আইনী বিধান হচ্ছে সংবিধান এবং এই পুস্তকটি দেশের অন্যান্য আইন প্রণয়নের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। সংবিধান সম্পর্কে একটি সংজ্ঞায় বলা হয়েছে : "সংবিধান হচ্ছে কিছু আইনকানুনের সমষ্টি যার মাধ্যমে সরকার ব্যবস্থা, সরকারের তিন বিভাগ এবং সরকারের সাথে জনগণের সম্পর্কের বিষয়গুলো পরিচালিত হয়।" দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে সংবিধানের কোন অসম্পূর্ণতা থাকলো কি না বা কোন সমস্যায় পড়তে হয়েছে কিনা তা পর্যালোচনার জন্য ১৯৮৯ সালে অর্থাৎ প্রথম সংবিধান প্রণয়নের দশ বছর পর এটি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। এক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগ এবং সম্প্রচার সংস্থার কার্যক্রমের ওপর বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয়া হয়। দেশের সর্বোচ্চ নেতার যোগ্যতা ও ক্ষমতার পাশাপাশি সংবিধান পর্যালোচনার শর্তসমূহে কিছু সংশোধনী আনা হয়। যথারীতি এবারও সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং অধিকাংশ মানুষের সমর্থন পেয়ে তা পাশ হয়ে যায়।

জনগণের সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত ইরানের সংবিধানে ইসলাম ও জনগণের অধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। ইরানের সংবিধানের প্রথম মূলনীতি হচ্ছে, এদেশের শাসনব্যবস্থা হবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রী ব্যবস্থা। সংবিধানের বিভিন্ন ধারা প্রণয়নের ক্ষেত্রে আইন ও সমাজের ওপর ইসলামী মূল্যবোধকে স্থান দেয়া হয়েছে। ইরানী সংবিধানের চার নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, নাগরিক অধিকার, ফৌজদারি আইন, অর্থ, প্রশাসন, সংস্কৃতি, সামরিক ও রাজনৈতিক বিভাগসহ সকল ক্ষেত্রে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি এ সংবিধানের ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, "জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা প্রশাসন পরিচালনা করবে। প্রেসিডেন্ট, পার্লামেন্ট, সিটি কর্পোরেশনসহ অন্যান্য স্থানীয় পরিষদের সদস্যবৃন্দ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন।"

ইরানের সংবিধানের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করে থাকেন। সংবিধানের এক জায়গায় বলা হয়েছে, "নারী পুরুষ নির্বিশেষ এদেশের প্রতিটি নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং ইসলামী নীতিমালার আওতায় সমভাবে মানবিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার ভোগ করবে।" ইরানের সংবিধানে আরো বলা হয়েছে, " ইরানী জনগণের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ কিংবা বিশেষ ভাষাভাষি কোন জনগোষ্ঠি বিশেষ কোন সুবিধা পাবে না, কিংবা কোন সুযোগ থেকে তাদের বঞ্চিত করা যাবে না।" কাজেই দেখা যাচ্ছে, ইরানের জনগণের মধ্যে বৈষম্যমূলক বা অন্যায় আচরণ করার কোন সুযোগ নেই।

ইসলামী বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলোতে জনগণের অন্যতম দাবি ছিল স্বাধীনতা ভোগ করা। সংবিধানের ৫৬ নম্বর ধারায় জনগণের এ গুরুত্বপূর্ণ চাহিদাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, "বিশ্ব ও মানবতার ওপর সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মহান আল্লাহ। তবে তিনি মানুষকে তার সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণের ব্যাপারে স্বাধীনতা দিয়েছেন। আল্লাহ প্রদত্ত এ স্বাধীনতা খর্ব করার অধিকার কারো নেই কিংবা তাকে বিশেষ কোন পক্ষ বা গোষ্ঠির স্বার্থ হাসিলের কাজেও ব্যবহার করা যাবে না।" এ কারণে অনুমোদিত রাজনৈতিক দল, পত্রপত্রিকা ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠি স্বাধীনভাবে তাদের কাজকর্ম চালাতে পারবে। সংবিধানের ১৩ নম্বর ধারায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সম্পর্কে বলা হয়েছে, "জরাথ্রুষ্ট, ইহুদী ও খ্রীস্টান এই তিন ধর্মকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলো। এই তিন ধর্মের জনগোষ্ঠি স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মীয় আচার আচরণ পালন করতে পারবে" এই তিন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ইরানের বাকি জনগোষ্ঠির মত স্বাধীনভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে এবং তাদের প্রত্যেক ধর্মের পক্ষ থেকে ইরানের পার্লামেন্টে জন প্রতিনিধি থাকবে।

ইরানের অধিকাংশ জনগোষ্ঠি শিয়া মুসলমান হওয়ার কারণে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম এবং শিয়া মাযহাবকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তবে ইসলামের অন্যান্য মাযহাবের প্রতিও যথাযথ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে সংবিধানে যা বলা হয়েছে তা এরকম- "...ইসলামের অন্যান্য মাযহাব যেমন, হানাফি, শাফিঈ, মালিকি, হাম্বলি ও যেইদি'র অনুসারীগণ পূর্ণ সম্মানের অধিকারী। তারা তাদের ফিকাহ অনুসারে স্বাধীনভাবে ধর্মীয় বিধি বিধান ও অনুষ্ঠান পালন করতে পারবেন। বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার এবং অসিয়তসহ এ ধরনের ফিকাহ সংক্রান্ত বিষয়ে সুন্নী মাযহারের অনুসারীগণ নিজ নিজ ফিকাহ অনুযায়ী কাজ করবেন। এছাড়া তাদের মধ্যে এ সংক্রান্ত কোন বিরোধের সৃষ্টি হলে আদালতে তাদের নিজস্ব ফিকাহ অনুযায়ী বিচারকাজ পরিচালিত হবে.....।"
ইরানের সংবিধানে নারীর প্রতি যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে। সংবিধানের শুরুতে এবং ২১ নম্বর ধারায় অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নারীর মর্যাদা ও অধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। সংবিধান পারিবারিক কাঠামো রক্ষায় নারীর ভূমিকাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ইসলামী শাসনব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতার মর্যাদা ও ক্ষমতা নির্ধারণ ইরানের সংবিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সংবিধানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু হবেন ইসলাম বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ প্রশাসক, যিনি সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে পরিচিত। এই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা তার আধ্যত্মিক প্রভাব ও পদাধিকারবলে দেশ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। সর্বোচ্চ নেতা- যাকে ওলিয়ে ফকিহ বলা হয়, তিনি বিশেষজ্ঞ পরিষদের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন। বিশেষজ্ঞ পরিষদ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। সর্বোচ্চ নেতার সবচেয়ে গুরুত্বপূণ কাজ হচ্ছে দেশের সার্বিক নীতি নির্ধারণ করা। এক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণী পরিষদ সর্বোচ্চ নেতাকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করবে। একই সাথে সর্বোচ্চ নেতা সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রধান বিচারপতি, সম্প্রচার সংস্থার প্রধান এবং অভিভাবক পরিষদের ফকীহদের নিয়োগ ও বরখাস্ত করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করবেন।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত ইরানের সরকারেরও তিনটি বিভাগ রয়েছে- প্রশাসনিক বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং আইন বিভাগ। সংবিধানে এই তিন বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে এবং এর কোন বিভাগ অপর বিভাগের ওপর নির্ভরশীল নয় বা এক বিভাগ অপর বিভাগের কাজের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। ইরানের আইন বিভাগের দুটি পরিষদ রয়েছে। পার্লামেন্ট বা মজলিশে শুরায়ে ইসলামী এবং অভিভাবক পরিষদ। সংবিধানে পার্লামেন্টকে ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তবে তারপরও ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কোন আইন প্রণয়নের ক্ষমতা পার্লামেন্টকে দেয়া হয় নি এবং এর কাজকর্মের ওপর নজরদারি করার জন্য অভিভাবক পরিষদকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সমসাময়িক বিশ্বের ঘটনাবলী সম্পর্কে অবহিত ৬ জন বিজ্ঞ আলেম এবং ৬ জন বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে ১২ সদস্যবিশিষ্ট অভিভাবক পরিষদ গঠিত। এ পরিষদের আলেমগণ সর্বোচ্চ নেতা কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং ৬ জন আইনবিদকে নিয়োগ দেন প্রধান বিচারপতি। তবে ১২ জনকেই পার্লামেন্টের আস্থাভোটে বিজয়ী হতে হয়।

ইরানের সংবিধান অনুযায়ী প্রশাসনিক বিভাগের প্রধান অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেন। তবে তার গঠিত মন্ত্রীসভার প্রত্যেক সদস্যকে আলাদা আলাদাভাবে পার্লামেন্টে আস্থাভোটে জয়ী হতে হয়। এছাড়া পার্লামেন্ট যে কোন সময়ে যে কোন মন্ত্রীকে ইমপিচ করার ক্ষমতা রাখে। সর্বোচ্চ নেতার পর প্রেসিডেন্ট ইরানের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি। এছাড়া বিচার বিভাগের প্রধান বা প্রধান বিচারপতি সর্বোচ্চ নেতা কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-২৫

২০০৯ সালের ১০ ই ফেব্রুয়ারী ইরানে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লবের ত্রিশতম বার্ষিকী পূর্ণ হল। ১৯৭৯ সালের ১১ ই ফেব্রুয়ারীতে সংঘটিত দুনিয়া-কাঁপানো এ বিপ্লকে শুধু বিংশ শতকেরই নয় বরং বিগত এক হাজার বছরের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও অনন্য ঘটনা বলে অভিহিত করা যায়। এ ঘটনা ইসলামের অলৌকিক শক্তি ও মর্যাদা সম্পর্কে বিশ্ববাসীর চোখ খুলে দিয়েছে। সরকারী নেতৃবৃন্দসহ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিশ্লেষকরা ইসলামী বিপ্লবের বিজয়কে একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং পাশ্চাত্যের ও প্রাচ্যের পরাশক্তিসহ তাদের সহযোগী সরকারগুলো মনে-প্রাণে এ বিপ্লবের ধ্বংস কামনা করেছেন কিংবা তারা এ বিপ্লবের স্থায়িত্ব কামনা করেন নি। সাম্রাজ্যবাদী ইসরাইলী বিশ্লেষক থেকে শুরু করে পশ্চিমা সরকার ও বিশ্লেষকরাও এ বিপ্লবকে ইসলামী পুনর্জাগরণের বাঁধ-ভাঙ্গা জোয়ারের অকৃত্রিম প্রকাশ এবং পাশ্চাত্যের আধিপত্যের জন্য ধ্বংসাত্মক বলে অভিহিত করেছেন। বিশেষ করে ইরানে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লব ছিল তাৎক্ষণিকভাবেই ইসরাইল ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জন্য এক বড় চপেটাঘাত এবং দীর্ঘ-মেয়াদে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সব আধিপত্যকামী শক্তির জন্য এক স্থায়ী আতঙ্ক।

ইরানে ইসলামের বিপ্লবী শক্তির ক্রমোজ্জ্বল এই শিখা ইসলামী আন্দোলনের প্রচলিত সব ধারাগুলোকে ম্লান করে দিয়েছে। কারণ, এ বিপ্লব একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অবস্থানকে নড়বড়ে করে দিয়ে ইসলামের চরম ও প্রধান শত্রুকে দূর্বল করতে সক্ষম হয় এবং অন্যদিকে খাঁটি ইসলামের অমিত-তেজ ও বিক্রম তুলে ধরে বিশ্ব ইসলামী জাগরণের কান্ডারীতে পরিণত হয় । ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) ইরানে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লবকে আলোর বিস্ফোরণ বলে উল্লেখ করেছেন। এ বিপ্লবের প্রভাবে শুধু মুসলিম বিশ্বই আলোড়িত হয়নি। ধর্মীয় শক্তির এ উত্থান আধ্যাত্মিক শুণ্যতার শিকার পাশ্চাত্যের জনগণকেও ইসলাম ও আধ্যাত্মিকতার দিকে আকৃষ্ট করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত ইরান থেকে মার্কিন কর্তৃত্বপনা ও উপস্থিতি সমূলে উৎপাটিত হবার প্রায় একই সময়ে নিকারাগুয়ার স্যান্ডানিস্ট গেরিলারা বিজয়ী হয় এবং সেখানে মার্কিন তল্পীবাহক সরকারের পতন ঘটে। আফগানিস্তানে ইসলামী জাগরণ ঠেকানোর জন্য সেখানে সোভিয়েত বাহিনী প্রবেশ করে এবং তারা আফগানিস্তান দখল করে। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন দেশটির ইসলামী জাগরণকে স্তব্ধ করার জন্য সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করে।
অন্যদিকে লেবানন ও ফিলিস্তিনের জনগণ ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ে উৎসব পালন করে। মিশর, আলজেরিয়া, সুদান তুরস্ক ও ভারত উপমহাদেশের ইসলামী আন্দোলনগুলো চাঙ্গা বা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী আইন ও ইসলামী সংস্কৃতির চর্চা যে আধুনিক যুগেও সম্ভব তা বাস্তবে প্রমাণ করেছে ইরানের ইসলামী বিপ্লব। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শক্তির ওপর নির্ভর না করে একমাত্র ইসলামের ভিত্তিতেই যে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে টিকে থাকা সম্ভব তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে হযরত আয়াতুল্লাহ রূহুল্লাহ খোমেনী (রঃ)'র নেতৃত্বাধীন ইরানের ইসলামী গণ-বিপ্লব। অস্ত্র কিংবা অর্থের শক্তি নয় জনগণের ঈমান ও তাদের স্বাধীন বা মুক্ত ইচ্ছাই যে আধুনিক যুগেও জাতিগুলোর চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারক হতে পারে এবং বদলে দিতে পারে বিশ্বের রাজনৈতিক ভূগোল তথা ক্ষমতার সীমকরণ তা প্রমাণ করেছে ইরানের আলোকোজ্জ্বল ইসলামী বিপ্লব।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাত্মক সহায়তাপুষ্ট বজ্রকঠিন শাহের রাজশক্তি যে গণ-বিপ্লবের জোয়ারে চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে তার রহস্য লুকিয়ে ছিল ইসলামের প্রকৃত নেতৃত্ব এবং কারবালার বিপ্লবের চেতনায় উজ্জ্বীবিত শাহাদত-পিয়াসী জনতার একনিষ্ঠ আনুগত্যের মধ্যে। ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) ছিলেন এমন একজন নেতা যার মধ্যে ইসলামী আদর্শ, সৎ অথচ আপোসহীন নেতৃত্বের সমস্ত গুণাবলী, আধ্যাত্মিক পূর্ণতা এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাসহ বহু অসাধারণ গুণের সমন্বয় ঘটেছিল। আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস নিয়ে তিনি ১৯৬০'র দশকের শুরুর দিকেই শাহী শাসনের ইসলাম-বিরোধী ও জাতীয় স্বার্থ বিরোধী তৎপরতাগুলো তুলে ধরে জনগণকে সচেতন করতে শুরু করেছিলেন। সে সময় শাহের আটককেন্দ্রে একজন জেনারেল তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কিসের শক্তি নিয়ে আপনি শাহের রাজতান্ত্রিক সরকারের মোকাবেলা করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ইমাম তখন বলেছিলেন, আমার সেনারা এখনও দোলনায় রয়েছে। ডক্টর হামিদ আলগারের ভাষায়: ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারীতে তিনি যখন ১৫ বছরের নির্বাসন শেষে ইরানে ফিরে আসেন তখন তিনি সাথে করে কোনো সম্পদ নিয়ে আসেন নি। কোনো রাজনৈতিক দলও তিনি গঠন করেন নি। কোনো গেরিলা যুদ্ধও তিনি পরিচালনা করেন নি। কোনো বিদেশী শক্তির সাহায্যও তিনি নিলেন না। অথচ এরই মধ্যে তিনি ইরানের অবিসম্বাদিত নেতা এবং ইসলামী বিপ্লবের তর্কাতীত নেতৃত্বে সমাসীন হলেন।
এ জন্যেই অনেক মনে করেন, আসলে ইমাম খোমেনী (রঃ)'র নেতৃত্ব ছিল অনেকাংশে নবীগণের আধ্যাত্মিক ও শক্তিশালী নৈতিক নেতৃত্বের মত।
মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বশেষ নেতা মিখাইল গর্বাচভের কাছে লেখা ঐতিহাসিক চিঠিতে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব-ব্যবস্থার পতন ঘটবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ইরাকের বাথিস্ট সাদ্দাম সরকারকে সহায়তাকারী আরব রাজা-বাদশাদের সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, সাদ্দামের যুদ্ধের মেশিন একদিন তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে। দূরদর্শী চিন্তার অধিকারী মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র এ দুটি ভবিষ্যদ্বানীই বাস্তবে পরিণত হয়েছিল। শাহের স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের পতন যে অনিবার্য তাও তিনি ঐ একই দূরদৃষ্টির বলে সুদূর প্যারিস থেকেই জানিয়ে দিয়েছিলেন।

ইরানে ইসলামী বিপ্লব সফল হবার পর এ বিপ্লবকে বহির্বিশ্বে রপ্তানী করা হবে বলে কোনো কোনো বিপ্লবী নেতা মন্তব্য করেছিলেন। আর এতে পাশ্চাত্যের নেতৃবৃন্দ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কিন্তু তারা এ কথার আসল অর্থ বুঝতে পারেন নি। বিপ্লব তো এমন কোনো বাক্সবন্দী পণ্য নয় যা পণ্যের মত রপ্তানী করা যায়। বিপ্লবী চিন্তাধারা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইসলামী আদর্শ তো কোনো দেশ বা স্থান ও কালের গন্ডীতে সীমিত নয়। ইসলামী বিপ্লবের যে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বার্তা তা ইথারের শব্দ তরঙ্গের মত আলোড়িত করেছে ফিলিস্তিন, লেবানন, তুরস্ক, ইরাক, কাশ্মীর ও আফগানিস্তানের মত দেশগুলোকে। এ জন্যেই আজ লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ফিলিস্তিনের হামাসের অগ্রযাত্রার জন্য পাশ্চাত্য ইরানকেই দায়ী করছে।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের অগ্রযাত্রাকে আতুড় ঘরেই রুদ্ধ করার জন্য ইরাকের সাদ্দামকে দিয়ে ইরানের ওপর ৮ বছরের যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে একের পর এক ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত অবরোধ। যা আজো অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র যোগ্য অনুসারীদের নেতৃত্বে ইরানের মুসলিম জাতি আজ সামরিক, অর্থনৈতিক, শিল্প, বাণিজ্য ও কৃষিক্ষেত্রে প্রায় স্বনির্ভর এবং বিশেষ করে বিজ্ঞান ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অনেক অবিশ্বাস্য সাফল্য অর্জন করেছে। ইরান আজ পরমাণু প্রযুক্তি, ন্যানো প্রযুক্তি, স্টেম সেল বা মৌলিক কোষ গবেষণা এবং মহাশুণ্য গবেষণায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশে পরিণত হয়েছে। তাই এটা বলা যায় যে ইরানের ইসলামী বিপ্লব সত্যিকার অর্থেই আলোর বিপ্লব। যে আলোর বন্যায় ভেসে যায় সব অন্যায়-অবিচার ও বৈষম্য এবং স্বাধিকার হারা মানুষ ফিরে পায় তাদের অধিকার। তাই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই মহতী বিপ্লবের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক প্রভাবের বিস্তৃতি ঘটাই স্বাভাবিক, অনিবার্য ও খোদায়ী রহমত হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। #

 

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-২৬

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান বিগত ত্রিশ বছরে বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এসেছে। বিচিত্র প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ইরান বহু মূল্যবান সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এইসব সাফল্য ইরানকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে এবং তার উদ্দেশ্য হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করা। ইসলামী বিপ্লব পরবর্তীকালে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদি যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, এইসব উন্নতি ও অগ্রগতি তারই ফল। অথচ আজকের এই উন্নয়ন ও সাফল্য সম্পর্কে যদি তিন দশক আগে বলা হতো,বিশ্লেষক ও চিন্তাবিদদদের মতে তা হতো অবিশ্বাস্য এবং অসম্ভব।
এখন প্রশ্ন জাগতেই পারে, যেই দেশটি প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে অন্তত দুই শ' বছর পিছিয়ে ছিল,সেই দেশটি শত বাধা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও কীভাবে কোন্ শক্তির বলে তা অতিক্রম করে বিজ্ঞানের উন্নত শিখরে আরোহন করলো ! বর্তমানে ইরানের নাম বিশ্বের এমন এমন দেশগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যারা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে পরমাণু বিজ্ঞান,পরমাণু জ্বালানী উৎপাদনের পূর্ণাঙ্গ চক্র এবং স্টিম সেল বা মূলকোষ উৎপাদনের মতো জটিল বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলোতে সাফল্য অর্জন করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনয়েী চলতি ফার্সি বছরের শুরুতে দেওয়া নববর্ষের বাণীতে ফার্সি ১৯৮৭ সালকে সৃষ্টিশীলতা ও নব উদ্ভাবনীর বছর বলে অভিহিত কে ছেন। তিনি এ-ও বলেছেন ইরানের মেধাবি জনগোষ্ঠি তাঁদের সৃজনশীলতা দিয়ে নব আবিষ্কারের পথে অগ্রসর হতে সক্ষম। ইরানের জনগণ ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের মধ্য দিয়ে নতুন এক ইতিহাস রচনা করেছে। বিশেষ করে বিশ্বে তখন দুই পরাশক্তির আধিপত্য চলছিল। ইরানের ইসলামী বিপ্লব ঐ দুই আধিপত্যবাদী ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।

এই চ্যালেঞ্জের ফলে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোসহ পরাশক্তিগুলোর একচেটিয়া অধিকার ফলানো বিশেষ করে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে এসেছিল। সেইসাথে স্বাধীনতা ও উন্নয়নকামী মেধাবি দেশগুলোর কাছে উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ইরানও আত্মবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে নিজস্ব শক্তি-সামর্থকে কাজে লাগিয়ে অতি দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়ে গেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিক্ষেত্রে ইরান একের পর এক অগ্রগতি লাভ করার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এই বিশাল অর্জনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে,ইসলামী বিপ্লব কেবলমাত্র ইরানের শাহী দুর্নীতি বিরোধী একটি রাজনৈতিক আদর্শই নয়,বরং বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে দুই শতাব্দী পিছিয়ে পড়া ইরানকে অতিক্রম করে উন্নতি ও অগ্রগতির অনন্য একটি আদর্শের নাম হচ্ছে ইসলামী বিপ্লব।

ইরানের ইসলামী বিপ্লব আধিপত্যবাদকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয় না। বিশ্বের রাজনৈতিক শক্তিগুলো যেভাবে অন্যান্য দেশকে দুর্বল করে তোলার জন্যে হস্তক্ষেপ করে,সেইসব পরাশক্তিকে প্রত্যাখ্যান ক'রে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের চূড়ান্ত শিখরে আরোহনকে উৎসাহিত করে। এ কারণেই পশ্চিমাদের অবরোধের মতো ব্যাপক চাপের মুখেও ইরান বিন্দুমাত্র পিছপা হয় নি। বিশেষ করে নতুন নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নিজেদের অগ্রগতির ব্যাপারে ইরান কোনোরকম আপোষ করে নি। একইভাবে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং শাসনব্যবস্থার মূল্যবোধ রক্ষার ক্ষেত্রে সম্মান ও মর্যাদার সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এ কারণেই বলেছেন-পশ্চিমাদের প্রত্যাখ্যান করা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতিই ইরানের ইসলামী গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ইসলামী বিপ্লবের শত্রুরা উঠেপড়ে লেগেছে।

ইরান যাতে উন্নতি-অগ্রগতি করতে না পারে, সেজন্যে ইরানের শত্রুরা বিগত ৩০ বছরে ব্যাপক ষড়যন্ত্র করেছে। কিন্তু ইরানের জনগণ জীবনের ভাঙ্গা-গড়া আর উত্থান-পতন সহ্য করে সকল প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে নিজেদের সৃজনশীল চর্চার কাজ অব্যাহত রেখেছে। এইসব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ইরান তার শত্রুদেরকে বড়ো ধরনের শিক্ষা দিয়েছে। শত্রুদেরকে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে ইরানের জনগণ মেধাবি এবং সকল প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ইরানী মেধাবি জনগণ জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাবার শক্তি রাখে। শত্রুদেরকে আরেকটি বড়ো যে শিক্ষাটি ইরান দিয়েছে তাহলো-তারা বুঝিয়ে দিয়েছে ইরানের অগ্রগতির পথে বাধা-বিপত্তি বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে কোনো লাভ নেই।

বিজ্ঞান-অর্থনীতি,শিল্প ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতি প্রমাণ করছে যে, ইরান অর্থনৈতিক উন্নতির দিক থেকে বিশ্বের প্রথম সারির ১৭ টি দেশের মানে রয়েছে। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে উন্নতির দিক থেকে,আভ্যন্তরীণ শিল্পসামগ্রীর দিক থেকে এবং পুঁজি বিনিয়োগে নিরাপত্তার দিক থেকে ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম সারির দেশগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর ইরানে বিজ্ঞান চর্চা যে কতোটা দ্রুততার সাথে অগ্রসর হয়েছে ইরানী বিজ্ঞানীদের লেখা বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা বা পরিমাণগত দিকটি বিবেচনা করলেই তা বোঝা যাবে। সেইসাথে শিল্পগত উন্নয়ন যেমন ইস্পাত শিল্প,গাড়ি তৈরী,শোধনাগার নির্মাণ,ন্যানো-টেকনোলজি,গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ সামগ্রি তৈরী,বাঁধ তৈরী,বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাসহ কারিগরী ও প্রকৌশল ক্ষেত্রে ইরানীদের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। ইরানী বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ এবং প্রকৌশলীগণ তাঁদের এইসব অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশেও বিনিময় করছেন।

শিল্প ও রপ্তানী শিল্পে ১৩৭ শতাংশ পুঁজি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়ে বিগত তিন বছরে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তিন হাজার কোটি ডলারে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ১২ হাজার ৬ শ' মেগাওয়াট। এরফলে কৃষিপণ্যসহ অন্যান্য পণ্য উৎপাদন বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। তাই ইরানের অর্থনৈতিক উন্নতিও ঘটেছে চোখে পড়ার মতো। উন্নতি ও অগ্রগতির এই জোয়ারের সূচনা হয়েছে বিপ্লব বিজয়ের পর থেকে। কিন্তু তারপরও ইরান সন্তুষ্ট নয়। ইরান চায় উন্নতির ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। মহাকাশে উমিদ উপগ্রহ প্রেরণের মধ্য দিয়ে তারি প্রথম সোপানে পা রেখেছে ইরান।

ইরানের এই উন্নতির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির শত ষড়যন্ত্র চালিয়েও শত্রুরা বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে পারে নি। সে জন্যেই তারা আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপনের চেষ্টা চালাচ্ছে। এতোসব প্রতিবন্ধকতা আরোপ,এতোসব ষড়যন্ত্র আর অপপ্রচারণা চালানোর পরও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল একটি রাষ্ট্রের আদর্শে পরিণত হয়েছে ইরান। অন্যান্য বিপ্লবের ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিজয়ের পর বিপ্লবী নেতারা জনগণকে ভুলে যায়,জনগণও আগের মতো সমাদৃতি পায় না। জনগণের উপস্থিতি ছাড়া যে-কোনো বিপ্লবী শাসন শেষ পর্যন্ত এক ধরনের স্বৈরাচারে পরিণত হয়। ইরানের বিপ্লব এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ত্রিশ বছর অতিক্রান্ত হবার পর আজো জনগণের উপস্থিতি আগের মতোই সক্রিয়,স্বতস্ফূর্ত এবং অম্লান রয়েছে। যদিও শত্রুরা বিপ্লবের পতন ঘটানোর জন্যে বহু ষড়যন্ত্র করেছে। ইরানের ওপর ইরাকের বাথ সরকারের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ ছিল সেই ষড়যন্ত্রেরই ভয়াবহতম অপচেষ্টা।
এমন একটা সময়ে ইরানের ওপর সেই ভয়াবহ যুদ্ধটি চাপানো হয়েছিল, যখন ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাবৃন্দ বিগত শাহী সরকারের আমলের সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল এবং দেশ পুনর্গঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। এমন একটি পরিস্থিতিতে ইরানের ওপর কঠিন যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে বিপ্লবকে অঙ্কুরে বিনাশ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ইরানের বিপ্লবী জনগণ সেদিন যেভাবে সেই চাপানো যুদ্ধকে মোকাবেলা করেছিল,তা দেখে বিদেশিরাও বিস্ময় প্রকাশ করেছে। যেই যুদ্ধ চাপানো হয়েছিল বিপ্লবকে নস্যাৎ করার জন্যে সেই যুদ্ধ বরং ইমাম খোমেনী (রহ) এর নেতৃত্বে ইরানী জনগণকে আরো বেশি সুসংহত ও জেহাদি মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ করেছে। দীর্ঘ ৮ বছর যুদ্ধ করে ইরানের বীর জনগণ ও সেনারা শেষ পর্যন্ত শত্রু সেনাদেরকে ইরানের ভূখণ্ড থেকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। ইরাকের মাধ্যমে আমেরিকার চাপিয়ে দেওয়া ৮ বছরের যুদ্ধ শেষ হলেও বিপ্লবের বিরুদ্ধে তথা ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং ইরানী জনগণের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিন্ন ভিন্ন রূপে তাদের আধিপত্যবাদ চাপিয়ে দেওয়ার ব্যাপক ষড়যন্ত্র অদ্যাবধি চালিয়ে যাচ্ছে। এতোসব ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও ইসলামী বিপ্লব তার পথে অব্যাহত গতিতে অগ্রসরমান রয়েছে।
সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো যখন বুঝতে পারলো যে ‘না প্রাচ্য,না পাশ্চাত্য'-ইসলামী বিপ্লবের এই শ্লোগান কিংবা ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র কোনোভাবেই বিদেশীদের ষড়যন্ত্রের কাছে মাথানত করবে না-তখন তারা ইরান ও ইরানী জনগণের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে শত্রুতা শুরু করলো। তারা ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করলো। আমেরিকাসহ পশ্চিমা যেসব দেশের সাথে শাহী শাসনের সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে চুক্তি হয়েছিল, ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর সেইসব চুক্তি স্থগিত হয়ে গেল। বিপ্লব পরবর্তীকালে স্থগিত হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তি ছিলো ইরানে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার চুক্তি। চুক্তি বাতিল করা,ইসলামী প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা, রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক এবং প্রচারণাগত আগ্রাসন ইত্যাদি বিপ্লব পরবর্তী দ্বিতীয় দশকেই ব্যাপক চরমে ওঠে।

আমেরিকা চেয়েছিল পারস্য উপসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের তেল সম্পদের ওপর এককভাবে নিজস্ব কর্তৃত্ব আরোপ করে তেলের একচেটিয়া মজুদ গড়ে তুলতে। কিন্তু তার এই লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইরান। স্বাভাবিকভাবেই ইরান আমেরিকার শত্রু তালিকার শীর্ষে স্থান পায়। কমিউনিজমের পতনের পর আমেরিকা নিজেকে বিশ্বের একমাত্র ক্ষমতাধর শক্তি বলে ভাবতে শুরু করে। তাই তারা ইরানকে প্রতিহত করার জন্যে উঠেপড়ে লেগে যায়।কিন্তু ঈমানী শক্তির কাছে শত্রুদের সকল ষড়যন্ত্রই ব্যর্থ হয়। আমেরিকা,ইহুদিবাদী ইসরাইল এবং তাদের মিত্র শক্তিগুলো ইরানের প্রযুক্তিগত উন্নতি ঠেকানোর লক্ষ্যে শত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারপরও ইরান নিজেদের তৈরী উপগ্রহ মহাকাশে প্রেরণ করে শত্রুদের চেষ্টার ব্যর্থতাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে। আল্লাহর সাহায্য থাকলে কোনো শক্তির পক্ষেই ইসলামের অগ্রযাত্রা স্তব্ধ করা সম্ভব নয়।

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-২৭

ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ত্রিশ বছর আগে। এই ত্রিশ বছরে ইরান অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এমন স্থানে পৌঁছেছে যে, বর্তমানে ইরানের ঘোর শত্রুরাও সকল ক্ষেত্রে ইরানের উন্নতি ও অগ্রগতির কথা স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে। ইরান গত তিন দশকে প্রমাণ করেছে, বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চোখ ধাঁধানো সাফল্য অর্জন করেছে। আর এসব অগ্রগতি অর্জন করতে হয়েছে শত্রুদের ব্যাপক রাজনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক অবরোধকে মাথায় নিয়ে। আজকের আসরের আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের উন্নতি ও অগ্রগতি সম্পর্কে আলোচনা করবো। আর আলোচনার শেষভাবে থাকবে বিশ্বব্যাপী ইরানের কূটনৈতিক সাফল্য সম্পর্কে কিছু কথা।

বর্তমানে নব্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো বিশ্বের ওপর আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে তাদের তৈরি কথিত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে জ্ঞানবিজ্ঞানসহ সকল ক্ষেত্রে পেছনে ফেলে রাখার চেষ্টা করছে। এ লক্ষ্যে তারা এসব দেশের বিরুদ্ধে প্রচারণার ধুম্রজাল সৃষ্টি করে তাদেরকে একটি কথা তাদের মনে প্রাণে বদ্ধমূল করে দিয়েছে, আর তা হলো, "তোমরা পারবে না"। কিন্তু ইরান সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর ওপর নির্ভরতা বাদ দিয়ে নিজস্ব মেধা ও সম্পদকে কাজে লাগিয়ে উন্নতি করে একথা প্রমাণ করেছে যে, "আমরাও পারি"।
১৯৮৮ সালে ইরানের ওপর ইরাকের চাপিয়ে দেয়া ৮ বছরের যুদ্ধ শেষে শুরু হয় দেশ পুনর্গঠনের কাজ। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে এ কাজে গতি সঞ্চার করা হয়। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মানের পর চূড়ান্ত উন্নতির অধ্যায় শুরু হয় ২০০৫ সালে। ঐ বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ২০ বছর মেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তা দেশের তিন বিভাগের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঐ পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল নাগাদ ইরান অর্থনৈতিক এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার শীর্ষে অবস্থান করবে।

একটি দেশের উন্নতির পূর্বশর্ত হচ্ছে সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনা গ্রহণ। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ১৯৮০র দশক থেকে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং বহু দেশ এক্ষেত্রে সফলতাও অর্জন করেছে। ইরানের ২০ বছর মেয়াদী পরিকল্পনাও যে ফল দিতে শুরু করেছে, তা গত কয়েক বছরের জিডিপির হার দেখে বোঝা যায়। ঐ পরিকল্পনা গ্রহণের পর প্রতি বছর ইরানের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপির হার শতকরা ৭ ভাগেরও বেশী ছিল। এছাড়া ইরান সম্প্রতি বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে তেল বিক্রির অর্থের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। শুস্ক অঞ্চলের দেশ বলে পরিচিত ইরানে অসংখ্য বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে কৃষকের পানি সংকটের সমাধান করা হয়েছে। ফলে কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে এবং এ খাতে উৎপাদন শতকরা ত্রিশ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প ও বৈদেশিক বাণিজ্য খাতে পূঁজি বিনিয়োগ ১৭২ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ৩ বছরে তেল বহির্ভূত খাতে ইরান ৩ হাজার কোটি ডলারের পন্য রপ্তানি করেছে, যা এদেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে আশাতীত সাফল্য বলে মনে করা হচ্ছে।

ইরানের তরুণ বিজ্ঞানীরা আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডগুলোতে প্রায় প্রতি বছরই শীর্ষস্থান অধিকার করে আসছেন। এছাড়া গত বছর বিজ্ঞান ও গবেষণা ক্ষেত্রে ইরানী বিশেষজ্ঞরা ১৩ হাজারেরও বেশী গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ রচনা করেছেন, যা ছিল যে কোন মুসলিম দেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ। কাজেই দেখা যাচ্ছে, ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক পরে শত বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। এ থেকে আরো যে বিষয়টি প্রমাণিত হয় তা হচ্ছে, ইরান ২০ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা অত্যন্ত সাফল্যের সাথে বাস্তবায়ন করতে পারবে। তবে এ পর্যন্ত পরমাণু প্রযুক্তি অর্জন ও মহাশুণ্যে কৃত্রিম উপগ্রহ প্রেরণসহ আরো বহু ক্ষেত্রে উন্নতি করলেও মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ এখনো অনেক বাকি রয়ে গেছে।
এমন একটি অঞ্চলে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান যার চারিদিকে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চল। ভূকৌশলগত কারণে এসব অঞ্চলে সুদীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা লেগেই রয়েছে। ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পরপরই ইরান নিজে একটি দীর্ঘমেয়াদী সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়। ইরাকের সাদ্দাম সরকারের চাপিয়ে দেয়া আট বছরের ঐ যুদ্ধের সময় ইরানের সার্বিক কূটনৈতিক তৎপরতা যুদ্ধের ব্যাপারে কেন্দ্রীভূত থাকে। ইরাকের চাপিয়ে দেয়া আট বছরের যুদ্ধে তৎকালীন দুই পরাশক্তির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের তাবেদার রাষ্ট্রগুলো ইরাক সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা দেয়। ফলে ইরানকে একাকী প্রায় গোটা বিশ্বের সাথে লড়াই করতে হয়। ইরাক যে প্রথম ইরানে হামলা চালিয়ে যুদ্ধের সূচনা করে, সে বিষয়টি বেমালুম চেপে গিয়ে ঐসব দেশ ইরানকে যুদ্ধের জন্য দায়ী করতে থাকে। ঐ রাজনৈতিক ও প্রচারণাগত আক্রমন প্রতিহত করে বিশ্বকে যুদ্ধের সঠিক চিত্র সম্পর্কে অবহিত করার জন্য সে সময় ইরানকে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হয়। ঐ তৎপরতার ফলে শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘ সাদ্দাম সরকারকে ইরানের ওপর হামলার জন্য দায়ী করে এবং ইরাককে আগ্রাসী শক্তি হিসেবে ঘোষণা দেয়।

ইরাকের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে ইরানের উত্তরাঞ্চলে বেশ কিছু স্বাধীন দেশের আত্মপ্রকাশ করে। এদের মধ্যে তাজিকিস্তান স্বাধীনতা লাভের পরপরই গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তাজিকিস্তানের সাথে ইরানের রয়েছে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বন্ধন, বিশেষ করে এই দুই দেশের জনগণ অভিন্ন ভাষা অর্থাৎ ফার্সিতে কথা বলে। এ কারণে তাজিকিস্তান তার প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের তুলনায় ইরানের ওপর অনেক বেশী নির্ভরশীল। ইরান তাই তাজিকিস্তানের গৃহযুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। তাজিকিস্তান সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠির সাথে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজনের মাধ্যমে ইরান ঐ যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সক্ষম হয়।

ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতা মূলত মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে দুই পরাশক্তি অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শীতল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ঐ দুটি শক্তিই মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এ প্রক্রিয়া প্রায় অর্ধশতাব্দি অব্যাহত ছিল। এ সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যতগুলো যুদ্ধ হয়, তার অধিকাংশই ছিল এ অঞ্চলে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কিন সরকার ভাবতে থাকে, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রভাব বিস্তার করে এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাটের মোক্ষম সময় এসে গেছে। এদিকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তেহরানের সাথে ওয়াশিংটনের যে বৈরি ভাব সৃষ্টি হয়েছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তা চরম আকার ধারণ করে। মার্কিন সরকার মধ্যপ্রাচ্যে তার অশুভ লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে ইরানকে বড় বাধা বলে মনে করতে থাকে।

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর মার্কিন সরকার মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা জোরদার করে। ঐ ঘটনার কিছুদিন পর মার্কিন সরকার যখন বিশ্বের সকল দেশকে তার অশুভ লক্ষ্য বাস্তবায়নের পক্ষে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, তখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ কংগ্রেসে বলেন, যে সব দেশ আমাদের সাথে নেই, তারা আমাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন সরকার ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনাকে ব্যবহার করে বিশ্বজনমতকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে প্রথমে আফগানিস্তান ও পরে ইরাকে হামলা চালিয়ে দেশ দু'টি দখল করে নেয়।

এদিকে ২০০৬ সালের ৩৩ দিনের যুদ্ধে লেবাননের হিযবুল্লাহর কাছে আগ্রাসী ইহুদীবাদী সেনাদের শোচনীয় পরাজয়ের ফলে মার্কিন সরকারের পরিকল্পিত বৃহৎ মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ঐ যুদ্ধের পর মার্কিন সরকারকে আর বৃহৎ মধ্যপ্রাচ্যের কথা বলতে শোনা যায় নি। এছাড়া সম্প্রতি গাজায় ২২ দিনের যুদ্ধে হামাসের নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ সংগ্রামীদের কাছে ইসরাইলীদের পরাজয়ের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সরকারের পরাজয় ষোলকলায় পূর্ণ হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন চিন্তাবিদদের বক্তব্যে শুধু এক কথাই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, আর তা হলো, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির ওপর ইরানের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে এবং এ অঞ্চলের সকল সমস্যার সমাধানের চাবিকাঠি রয়েছে ইরানের হাতে।
ইরান মুসলিম দেশ হওয়ার কারণে মধ্যপ্রাচ্যসহ এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে ইরানের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কাজেই ইরাক, লেবানন, ফিলিস্তিন ও আফগানিস্তানের ঘটনাপ্রবাহে ইরানের গভীর প্রভাব থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এসব দেশের সংকট সৃষ্টি হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদীবাদী ইসরাইলের আগ্রাসী তৎপরতার কারণে। আর ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে ইরাক, লেবানন, ফিলিস্তিন ও আফগানিস্তানের মুসলিম জনগণ তাদের দেশে বিদেশী দখলদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সাহস ও অনুপ্রেরণা পেয়েছে। মার্কিন সাপ্তাহিক টাইম গত সপ্তায় মার্কিন সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে, ইরাক ও আফগানিস্তান সংকট সমাধানের প্রচেষ্টায় ইরানকে অংশগ্রহণ করতে দিতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সকল সংকট সমাধানে ইরানের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যাবে না। কাজেই দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কূটনৈতিক ও সামরিক প্রচেষ্টা একের পর এক মার খাওয়ার পর এখন ওয়াশিংটন ইরানের সরকার ব্যবস্থায় পরিবর্তনের বিষয়টি বাদ দিয়ে ইরানের কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণের দিকে মনোযোগী হয়েছে। সার্বিকভাবে বলা যায়, ইরানের সফল কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে এবং মার্কিন সরকার এ অঞ্চলের যে কোন বিষয়ে এখন আর ইরানের ভূমিকাকে অস্বীকার করতে পারছে না।#

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-২৮

 

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ত্রিশ বছর পুর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের গত তিন দশকের অর্জনগুলো নিয়ে আমরা এ অনুষ্ঠানে আলোচনা করি। আজকের আসরে আমরা ইরান কর্তৃক পরমাণু প্রযুক্তি অর্জন এবং সেই সাথে অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে ইসলামী ইরানের অভূতপূর্ব উন্নতির বিষয়টি তুলে ধরবে।

পরমাণু প্রযুক্তি হচ্ছে বিশ্বব্যাপী এ পর্যন্ত অর্জিত সবচেয়ে জটিল প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বহু ধরনের শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা যায়। ভূগর্ভে সংরক্ষিত তেল ও গ্যাস সম্পদ সীমিত হওয়ার কারণে এক সময় তা ফুরিয়ে যাবে। কাজেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এখনই বিকল্প উপায়ের কথা ভাবছে সবাই। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানও স্বল্প ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে পরমাণু কর্মসূচী শুরু করেছে। ইরানী বিশেষজ্ঞরা ২০০৪ সালে ইরানের আরাক অঞ্চলে ৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পরীক্ষামূলক পরমাণু চুল্লি চালু করেন। ভারী পানির ঐ চুল্লি ইরানে এ ধরনের আরো চুল্লি নির্মানের ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। ঐ চুল্লি নির্মানের মাধ্যমে ইরান ভারী পানি উৎপাদনের প্রযুক্তি সমৃদ্ধ বিশ্বের ৯টি দেশের কাতারে শামিল হয়। বর্তমানে ইরান চিকিৎসা, কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। যে সব খাদ্য সামগ্রী দীর্ঘদিন মজুত রাখার ফলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, সে সব খাদ্যদ্রব্য বিশেষ ধরনের পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার করে রক্ষা করা সম্ভব।

ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের আগে গোটা কাজার শাসনামল জুড়ে এবং প্রথম পাহলাভি শাসনামলে ইরানের ওপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি রাশিয়া ও বৃটিশদের আধিপত্য ছিল। এরপর দ্বিতীয় পাহলাভি শাসক অর্থাৎ রেজা শাহর শাসনামলে ইরানের ওপর মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় মার্কিনীরা ইরানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতি নির্ধারণ করে দিতো। এ ধরনের পরিকল্পনায় মার্কিন সরকার ও কতিপয় পশ্চিমা দেশের স্বার্থ সংরক্ষিত হতো এবং এতে ইরানী জনগণের স্বার্থের কথা খুব কমই ভাবা হতো। ইসলামী বিপ্লব ইরানের জনগণকে ঐ দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে। ইরানে মার্কিন সরকারের আধিপত্য পুরোপুরি খর্ব হয় এবং জনগণ নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ লাভ করে। বিপ্লবের পাঁচ বছর আগে শাহ সরকার জনগণকে ধোঁকা দেয়ার জন্য নয়া অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ঐ পরিকল্পনায় ইরানের অর্থনীতিকে শুধুমাত্র তেল বিক্রিলব্ধ বৈদেশিক মূদ্রার ওপর নির্ভরশীল রাখা হয়। এর ফলে স্বাভাবিকভাবে ইরান আমদানি পন্যের ওপর, অর্থাৎ পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

শাহ সরকারের গৃহিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচী বাস্তবায়ন শুরু হলে ইরানের গ্রামগুলো খালি হয়ে যেতে থাকে। মানুষ গ্রাম থেকে শহর কিংবা শহরতলীতে এসে বসবাস করতে শুরু করে, ফলে কৃষিখাতে নেমে আসে বিপর্যয়। উৎপাদন খাতে উৎসাহ কমে যায়, বিভিন্ন পন্য সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে উৎপাদনের পরিবর্তে বিদেশে তৈরি পার্টস আমদানি করে এসেম্বল শিল্প বিকাশ লাভ করে। এছাড়া সে সময় ইরানের বাজারের অধিকাংশ পন্য ছিল পশ্চিমা দেশগুলো থেকে আমদানি করা। খনিজ সম্পদ কোন ধরনের পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি বিদেশ রপ্তানি করার ফলে ইরানী জনগণের বিদেশের ওপর নির্ভরতা আরো বেড়ে যায়। ইসলামী বিপ্লবের ফলে ইরানের অর্থনীতি, শিল্প ও সামাজিক খাতে এই বিদেশী নির্ভরতার অবসান ঘটে। আর বিপ্লবের চতুর্থ দশকে পা রাখতে গিয়ে ইরানের স্বনির্ভরতার বিষয়টি এখন সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সামাজিক খাতে ইসলামী বিপ্লবের একটি বড় অর্জন ছিল মানব সম্পদের উন্নয়ন। "জাতিসংঘের মানব সম্পদ উন্নয়ন" শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামী বিপ্লবের পরবর্তী বছরগুলোতে ইরানে মানব সম্পদ উন্নয়নের হার ১৮.৮ শতাংশে পৌঁছে যায়। সে সময়ের ১৭৭টি দেশের মধ্যে মানব সম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইরান ১৬ তম স্থান দখল করে। জাতিসংঘ প্রতি বছর যে সব প্রতিবেদন প্রকাশ করে, মানব সম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিবেদন তার অন্যতম। এ প্রতিবেদনে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, মানুষের প্রকৃত আয় এবং মাথাপিছু গড় আয়ের মত বিষয়গুলোকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অবশ্য একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবগুলো বিষয়কে এ প্রতিবেদনের অন্তর্ভূক্ত করা হয় বলে জাতিসংঘের মানব সম্পদ উন্নয়নের প্রতিবেদনকে একটি দেশের অবস্থা সম্পর্কে পরিপূর্ণ প্রতিবেদন বলে ধরে নেয়া যায়।

জাতিসংঘের মানব সম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে ইরানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.৩ শতাংশ। অথচ এই হার ইসলামী বিপ্লবের আগের বছর অর্থাঁ ১৯৭৮ সালে ছিল মাইনাস ১ শতাংশ এবং ১৯৭৯ সালে শাহ সরকারের শাসনামলের শেষ বছর ছিল মাইনাস ৭.৭ শতাংশ। ১৯৭৮ সালে ইরানের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের পরিমান ছিল প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার যা বেড়ে ২০০৮ সালে দাঁড়ায় ১৯ হাজার কোটি ডলারে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনের পরবর্তী অংশ সম্পর্কে কথা বলার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে বলে রাখা প্রয়োজন মনে করছি। অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিল্প, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ইরান গত ত্রিশ বছরে এমন সময় ব্যাপক উন্নতি অর্জন করেছে, যখন তাকে পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেয়া ভয়াবহ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কাটাতে হয়েছে। এছাড়া ইরাকের চাপিয়ে দেয়া আট বছরের যুদ্ধসহ পশ্চিমাদের আরো অনেক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হয়েছে।

ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর নেতৃত্বে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর পশ্চিমা চিন্তাবিদরা ইরানকে নানান সংকটের মধ্যে জর্জরিত করে ফেলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। গত ত্রিশ বছর ধরে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে তারা বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় নি। ইরানের ইসলামী বিপ্লব যাতে অঙ্কুরেই মারা পড়ে এবং অন্যান্য দেশে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সে লক্ষ্যে পশ্চিমারা ঐ কুপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। পশ্চিমা চিন্তাবিদরা ভেবেছিল, ইরানকে বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত করে রাখলে ইসলামী বিপ্লব ইরানের সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং তা মুসলিম দেশগুলোতে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। কিন্তু আল্লাহর ওপর নির্ভরতা ও জনগণের শক্তির ওপর ভিত্তি করে ইরান পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেয়া বহু সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। ইসলামী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী গত সাতই ফেব্র"য়ারি এক ভাষণে এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের ওপর পশ্চিমারা উপর্যপুরি যেসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তার ভেতর দিয়ে উমিদ নামক উপগ্রহ মহাশূণ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এছাড়া ইরানের সাথে যেসব দুর্ব্যবহার করা হয়েছে, তার ভেতর থেকে ইরান পরমাণু প্রযুক্তি অর্জন করেছে।

ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গ টানার উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা বলা যে, এসব নিষেধাজ্ঞা না থাকলে ইরান অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আরো অনেক বেশী অগ্রগতি অর্জন করতে পারতো। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ফাও এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর ইরান বিভিন্ন ধরনের শষ্যের উৎপাদন ৫ কোটি টন বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। ফাওয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭৮ সালে ইরানের কৃষিপন্য উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৮৮ লাখ টন। ২০০৭ সালে এর পমিাণ দাড়ায় ৮ কোটি ৮৫ লাখ টনে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭০ সালে ইরানের জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ অপুষ্টিতে ভুগতো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানে অপুষ্টির হার শতকরা ৪ ভাগেরও নীচে নেমে গেছে। এ পরিসংখ্যানের গুরুত্ব আরো বেড়ে যাবে ইরানের জনসংখ্যার তারতম্য লক্ষ্য করলে।

১৯৭০ সালে যখন ইরানে অপুষ্টির হার অনেক বেশী ছিল তখন এদেশের জনসংখ্যা ছিল মাত্র সাড়ে তিন কোটি। অথচ বর্তমানে ইরানের জনসংখ্যা ৭ কোটিরও বেশী, সেই সাথে অপুষ্টির হার বহুলাংশে কমে গেছে। ফাও আরো বলেছে, ইরান বহু শষ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। ইসলামী বিপ্লবের পর সরকার বাধ নির্মান করে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করাসহ কৃষিক্ষেত্রকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়ার কারণে কৃষিক্ষেত্রে দেশটি এই উন্নতি অর্জন করতে পেরেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তারা বলছেন, ইসলামী বিপ্লবের পর গত তিন দশকে ইরান যে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা অল্প কথায় বলে শেষ করা যাবে না।

ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক-২৯

পাঠক! ৩০ পর্বের এ ধারাবাহিক অনুষ্ঠানে ইসলামী বিপ্লবের পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের অভূতপূর্ব উন্নতি সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আমরা বিগত পর্বগুলোতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতি সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আজকের আসরে আমরা চিকিৎসা, সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে ইরানের উন্নতি ও অর্জন সম্পর্কে আলোচনা করবো।

 

ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর ওষুধ উৎপাদন শিল্পে ইরান উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। বর্তমানে দেশের মোট চাহিদার শতকরা ৯৫ ভাগ ওষুধ ইরানের অভ্যন্তরে তৈরি হয় এবং প্রতি বছর গড়ে ৫০ ধরনের নতুন ওষুধ ইরানী বিশেজ্ঞরা তৈরি করছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এম.এস রোগের চিকিৎসার জন্য ইরান নিজস্ব প্রযুক্তিতে সিনোভিক্স ওষুধ উৎপাদন করেছে। ইরান দুই বছর আগে বিশ্বে প্রথমবারের মত এ ওষুধ উৎপাদন করে। এইডস রোগের চিকিৎসার জন্য ইরানী বিশেষজ্ঞরা আইমড (Immmmmoodd) ওষুধ আবিস্কার করেছেন। এই ওষুধ এইডস রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি আগের চেয়ে অনেক দিন বেশী বেঁচে থাকতে পারে। রাসায়নিক অস্ত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং হেপাটাইট সি'র চিকিৎসার জন্যও ইরানে বিভিন্ন রকম ওষুধ উৎপাদিত হচ্ছে।

হার্ট ও লাঞ্জ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেও ইরান ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাকেরি লাঙ্কারানি এ সম্পর্কে বলেছেন, ইরানে প্রতি বছর ১৫ হাজার হার্টের অস্ত্রপচার হয়। এ দিক থেকে ইরান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ১০টি দেশের একটি। এনজিওপ্লাস্টি এবং ওপেন হার্ট সার্জারির ক্ষেত্রে ইরানী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন। বিশ্বের অন্যতম নামকরা হার্টের চিকিৎসক- ব্রাজিলের নাগরিক প্রফেসর র্যা নডাস বাতিস্তা বলেছেন, হার্টের চিকিৎিসায় ইরান স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, কাজেই এ রোগের চিকিৎসার জন্য কোন ইরানীর বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এছাড়া ইরানে গত ২৫ বছরে ২৫ হাজার মানুষের শরীরে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ল্যাপারোস্কপি প্রযুক্তির সাহায্যে অপারেশনের ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। বর্তমানে ইরানে এই প্রযুক্তির সাহায্যে কোনরকম কাটাছেড়া ছাড়াই কিডনি প্রতিস্থাপনের কাজ করা হয়।

ইরানের ওপর বিদেশী হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী বিপ্লবের পর তেহরান প্রতিরক্ষা খাতের ওপর বিশেষভাবে জোর দেয়। ইমাম খোমেনি (রহঃ)এর নেতৃত্বে ইরানে যে ইসলামী বিপ্লব হয়েছিল, তা ছিল শুধুমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভর করে নিরস্ত্র মানুষের বিপ্লব। বিপ্লব বিজয়ের পর থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হুমকি ও হামলা শুরু হয়ে যায়। বিপ্লব বিজয়ের মাত্র দেড় বছরের মাথায় ইরানের ওপর সাবেক সাদ্দাম সরকার আগ্রাসন চালায়। পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের ওপর নানামুখী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এসব কারণে বিপ্লব পরবর্তী ইরানের ইসলামী সরকার এ সিদ্ধান্তে উপনিত হয় যে, দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।

অবশ্য বিপ্লবের আগেও ইরানের শাহ সরকার দেশের সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী ও সুসজ্জিত বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলো। তবে তার মূল উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন অস্ত্র কিনে এনে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করা। এছাড়া ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি মার্কিনীদের নিয়ন্ত্রণে দিয়ে দেয়াও ছিল ঐ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। সে সময় ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শত শত কোটি ডলারের অস্ত্র ক্রয় করে। ঐসব অস্ত্র পরিচালনার জন্য মার্কিন বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন ছিল বলে সে সময় মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাজার হাজার সদস্যকে ইরানের প্রতিরক্ষা বিভাগে চাকুরি দেয়া হয়। ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর ঐসব মার্কিন সেনা সদস্য ইরান ত্যাগ করার পর সামরিক খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন একটি অবশ্যম্ভাবী বিষয়ে পরিণত হয়।
কিন্তু সে সময় সমরাস্ত্রে সমৃদ্ধ বিশ্ব শক্তিগুলো ইসলামী ইরানকে সহযোগিতা করতে রাজী হয় নি। অন্যদিকে তারা রাজী হলেও সে সব শক্তির সাথে সহযোগিতা করার অর্থ ছিল পাশ্চাত্যের ওপর নির্ভরশীল শাহ সরকারের সামরিক কর্মসূচী এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কাজেই ইরান নিজস্ব মেধা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণভাবে প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তবে সামরিক খাতে শক্তিশালী হওয়ার ক্ষেত্রে কোন দেশের ওপর হামলা চালানোর কোন উদ্দেশ্য ইরানের নেই। শুধুমাত্র বহিঃশক্তির আক্রমন প্রতিহত করা কিংবা হামলা চালানো থেকে বিরত রাখা হচ্ছে ইরানের সামরিক শক্তি অর্জনের উদ্দেশ্য।

বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ইরান বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপনাস্ত্র নির্মানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী সাফল্য অর্জন করে। ইরান দুই হাজার কিলোমিটার পাল্লার শাহাব-৩ ক্ষেপনাস্ত্র নির্মান করেছে যা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম। ঐ ক্ষেপনাস্ত্রের সফল পরীক্ষার পর ইরান এখন আরো উন্নত প্রযুক্তি সম্বলিত এবং আরো দূরে আঘাত হানতে সক্ষম শাহাব-৪ ক্ষেপনাস্ত্রের ওপর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষেপনাস্ত্র খাতে ইরানের এ সাফল্য দেখে পশ্চিমা দেশগুলো হতভম্ভ হয়ে গেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক স্টাডি পরিষদ কয়েক মাস আগে এক প্রতিবেদনে বলেছে, "ইরানের উন্নতমানের ব্যালাস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র দেশটিকে এমন ক্ষমতা দিয়েছে, যা ব্যবহার সে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সংলাপের ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে থাকবে। ইরানের কাছে হাজার হাজার ক্ষেপনাস্ত্র রয়েছে যার মধ্যে শাহাব ১, ২ ও ৩ ক্ষেপনাস্ত্র উল্লেখযোগ্য। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যে কোন মার্কিন সেনা ঘাঁটির পাশাপাশি ইসরাইলে আঘাত হানার ক্ষমতা ইরানের শাহাব ৩ ক্ষেপনাস্ত্রের রয়েছে।" ইরানের কাছে আরো যে সব ক্ষেপনাস্ত্র রয়েছে সে সবের মধ্যে ১৮০০ কিলোমিটার পাল্লার 'কাদর ৩' এবং 'ফাতহ ১১০' ক্ষেপনাস্ত্রের নাম উল্লেখ করা যায়।

দুরপাল্লার ক্ষেপনাস্ত্রের পাশাপাশি ইরান নিজস্ব প্রযুক্তিতে ট্যাংক ও বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপনাস্ত্রও তৈরি করেছে। এর মধ্যে "শাহাব সাকেব" ক্ষেপনাস্ত্র অত্যন্ত নীচু দিয়ে উড়ে যাওয়া শত্রু জঙ্গীবিমান সনাক্ত করে তাতে আঘাত হানতে সক্ষম। এছাড়া ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোস্তফা মোহাম্মাদ নাজ্জার গত ৩১শে জানুয়ারি ঘোষণা করেছেন, ইরানের বিমান বাহিনী এমন এক ধরনের ক্ষেপনাস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা শত্রু জঙ্গীবিমান ও ক্ষেপনাস্ত্র খুঁজে বের করে তা ধ্বংস করতে পারবে। ইরানে যেসব ভারী অস্ত্র তৈরি হয়েছে তার মধ্যে জুলফিকার ট্যাংক উল্লেখযোগ্য। এ ট্যাংককে বহু ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ইরানের পদাতিক বাহিনী রাসয়নিক অস্ত্রের মোকাবিলায় টিকে থাকার মত সাঁজোয়া যান 'বাররাগ্' তৈরি করেছে। পাশাপাশি ইরান "খায়বার" মেশিনগানসহ বেশ কিছু স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রও তৈরি করেছে।

ইরানের বিমান বাহিনী সব সময়ই মধ্যপ্রাচ্যের একটি উল্লেখযোগ্য শক্তি বলে বিবেচিত হতো। সাদ্দামের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের সময় বিমান বাহিনী শাহের আমলে কেনা মার্কিন ফ্যান্টম জঙ্গীবিমান মেরামত করতে সক্ষম হয়। এফ-১৪ জঙ্গীবিমান থেকে শত্রু জঙ্গীবিমানে আঘাত হানার জন্য ইরানের বিমান বাহিনী 'তাভ' ক্ষেপনাস্ত্র তৈরি করে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন এবং শব্দের চেয়ে দ্রুতগতি সম্পন্ন জঙ্গীবিমান 'সায়েকে' অচিরেই ইরানের বিমান বাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত করা হবে। বর্তমানে শত্রুঘাঁটি চিহ্নিতকরণ, সেখানকার ছবি সংগ্রহ, এমনকি হামলা চালানোর কাজে পাইলটবিহীন বিমান অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। এ কারণে ইরানী বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ধরনের ও ভিন্ন ভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন পাইলট বিহীন বিমান তৈরি করছেন। এছাড়া রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম জঙ্গীবিমানও বর্তমানে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং অচিরেই ইরানে বানিজ্যিকভাবে এ বিমান তৈরির কাজে হাত দেয়া হবে।

পারস্য উপসাগরের তীরে অবস্থিত ইরানের রয়েছে দীর্ঘ সমূদ্রসীমা। এ সীমান্ত রক্ষার জন্য শক্তিশালী নৌবাহিনী প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে ইরান এ পর্যন্ত বেশ কয়েক ধরনের গাটবোট তৈরি করেছে যার মধ্যে গাদির, জামারান ও দামাভান্দের নাম উল্লেখযোগ্য। এছাড়া 'গাদির' ও 'সাবেহাত' নামের দুই ধরনের সাবমেরিনও ইরান তৈরি করেছে। তবে ইরানের সর্বাধুনিক সাবমেরিনের নাম নাহাংগ বা তিমি যা উন্নত প্রযুক্তির টর্পেডো ও ক্ষেপনাস্ত্র সমৃদ্ধ। সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ইরানের সর্বাধুনিক ক্ষেপনাস্ত্রের নাম হুত। এটি সব ধরনের রাডার ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত সূচারুভাবে শত্রুসেনার নৌযানে আঘাত হানতে সক্ষম। পাশাপাশি ইরানের রয়েছে ভূমি থেকে সাগর, আকাশ থেকে সাগর এবং সাগর থেকে সাগরে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপনাস্ত্র।

সার্বিকভাবে ইরান গত তিন দশকে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এমন পর্যায়ে উপনিত হয়েছে, যার ফলে বিশ্বের কথিত বৃহৎ শক্তিগুলোকে ইরানের ব্যাপারে সাবধানে কথা বলতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অবৈধভাবে চেপে বসা ইহুদীবাদী ইসরাইল ও তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক মার্কিন সরকার এ পর্যন্ত বহুবার ইরানের ওপর হামলা চালানোর হুমকি দিলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়নের সাহস দেখায় নি। #

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন