এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 25 ডিসেম্বর 2008 16:30

বিপ্লবের দিনগুলি

১ম পর্ব

ইরানের ইসলামী বিপ্লব, বিশ্ব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রাজতান্ত্রিক স্বৈর শাসনের কষাঘাতে নিস্পেষিত ইরানি জনগণ ইমাম খোমেনী (রহঃ)-র নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে এই বিপ্লব সফল করেন। ইরানের বিপ্লব বিশ্বের ন্যায়কামী ও নির্যাতিতদের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। ইরানের দুর্দন্ড প্রতাপশালী ও স্বৈরাচারী শাহের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব খুব সহজ ছিল না। এজন্য বহু মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। সহ্য করতে হয়েছে চরম নির্যাতন ও দুঃখ-কষ্ট।
আগামী ১০ই ফেব্রুয়ারি ইরানের এই ইসলামী বিপ্লবের তিন দশক পূর্ণ হবে। এ উপলক্ষ্যে আমরা বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছি। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা আপনাদেরকে বিপ্লবের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করব।

অন্যায়-অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে ইরানিদের সংগ্রামের ইতিহাস সুপ্রাচীন। ১৯৬০-র দশকে ইসলামী বিপ্লবের পথে চূড়ান্ত যাত্রা শুরু হলেও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ইরানিদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল আরও আগে। ১৯০৫ সালের সাংবিধানিক বিপ্লব এবং তেল সম্পদকে জাতীয়করণের জন্য ১৯৫০-র দশকের গণসংগ্রাম, বিংশ শতাব্দির আরও দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সে যাইহোক, আমরা ফিরে আসছি ইসলামী বিপ্লবের পথে চূড়ান্ত যাত্রার ইতিহাসে।

১৯৬১ সাল। স্বৈরাচারী শাহ সরকার ইসলাম বিরোধী স্থানীয় পরিষদ আইন অনুমোদন করার সাথে সাথে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ইমাম খোমেনী (রহঃ) এই আইন বাতিলের আহ্বান জানালেন। কিন্তু শাহ প্রথমে তাতে কান দিলেন না। আন্দোলন আরও জোরদার হলো। এক বছরেরও কম সময়ের আন্দোলনে শাহ বিতর্কিত আইনটি বাতিল করতে বাধ্য হলেন। বলা যায়, সাফল্য দিয়েই বিপ্লবের পথে যাত্রা শুরু হলো।

১৯৬৩ সালের শুরুতে শাহ, শ্বেত বিপ্লব শীর্ষক একটি গণপ্রতারণামূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। বাস্তবে এই পরিকল্পনাটি ইরানি জনগণ ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ছিল। এ কারণে ইমাম খোমেনি (রহঃ) ধর্মীয় নগরী কোম থেকে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। এরপরও এই পরিকল্পনার ব্যাপারে গণভোটের আয়োজন করা হয়। ইমাম খোমেনী এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় অধিকাংশ মানুষ গণভোট বয়কট করে। ইরানিরা শ্বেত বিপ্লব পরিকল্পনার প্রতিবাদে ঐ বছর ফার্সি নববর্ষের উৎসব পালন না করে শোকানুষ্ঠান পালন করেছিল। উল্লেখ্য, ইরানে প্রতিবছর অত্যন্ত জাকজমকপূর্ণভাবে ফার্সি নববর্ষ উদযাপিত হয়। নববর্ষ উৎসবকে ইরানের সবচেয়ে বড় আনন্দ উৎসবও বলা যেতে পারে। কিন্তু সেদিন ইরানিরা ইমাম খোমেনীর প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ উৎসব পালন থেকে বিরত ছিলেন। ইরানি জনগণের অবিশ্বাস্য এ পদক্ষেপের কারণে শাহ তার ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। সাথে সাথে ধর্মীয় নগরী কোমে হামলা চালানোর নির্দেশ জারি হয়। শাহের পেটোয়া বাহিনী কোমে হানা দেয়। শহীদ হন ছাত্র-শিক্ষকসহ বেশ কয়েক জন। শাহের বাহিনীর এই নির্মম হামলার নিন্দা জানিয়ে পরের দিনই ইমাম খোমেনী (রহঃ) বিবৃতি প্রকাশ করেন।


এর কিছু দিন পরই বিশ্বনবীর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেন (আঃ)-র শাহাদাতের স্মৃতিবিজড়িত মহররম মাস শুরু হয়। ইরানের জনগণ শোকাবহ এই মাসে বিভিন্ন শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করে এবং এসব অনুষ্ঠানে বিজ্ঞ আলেম ও বিশিষ্টজনেরা বক্তব্য রাখেন। এ অবস্থায় শাহের নির্যাতন ও অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করার জন্য ইমাম খোমেনী (রহঃ) মহররম মাসকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। এই আহ্বানের পরপরই শোকানুষ্ঠানে বক্তারা শাহের নানা অপকর্মের বিবরণ তুলে ধরতে শুরু করেন।
দশই মহররমকে আশুরা বলা হয়। ইমাম হোসেন (আঃ)র শাহাদাৎ দিবস বা আশুরার দিনে গোটা ইরান শোকাচ্ছন্ন থাকে। এদিনের শোকানুষ্ঠানে কোটি কোটি মানুষ অংশ নেয়।

 

১৯৬৩ সালের এমনি এক দিনে ইমাম খোমেনী শাহের ধর্ম ও দেশ বিরোধী তৎপরতা সম্পর্কে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন,যা আশুরার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পড়ে শোনানো হয়। এই বিবৃতি প্রকাশের অপরাধে শাহের বাহিনী ১৯৬৩ সালের ৫ই জুন ইমাম খোমেনী (রহঃ)-কে গ্রেফতার করে তেহরানের কারাগারে প্রেরণ করে।
ইমাম খোমেনী (রহঃ)-কে গ্রেফতারের খবর বাতাসের গতিতে গোটা ইরানে ছড়িয়ে পড়ে এবং জনতা রাস্তায় নেমে ইমামের মুক্তির দাবিতে শ্লোগান দেয়। শাহের বাহিনী অস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভকারীদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। রক্তাক্ত হয় রাজপথ। রাজধানী তেহরান ও ধর্মীয় কোমসহ সারা দেশে শহীদ হয় কয়েক হাজার ন্যায়কামী মানুষ।

 

আন্দোলন বাহ্যত স্তিমিত হয়ে আসে। ইমাম খোমেনীকে কিছুদিন সেনা ঘাঁটিতে এবং প্রায় ১০ মাসের মতো একটি বাড়ীতে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে আসায় শাসক গোষ্ঠী ধরেই নিয়েছিল যে, ইমাম খোমেনী (রহঃ) তার আন্দোলনের সাহস হারিয়ে ফেলেছেন এবং জনতাও আর নতুন করে আন্দোলন গড়ে তোলার দুঃসাহস দেখাবে না। এ কারণে ১৯৬৪ সালের এপ্রিল মাসে ইমাম খোমেনীকে মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু ইমাম খোমেনী (রহঃ) মুক্তি পাবার পর কয়েক দিন পরই শাহ সরকারের বিরুদ্ধে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। তিনি বিজাতীয়দের উপর শাহের নির্ভরতার কড়া সমালোচনা করেন এবং জনগণকে প্রতিরোধ গড়ে তুলার আহ্বান জানান। এর কিছু দিন না যেতেই আবারও শোকের মাস মহররম এসে উপস্থিত হয়। ঐ বছরের শোকানুষ্ঠানগুলোও শাহের অন্যায়-অপকর্ম ফাঁস করার অনুষ্ঠানে রূপ নেয়। এসব শোকানুষ্ঠানে আগের বছরের একই মাসে শাহের বাহিনীর হামলায় যারা শহীদ হয়েছিল তাদেরকেও স্মরণ করা হয় গভীর শ্রদ্ধাভরে।

 

১৯৬৪ সালের অক্টোবর মাসে শাহ তার অনুগত সংসদকে দিয়ে ক্যাপিটিউলেশন বিল পাশ করিয়ে নেয়। এই বিলটি ইরানের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্বের জন্য অপমানজনক ছিল। এই আইনের কারণে ইরানে কোন মার্কিন নাগরিকের বিচার করা যেত না। এক কথায় ইরানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদেরকে বিচারের উর্ধ্বে রাখা হয়েছিল। ইরানের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব বিরোধী এই ক্যাপিটিউলেশন আইনের বিরুদ্ধে সমগ্র জাতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ইমাম খোমেনী এই আইনের ধ্বংসাত্বক প্রভাব সবার সামনে তুলে ধরেন। মহান এই নেতা শাহের অন্যায় ও দুর্নীতি সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করে তোলার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে জনগণের দুঃখ-কষ্টের প্রধান হোতা হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি বলেছিলেন, বর্তমানে আমাদের দুঃখ-কষ্টের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরাইলই দায়ী। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের পরামর্শে ইরানের স্বৈরাচারী সরকার, ইরানিদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছিল।

 

এ অবস্থায় ইমাম খোমেনীর যুক্তিপূর্ণ ঐ ভাষণ শাহের সরকারকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলে। তারা এই ভীতি কাটিয়ে ওঠার জন্য ইমাম খোমেনীকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইমামকে ১৯৬৪ সালের চৌঠা নভেম্বর তুরস্কে এবং এর ১১ মাস পর ইরাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। আর এভাবেই ইমামের ১৪ বছরব্যাপী নির্বাসিত জীবনের সূচনা হয়। ইমাম যখন নির্বাসনে তখনও ইরানে কম-বেশি আন্দোলন অব্যাহত ছিল। শাহের বাহিনীর দমন-পীড়নের কারণে বাহ্যত মাঠে-ময়দানের আন্দোলন স্তিমিত থাকলেও ভেতরে ভেতরে ন্যায়কামীরা তাদের প্রস্তুতি অব্যাহত রাখে। এর প্রমাণ পাওয়া যায়, ১৯৬৫ সালের ২০ শে জানুয়ারি। এদিন ইসলামী মুতালেফে পার্টির কয়েক জন সদস্য শাহের অনুগত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসান আলী মানসুরকে হত্যা করে। পরে অবশ্য শাহের বাহিনী এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদেরকে ফায়ারিং স্কোয়াডে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। #

 

২য় পর্ব 

পাঠক! ধারাবাহিক আয়োজন বিপ্লবের দিনগুলি-র গত আসরে আমরা ইসলামী বিপ্লবের পথে চূড়ান্ত যাত্রার সূচনা এবং ১৯৬৩ সালের জুন মাসে শাহ বিরোধী মিছিলে নৃশংস হামলায় হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানির ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা এও বলেছি যে, শাহ, ইমাম খোমেনী (রহ:) কে জনবিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে তাকে নির্বাসনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। আজকের আসরে আমরা ইমাম খোমেনীর অনুপস্থিতিতে ন্যায়কামীদের আন্দোলন এবং স্বৈরাচারী শাহের দমন-পীড়ন সম্পর্কে আলোচনা করব।

 

ইমাম খোমেনী (রহ:)-র নির্বাসিত জীবনের সূচনা হয় ১৯৬৪ সালের চৌঠা নভেম্বর। তুরস্কে ১১ মাস রাখার পর ইমামকে ইরাকে পাঠানো হয়। ইমাম খোমেনী (রহ:)-কে ইরান থেকে সরিয়ে দেয়ার পর শাহ বিরোধী আন্দোলন সাময়িকভাবে কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। এ সময় শাহের নিরাপত্তা বাহিনী খোঁজে খোঁজে আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করতে থাকে এবং গ্রেফতারকৃতদের অনেককেই হত্যা করে। শাহের বাহিনীর নির্যাতনে অনেকেই পঙ্গু হয়ে যায়। শাহের স্বৈরাচারী সরকার তার গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা সাভাককে আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী করে। সাভাক সদস্যদের প্রধান দায়িত্বই ছিল শাহ বিরোধীদের সনাক্ত করে তাদের গ্রেফতার করা এমনকি প্রয়োজনে হত্যা করা। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সি.আই.এ. এবং ইসরাইলী গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ, ইরানের সাভাকের সদস্যদেরকে এ ব্যাপারে সব ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।

 

সেদিনের ইরানের মানুষ কিন্তু আজকের মতো অর্থনৈতিক দিক থেকে এতটা সমৃদ্ধ ছিল না। কারণ তেল খাত থেকে অর্জিত অর্থ জনকল্যাণে ব্যয় না করে শাসক শ্রেনীর ভোগ-বিলাসে খরচ করা হতো। জনগণের অর্থের একটা বড় অংশ ব্যয় হতো, শাহের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরাইলের সমর্থন অটুট রাখার জন্য। ফলে ইরানের সাধারণ জনগণ অতিকষ্টে দিনাতিপাত করতো। অন্যদিকে, শাহ সাধারণ মানুষকে অভুক্ত রেখে বিদেশী অতিথিদের ডেকে এনে কোটি কোটি ডলার খরচ করে জাঁকজমকপূর্ণ নানা উৎসব পালন করতো। ১৯৬৬ সালে শাহ তার ক্ষমতা গ্রহণের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে চোখ ধাঁধাঁনো এক উৎসবের আয়োজন করে। এরপর ১৯৭১ সালে ইরানে রাজতান্ত্রিক শাসনের আড়াই হাজার বছর উপলক্ষ্যে ব্যয়বহুল এক উৎসবের আয়োজন করা হয়। এই উৎসবে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও রাজা-বাদশাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এই উৎসব উপলক্ষ্যে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করা হয়েছিল। নিজেকে পরাক্রমশালী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছিল সেই উৎসবের মাধ্যমে। এখানেই শেষ নয়। পরের বছর এই উৎসবের বর্ষপূর্তিও পালন করা হয় বেশ ধুমধামের সাথে।

 

এরপর ১৯৭৫ সালে, পাহলভি বংশের রাজ সিংহাসন দখলের ৫০ বছর পূর্তি পালন করা হয় ব্যাপক আয়োজনের মাধ্যমে। ইরানের সাধারণ মানুষ যখন দারুণ অর্থকষ্টে ভুগছিল তখন এ ধরনের ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান যেন শাহের পতনকেই ত্বরান্নিত করছিল। ইরানের সাধারণ জনগণ তখন তাদের মৌলিক চাহিদাগুলোও পুরণ করতে অপারগ ছিল।

শাহ ছিল ইসলাম বিদ্বেষী। এ কারণে ইরানে ইসলামের প্রভাব ক্ষুন্ন করার জন্য তিনি ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করেন। রাজতান্ত্রিক শাসনের আড়াই হাজার বছর উপলক্ষ্যে বিশাল আয়োজনের একটি বড় লক্ষ্য ছিল, ইরানের ইতিহাস থেকে ইসলাম ধর্মকে মুছে ফেলা। শাহ তার ইসলাম বিরোধী তৎপরতার অংশ হিসেবে ইরানে হিজরী সালের পরিবর্তে শাহী সালের প্রবর্তন ঘটিয়েছিল। শাহ ১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে, আড়াই হাজার বছর আগে থেকে অর্থাৎ রাজতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার সময় থেকে তারিখ গণনার নির্দেশ জারি করে।

 

ইরানে সে সময় শাহের অনুগত কয়েকটি রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু শাহ ১৯৭৫ সালে ঐসব পার্টিকেও বিলুপ্ত ঘোষণা করে নিজের নেতৃত্বে রাস্তখিয নামক একটি দল প্রতিষ্ঠা করে। শাহ অর্থাৎ মোহাম্মদ রেজা ঐ দল গঠনের পর দম্ভভরে বলেছিল, কেউ চাক বা না চাক, ইরানের সকল মানুষই এখন একটি মাত্র দল অর্থাৎ রাস্তখিয পার্টির সদস্য। কেউ মেনে না নিলে তা ঘোষণা করতে পারে, তাহলে আমরা তাকে পার্সপোর্ট দিয়ে দেশ থেকে বিদায় করে দিতে পারব। আর কেউ যদি দেশ ছেড়ে যেতে না চায় তাহলে তার আশ্রয় হবে কারাগারে।

 

শাহ এ ধরনের দম্ভোক্তির জন্য সাহস পেয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। মার্কিন সরকার শাহকে তার ইসলাম বিদ্বেষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছিল। শাহ ধরেই নিয়েছিল যে, মার্কিন ষড়যন্ত্রের কাছে জনগণের আন্দোলন পরাস্ত হবে এবং তিনি আজীবন তার অন্যায়-অপকর্ম চালিয়ে যেতে পারবেন।
ইমাম খোমেনী (রহ:)-র অনুপস্থিতিতে ইরানে শাহ বিরোধী কয়েকটি গেরিলা সংগঠন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। গেরিলা আন্দোলনে ইসলামপন্থীদের বাইরে অন্যান্য মতবাদের অনুসারীরাও যোগ দিয়েছিল। কিন্তু এসব গেরিলা সংগঠন খুব একটা সফল হতে পারেনি। ইমাম খোমেনী (রহ:)সহ ইরানের অধিকাংশ ধর্মীয় নেতাই মনে করতেন, বিপ্লব সফল করার জন্য প্রথমে মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। আর এ লক্ষ্যে তারা ইসলামী শিক্ষা প্রচার এবং শাহের অন্যায়-অপকর্ম ও দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করে দিতে থাকেন। অবশ্য এ কাজটিও খুব সহজ ছিলনা। কারণ সে সময় শাহের বিরোধিতা করলেই তাকে গ্রেফতার করা হতো। কোন আলেম, শাহের জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বললে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াবার আহ্বান জানালে তার উপর অসহনীয় নির্যাতন চালানো হতো এবং নির্বাসনে পাঠানো হতো।

 

সে সময় পরিস্থিতি এতটাই শ্বাসরুদ্ধকর ছিল যে, ইমাম খোমেনী (রহ:)-র প্রতি সমর্থন ঘোষণার কারণে ১৯৭০ সালে ইরানের শীর্ষ স্থানীয় আলেম আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোহাম্মদ রেজা সায়িদীকে গ্রেফতার করে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। ১৯৭৪ সালে একই কারণে অপর আলেম আয়াতুল্লাহ গাফ্ফারিকে গ্রেফতার ও হত্যা করা হয়। এরপর ১৯৭৬ সালের জুন মাসে ইরানের মুসলিম চিন্তাবিদ ড: আলী শারিয়াতি সন্দেহজনক ভাবে মৃত্যুবরণ করেন। মুসলিম ছাত্র সমাজের উপর ড: আলী শারিয়াতির ব্যাপক প্রভাব ছিল এবং মনে করা হয়, শাহের অনুচরদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। এতসব প্রতিবন্ধকতার পরও ইরানের আলেমগণ ও ন্যায়কামীরা জনগণকে সচেতন করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখেন। তারা শাহের জুলুম-নির্যাতন, ভোগ-বিলাসিতা, ইসলাম বিদ্বেষ, দুর্নীতি, মার্কিন ও ইহুদিবাদ প্রীতি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে থাকেন।

 

ইসলামী বিপ্লব সফল হবার কয়েক বছর আগে বিশ্বে জ্বালানী তেলের দাম হঠাৎ করে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের অকুন্ঠ সমর্থনের কারণে ইরানের শাহ আরও বেশি দাম্ভিক হয়ে ওঠে। সে সময় ইরানের শাহ সরকার, গোটা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণ করার দায়িত্ব পালন করতো। তবে তার প্রশাসনে দুর্নীতি ও বৈষম্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।

 

৩য় পর্ব

পাঠক! ধারাবাহিক আয়োজন বিপ্লবের দিনগুলি-র গত আসরগুলোতে আমরা ১৯৬৩ সালের জুন মাসে শাহ বিরোধী মিছিলে নৃশংস হামলায় হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং ইমাম খোমেনী (রহঃ)-কে নির্বাসনে প্রেরণ ও তার অনুপস্থিতিতে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনাবলী নিয়ে আলোচনা করেছি। ১৯৬৪ সালের চৌঠা নভেম্বর ইমামের নির্বাসিত জীবনের সূচনা হবার পর ইরানে স্বৈর শাসন বিরোধী আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে এলেও বিপ্লবের প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়নি। ইমাম খোমেনী (রহঃ) নির্বাসনে থেকেই ইরানিদেরকে বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন।এ সময় তিনি তার প্রিয় সন্তানকে হারান। আজকের আসরে আমরা এসব বিষয় নিয়েই আলোচনা করব।



ইমাম খোমেনী (রহঃ) বিদেশে অবস্থান করলেও তিনি সব সময় ইরানি জনগণকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত করার চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। নির্বাসনে থেকেও তিনি শাহের অন্যায়-অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন। ইমাম খোমেনীর পাশাপাশি ইরানে অবস্থানকারী তার সহযোগীরাও জনগণকে সজাগ ও সচেতন করে তোলার ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন। এর মধ্য দিয়েই ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত হতে থাকে।এমনি এক পরিস্থিতিতে ১৯৭৭ সালের ২৩ শে অক্টোবর ইমাম খোমেনী (রহঃ)-র জেষ্ঠ পুত্র আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোস্তফা খোমেনী ৪৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ইমামের এই সন্তানের মৃত্যুর পেছনে ইরানের শাহ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী এবং ইরাকের বাথ সরকারের হাত ছিল বলে সবাই বিশ্বাস করেন। তাদের সম্পৃক্ততার ব্যাপারে কিছু তথ্য-প্রমাণও রয়েছে।

 

ইমাম খোমেনী (রহঃ)-র জেষ্ঠ পুত্র আয়াতুল্লাহ মোস্তফা খোমেনী একজন আদর্শ মানুষ ছিলেন। তিনিও তার পিতার মতোই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ইরানের স্বৈরাচারী শাহ সরকারের বিরোধিতা করার কারণেই আয়াতুল্লাহ মোস্তফা খোমেনীকেও গ্রেফতার করে তুরস্কে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। ইমাম খোমেনী (রহঃ)-কে নির্বাসনে পাঠানোর কিছু দিন পরই এই ঘটনা ঘটে। এরপর মোস্তফা খোমেনীকেও তার পিতার সাথে ইরাকে পাঠানো হয়। ইরাকে পৌছে তিনি তার পিতা ইমাম খোমেনী (রহঃ) এবং সেখানকার বিখ্যাত আলেমদের কাছ থেকে আরও উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণে মনোনিবেশ করেন। সাইয়্যেদ মোস্তফা খোমেনী সব সময় তার পিতার সহযোগী ও উপদেষ্টা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন।
ইরানের শাহ সরকার ভেবেছিল পুত্রের মৃত্যুর ফলে ইমাম খোমেনী (রহঃ) অত্যন্ত ভেঙ্গে পড়বেন এবং সত্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে সরে যাবেন। কিন্তু শাহ সরকারের সেই আশা পূর্ণ হয়নি। ইমাম খোমেনী তার সন্তানের মৃত্যুতে অত্যন্ত কষ্ট পেলেও আন্দোলন অব্যাহত রাখার ব্যাপারে তিনি ছিলেন দৃঢ়সংকল্প। এ ব্যাপারে তার অবস্থানে বিন্দু পরিমাণ ছেদ পড়েনি। সন্তানের শাহাদাতের পর তিনি এক ভাষণে স্বৈরাচারী শাহের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী ভাষণ দেন এবং ইরানি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

 

ইমাম খোমেনী (রহঃ)-র জেষ্ঠ পুত্রের সন্দেহজনক মৃত্যুর খবরকে শাহ সরকার সেন্সর করলেও বিভিন্ন মাধ্যমে তা জনগণের কাছে পৌছে যায় এবং জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। আয়াতুল্লাহ মোস্তফা খোমেনীর স্মরণে ইরানে বিশেষ অনুষ্ঠান উদযাপন করা হয় এবং প্রায় তের বছর পর এই প্রথম প্রকাশ্যে জনসমাবেশে ইমাম খোমেনীর নাম উচ্চারিত হয়। এর প্রায় তিন মাস পর ইরানে শাহের অনুগত একটি পত্রিকায় ইমাম খোমেনী (রহঃ)-র প্রতি কটূক্তি করে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৯৭৮ সালের ৯ই জানুয়ারি শাহের সরাসরি নির্দেশে এত্তেলাত পত্রিকায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়।

প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবার পরপরই জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমে এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবার পরের দিন অর্থাৎ ১০ই জানুয়ারি এর প্রতিবাদে কোমের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মঘট পালিত হয় এবং ছাত্ররা বিক্ষোভে অংশ নেয়। ১১ ই জানুয়ারি ছাত্রদের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে কোমের সাধারণ মানুষও বিক্ষোভে ব্যাপক ভাবে অংশ নেয়। ফলে কোম শহর বিক্ষোভের নগরীতে পরিণত হয়।

 

অতীতের মতোই বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। হতাহত হয় বহু মানুষ। বিক্ষোভকারীদের উপর ভয়াবহ এই হামলার পর বাহ্যত ঐ আন্দোলনটি স্তিমিত হলেও সবার কাছে এটা স্পষ্ট হয় যে, সচেতন ইরানিরা শাহের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য সব সময় প্রস্তুত রয়েছে। কোমে অনুষ্ঠিত ঐ বিক্ষোভের পর এ বিষয়টিও স্পষ্ট হয় যে, ইরানিরা ১৩ বছর ধরে ইমাম খোমেনীর অনুপস্থিতির পরও তাকেই নিজেদের নেতা বলে মনে করে এবং ইমামের অবমাননাকে তারা কোন ভাবেই মেনে নেবে না। ইরানের শাহ সরকার ও সহযোগী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভাবতেও পারেনি যে, রাষ্ট্রীয় ভাবে ব্যাপক অপপ্রচারণার পরও ইরানি জনগণ তাদের ধর্ম এবং ধর্মীয় নেতাকে এত বেশী ভালোবাসেন। এরপরও স্বৈরাচারী শাহ সরকার এই ভেবে স্বস্তি অনুভব করছিল যে, কোমের আন্দোলন থেমে গেছে এবং নতুন করে এ ধরনের ঘটনার পুণরাবৃত্তি আর সম্ভব নয়। কিন্তু ঐ ঘটনার চল্লিশতম দিবসে শহীদদের স্মরণে ইরানের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তাব্রিজে বিপ্লবী আলেম আয়াতুল্লাহ কাজী তাবাতাবায়ির আহ্বানে চেহলামের অনুষ্ঠানে শাহের নিরাপত্তা বাহিনী হামলা চালায়। এতে বেশ কয়েক জন হতাহত হয়। আর এই ঘটনার পর গোটা তাব্রিজের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং রাস্তায় নেমে শাহ বিরোধী বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকে। এ অবস্থায় শাহের সেনাবাহিনী ট্যাংক ও সাজোয়া যান মোতায়েন করে এবং বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক হামলা চালায়। সেনাবাহিনীর হামলায় বহু লোক শাহাদাৎবরণ করেন এবং শত শত মানুষ মারাত্বক আহত হয়। তাব্রিজের ঐ গণজাগরণের পর তখনি সবাই এটা উপলব্ধি করতে থাকে যে, ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে এবং শাহের বিরুদ্ধে বিপ্লব সফল হবে।

 

ইমাম খোমেনী (রহঃ) সে সময় ইরাকে নির্বাসনে ছিলেন এবং তিনি সেখান থেকেই গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি তাব্রিজের রক্তক্ষয়ী ঘটনা পর্যবেক্ষণের পর ইরানি জনগণের প্রতি এক শোক বার্তায় বলেন, শাহের এটা জানা উচিত যে, ইরানিরা তাদের পথ খোজেঁ পেয়েছে এবং অপরাধীদেরকে পর্যবসিত করে প্রতিশোধ না নেয়া পর্যন্ত তারা থামবেনা। আল্লাহর ইচ্ছায় গোটা ইরানের মানুষ শাহ সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠেছে ও এই প্রতিবাদ আরও জোরালো হবে এবং স্বৈরাচারী শাহের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য সম্মানিত আলেমদের মাধ্যমে ইসলামের পতাকা উত্তোলিত হবে।

ইমাম খোমেনী (রহঃ) এরপর ঐ বছর ফার্সি নববর্ষ উপলক্ষ্যে আবারও কোম ও তাব্রিজের শহীদদের আত্মদানের কথা ইরানীদের স্মরণ করিয়ে দেন। সে বছর ইরানিরা নববর্ষের আনন্দে ডুবে না গিয়ে বিপ্লব সফল করার উপায় নিয়ে ভাবতে থাকেন এবং নিজেদের মধ্যে ঐক্য অটুট রাখার লক্ষ্যে কাজ করে যেতে থাকেন। আর এভাবেই বিপ্লবের পথে অগ্রযাত্রা ত্বরান্নিত হয়।

 

৪র্থ পর্ব

পাঠক! ধারাবাহিক আয়োজন বিপ্লবের দিনগুলি-র গত আসরে আমরা বলেছি ইরানের পত্রিকায় ইমাম খোমেনী (রহঃ)-কে অবমাননা করে প্রবন্ধ প্রকাশিত হবার পর দেশের বিভিন্ন শহরে বিশেষকরে কোম ও তাব্রিজে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। কোমের বিক্ষোভে শাহের বাহিনীর হামলায় বেশ কয়েক জন শাহাদাৎবরণ করে। কোমের শহীদদের চেহলাম উপলক্ষ্যে তাব্রিজ শহরে আয়োজিত শোকানুষ্ঠানেও নৃশংস হামলা চালানো হয়। কোমের শহীদদের স্মরণ করতে শহীদ হন তাব্রিজের জনতা। এরপর ১৯৭৮ সালের মার্চ মাসের শেষ ভাগে গোটা ইরানে তাব্রিজের শহীদদের স্মরণে শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তাল হয়ে ওঠে। হ্যাঁ, আজকের আসরে আমরা সেই উত্তাল দিনগুলি নিয়েই আলোচনা করবো।

 

১৯৭৮ সালের ২৯ শে মার্চ। পরিস্থিতি তখনও থমথমে। মানুষ শাহের ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ। কোমের বিক্ষোভে গুলির পর তাব্রিজের শোকানুষ্ঠানে নৃশংস হামলা; মানুষের ধৈর্যের বাধ যেন ভেঙ্গে যাচ্ছিল। তাব্রিজের শহীদদের স্মরণে শোকানুষ্ঠান শেষ করেই ক্ষুব্ধ জনতা দলে দলে রাস্তায় নেমে আসে। তারা প্রকাশ্যে শাহের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্লোগান দেয়। হত্যাকান্ডের পুণরাবৃত্তির ব্যাপারে মানুষরূপী হায়েনাদের সতর্ক করে দেয়া হয়।

 

২৯ শে মার্চ কোন অঘটন না ঘটলেও ৩০ শে মার্চ ইরানের আরেক শহর ইয়াযদের রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়। ইমাম খোমেনী (রহঃ)-র ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বিখ্যাত আলেম আয়াতুল্লাহ সাদুকি ইমামের মুক্তির দাবিতে ইয়াযদ জামে মসজিদে এক সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন। সমাবেশ শেষে উপস্থিত জনতা রাস্তায় শাহের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেয়। সেদিনের বিক্ষোভও শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হতে দেয়নি শাহের বাহিনী। বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। ঐ হামলায় ১৫ জন বিক্ষোভকারী শহীদ এবং আরও অনেকে আহত হন। কিন্তু সেদিন শাহের বাহিনী গুলি চালিয়েও বিক্ষোভ বন্ধ করতে পারেনি। ঐ বিক্ষোভ টানা তিনদিন অব্যাহত ছিল। শাহের নির্যাতন যত বাড়ছিল আন্দোলনও ততটাই বেগবান হচ্ছিল।

 

ইসলামী বিপ্লবের সেই দিনগুলির ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শহীদদের স্মরণে আয়োজিত শোকানুষ্ঠানগুলো ইসলামী বিপ্লবকে সফল করার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন মুসলিম দেশের মতো ইরানেও কেউ মারা গেলে এর তৃতীয়,সপ্তম ও চল্লিশতম দিবসে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবসহ শুভানুধ্যায়ীরা অংশ নেন এবং মরহুমের পরকালীন শান্তির জন্য দোয়া করেন। ইরানে বিপ্লবের দিনগুলিতে স্বৈরাচারী শাহের বাহিনীর হাতে শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন দিবসে যেসব অনুষ্ঠান হতো,তাতে মানুষের ব্যাপক সমাবেশ ঘটতো। কোন কোন শহীদের স্মরণে ইরানের প্রায় সকল শহরে শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এর প্রধাণ কারণ হলো, শহীদদের প্রতি জনগণের গভীর শ্রদ্ধাবোধ। সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা জীবনদান করেন,ইরানীরা তাদেরকে অতি আপনজন বলে মনে করে। শহীদদের স্মরণকে তারা অপরিহার্য বলে বিশ্বাস করেন। কাজেই শাহ প্রতিটি হত্যার মাধ্যমে নিজেরই পতন ডেকে আনছিলেন। একেকটি শাহাদাতের ঘটনা অন্তত তিনটি শোক সমাবেশের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতো। শহীদদের স্মরণে তৃতীয়,সপ্তম ও চল্লিশতম দিবসে যেসব অনুষ্ঠান হতো, তার প্রত্যেকটিতে স্বাভাবিক ভাবেই স্বৈরাচারী শাহের বিরুদ্ধে কথাবার্তা হতো এবং বিপ্লবী আন্দোলন নতুন মাত্রা পেত। শহীদদের রক্ত যাতে বৃথা না যায়, সে ব্যাপারে ইরানীরা শপথ নিতো। ইরনের সমকালীন ইতিহাস সম্পর্কে পাশ্চাত্যের লেখক জন ফুরান একটি বই লিখেছেন। 'কঠোর প্রতিরোধ' নামক ঐ বইয়ে তিনি বিপ্লব সফল করার ক্ষেত্রে চেহলাম অনুষ্ঠানের ভূমিকা সম্পর্কে লিখেছেন, শাহ সরকার চেহলাম উপলক্ষ্যে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশগুলোর বিষয়ে আগে থেকে ভাবতেও পারেনি। ইরানে কেউ শহীদ হলে তাদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শাহাদাতের চল্লিশতম দিবসে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ১৯৭৮ সালের ৯ই জানুয়ারি কোম শহরে যারা শহীদ হয়েছিল তাদের স্মরণে ১৮ই ফেব্রুয়ারি তাব্রিজ,কোম, মাশহাদ এবং আরও নয়টি শহরে চেহলামের আয়োজন করা হয়। পুলিশ তাব্রিজের অনুষ্ঠানে সেদিন এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে। এরপরই ক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে আসে। তাদের উপরও হামলা চালানো হয়। ঐ ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারায়। তাব্রিজের শহীদদের চেহলাম দিবসে ৫৫ টি শহরে পুলিশের সাথে জনতার সংঘর্ষ হয়।

 

ইরানের জনগণের মাঝে প্রথম দিকে যে ভীতি কাজ করছিল ক্রমান্নয়ে তা দূরীভুত হয় এবং শাহের দমন-পীড়ন আন্দোলনে সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ততাকে আরও বেশি জোরদার করে। আর এর মাঝে নির্বাসনে থেকেই ইমাম খোমেনী (রহঃ) নিয়মিত দিক-নির্দেশনামূলক বাণী পাঠাতে থাকেন। ইমামের বক্তব্যে বারবারই আশাবাদ ফুটে ওঠত। তার আশাবাদ থেকে জনগণ শক্তি ও সাহস সঞ্চয় করতেন। ইমাম খোমেনী (রহঃ) সব সময় ঐক্য বজায় রেখে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এর ফলে মানুষ ঐক্যবদ্ধ ভাবে তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখে এবং পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে।

 

এর কয়েক মাস আগেও ইরানে ভালো কোন বিশেষণ যোগ না করে শাহের নাম উচ্চারণ করলে বা তার সামান্যতম সমালোচনা করা হলে কঠোর শাস্তি পেতে হতো। শুধু শাহ নয় তার পরিবারের কারো সমালোচনা করা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু আন্দোলন বেগবান হবার সাথে সাথে সেসব নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাও লোপ পায়। ইরানের জনগণ তাদের নিজস্ব মত-পার্থক্য ভুলে ইমাম খোমেনী (রহঃ)-র নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পেরেছিলেন বলেই আজ স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ পেয়েছেন এবং স্বাধীন ভাবে মত প্রকাশ করতে পারছেন।

 

৫ম পর্ব

 

পাঠক! গত আসরে আমরা বলেছি, ইরানের স্বৈরশাসক শাহের বাহিনীর হাতে সে সময় যারা শহীদ হতো, তাদের স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো এবং অংশগ্রহণকারীরা শাহ বিরোধী আন্দোলনকে আরও বেগবান করার শপথ গ্রহণ করতো। এর ফলে আন্দোলন ক্রমেই আরও জোরদার হতে থাকে। এক পর্যায়ে গোটা ইরান বিক্ষোভের দেশে পরিণত হয়।
পরিস্থিতি ক্রমেই প্রতিকূল হতে দেখে স্বৈরাচারী শাহ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। শাহের সেনারা বিপ্লবীদের অবস্থান দুর্বল করার জন্য চেষ্টা জোরদার করে। ইরানের শাসক মোহাম্মদ রেজা শাহ ১৯৭৮ সালের ১৮ই আগস্ট এক সাক্ষাতকারে তার ভীত-সন্ত্রস্ত হবার বিষয়টি স্পষ্ট করেছিলেন। আজকের আসরে আমরা এসব বিষয়েই আরও বিস্তারিত আলোচনা করব।

১৯৭৮ সালের আগস্ট মাস। বিপ্লবী আন্দোলন জোরদার হতে দেখে স্বৈরাচারী শাহ সরকার দিশেহারা। তাদের একটাই চিন্তা,কিভাবে বিপ্লবী মুসলমানদের কাবু করা যায়। এ অবস্থায় শাহ এক ঘৃণ্য পন্থা বেছে নেয়। বিপ্লবীদের সুনাম ক্ষুন্ন করার লক্ষ্যে অনুচরদের সাহায্যে আবাদানের রেক্স সিনেমাহলে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। সিনেমাহলটি তখন দর্শকে পরিপূর্ণ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুনের লেলিহান শিখায় নারী ও শিশুসহ তিন শতাধিক মানুষের করুণ মৃত্য ঘটে। সিনেমাহলে আগুন দেয়ার ঘটনায় সেদিন নারী ও শিশুসহ মোট ৩৭৭ জনের মৃত্য হয়েছিল। এছাড়া আহত হয় আরও অনেকে। অগ্নিকান্ডের পরপরই শাহ নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলো, বিপ্লবীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে প্রচার শুরু করে। তারা বলতে থাকে, ইসলামপন্থীরা শিল্প ও সিনেমার বিরোধী। একারণেই তারা এখানে আগুন দিয়েছে। কিন্তু সৌভাগ্যের বিষয় হলো, শাহ ও তার প্রচার মাধ্যমের সে কথা মানুষ বিশ্বাস করেনি।  

ঐ ঘটনার পর ইমাম খোমেনী (রহঃ) এক বাণীতে বলেছিলেন, কোন মুসলমান এমনকি কোন মানুষ এ ধরনের নৃশংসকান্ড ঘটাতে পারে বলে আমার মনে হয় না। এ কাজ তাদেরই যারা নৃশংসতা ও পাশবিকতার মাধ্যমে নিজেদের মনুষত্বকে ধ্বংস করেছে। তিনি সিনেমাহলে আগুন দেয়ার জন্য শাহকে দায়ি করে বলেন, ইসলাম বিরোধী এই অমানবিক কাজ বিপ্লবীরা করতে পারেনা কারণ তারা ইসলাম ও ইরানের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ। ইরানে ইসলামী বিপ্লব সফল হবার পর পরিচালিত এক তদন্তের মাধ্যমেও সিনেমা হলে আগুন দেয়ার ঘটনায় শাহ ও তার অনুচরদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে।
আবাদানের রেক্স সিনেমাহলে আগুন দেয়ার পরও শাহ বিরোধী আন্দোলন পুরোদমে অব্যাহত থাকে। এক পর্যায়ে শাহের প্রধানমন্ত্রী জামশিদ অমুযেগার পদত্যাগ করেন এবং জাফর শরীফ ইমামি তার স্থলাভিষিক্ত হন। জনগণকে ধোকা দেয়ার জন্যেই মূলত শাহ, প্রধানমন্ত্রী পদে রদবদল করেন। এর মাধ্যমে তারা জনগণকে বোঝাতে চেয়েছিল যে, শাহের নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

 

নয়া প্রধানমন্ত্রীও জনগণকে সন্তুষ্ট করার জন্য এবং শাহ বিরোধী আন্দোলনকে স্তিমিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। তিনি ইরানে হিজরী তারিখ পুণরায় চালু করেন। উল্লেখ্য, এর আড়াই বছর আগে শাহ, ইসলাম বিরোধী এক নির্দেশে শাহী তারিখ চালু করেছিলেন। এর ফলে গোটা ইরানের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। নয়া প্রধানমন্ত্রী হিজরী তারিখ পুণরায় চালুর পাশাপাশি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার এবং সাধারণ মানুষের আতংক সাভাক সংগঠন বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ অবস্থায় ইমাম খোমেনী,শাহের চালবাজি উপলব্ধি করতে পেরে জনগণকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।



ইরানের জনগণও নয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রতারণা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। তারা শাহ মনোনীত নয়া প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থা না রেখে ১৯৭৮ সালের চৌঠা সেপ্টেম্বর ঈদুল ফিতরের দিন বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেয়। এদিন সারা ইরানের লাখ লাখ জনতা ঈদুল ফিতরের নামাজ শেষে স্বৈরাচারী শাহ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্লোগান দেয়। সেদিন রাজধানী তেহরানে বিশিষ্ট বিপ্লবী আলেম আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ মুফাত্তাহ-র ইমামতিতে অনুষ্ঠিত ঈদের জামাতেও লাখ লাখ মানুষ অংশ নেয়। নামাজ শেষে অপর সংগ্রামী আলেম হুজ্জাতুল ইসলাম ড: মোহাম্মদ জাওয়াদ বহুনার দেশের বাস্তব পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরেন। আর এর পরই সবাই রাস্তায় নেমে শাহ বিরোধী শ্লোগান দিতে থাকে এবং হযরত ইমাম খোমেনী (রহঃ)-র প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে। তেহরানে লাখ জনতার এই বিক্ষোভের খবর গোটা বিশ্বের গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হয়।

 

এর তিন দিন পর ১৯৭৮ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর আলেমদের আহ্বানে তেহরানে এক মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ থেকে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়। বিপ্লবী জনতা পরের দিনও বিক্ষোভ মিছিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাজতন্ত্র বিলুপ্তির দাবি উত্থাপিত হওয়ায় শাহ ও তার সহযোগীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারে যে, নয়া প্রধানমন্ত্রীর গণপ্রতারণামূলক তৎপরতায় কোন কাজ হয়নি। এ কারণে শাহ বিপ্লবীদের সাথে আরও বেশি নৃশংস আচরণের নির্দেশ দেয়। এর পরের দিনই ইরানের ইতিহাসে এক কলংকজনক অধ্যায়ের সংযোজন ঘটে।

১৯৭৮ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর। শাহের বাহিনী রাজধানী তেহরান, কোম, ইস্ফাহান, শিরাজ, তাব্রিজ ও মাশহাদসহ ১২ টি শহরে সামরিক শাসন জারি করেছে। তেহরানের রাস্তায় রাস্তায় ট্যাংক ও সাজোয়া যান মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু এসব কিছুকেই তোয়াক্কা করছেনা মানুষ। হুমকি ও ভয়-ভীতিকে উপেক্ষা করে শাহের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিতে হাজার হাজার মানুষ স্কোয়ারগুলোতে সমবেত হচ্ছে। কিন্তু শাহের অনুগত মানুষরুপী হায়েনারা এ দৃশ্য বেশিক্ষণ সহ্য করে নি। তারা নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। একদিকে ট্যাংক আর অন্যদিকে জঙ্গী বিমানের হামলায় হাজার হাজার বিপ্লবীর বুক ঝাযরা হয়। আহত হয় আরও বহু মানুষ। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করা এই হামলার লক্ষ্য ছিলনা বরং তারা সবচেয়ে বেশী সংখ্যক মানুষকে হত্যা করতে চেয়েছিল। শাহ সরকার ভেবেছিল,এই গণহত্যার পর আর কেউ কোন দিন রাজতন্ত্রকে বিলুপ্ত করার কথা মুখে আনবে না।
কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ঐ হত্যাকান্ডের পর বিপ্লবী আন্দোলন আরও গতিময় হয়ে ওঠে। ইমাম খোমেনী (রহঃ) পাশবিক হামলার পর এক শোকবাণীতে বলেন, শাহ নিরস্ত্র ইরানি জাতির উপর প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছে। একারণে ঘৃণ্য ঘটনা সাজিয়ে ইরানিদের উপর অস্ত্র চালাচ্ছে এবং শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। কিন্তু ইরানের মজলুম জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন। তিনি তার বাণীতে আবারও ইরানের সেনাবাহিনীকে জনগণের কাতারে শামিল হবার আহ্বান জানান। একই সাথে সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে জনগণকে অনুপ্রেরণা প্রদান করেন।

 

তেহরানে সেদিন যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল, মানবাধিকারের দাবিদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিবাদ না জানিয়ে বরং শাহের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ঐ ঘটনার কয়েক দিন পর নিজে চিঠি লিখে শাহের অমানবিক কর্মকান্ডের প্রতি সমর্থন জানান। এছাড়া, মার্কিন প্রেসিডেন্টের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রেযিনেস্কি, শাহকে টেলিফোন করে বলেছিলেন, আপনি যাই করুন না কেন আপনার প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। ইরান সে সময় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে গণ্য হতো এবং শাহের সকল অপকর্মের প্রতি হোয়াইট হাউজের সমর্থন ছিল। এ কারণে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সফল হবার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে নয়া সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং এখনও ঐ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

 

৬ষ্ঠ পর্ব

পাঠক! গত আসরে আমরা বলেছি, ১৯৭৮ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর স্বৈরাচারী শাহের বাহিনী রাজধানী তেহরানে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। এতে হাজার হাজার ইরানী শাহাদাৎবরণ করেন। কিন্তু এরপরও বিপ্লবীদের মনোবলে কোন ভাটা পড়েনি বরং শাহের ধারনার বিপরীতে বিপ্লবীরা আরও বেশি আগ্রহ ও দৃঢ়তা নিয়ে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যান। এক পর্যায়ে এসে আন্দোলন দমনের উপায় নিয়ে শাহ ও মার্কিন সরকারের মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। আজকের আসরে আমরা এসব বিষয়েই বিস্তারিত আলোচনা করব।

 

১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ হয় নতুন মাত্রা। দেশের বিভিন্ন সেক্টরে ধর্মঘট শুরু হয়। ৯ই সেপ্টেম্বর ইরানের সর্ববৃহৎ তেল শোধনাগারের কর্মচারী ও শ্রমিকরা ধর্মঘট শুরু করে। এর পরপরই দেশের অন্যান্য শহরের তেল স্থাপনাগুলোতেও ধর্মঘট শুরু হয়। এর ফলে কার্যত তেল উত্তোলন ও রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়।
তেল স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং সরকারী প্রতিষ্ঠানেও ধর্মঘট শুরু হয়। ইমাম খোমেনী (রহঃ) এক বার্তায় শ্রমিক-কর্মচারীদের ধর্মঘট বিশেষকরে তেল শিল্পে ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন এবং ধর্মঘটকারীদের ক্ষতি যতটুকু সম্ভব পুষিয়ে দিতে সাধারণ জনগণ ও আলেম-ওলামাদের প্রতি আহ্বান জানান। সরকারী অফিস, ব্যাংক, কারখানা এমনকি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েও ধর্মঘট চলতে থাকে। তবে শাহ তার প্রধান আয়ের উৎস তেল শিল্পে ধর্মঘটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয় । তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গোটা বিশ্বেই এর প্রভাব পড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি গোটা বিশ্বই এটা উপলব্ধি করতে পারে যে, ইরানে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শাহের পতনের আগ পর্যন্ত তেল শিল্পে ধর্মঘট অব্যাহত ছিল।

 

সে সময় আরেকটি মজার ঘটনা ঘটানো হতো। সেটি হলো, বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতি রাতের একটা নির্দ্দিষ্ট সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিতেন যাতে বিপ্লবীরা বিক্ষোভ করতে পারেন। বিদ্যুৎ চলে গেলে বিপ্লবীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতো এবং বাসার ছাদ থেকে শাহ বিরোধী বিভিন্ন শ্লোগান দিতো। এ অবস্থায় শাহ ও তার সহযোগীরা আরও এক নারকীয় তান্ডবের জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে।

১৯৭৮ সালের ১৬ই অক্টোবর। তেহরানে ৮ই সেপ্টেম্বরের গণহত্যার চেহলাম উপলক্ষ্যে কেরমান শহরের জামে মসজিদে ২০ হাজার মুসল্লী সমবেত হয়। অনুষ্ঠানের মাঝখানে হঠাৎ চিৎকার-চেচামেচি শোনা গেল। বেশ কিছু ব্যক্তি চাকুসহ হাতে তৈরী ধারালো অস্ত্র দিয়ে একের পর এক মানুষ খুন করছে। মসজিদের মেঝে রক্তে ভিজে যায়। এরপর এসব ব্যক্তি মসজিদে আগুন লাগিয়ে চলে যায়। সেদিন শাহের পুলিশ বাহিনী সাদা পোশাকে নারকীয় এই তান্ডব চালিয়েছিল। বিষয়টি সবাই উপলব্ধি করতে পারে। ইমাম খোমেনী (রহঃ) এক শোকবার্তায় ঐ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান।
এর ক'দিন পরই শাহের জন্মবার্ষিকী পালিত হয়। মোহাম্মদ রেজা শাহের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মতো শক্তিধর দেশগুলো তার কাছে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠায় এবং শাহের প্রতি তাদের সমর্থন পুণরায় ঘোষণা করে। অন্যদিকে, ইমাম খোমেনী (রহঃ) শাহের জন্মদিনকে শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন।

 

ইরানে যখন আন্দোলন তুঙ্গে তখন ইরাকের বাথ সরকার নাজাফে নির্বাসিত ইমাম খোমেনী (রহঃ)-র আবাসস্থল অবরোধ করে। ইমাম খোমেনী (রহঃ) কে আন্দোলন থেকে দূরে রাখার এটিও ছিল একটি পন্থা। ইরানের শাহ ও ইরাকের বাথ পার্টির সরকারের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শাহ চাচ্ছিল ইমাম খোমেনীর রাজনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধ করতে। আর অন্যদিকে ইরাকি জনগণের উপর ইমামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রভাব পড়তে পারে, সে আশংকায় বাগদাদ উদ্বেগের মধ্যে ছিল। কাজেই তারা ইরাকে ইমামের উপস্থিতিকে নিজেদের জন্য নিরাপদ বলে মনে করছিলনা। এ পরিস্থিতিতে ইমাম খোমেনী (রহঃ) ইরাকের পবিত্র নাজাফ শহর ছেড়ে কুয়েতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু ইরানের শাহ ও মার্কিন সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে কুয়েত সরকারও ইমামকে গ্রহণ করতে রাজী হয়নি।

 

এরপর সবাই ভেবেছিল ইমাম হয়ত অপর কোন মুসলিম দেশকে বেছে নেবেন। কিন্তু না। দেখা গেল তিনি অপ্রত্যাশিত ভাবে ফ্রান্সে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৯৭৮ সালের ৭ই অক্টোবর তিনি ফ্রান্সে যান। ইরানের শাহী সরকার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ খবর শুনে বেশ খুশীই হয়েছিল। তারা ভেবেছিল পাশ্চাত্যের দেশে ইমাম কোনঠাসা হয়ে পড়বেন এবং ইরানের জনগণের সাথে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাস এর উল্টো কথাই বলে। ইমাম খোমেনী (রহঃ) ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে পৌছার কয়েক দিন পরই সেখানকার নুফেল লুশাতু গ্রামে যান। ইরানের শাহের প্রতি ফরাসী সরকারেরও সমর্থন ছিল। একারণে ফ্রান্স সরকার ইমামের সাথে সাংবাদিকদের যোগাযোগ ও জামাতে নামাজের উপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল। কিন্তু ব্যাপক সংখ্যক সাংবাদিক ও ভক্তের চাপের কারণে শেষ পর্যন্ত সে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকেনি। ইমামের উপস্থিতির চার মাসের মধ্যে প্যারিসের অদূরবর্তী নুফেল লুশাতু গ্রামটি বিশ্বের গণমাধ্যমে একটি পরিচিত গ্রামে পরিণত হয় এবং সেখান থেকেই ইমাম খোমেনী, ইরানের শাহের অন্যায় ও অপরাধ ফাঁস করতে থাকেন।

 

এ সময় ইরানে নয়া প্রধানমন্ত্রী শরীফ ইমামী, শাহকে টিকিয়ে রাখার জন্য লোক দেখানো কিছু গণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সে নিজেকে দল-নিরপেক্ষ হিসেবে ঘোষণা করে। এক পর্যায়ে ১৯৭৮ সালের ২৪ শে সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে শাহের গঠিত রাস্তখিয দলকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। শাহ যে নিকৃষ্টতম স্বৈরশাসক ছিল,তার একটি বড় উদাহরণ হলো এই রাস্তখিয পাটি। রাস্তখিয পার্টি গঠনের আগে ইরানে দুটি দলের অস্তিত্ব ছিল এবং উভয় দলই শাহের আনুগত্য পরিপূর্ণ ভাবে মেনেই নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতো। আনুগত্য বজায় রাখার পরও এই দল দুটির অস্তিত্বকে তিনি সহ্য করতে পারেননি। শাহ ঐ দল দুটি বিলুপ্ত করে রাস্তখিয নামের নতুন পার্টি গঠন করেন এবং সবাইকে তার দলে যোগ দেবার নির্দেশ দেন। তিনি ঐ দল গঠনের পর শাহ বলেছিলেন, রাস্তখিয দলে যারা যোগ দেবেনা তাদেরকে ইরান ছেড়ে চলে যেতে হবে অথবা কারাবরণ করতে হবে। এই দম্ভোক্তির সাড়ে তিন বছর পর জনগণের চাপের মুখে শাহের ইঙ্গিতেই এই দলটি বিলুপ্ত করা হয়।

 

এটি ছিল শাহের জন্য একটি বড় ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা ঢাকার জন্য শাহ টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে স্বীকার করেন যে, অতীতে অনেক ভুল হয়েছে। তবে এসব ভুলের জন্য তিনি তার অনুগত পূর্বের সরকারগুলোকে দায়ি করেন। এরপরই সাবেক প্রধানমন্ত্রী আমির আব্বাস হুবাইদা এবং গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা সাভাকের সাবেক প্রধান নাসিরীকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু ইরানি জনগণ শাহের এসব প্রতারণামূলক পদক্ষেপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় এবং অতীতের সকল কর্মকান্ডের জন্য শাহকে দায়ি করে তার পতনের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করে। পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিও জোরেসুরে উচ্চারিত হতে থাকে।

 

নয়া শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রথম থেকেই ইরানের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শাহ সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের দূর্গে পরিণত হয়। ছাত্ররা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমবেত হয়ে শাহের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। এর ফলে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে। বিপ্লবী আন্দোলনকে বেগবান করতে ছাত্রদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উপলব্ধি করার পর শাহের বাহিনী তা দমনের সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯৭৮ সালের চৌঠা নভেম্বর ছিল ইমাম খোমেনী (রহঃ)কে তুরস্কে নির্বাসনে পাঠানোর ১৮ তম বার্ষিকী। দিবসটি উপলক্ষ্যে ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এগোচ্ছিল। হঠাৎ গুলির শব্দ। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে লাশ হয় ৫৬ জন বিপ্লবী ছাত্র। আহত হয় আরও শত শত বিক্ষোভকারী। এরপর ছাত্রদের বিক্ষোভ আরও তুঙ্গে ওঠে। উপায়ান্তর না দেখে শাহের সরকার সকল স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে।

 

৭ম পর্ব

পাঠক! গত আসরে আমরা বলেছি, ১৯৭৮ সালের ২৪ শে সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে শাহের গঠিত রাস্তোখিয দলকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং ৭ই অক্টোবর ইমাম খোমেনী (রহঃ)  ফ্রান্সে যান। আজ আমরা ১৯৭৮ সালের চৌঠা নভেম্বরের রক্তাক্ত ঘটনা পরবর্তী উত্তাল পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করব।

স্বৈরাচারী শাহের বাহিনী ১৯৭৮ সালের চৌঠা নভেম্বর ছাত্র বিক্ষোভে গুলি চালিয়ে ৫৬ জনকে হত্যা করার পর আন্দোলন আরও তীব্রতর হয়। শাহ তার অতীত ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন থেকে তার বক্তব্য প্রচার করা হয়। ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি তিনি সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এর একদিন পরই ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার শ্লোগান নিয়ে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী শরীফ ইমামী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। শাহ, জেনারেল আযহারিকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেন। সেনা কর্মকর্তাদের হাতে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেয়ার মাধ্যমে শাহ আরও কঠোর হস্তে বিপ্লবী আন্দোলন দমনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু জনগণ তাতে ভয় পায়নি। তারা তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখে। এরই মাঝে একদিন শাহের নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভ দমনের জন্য পবিত্র মাশহাদ শহরে অবস্থিত বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-র বংশধর হযরত ইমাম রেজা (আঃ)-র মাজারে প্রবেশ করে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। ইমাম রেজা (আঃ)-র মাজার অবমাননার খবর সমগ্র ইরানে ছড়িয়ে পড়লে জনগণ আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

 

দেখতে দেখতে আবারও শোকাবহ মহররম মাস এসে হাজির হয়। মহররম মাস উপলক্ষ্যে ইমাম খোমেনী (রহঃ) ইরানিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠান। তিনি ঐ বার্তায় মহররম মাসে সংঘটিত কারবালার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, মহররম হচ্ছে তলোয়ারের বিরুদ্ধে রক্তের বিজয়ের মাস। তিনি শয়তানি শক্তির মোকাবেলায় নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। ইমাম খোমেনী (রহঃ) ইরানের স্বৈরাচারী শাহকে এজিদের সাথে তুলনা করে বলেন, মহররম হচ্ছে এজিদি শক্তির পরাজয়ের মাস। এই মাসে ঘাতক শাহের অন্যায়-অপকর্ম আরও বেশি বেশি তুলে ধরতে তিনি দেশের আলেম সমাজের প্রতি আহ্বান জানান। ইমামের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে মহররমের প্রথম দিন থেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শাহের অন্যায়-অপকর্ম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। প্রথম দিনই শাহের ঘাতক বাহিনীর হাতে কয়েক জন শাহাদাৎবরণ করেন। ইমাম খোমেনী (রহঃ) ঐ হত্যাকান্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেন, এসবের মাধ্যমে শাহ তার পতন ঠেকাতে পারবে না। তিনি ইরানি জনগণের উপর হামলা না চালাতে শাহের সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অত্যাচারী শাহের খেদমত না করার উপায় হিসেবে ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে যাওয়া এখন সেনা সদস্যদের ধর্মীয় দায়িত্ব।

 

১৯৭৮ সালের ১০ই ডিসেম্বর। ইমাম হোসেন (আঃ)-র শাহাদাৎবার্ষিকী বা আশুরার পূর্ব দিন। ইমাম হোসেন (আঃ)-র প্রতি ইরানিদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বিষয়টি উপলব্ধি করে শাহ দুই দিনের জন্য সামরিক আইন তুলে নেয়।
কিন্তু একি দেখছে শাহ। রাজধানী যে জনসমুদ্রে পরিণত হচ্ছে। জনসমুদ্রের সবার মুখে একই সুর। সবাই শাহের পতনের দাবি জানাচ্ছে। সেদিনের মিছিলে তেহরানের পয়ত্রিশ লক্ষাধিক মানুষ অংশ নিয়েছিল। এর পরের দিন অর্থাৎ এগারোই ডিসেম্বর ইমাম হোসেন (আঃ)-র শাহাদাৎবার্ষিকীর মিছিলে মানুষের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। ঐ দিন রাজধানী তেহরানে আশুরার শোক মিছিলে চল্লিশ লক্ষ মানুষ অংশ নেয়। সেদিনও একই ধ্বনি ওঠে; স্বৈরাচার নিপাত যাক, শাহের পতন চাই। মিছিল শেষে তেহরানের বিক্ষোভকারীরা শাহের পতন দাবি করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে।

 

সেদিনের বিক্ষোভের পর সবাই এটা বুঝতে পারে যে, শাহের পতন এখন শুধুই সময়ের ব্যাপার। রাজধানী তেহরানে আশুরার মিছিলে শাহের পুলিশ ও সেনাবাহিনী কোন প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি না করলেও বিভিন্ন মফস্বল শহরে হামলার ঘটনা ঘটে এবং বেশ কয়েক জন বিপ্লবী হতাহত হয়।
আশুরার মিছিলে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ও শাহের পতনের দাবিতে বিবৃতি প্রকাশিত হবার পর ইমাম খোমেনী (রহঃ) আশুরার মিছিলকে শাহের পতনের পক্ষে গণরায় হিসেবে ঘোষণা করেন। পাশাপাশি তিনি আবারও জনগণের পাশে দাড়াতে সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান। ইমাম খোমেনীর আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে সেনা সদস্যরা ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে যেতে শুরু করে এবং বিপ্লবীদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায়।

 

১৯৭৮ সালের ২৬ শে ডিসেম্বর। শাহের গার্ড বাহিনীর সদস্যরা সেদিন তেহরানে গুলি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কামরান নেজাতুল্লাহিকে হত্যা করে। তিনিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েক জন শিক্ষক তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও নিরপরাধ মানুষ হত্যার প্রতিবাদে তিন সপ্তাহ ধরে অবস্থান ধর্মঘট পালন করছিলেন। শ্রদ্ধেয় এ শিক্ষকের দাফন অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেয় এবং তা শাহ বিরোধী বিক্ষোভে রূপ লাভ করে। শাহের বাহিনী এখানেও গুলি চালায়। এক শহীদের জানাযায় এসে আরও বহু বিপ্লবীকে লাশ হয়ে ঘরে ফিরতে হয়। এর একই সময়ে ইরানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাব্রিজের পরিস্থিতি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সেখানকার বেশ কিছু সেনা সদস্য ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দেয় এবং শাহের অনুগত সেনাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে।

 

১৯৭৯ সালের পহেলা জানুয়ারি। শাহের বাহিনী ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মাশহাদ শহরে গণহত্যা চালায়। শত শত মানুষ হতাহত হয়। অন্যান্য শহর থেকেও সংঘর্ষের খবর আসতে থাকে। জেনারেল আযহারির নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার বিপ্লবী আন্দোলন স্তব্ধ করার লক্ষ্যে নৃশংসতার মাত্রা বৃদ্ধি করে।
অন্যদিকে, শাহের পতন নিশ্চিত বুঝতে পেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি ও বৃটেনের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানরা ক্যারিবিয়ান সাগরের পূর্বে অবস্থিত গুয়াদেলুপ দ্বীপে এক বৈঠকে বসে। সেখানে তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, বিপ্লবীদের আন্দোলনের কারণে শাহ আর টিকে থাকতে পারবে না,ফলে তাকে ক্ষমতা ছাড়তেই হবে। পাশাপাশি তারা এও বলে যে, ইমাম খোমেনী(রহঃ)-র অনস্বীকার্য অবস্থানের কারণে তার সাথে আলোচনায় যাওয়াটাই মঙ্গলজনক হবে।

 

এই বৈঠকের একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেদেশের নৌবাহিনীর তৎকালীন উপ-প্রধান রবার্ট হাইযারকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে ইরানে প্রেরণ করে। ইরানের সেনাবাহিনীকে সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত করাই ছিল তার প্রধান দায়িত্ব। গুয়াদেলুপ দ্বীপে ইরান সম্পর্কে বৈঠক এবং সেনা অভ্যুত্থানের জন্য নৌ কর্মকর্তাকে তেহরানে প্রেরণের ঘটনা, ইরানের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের স্পষ্ট প্রমাণ। বৃটেনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শাহ সরকারের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল এবং শাহ মার্কিন ইঙ্গিত ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্তই গ্রহণ করতো না।

শাহ বহু বার প্রকাশ্যেই মার্কিন নীতি অনুসরণের কথা বলেছেন। মার্কিন নীতি বাস্তবায়ন করতে যেয়ে শাহ জনগণের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টিকে সব সময় উপেক্ষা করেছেন। ইরানে মহান বিপ্লব সফল হবার এটিও ছিল একটি কারণ। ইরানি জনগণ সব সময় স্বৈরাচারী শাহকে হঠিয়ে জনকল্যাণমুখী সরকারের হাতে দেশের পরিচালনাভার হস্তান্তরের চেষ্টা করে আসছিল। ইসলামী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাদের সে প্রত্যাশা পূর্ণ হয়।

 

বিপ্লবের দিনগুলি-৮

পাঠক! গত আসরে আমরা বলেছি, ১৯৭৮ সালের ১০ ও ১১ই ডিসেম্বর সারা ইরানে লাখ লাখ মানুষ স্বৈরাচারী শাহের পতনের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শনের পর শাহের বাহিনী পহেলা জানুয়ারি পবিত্র মাশহাদ শহরে নারকীয় গণহত্যা চালায়। এর ফলে জনগণ আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। আজ আমরা ঐ গণহত্যা পরবর্তী উত্তাল পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করব।

 

বিপ্লব বিজয়ের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। আশুরার মিছিলে ৪০ লক্ষাধিক মানুষের অংশগ্রহণের কারণে হতভম্ব শাহ ও মার্কিন সরকার এটা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, সহিংসতা চালিয়ে আর কোন লাভ হবেনা বরং তা বিপ্লবের বিজয়কেই আরও ত্বরান্বিত করবে। এ অবস্থায় শাহ এমন একজনকে প্রধানমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত নেন,যিনি সবার কাছেই কিছুটা হলেও গ্রহণযোগ্য হবেন। ইমাম খোমেনী শাহের এ সিদ্ধান্তের পেছনের অশুভ উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হন এবং স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, যে ব্যক্তিই শাহের সাথে সাক্ষাত করবে, গোটা ইরানি জাতি তাকে প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু অবশেষে ১৯৭৯ সালের ছয়ই জানুয়ারি শাহপুর বাখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করতে রাজী হন এবং সবাইকে এ প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি দূর্নীতির মোকাবেলা করবেন ও জনগণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবেন। শাহপুর বাখতিয়ার এমন সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন যখন দেশের বেশীর ভাগ অঞ্চলই বিপ্লবীরা নিয়ন্ত্রণ করছিল। ইমাম খোমেনী (রহঃ)-ও এক ঘোষণায় বাখতিয়ারের সরকারকে অবৈধ হিসেবে অভিহিত করেন এবং ঐ সরকারের সাথে কোন ধরনের সহযোগিতা না করতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

 

ইমাম খোমেনী (রহঃ) ১২ই জানুয়ারি বিশিষ্ট আলেম ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে ইসলামী বিপ্লবী পরিষদ গঠন করেন,যাতে অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা যেতে পারে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের অংশগ্রহণে পূর্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে অনুগত একটি পরিষদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে ১৩ ই জানুয়ারি রাজতান্ত্রিক পরিষদ গঠন করে। পাশাপাশি মার্কিন বিশেষ প্রতিনিধিও ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে শাহকে দেশ ত্যাগে রাজি করাতে সক্ষম হন। শাহকে বোঝানো হয়, রাজতন্ত্র ও মার্কিন স্বার্থে আপাতত তার দেশ ত্যাগ করা উচিত।

 

এ অবস্থায় শাহ ১৬ই জানুয়ারি মিশর চলে যান। এর ফলে গোটা ইরানে আনন্দের জোয়ার বইয়ে যায়। এ উপলক্ষ্যে জনতা একে অপরকে মিষ্টি খায়িয়ে উৎসব পালন করে। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের স্কোয়ারগুলো থেকে শাহের মূর্তি নামিয়ে ফেলা হয়। সে সময় ইমাম খোমেনী (রহঃ) এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানি জাতিকে এটা বুঝতে হবে শাহের দেশত্যাগ মানেই বিজয় নয়। তবে তা বিজয়ের পথে অগ্রগতি।

 

শাহের দেশত্যাগের পর তার ঘনিষ্ঠজন ও আত্মীয় স্বজনদের মধ্যেও দেশত্যাগের হিড়িক পড়ে যায় এবং তারা সাথে করে বিপুল অর্থ-কড়ি নিয়ে বিদেশ চলে যায়। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক প্রতিবেদনে বলেছিল, সে সময় প্রায় এক হাজার তিন'শ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। যাইহোক শাহের দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে ৫৩ বছরের পাহলাভি রাজতন্ত্রের পতন যে অনিবার্য,তা সবাই উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাল না ছেড়ে ইরানের সেনাবাহিনীকে সেনা অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত করে। কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি।
১৯৭৯ সালের ১৯ শে জানুয়ারি। ইমাম হোসেন(আ:)-র শাহাদাতের চেহলাম বার্ষিকী। সেনা অভ্যুত্থানের গুজবকে গুরুত্ব না দিয়ে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ঐ দিনের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের পর একটি ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। ঐ ইশতেহারে স্বৈরাচারী শাহের রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও প্রধানমন্ত্রী শাপুর বাখতিয়ারের নেতৃত্বাধীন সরকারকে অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়। ইমাম খোমেনী (রহঃ) ঐ বিক্ষোভ মিছিলের পর এক বার্তায় জানান যে, তিনি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দেশে ফিরে আসবেন। পাশাপাশি তিনি ইরানের সংসদ ও রাজতান্ত্রিক পরিষদের সদস্যদের পদত্যাগের আহ্বান জানান।


ইমাম খোমেনী(রহঃ)-র স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘোষণার পর প্রতিটি মুহুর্তই আরও ঘটনাবহুল হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন শহরে প্রতিদিনই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হতে থাকে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বিপ্লবীদের হতাহত হবার খবর প্রকাশ হতে থাকে। আর এ পর্যায়ে এসে সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীতেও শাহের বিরোধিতা বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৯ সালের ২০ শে জানুয়ারি দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাস বিমান ঘাটির বেশ কিছু অফিসার ও সদস্য, বিপ্লবীদের সাথে যোগ দেয়। তাদের পথ ধরেই আরও অনেকে জনগণের পাশে এস দাড়ায়। পাশাপাশি কিছু বিপ্লবী সেনা সদস্যকে আটক ও তাদেরকে মৃত্যুদন্ড দেয়ার খবরও প্রকাশিত হয়।

 

অন্যদিকে, শাহের অনুপস্থিতিতে দেশ পরিচালনার জন্য গঠিত রাজতান্ত্রিক পরিষদের প্রধান সাইয়্যেদ জালাল উদ্দিন তেহরানি, ইমাম খোমেনী (রহঃ)-র সাথে সাক্ষাত করতে ফ্রান্সে যান। ইমাম তার সাথে সাক্ষাত করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি এর আগেই ঘোষণা করেছিলেন যে, শাহী সরকারের কর্মকর্তাদের সাথে তিনি তখনি কেবল সাক্ষাত করবেন যখন তারা তাদের পদ থেকে সরে দাড়াবে। ইমাম খোমেনী(রহঃ), সাইয়্যেদ জালাল উদ্দিন তেহরানিকেও পদত্যাগ ও রাজতান্ত্রিক পরিষদ বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিতে বলেন। জালাল উদ্দিন তেহরানি রাজতন্ত্রের পতন অনিবার্য দেখে ইমামের কথা অনুযায়ী পদত্যাগ করেন এবং ইমামের সাথে সাক্ষাতের অনুমতি লাভ করেন।


ইমাম খোমেনী দেশে ফিরবেন, এ খবর বিপ্লবীদের মনোবল চাঙ্গা করলেও শাহ সরকার ও তার দোসররা উদ্বেলিত হয়ে পড়ে। তারা জানতো ইমাম ইরানে প্রবেশ করার সাথে সাথে চূড়ান্ত বিজয়ের পথে যাত্রা আরও ত্বরান্বিত হবে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শাপুর বাখতিয়ার দেশের সকল বিমানবন্দর বন্ধ করে দেয় এবং তেহরানের মেহরাবাদ বিমান বন্দরে ভারী অস্ত্র মোতায়েন করে। ইমামকে অভ্যর্থনা জানাতে যেসব ইরানি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল,তারা এ পদক্ষেপের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী বাখতিয়ার জনগণের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রমাণ করার লক্ষ্যে প্যারিসে ইমাম খোমেনী (রহঃ)-র সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছে ব্যক্ত করে। কিন্তু ইমাম ঘোষনা করেন, বাখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাড়ালেই কেবল তার সাথে বৈঠক হতে পারে। এ অবস্থার মধ্যে স্বৈরাচারী শাহ ও প্রধানমন্ত্রী বাখতিয়ারের পক্ষে খুব অল্প সংখ্যক মানুষ মিছিল বের করে। এই মিছিল থেকেই আরেকবার প্রমাণিত হয় যে, ইরানের মাত্র হাতে গোনা কিছু মানুষ শাহকে সমর্থন করছে, বাকী সবাই তার পতন চাচ্ছে।

 

১৯৭৯ সালের ২৭ শে জানুয়ারি ইরানের আলেমরা বিমান বন্দর বন্ধের প্রতিবাদে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন। তারা ঘোষণা করেন যে, বিমান বন্দরগুলো খুলে না দেয়া ও ইমাম খোমেনীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে। আলেমদের অবস্থান ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রতিদিনই বহু মানুষ মিছিল নিয়ে মসজিদের দিকে যেতেন। এ সময় শাহের বাহিনীর গুলিতে বেশ কয়েক জন বিক্ষোভকারী হতাহত হয়। অন্যান্য শহরেও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে।

১৯৭৯ সালের ২৭ শে জানুয়ারি সারা ইরানে লাখ লাখ মানুষ ইমামের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পথে বাধা অপসারণের জন্য বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এর পরের দিন তেহরানসহ অন্যান্য শহরে শাহের লুটেরা বাহিনীর গুলিতে শত শত মানুষ শাহাদাৎবরণ করেন। এই হত্যাকান্ডের পর জনগণ আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। উপায়ান্তর না দেখে শাপুর বাখতিয়ার বিমানবন্দরগুলো খুলে দেয়ার ঘোষণা দেয়। এর মধ্য দিয়ে ইমামের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পথে বাধা দূর হয়। ইরানের নানা প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ ইমাম খোমেনী (রহঃ)-কে স্বাগত জানাতে রাজধানী তেহরানে এসে সমবেত হন। ইমামের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত জেনে শাহের মার্কিন উপদেষ্টারা দ্রুত ইরান থেকে চলে যেতে থাকে। অন্যদিকে, ইমামকে স্বাগত জানাতে যাতে বেশি সংখ্যক মানুষ সমবেত না হয়, সে লক্ষ্যে সেনা অভ্যুত্থান ও ইমাম খোমেনী(রহঃ)-কে বহনকারী বিমানকে ধ্বংস করা হবে বলে গুজব রটানো হয়।

 

নানা গুজব আর আশংকার মধ্য দিয়ে একদিন প্রতীক্ষার পালা শেষ হলো। ১৯৭৯ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে নয়টায় ইমামকে বহনকারী বিমানটি তেহরানের মেহরাবাদ বিমান বন্দরে অবতরণ করে। ইমাম মেহরাবাদ বিমান বন্দরে পৌছে সংক্ষিপ্ত ভাষণে সর্বস্তরের মানুষকে ধন্যবাদ জানিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। এরপর তিনি বিপ্লবী আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন,তাদের করব যিয়ারত করেন। ইমাম যখন তেহরানের দক্ষিণাঞ্চলে শহীদদের কবরস্থান 'বেহেশতে যাহরা'য় যাচ্ছিলেন,তখন লাখ লাখ মানুষ রাস্তার দুপাশে দাড়িয়ে ইমামকে শুভেচ্ছা জানান। সেদিন প্রায় আশি লক্ষ মানুষ তেহরানে সমবেত হয়েছিলেন। ইমাম খোমেনী (রহঃ) শহীদদের কবরস্থান যিয়ারতের পর সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন।

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন